সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

নামাজ

স্বপ্ন নীলা ১৯ জানুয়ারী ২০২১, মঙ্গলবার, ০৮:২৩:২১অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২২ মন্তব্য
নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য ফরজ। তাই মুসলমান মাত্রই দল-মত-নির্বিশেষে নামাজ পড়তেই হবে। গভীর বিশ্বাস-আস্থা-বিনয়, সুরার অর্থ বুঝে, মানুষের কল্যানের জন্য কমিটমেন্ট নিয়ে মহান আল্লাহর সামনে ৫ বার দাঁড়ালে মনটাই একটা অনাবিল শান্তিতে ভরে ওঠে।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনা এবং তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্য দান করার পর ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায। এটা আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে খাস একটি ইবাদত।
কেউ আল্লাহর ওপর ঈমান আনলে, কালেমা পাঠ করলে, তার জন্য নামাজ ফরজ হয়ে যায়। নামাজের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম। আজানের মধ্যে নামাজের আহবান জানানো হয় এই বলে: ‘নামাজের জন্য এসো।’ এরপরই বলা হয়, ‘কল্যানের জন্য এসো।’ এ থেকে বোঝা যায় যে নামাজের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যান।
নামাজ ইসলামের মূল পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইসলাম পাঁচটি খুঁটির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া ইলাহ্ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মদ (স) আল্লাহ রাসুল এ কথার সাক্ষ্য দান, নামাজ কায়েম করা, জাকাত দেওয়া, হজ করা ও রমাদান এর সিয়াম পালন করা।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পৃষ্ঠা: ১৬, হাদিস: ৭)।
:
নামাজ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা রয়েছে ৮২ বার। নামাজের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহ তাআলা কোরআন কারিমে বলেন, ‘আমিই আল্লাহ আমি ব্যতিত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে নামায কামে কর।’ (সুরা-২০ ত্বোয়াহ, আয়াত: ১৪)।
:
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন । নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গির্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।’ (সুরা-২৯ আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)।
:
আল্লাহ তাআলার যে বান্দা দৈনিক পাঁচবার আল্লাহ তাআলার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি গায়, তাঁর সামনে ঝোঁকে ও সিজদাবনত হয় এবং দুআয় নিমগ্ন হয়, সে বান্দা আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও মুহাব্বতের অধিকারী হয়ে যায়। তাঁর গোনাহখাতা ঝরে যেতে থাকে, পাপের পঙ্কিলতা থেকে জীবন শুদ্ধ হতে থাকে, অন্তর আল্লাহ তাআলার নূরে নূরান্বিত হয়ে ওঠে। হাদীস শরীফে নবীজী বড় সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন-
বলো তো, তোমাদের কারো ঘরের পাশেই যদি নহরনালা বহমান থাকে, আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবারা বললেন, ইয়া রাসুল ! কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবীজী বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও উদাহরণ তেমন। এর বরকতে বান্দার গোনাহখাতা মাফ হয়ে যায়। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৬৭
:
বে-নামাযীর লাঞ্চনাকর অবস্থা:
