সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

নস্টালজিক কিছু ইতিহাস

তির্থক আহসান রুবেল ২৬ আগস্ট ২০২১, বৃহস্পতিবার, ০১:১২:২১পূর্বাহ্ন স্মৃতিকথা ১৬ মন্তব্য

আমাদের ছোটবেলায় (৯০ পরবর্তী) মেহমান বেড়াতে আসার সময় মিষ্টি নিয়ে আসতো। সেটাই মিষ্টি খাওয়ার একমাত্র সুযোগ। কেউ কেউ পাইনাপেল বিস্কুট আনতো। আমরা ছোটদের কাছে তারা ছিল গুরুত্বহীন। একবার এক মেহমান জিলাপী নিয়ে এসেছিল। তার সামনেই যাই নি। আরেকবার এক মেহমান আপেল-কমলা নিয়ে এসেছিল। আকাশ থেকে পড়েছিলাম। কারণ বছরে একদিন শুধুমাত্র বড়দিনে খ্রিস্টান বাড়িতে (বড় বোনের বান্ধবী) সন্ধ্যায় গেলে আপেল-কমলা-আঙ্গুরের দেখা পেতাম।

বাড়িতে শুক্রবার গরুর মাংস রান্না হতো। কারণ সেদিন ছুটির দিন। সে আমলে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তরা গরুর মাংস খেতো। বড়লোকেরা মুরগীর মাংস। মুরগী হতো মেহমানকে দাওয়াত দিলে। আমি ছিলাম মুরগী ধরার ওস্তাদ। সরকারী কোয়ার্টারে যার বাসাতেই মেহমান আসতো, মুরগী ধরতে আমার ডাক পড়তো। বড়জোর ২ মিনিট লাগতো মুরগী ধরতে। বড়দের জীব বিজ্ঞান প্র্যাকটিক্যালে ব্যাঙ কাটার ব্যাঙ আমি ধরে দিতাম খাটের নিচে ঢুকে। ব্যাঙ হাত ভিজিয়ে দিতো রক্ষা পেতে। সবাই বলতো হাতে পেশাব করে দিয়েছে।

পাঙ্গাস বা কৈ মাছ! ওরে বাবা বড়লোকের খাওয়া। আমাদের জন্য ছিল মাঝেমধ্যে রুই মাছ। বেশীরভাগ সময় পাঁচমিশালী দেশী ছোট মাছের চচ্চরি। আর হ্যা ইলিশের সিজনে দুদিন পরপর ইলিশ। পোলাও সাধারণত দুই ঈদে। আর শীতকালীন কোন পিকনিক বা বছরে ২/১ বার বিয়ের দাওয়াতে। তবে হ্যা, ঈদের পোলাও-মাংস, পিকনিকের পোলাও-মাংস আর বিয়ের পোলাও মাংসের স্বাদ আলাদা ছিল।
পুরো স্কুল জীবনে ৩/৪ বার জন্মদিনের দাওয়াত খেয়েছি। একবার কোয়ার্টারের সবচেয়ে বড়লোক এক্সিয়েন কাকুর মেয়ে রুমা আপার জন্ম দিনে। তিতা কেক! এখন বুঝি সেটা চকলেট কেক ছিল। হাফ প্লেটে একটু চানাচুর, একটা বিস্কুট, একটা আপেলের ৮ ভাগের একভাগ আর দুই কোয়া কমলা। সে আমলে বিস্কুট বাদে সবই হা করে তাকিয়ে থাকার বিষয় ছিল। আরেকবার এক জন্মদিনে একটা প্যাকেট আর তার উপর এক টুকরা কেক। প্যাকেটে বিরিয়ানী। খুলে দেখি এক টুকরা হাড্ডি। আর পোলাও। তবু ঘরের উঠানের সেই আয়োজন চোখে লেগে আছে। এরা সবাই বড়লোক মানুষ। সর্বশেষ জন্মদিনের দাওয়াত খাই আমার পাশের বাসায় থাকা ড্রাইভার জহির কাকুর ছেলের। সে ছিল রাজকীয় আয়োজন। প্লেটে কেকের সাথে ৭/৮ পদের খাবার। তারপর আবার রোস্ট-পোলাও-রেজালা-সালাদ। যদিও আগের ঘটনাগুলোর সাথে এই ঘটনার ব্যবধান ৭/৮ বছর প্রায়। জহির কাকু এবং কাকি কেউই শিক্ষিত না।

জহির কাকুর ৩ ছেলে মেয়ের অক্ষরজ্ঞান এবং পরবর্তীতে পড়ানো, কোলে তুলে খাওয়ানো সবই হয়েছিল আমার মা এবং আমাদের ভাই-বোনের হাতে। আজ সেই বাচ্চাদের একজন আর্মিতে আছে, একজন ডাক্তার আরেকজন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে বোধহয় কানাডায় আছে। কাকুর মতো ব্যাক্তিত্ববান মানুষ আমি আজো দেখিনি। আমার জীবনযাপন এবং আজো বেঁচে থাকার পেছনে অনেক বড় অবদান এই মানুষটির।

