নাক ডাকা ভালবাসা

মনির হোসেন মমি ৩০ জুন ২০১৯, রবিবার, ০৯:০৪:১৬অপরাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য

তুমি আমার স্বামী
আমি তোমার বধু
খোদার পরে
আমি তোমায় বড় বলে জানি……

আহা কি রোমান্টিকরে বাবা! মানে এ জীবনটা যেন তার স্বামীর জন্য বলিদান হতে প্রস্তুত।বিয়ের আগে প্রেমিক প্রেমিকা মানে আমাদের আবুল আর ফুলবানু বোটানিক্যাল গার্ডেনে জমিয়ে প্রেম করছেন।
আবুলঃ হেগো, তোমাকে না আজ খুব সুন্দর লাগছে!
ফুলবানুঃ ও তাই! তা কেমন সুন্দর লাগছে আমায়?
আবুলঃ ঠিক যেন ডানা কাটা পরী!
ফুলবানুঃ কি যে কও না তুমি! আমি কি আর অতো সুন্দর নাকি ?
আবুল ঃ খোদার কসম তুমি একদম নীল ডানা কাটা পরী।
ফুলবানুঃ এতোক্ষণতো কইলা আমি ডানাকাটা পরী আর এহন কইতাছো নীলপরী।নীলতো কালোর মতই।
আবুল ঃ আরে না, এই নীল সেই নীল না…এটা হল সাহিত্যিকের ভাষায়..মানে অনেক সুন্দরী।
ফুলবানুঃ ওতাই কও,,,।
প্রত্যাক প্রেমীকে কাছ হতে প্রেমীকারা তার রূপের এমন প্রশংসা শুনে যেন লজ্জায় মরে তার দেহমন।ঠিক সেই সময় ফুলবানুর মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠে।রিসিভ করে কথা বলতে লাগলেন।পাশে বসা প্রেমিক ইশারায় বার বার জানতে চাচ্ছেন কে ফোন করেছেন।কে শুনে কার কথা আবুলকে পাত্তা না দিয়েই ফুলবানু তার মোবাইলে কথার খৈ ফুটিয়েই চলছেন। এদিকে আবুল প্রেমিকার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে না পেরে বসা অবস্থায়ই একটি গাছে হেলান দিয়ে  নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।

নাক ডাকার এমন শব্দ যে তাদের পাশ দিয়ে যারাই যাচ্ছেন সবাই এক বার হলেও তার নাক ডাকার শব্দ ও ভঙ্গিমা খুব ভাল ভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছেন।এর মধ্যে এক টিভি রিপোর্টারের ক্যামেরায় তাদের দিকে তাক করে উপস্থাপক তাদের কাছে গেলেন।তখনো আবুল প্রচন্ড শব্দে শব্দ করে ঐ অবস্থায় ঘুমাচ্ছেন।ভুরিটা একটু বাড়তি ছিলো বলে  তার নাক ডাকা আর সেই সাথে ভূড়ির উঠা নামায় মনে হচ্ছিল এ যেন ঢেউয়ের সাথে সাগরের গর্জন।ফুলবানু রিপোর্টারকে দেখে মোবাইলে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন।রিপোর্টারের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন ফুলবানু।ফুলবানুতো মহা খুশি,নিজেকে টিভিতে দেখাবে তাই তার সাজগুজটা একটু হাত নাড়িয়ে ঠিক করে নিলেন।
রিপোর্টারঃ কেমন আছেন আপনি?
ফুলবানুঃ জি ভাল।
-আপনার নামটা একটু বলবেন
-জি ফুলবানু
-আর ওনি কে?
-সেকি আর বলতে হয়!
-খুব ভাল খুব ভাল-তবে ওনি যে ভাবে নাক ডেকে  ঘুমুচ্ছেন… এ সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?
-কি যেন কননা, ওর ওমন নাক ডাকা দেখেইতো ওর প্রেমে পড়েছিলাম।
-বাহ্ চমৎকার কথাতো! তাতে আপনি বিরক্তবোধ করেন না?
-না একটুও না বরং আমার খুব ভাল লাগে।ঘুমের মধ্যে ও’ নাক না ডাকলে আমার যেন মনে হয় আমি অন্য কারোর সাথে আছি।
-ও আচ্ছা।দর্শক এ এক চমকপ্রদ তথ্য বলতে পারি যেখানে নাক ডাকায় পুরো মানবকুল অতিষ্ট সেখানে এ ….কি যেন নামটি…?
-ফুলবানু আর আবুল।
-হ্যা, এই ফুলবানু আর আবুল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন,যা কি না এই নাক ডাকার শব্দে অতিষ্ট জাতি গোষ্টি সেখানে এ ঘটনা সত্যিই বিরল।এর মধ্যে আবুল জেগে অবাক হয়ে রিপোর্টারকে প্রশ্ন করলেন।
-আমাকে কি কিছু বলছেন?
-না ভাইয়া- আপনি ঘুমান।

