নামাবলি

রেহানা বীথি ১৩ মে ২০২০, বুধবার, ১০:৪৪:৪২পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ১৭ মন্তব্য

এইসব আবার কেমুন নাম? শিউলী-বীথি, সালাম-রুবা এগুলান কুনু নাম হইলো? নাম হইলো গিয়া আমার দুই পোলার!

তা কী নাম তোমার ছেলেদের?

ভ্যালা আর ফ্যালা। কন তো আম্মা, সুন্দর নাম না?

মুচকি হেসে আম্মা বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালো নাম তোমার ছেলেদের। কে রেখেছিল নামগুলো, তুমি না ছেলেদের বাপ?

তাগো বাপেই রাখছিলো। বড় ভালা মানুষ আছিলো গো আম্মা! খালপাড়ে যদি সাপের কামড় না খাইতো, আইজকা হেই বাঁইচা থাকতো আর আমারও এমুন কইরা কপাল পুড়তো না। কত শখ কইরা পোলাগো নাম রাখছিলো, কিন্তু অসময়ে ওইপারে চইলা গেলো!!

এই হল ভ্যালার মায়ের জীবনবৃত্তান্ত। মিশমিশে কালো গায়ের রঙ আর লিকলিকে লম্বা শরীর। দাঁতে সমানে গুল ঘষা আর বিড়ি ফুঁকার কারণে দাঁতগুলোও তার প্রায় কালো বর্ণ ধারণ করেছিল। কিন্তু তবুও যখন ছেলেদের নিয়ে তার স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কথা স্মরণ করে হাসি দিতো, তখন কী যে ভালো লাগতো দেখতে! তার ঘন কৃষ্ণবরণ মুখটায় যেন আলো খেলে যেতো একরাশ। স্বপ্নালু চোখদুটোতে তার চিকচিক করে উঠতো আনন্দের অশ্রু। ছোটবেলায় দেখা সেই ভ্যালার মা’কে ভুলতে পারিনি আজও। নিজের ছেলেদের নাম ছিল তার কাছে সেরা নাম। নামগুলোর ব্যাখ্যা যখন তার কাছে শুনতাম, হেসে গড়িয়ে পড়তাম আমরা। তাই দেখে তার সে কী রাগ! বলতো, আমার পোলাগো নাম শুইনা তো তাও তোমরা হাসবার পারতাছো, কিন্তু তোমাগো নাম শুইনা হাসুম না কান্দুম তাই তো বুঝবার পারি না!

ভ্যালার মায়ের কথা আপাতত থাক। নিজের নাম নিয়ে কিছু কথাই বরং বলি এখন।
অত্যন্ত রূপবান আর রূপবতী বাবা-মায়ের সন্তান আমি। তাঁদের প্রথম সন্তান, অর্থাৎ আমার বড়বোন, সেও তাঁদের রূপ পেয়েই এসেছিল পৃথিবীতে। কিন্তু আমি? নাহ্, মোটেই ফুটফুটে রূপ নিয়ে জন্মাইনি। বহু সাধনার পর আমার বড় বোনের জন্ম হয়। তারও সাড়ে চারবছর পর আমার দাদী সৃষ্টিকর্তার কাছে বহু কান্নাকাটি করে নাকি আমার আগমন ঘটেছিল। কান্নাকাটির কারণ ছিল, তাঁর বড় ছেলে কি একসন্তানের পিতা হয়েই থেকে যাবে? কালো হোক, ফর্সা হোক, হোক ছেলে কিংবা মেয়ে, আর একটা সন্তান যেন তাঁর পুত্রের হয়! সেকারণেই আমার গায়ের রঙটা তাঁদের কাছে গুরুত্বহীন ছিল। প্রথমবার যখন আব্বা আমাকে কোলে নেন, তখন নাকি আমি আমার ঠোঁটজোড়া পাখির মতো করে নাড়াচ্ছিলাম। সেই দেখে আব্বার শখ জাগে, তাঁর সদ্য ভূমিষ্ট কন্যাটির নাম রাখবেন ময়না। কিন্তু আমার মা বাঁধ সাধেন। বলেন, গায়ের রঙ ময়লা, যদি বড় হয়ে মন খারাপ করে নামের কারণে!
সত্যিই তো! আব্বা তৎক্ষণাৎ গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন এবং তাঁর কালো কন্যাটির নাম রাখলেন ‘বীথি’।

সেই থেকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলাম এই নাম নিয়েই। কেউ কেউ অবশ্য আমার বিচ্ছুমার্কা স্বভাবের কারণে বীথির আগে ওই ‘বিচ্ছু’ শব্দটি জুড়ে দিতো, কিন্তু খুব বেশি হেনস্তা হতে হয়নি কখনোই । স্কুল, স্কুল পেরিয়ে কলেজ, এ পর্যন্ত ঠিকঠাকই চলছিল। বিপত্তি বাঁধলো ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে। একদিন…. … ক্লাস নিচ্ছেন আসমা সিদ্দিকা ম্যাডাম। পড়া বোঝাচ্ছেন, আমরাও খুব বুঝছি হ্যাঁ হুঁ করে করে। একসময় তিনি পড়া বোঝাতে বোঝাতে মনে মনে চলে গেলেন যেন কোন সুদূরে! বললেন,