কেয়ামতের দিন বেনামাযী সর্ব প্রথম যে অপদস্থতা ও লাঞ্ছনার শিকার হবে তা কোরআন শরীফের আয়াতে তার বিবরণ এসেছে–
”গোছা পর্যন্ত পা খোলার দিনের কথা স্মরণ কর, সিদিন তাদেরকে সেজদা করতে আহবান জানানো হবে, অতঃপর তারা সক্ষম হবে না “। সূরা ৬৮, আয়াত ৪২
তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে; তারা সুস্থ্য ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল, তখন তাদেরকে সেজদা করতে আহবান জানানো হতো “। সূরা ৬৮, আয়াত – ৪৩
 
যার মর্ম নিম্নরূপ
কেয়ামতের সেই কঠিন দিনে যখন আল্লাহ তাআলার বিশেষ নূর প্রকাশ পাবে এবং সকল মানুষকে সিজদায় পড়ে যেতে বলা হবে, তখন (যে খোশনসীব দুনিয়াতে নামায পড়তো, সে তো সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু) যারা নামায পড়তো না, তারা সিজদার জন্য ঝুঁকতেই পারবে না। (কারণ তাদের কোমরকে কাঠের মতো শক্ত করে দেওয়া হবে।) ভয় ও লজ্জার কারণে তাদের চক্ষু অবনমিত থাকবে। লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার আযাব তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। এ শাস্তি এই জন্য যে, দুনিয়াতে তাদেরকে সিজদার প্রতি আহ্বান করা হতো, যখন তারা সুস্থ সবল ছিলো। তা সত্ত্বেও তারা সিজদায় ঝুঁকে পড়তো না।
:
আসুন আমরা সবাই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভাষায় দুআ করি,
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ. رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
হে আমার আল্লাহ! আমাকে এবং আমার বংশধরদেরকে নামাযী বানিয়ে দাও। হে আমাদের মালিক! আমাদের এ দুআ তুমি কবুল করে নাও। ওহে আমাদের প্রভু! আমাকে, আমার মাতাপিতাকে এবং সকল ঈমানদারকে কেয়ামতের দিন তুমি ক্ষমা করে দিও। সূরা ১৪, আয়াত ৪০-৪১
:
নামায সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি:
আমি নামাজ এবং ইসলাম ধর্মের অন্যান্য বিষয়ের অনেকের সাথে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। দেখেছি যে অনেকে নামাজ পড়ছে আবার ইসলাম কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজগুলিও নিয়মিত চর্চা করছে, আবার অনেকে নামাজ পড়ছে দুই একটি বড় ধরণের অন্যায় কাজ হেলেদুলে ঠিকই করছে। তখন খুবই দ্বিধায় পড়ে যাই। আবার কিছু মানুষকে দেখেছি তারা নামাজও পড়ছে এবং অন্যান্য নির্দেশিত হুকুমগুলো চর্চা করার চেষ্টা করছে। নামাজ বিষয়ে আমার কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি—
– যখন কেউ নামাজ পড়ে তখন বুঝতে হবে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আর আমিই তার কাছেই নিজেকে নিবেদন করছি।
– প্রকৃত নামাজী কোরআন এবং সুন্নাহ’র আলোকে নিজের জীবন পরিচালিত করে।
– যে প্রকৃতপক্ষে নামাজের মা্ধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করে সে কখনোই অপর ধর্মের কারো ক্ষতি করতে পারে না। যদি ক্ষতি করে তবে সে আসলেই ভন্ড ধার্মিক এবং সে লোক দেখানোর জন্যই নামাজ পড়ছে।
-যে প্রকৃতপক্ষে নামাজ পড়ে সে মানুষের কল্যানে নিজেকে নিবেদন করে। বিপদে-আপদে অপরের পাশে দাঁড়ায়।
– প্রকৃত নামাজী কখনোই অপরকে বিদ্রুপ, উপহাস করে না, কখনোই কাউকেই ছোট করে না। রাগকে নিয়ন্ত্রন করে। তার দ্বারা কখনোই মারামারি হানাহানি, খুনাখুনি হয় না।
-প্রকৃত নামাজী ধনী দরিদ্রদের মাঝে ভেধাভেদ করে না। সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করে।