এতো গেল বিয়ের আগের ঘটনা এবার জানব বিয়ের ছয় সাত বছর পরের ঘটনা।খুব ধুমধাম করে আবুল আর ফুলবানুর বিয়েটা হয়ে গেল।বিয়ের বরমঞ্চে যে আবুল নাক ডাকেনি তাও কিন্তু নয়।বিয়ের পাচ বছরে দু বাচ্চা এক ছেলে এক মেয়ের জনক হন আবুল ।ভুড়ি পেটওয়ালাদের ঘুমের ভাবটা একটু বেশীই হয়।যেখানে যে অবস্থায় থাকুক না কেন, একটু বসতে পারলেই হল-অমনি মাথা নীচু করে ঘুমিয়ে নেন কিছুক্ষণ।অফিসেও আবুলের ঘুমের জুড়ি নেই।বস্ বলে কথা তাই কেউ কিছু বলতে পারেন না তবে নাক ডাকা বাবু এই খেতাবটি অফিসে সকল কর্মচারীদের মুখে মুখে।

ছেলের মুসলমানী বা সূন্নতে খৎনার অনুষ্ঠানে আবুলের শশুড়বাড়ীর লোকজন এসেছে।ঘর ভর্তি মেহমান।দিনের বেলায় যে যার মত আনন্দ করে রাতে সবাই ঘুমের ব্যাবস্থায় ব্যাস্ত।মোটামোটি মেহমানদের ঘুমের স্থানের ব্যাবস্থা ঠিকঠাক মত হয়েছিলো কিন্তু আবুল আর ফুলবানুর সন্তানদের ঘুমের রুম দখলে নেন মেহমানরা।তাই আজ তাদের দু সন্তানই আবুলের বেড রুমে থাকতে হবে।যথারিতী আবুল ফুলবানু আর সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়ল।এক খাট তাই সবাইকে ভাগাভাগি করে শুইতে হল।দু সন্তান খাটের মাঝখানে,আবুল আর ফুলবানু দুজন খাটের দুপ্রান্তে।

রাত যত গভীর হচ্ছে আবুলের নাক ডাকার শব্দও যেন বাড়ছে।ফুলবানুর এমন নাক ডাকা অবস্থায় ঘুমানোর কৌশলটা তার আগেই রপ্ত করা ছিলো।সে দুকানে তুলো দিয়ে ঘুমাত।কিন্তু সন্তান দুটো ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ল। তাদের আব্বুর নাক ডাকার দৃশ্য দেখছে আর না ঘুমাতে পেরে বিরক্তবোধ করে মাকে ডাকছে।
-আম্মু আম্মু..।
কয়েকবার ডাকার পরও তাদের আম্মু যখন শুনছেন না তখন একজন হাত দিয়ে ধাক্কা ডাক দিয়ে ডাক দিল।ফুলবানু তাদের ধাক্কায় হঠাৎ জেগে উঠে কান হতে তুলোগুলো রিমুভ করলেন।সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর নাক ডাকার সেই বিকট বিরক্তিকর শব্দ তার কানে এলো।
-কি! কি হয়েছে ঘুমাও।
-ঘুমাবো কি করে!
সত্যিইতো এমন শব্দে কেউ কি ঘুমাতে পারে! ছেলে মেয়ে দুটোকে কাজের বুয়ার ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘুমানোর ব্যাবস্থা করে
নিজের রুমে ফিরে এলেন।রুমে এসেও তার চোখে এখন আর ঘুম আসছে না।কানে যতো তুলো দিক নাক ডাকার শব্দ যেন অদৃশ্যের ন্যায় কানে বাজছে।ঐ দিকে ছেলে মেয়ে দুটোকে বুয়ার রুমে ঘুমাতে রেখে এসেও চিন্তায় পড়ে গেছেন।ওরা ঠিক মত ঘুমাতে পারবে কি না!।এ পাশ ওপাশ করে কিছুইতেই যখন ঘুমাতে পারছিলেন না তখন আবুলকে ডাকছেন।আবুল অন্য কাত হয়ে শুয়ে স্বপ্ল ঘুমের ঘুরে নাক ডাকছেন আর জবাব দিচ্ছেন।
-কি হয়েছে?
-এইটা কি শুরু করছো…আমাগো কি ঘুমাইতে দিবে না?
-আমি আবার কি করলাম? তোমরা ঘুমাও।
-কেমনে ঘুমাবো।….তোমার নাক ডাকা বন্ধ করবে একটু?
-কৈ আমিতো নাক ডাকছি না!
-হায়রে আমার কপাল! একোন গন্ডাররে লইয়া ঘর করছি!।
মনের জিদে ফুলবানু আবুলের নাক চেপে ধরল।আবুল নিশ্বাস নিতে না পেরে এক ঝাটকায় উঠে বসলেন।
-কি হয়েছে? তুমি আমার নাক চেপে ধরলে কেন? আমাকে মেরে ফেলবে নাকি?
-হ..তোমার নাক ডাকা বন্ধ করো নয়তো….
-কৈ বিয়ের আগেতো তোমার এমন অভিযোগ ছিলো না! তুমিতো সবাইকে বলতে আমাকে এমন নাক ডাকার জন্যই যেন ভালবেসেছো।আমি নাক না ডাকলে নাকি তোমার মনে ভালবাসা জাগে না।
-সেতো বিয়ের আগে।
-মানে, ভালবাসা কি বিয়ের আগে এক রকম আর বিয়ের পর আরেক রকম হয় নাকি ?