“যদি কোনও জিনিস তোমাদের খুব ভালো লেগে যায়, সেটা সম্পর্কে তোমাদের অনুভূতি কী? জিনিসটার প্রতি একটা গভীর মায়া কাজ করে, তাই তো? কিন্তু তোমরা কি সে মায়ার প্রকাশ করার জন্য সঠিক কোনও শব্দ খুঁজে পাও? ঠিক তেমনই কোনও কোনও সৌন্দর্য ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না।”
এ পর্যন্ত বলেই তিনি আমার দিকে নির্দেশ করে বললেন, “তুমি একটু দাঁড়াও তো!”

মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, কী দোষ ধরা পড়লো ম্যাডামের চোখে কে জানে! দুরুদুরু বুকে উঠে দাঁড়ালাম। পুরো ক্লাসের দৃষ্টি তখন আমার দিকে, চোখে জিজ্ঞাসা। আমার দুই কান তখন অপমানের আশঙ্কায় ঝাঁ ঝাঁ করছে।
কিন্তু ম্যাডামের কণ্ঠে আশ্চর্য কোমলতা। আমার নাম জানতে চাইলেন, বললাম।

ম্যাডাম যেন তখন ভিনগ্রহের বাসিন্দা আমার কাছে। আর সেই গ্রহ থেকেই যেন ভেসে এল তাঁর কণ্ঠস্বর। বললেন…..
“বীথির মুখটা দেখো! কেমন যেন একটু আলাদারকম। একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে ওর মুখটা দেখলেই। আর সে ভালোলাগাটুকু প্রকাশের যথাযথ কোনও ভাষা নেই। যেমন ধরো ‘নিমকি’, কিছুটা নোনতা আর মুচমুচে। আমরা পছন্দ করি সবাই, কিন্তু কি কারণে পছন্দ করি, সেটা ঠিক বোঝাতে পারি না। ওর মুখটা দেখে কেন যেন আমার সেই তুলনাটাই মনে এলো। ব্যাখ্যাহীন ভালোলাগা একটা মুখ।”

বাপরে বাপ!! ম্যাডামের এমনধারা বক্তব্য শুনে আমি তো থ! আবেগে চোখও ভিজে যাবার জোগাড়! অন্যেরা তুলেছে মৃদু গুঞ্জন। ম্যাডাম চলে যেতেই সেই গুঞ্জন রূপ নিলো তুমুল হট্টগোলে। সবাই শুরু করে দিলো আমাকে নিয়ে আলোচনা, হাসাহাসি। আমার ঝাঁ ঝাঁ করা কান দিয়ে তখন আগুনের হল্কা বেরোচ্ছে। এ কী সর্বনাশ করলেন ম্যাডাম!
এই ফাঁকে আমার পিতৃপ্রদত্ত নামটা হটিয়ে ওই ‘নিমকি’ নামেই ডাকতে থাকলো সবাই। এ আলোচনা, গুঞ্জন অব্যাহত থাকলো পরবর্তী কয়েকদিন। যার ফলে সেদিন যারা অনুপস্থিত ছিল, জেনে গেল তারাও। আর তাতে করে
‘নিমকি’ নামটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করলো এবং ভার্সিটির শেষ দিনটি পর্যন্ত বন্ধুরা আমাকে সে নামে ডেকে বেশ আনন্দ অনুভব করতে থাকলো। প্রথম প্রথম বিরক্ত, তারপর ততটা নয়, তারপর গা সওয়া হয়ে গেল সেই নাম।
আমার নামের বৃত্তান্ত এ পর্যন্তই। বাড়ির কারও সামনে ঘুণাক্ষরেও ওই নাম নিয়ে টু শব্দ করিনি, সেকারণে জানেই না কেউ। এমনকি আমার একসময়ের প্রেমিক কাম বরকেও বলিনি। সময়ের ব্যবধানে মিলিয়ে গেল সে নাম। বীথি, বীথি হয়েই স্বদর্পে বিরাজমান রইল।

কিন্তু…… তার পরেও কথা থেকে যায়! একদা চাঁপাইনবাবগঞ্জ কোর্টে বিজ্ঞ সাবজজ হিসেবে জয়েন করে আমার সেই ভার্সিটির এক বন্ধু এবং এখানেও সে নিমকি নামটির প্রচারে বেশ তৎপর হয়। দু’চারজন জেনেও ফেলে।
সব্বোনাশ!!!
এই বুড়ো বয়সে আর নাম খোয়াতে চাই না, ক্ষমা দে বন্ধু!!

১০৮জন ৫জন
0 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য