– প্রকৃত নামাজী নারীদেরকে সম্মান করে এবং চোখ এবং মনের পর্দা রক্ষা করে। তার দ্বারা কোন নারী নির্যাতিত, ধর্ষিত হয় না। দ্বাম্ভিকতা পরিহার করে এবং বিনয়ী হয়।
– পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে এবং অন্যান্যদেরকে পরিচ্ছন্ন থাকতে উৎসাহিত করে।
– সুদ, ঘুষসহ অন্যান্য হারাম কাজ, শিরক ইত্যাদি হতে সে হাজার মাইল দূরে থাকে
-প্রকৃত নামাজী যাকাত ঠিকমত দেয় এবং তার যাকাতে অন্যান্যরা উপকৃত হয়। আগামীতে যাকাত গ্রহীতা নিজেই যাকাত দিতে সক্ষম হয়।
-প্রকৃত নামাজী কখনোই ঠক, প্রতারনা, জালিয়াতি, দুর্নীতি করে না এবং ২ নম্বরী জিনিস ১ নম্বরী করে বিক্রি করে না, অতি মুনাফা আদায় করে না, ক্রেতাকে হয়রানী করে না
– প্রকৃত নামাজী কখনোই এতিমদের ঠকায় না, তাদেরকে হেফাজত করে, তাদের মালামাল আমানত রাখে এবং পরে তা ফেরত দেয়।
– যে কোন ধর্মের কেউ তার কাছে আমানত রাখলে পরে তা ফেরত দেয়, ধার নিলে কমিটমেন্ট অনুযায়ী উক্ত ধার পরিশোধ করে।
-স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মেনে চলে এবং কমিটমেন্ট রক্ষা করে।
– প্রকৃত নামাজী আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে, ধনী গরীব ভেদাভেদ করে না, পরিবার, প্রতিবেশী ও গরিবের হক পালন করে।
-প্রকৃত নামাজী স্ত্রী-স্বামী পরষ্পরকে সম্মান করে, মা-বাবাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্মান করে এবং দায়িত্ব পালন করে, উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির সঠিক বন্টন করে, কখনোই অন্যের সম্পত্তি নিজের বলে চালিয়ে দেয় না।
– সন্তানদেরকে প্রকৃত শিক্ষায় মানুষ করে গড়ে তোলে।
– পরিবার, প্রতিবেশীদের কেউ অসুস্থ্য/বিপদ হলে তাদের খোঁজ নেয় এবং প্রয়োজনে সাধ্যমত সেবা / সহযোগিতা করে।
– নেতিবাচক সমালোচনা করে সময় কাটায় না, সমালোচনা পরিহার করে এবং অন্যদের সমালোচনা পরিহার করতে উৎসাহী করে।
– প্রকৃত নামাজী সব সময়ই মোনাফেকী করা হতে বিরত থাকে।
– প্রকৃত নামাজদারী সব সময় বিনয়ী হয়, তার আচরণ দ্বারা অন্য কেউই কষ্ট পায় না।
– বিলাসিতার ভেতর গা ভাসিয়ে অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে না। বৈধভাবে উপার্জনের কিছু অর্থ/সম্পদ দরিদ্র মানুষদের কল্যানে দান করে।
-সৎ, চিরত্রবান হয়। জোর করে কারো উপর কোন কিছুই চাপিয়ে দেয় না ।
– অন্যায়কে ন্যায় বলে কখনোই কোন অবস্থাতেই মেনে নেয় না এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।
:
আমরা বিশ্বাস করি: লা~ইলা-হা ইল্লাল্ল-হু মুহাম্মাদুর রসূলুল্ল-হ্‌ । অর্থ- আল্লাহ্ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নাই, মুহাম্মাদ (সা:) তার প্রেরিত রসূল।
:
নামাজ কিভাবে পড়তে হবে সে সম্পর্কে অনেক বই বাজারে আছে। তবে নামাজ পড়ার সময় অবশ্যই সহীহভাবে নামাজ পড়তে হবে। আসুন ! আমরা নিজেরা সহীহভাবে নামাজ পড়ি এবং অন্যদেরকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করি এবং সেইসাথে নিজেদেরকে পরিপুর্ণভাবে মানুষের কল্যানে নিজেদেরকে নিয়োজিত করি।
:
নোট: পবিত্র কোরআনের অর্থ বুঝে পড়লে প্রত্যেকটা বিষয়সূহ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পাওয়া যায়। সেইসাথে সহীহ হাদিসগুলো পড়াও জরুরী । তাই আর দেরী নয়, আসুন ! কোরআন এবং হাদিসসূহ পড়ি এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করি এবং অন্যদেরকে সেই আলোকিত পথ অনুসরন করার জন্য উৎসাহিত করি।
৩০৮জন ১৫৫জন
11 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য