ঠিক সে সময় বুয়ার ঘরে ঘুমাতে দিয়ে আসা ছেলে মেয়ে দুটো তাদের রুমে চোখ কচলাতে কচলাতে এসে হাজির।তা দেখে ইশারায় আবুল ওদের ডাক দিয়ে কাছে আনল।
-কি হয়েছে মামণিরা? তোমরা ঘুমাওনি।
ফুলবানুর মুখ গোমরা।সে কিছু বলছেন না।ছেলে মেয়ে দুটোই বলল।
-বুয়ার ঘরে অনেক গন্ধ আর মশা আমরা ঘুমাতে পারছি না।
-বুয়ার ঘরে কেন? তোমরা না এ ঘরে ছিলে?
-ছিলামতো কিন্তু….
-ও বুঝেছি। ঠিক আছে এসো,খাটে এসো-তোমরা মাকে নিয়ে এ ঘরে থাকো আমি দেখি অন্য কোন রুম আছে কি না।

ছেলে মেয়ে দুটোকে গালে আদঁর দিয়ে রুম হতে বের হয়ে গেলেন।সিড়ি ডিঙ্গিয়ে বাড়ীর ছাদে উঠলেন।সেখানে আগে রাখা ছিলো একটি ইজি চেয়ার -সেখানে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল ভরা পূর্ণিমার চাদ।অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। আজ আর ঘুম আসছে না।ভাবনায় আসছে জীবনের ইতি কথন।তাহলে এটাই কি জীবন! এই টুকুই কি জীবনে প্রাপ্ত ভালবাসা!।
——————————-ঃঃ………………………….

নাক ডাকার মুল কারনটা হলো ঘুমানোর সময় সঠিক ভাবে নিশ্বাস নিতে না পারা।ঘুমানোর সময় কেউ যদি দশ সেকেন্ড শ্বাস নিতে না পারে তবে ডাক্তারের ভাষায় তাকে “এপনিয়া” বলে। এই এপনিয়া এক ঘন্টায় কত বার হয় তা “এপনিয়া ইনডেক্স”মেপে বের করা হয়। যখন আমরা নিশ্বাস নেই তখন বাতাস ফুসফুসের ভেতর দিয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা দেহে প্রবাহিত হয়। বিশেষ করে  মস্তিষ্ককে পরিচালিত করতে সাহায্য করে।কিন্তু যখনই চলার পথে বাধা পায় তখনি মানুষ নাক ডাকে।এর কারন হলো যখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তখন মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন খাবার সরবরাহ হয় না।

এই যে নাক ডাকা এটি কেমন করে হয় এটি জানাটাও জরুরী তাই না।আমি ডাক্তার নই তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন নেট ঘেটে যা পেয়েছি তা হল-সাধারনতঃ আমাদের মুখের ভিতরে একটা শক্ত তালু আছে তার পিছনে নরম তালুও আছে সেই নরম তালু এবং খাদ্য নালীর উপরের অবস্থানরত যে জায়গাটা আছে সেটাকে ডাক্তারীর ভাষায়  ফ্যারিংক্স বলা হয়ে থাকে। সেই ফ্যারিংক্স যে দেয়ালটা আছে যা মাংস পেশী দিয়ে তৈরি সেই স্থানে বাতাস যখন বাধা পেয়ে পেয়ে  যায় অথবা ধাক্কা খায় তখন সেখান থেকেই এই আওয়াজটার সৃষ্টি হয় ।

আবার নাকের ভিতরে যেই দেয়ালটা থাকে সেটি যদি অনেক  বাকা হয় তাহলে নাক ডাকতে পারে। নাকের ভিতর স্পর্শকাতর একটি স্হান বা জায়গা আছে, এলার্জির কারণে যদি সেখানে মাংস পেশী ফুলে পথ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে নাক ডাকবে। আবার যাদের গলার ভিতর বড় বড় টনসিল থাকে, শক্ত তালুর পিছনে যে নরম তালু আছে সেটি ভীষন নরম। আলাজিভ যেটি আছে সেটি ভীষণ রকমের বড়, সবকিছু মিলে নিঃশ্বাসটা নিচের দিকে যেতে পারে না তাই নাক ডাকার শব্দ হয়।

ছবি ও তথ্য
অনলাইন

২২২জন ৯৬জন
13 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য