আমার জীবনে দেখা আরেকজন ব্যাক্তিত্ববান সুপুরষ এবং ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় তার আদর্শ সংজ্ঞা হচ্ছে অজিত কাকু। সেই আমলে উনি নিয়মিত ড্রিংস করতেন। গভীর রাতে যখন ফিরতেন, আমরা দেখতাম। কিন্তু কোনদিন কেউ উনার দিকে আঙ্গুল তুলতে পারেন নি নূন্যতম নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য। বলা যায় ১২/১৪ বছর বয়সে এই মানুষটার প্রেমে পড়ে যাই বা ভক্ত হয়ে যাই। যদিও কখনো কথা হয় নি উনার সাথে। উনার স্ত্রী কাকীকে আমরা সবাই ডাকতাম কাষ্মীরের নায়িকা। কাকীর গল্প আরেকদিন করবো। কাকুর ছোট ছেলে মুকেশ ছিল আমার ক্লাসমেট। আমি সে আমলে অত্র এলাকার ১০/১৫ কিলোমিটারের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রের খেতাব পাওয়ার পেছনে মুকেশেরও কিছুটা অবদান আছে। সেই সাথে আজকে আমার যে রান্না জানা, তার প্রাথমিক জ্ঞানও আমি মুকেশের কারণে পেয়েছিলাম। কারণ সে সময় আমি বাসা থেকে বের হলেই মুকেশ আমাকে মারতো। ফলে আমি স্কুল থেকে ফিরে বেশীরভাগ সময় বাসাতেই কাটাতাম। খেলতাম কম। দ্রুত বাড়ির কাজ শেষ করে রান্না ঘরের আশেপাশেই থাকতাম। সেই মুকেশের সাথে আমার গাঢ় বন্ধুত্ব হয় ক্লাস নাইনে পড়ার সময়। কিভাবে হয় সে গল্পটাও আরেকদিন বলবো। শুধু এটুকু বলি, সে সময় আমি যে বিভৎসতম মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে মুকেশ ছিল সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ। যদিও অন্যরাও খুব ভালভাবেই চলতো। তবু আমি মুকেশেই ভরসা করেছিলাম। সেই মুকেশ বছর কয়েক পর সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়। বছরখানেক আগে মুকেশের মেয়েকে দেখলাম। সদ্য কিশোরী। সেই কাষ্মীরী নায়িকা বলা কাকি, যে অজিত কাকুর স্ত্রী এবং মুকেশের মা, তিনি অসুস্থ শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি সে সময় বেশ কিছুদিন ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী। কিন্তু আমরা প্রায় ২০ জন সেই কোয়ার্টারের মানুষের আগমনে তিনি উঠে বসেন। সেখানেই মুকেশের মেয়ের সাথে দেখা। মেয়েটার দুটো হাত ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম। যদিও সেদিন সেই কোয়ার্টারের মানুষদের সাথে প্রায় ২২ বছর দেখা। একদিন আমি সবার কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম নিজে বাঁচার জন্য। এখন আমরা সব হিসেবের উর্দ্ধে। সবাই এখন, সে সময়ের আমাদের বাবা-কাকুদের বয়সী।
সময় কত বদলে গেছে। এখন কৈ আর পাঙ্গাস মাছ গরীবের খাওয়া। বড়লোকেরা দেশী ছোট মাছ খায়। মুরগী খায় গরীবে। গরু বড়লোকের খাওয়া। জন্মদিন-বিয়ে-পিকনিক-মুসলমানী সব জায়গায় একই খাবার, একই স্বাদ। বেশীরভাগ বাসায় একসাথে ১৫-২০ টি মুরগী কিনে ফ্রিজে ঢুকায় প্রতি মাসে। আর ইলিশ! ওরে বাবা, মধ্যবিত্ত কেনার জন্য দুবার চিন্তা করে।
সবকিছুই বদলে গেছে। শুধু আমি সেই আবেগ, পুরাতন সময়, পুরাতন মানুষ সব নিয়ে নিজের চারপাশের দৃশ্য সাজাচ্ছি। আমার মাঝে কাম আছে, কিন্তু আমি এখনো বিরহ যন্ত্রণায় পুড়ি, প্লেটোনিক ঋণ শোধ করি। আমি এখনো বেহিসাবী। তবে হ্যা, আমার সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটা হয়েছে, তা হলো: সে সময়ের সবচেয়ে লাজুক এবং কথা বলতে না পারা চুপ থাকা ছেলেটা এখন যে কোন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, এটাই সত্য। আমি সত্যের পক্ষে। সেই ছেলেটা অবলীলায় যে কাউকে গালি দিয়ে ভাসিয়ে দিতে পারে। যে কাউকে আঘাত করতে পারে। এমনকি নিজেকেও।
১৩৮জন ১১জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য