ডায়েরী লেখার প্রাত্যহিক কোন অভ্যাস আমার কোন কালেই ছিলো না, এখনো নেই। তবে প্রতি বছরই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রিয় বন্ধুদের কাছ থেকে অনেক ধরনের ডায়েরী উপহার হিসেবে পেয়ে থাকি। সেসব ডায়েরীতে আমি সাধারণত কবিতা ও লিরিক লেখার কাজটাই করি। দু-একটা ডায়েরীতে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু স্মরণীয় ঘটনার আংশিক বা পূর্ণ বিবরণ লিখে গেছি। এখন আর একদম লেখা হয়না। ডায়েরী দুটোতেও বেশ ধূলো জমে গেছে অবহেলায় পড়ে থেকে থেকে। আজ থেকে এই সিরিজে আমার সেই ধূলো পড়া ডায়েরী থেকে কিছু ঘটনা নিয়ে লেখবো। আশা করি আমার সাথেই থাকবেন বরাবরের মতোই।
২৯/০৭/২০১১
*উপরের তারিখে ২০০২ সালে ঘটা ঘটনাটি ফেসবুকের বন্ধুদের জন্য ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত করে আবারো লিখে প্রকাশ করেছিলাম, এখানে হুবহু কপি পেষ্ট মারছি।

আজ বেশ আনন্দের একটা ঘটনা ঘটলো, কিছুটা অপমানজনকও বটে। ব্যক্তিগত একটা কাজে দুপুরের দিকে বিয়ানীবাজারে গিয়েছিলাম। বিয়ানীবাজারে ঢুকার মুখেই আব্বু ফোন করলেন। বাইকটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে আব্বুর ফোন রিসিভ করলাম। তিনি জানালেন বাসায় এক বিশেষ অতিথি এসেছেন আমি যেখানেই থাকিনা কেন তাড়াতাড়ি যেন বাসায় ফিরি। বাবার আদেশ আমার কাছে শিরোধার্য্য। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ কি অমান্য করা যায় ? আমার বাবা আমার কাছে সুপ্রিম কোর্টের চাইতেও বেশি, সুপ্রিম কোর্টের কোন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে কিন্তু বাবার ক্ষেত্রে তা নয়। তিনি যা বলবেন তা-ই চুড়ান্ত। আমি আচ্ছা বলেই তার ফোনটা কেটে দিলাম। নিজের কাজ খুব দ্রুত সেরে নিলাম যাতে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে পারি।

বাইকে ফুয়েলিং করতে গিয়ে খেলাম ধরা। আমার খুব ঘনিষ্ট দুজন বন্ধুর দেখা পেয়ে গেলাম সেখানে। অনেক দিন পর তাদের সাথে দেখা। তাই তাদেরকে কিছুটা সময় না দেয়াটা অশোভন দেখায়। তারাও তাদের বাইকে ফুয়েলিং করতে এসেছিলো। দু লিটার অকটেন ট্যাংকের পেটে ঢেলে দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে একটা রেষ্টুরেন্টে বসলাম। হালকা চা নাস্তা সেরে তাদেরকে বিদায় দিয়ে খুব দ্রুত গতিতে বাসায় ফেরার চেষ্টা করছি। বিয়ানীবাজার থেকে আমার বাসায় পৌছতে বাইকে পনেরো থেকে বিশ মিনিট সময় লাগে, কিন্তু বন্ধুদেরকে পাক্কা আধা ঘন্টা সময় দেবার কারণে সব মিলিয়ে ঘন্টা দুই সময় ব্যয় করে ফেলেছি। সুপ্রীম কোর্ট থেকে যদিও কোন সময় বেঁধে দেয়া হয়নি তবুও বড্ড দেরি হয়ে গেছে এটা জানার জন্য কোন ল’ইয়ারে কাছে যাবার দরকার নেই। বিয়ানীবাজার থেকে বের হয়ে কিছুটা দ্রুত গতিতেই বাইক চালাচ্ছিলাম।

দুই তিন কিলোমিটারের রাস্তা পার হয়ে যখন মাথিউরায় ঢুকলাম তখনো বাইকটাতে পংখীরাজের একটা তেজ ছিলো। মাথিউরা ফুটবল মাঠ পেরিয়ে সামনে ছোট্ট একটা কালভার্ট পাড়ি দিয়েই ডানে একটা মোড় নিতে হয় তাই নিলাম তারপর বায়ে আরো একটা মোড়, সেটাও নিলাম। এক সঙ্গে ডানে ও বায়ে দুইটা মোড় থাকার কারণে স্থানীয় লোকজন এটাকে পুলসিরাতের ঘাট বলে থাকেন! দুনিয়ার এই পুলসিরাতের ঘাট পাড়ি দিতে আমার তেমন কোন কষ্ট হলোনা। পুলসিরাতের ঘাট পাড়ি দিয়ে যখন বাইকটাকে গতি বৃদ্ধি করছি ঠিক তখনি ডান পাশ থেকে একটা হাঁস দৌড়ে এসে বাইকে সামনে পড়লো। দিলাম কষে একটা ব্রেক কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গেছে।

হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক শব্দে দুনিয়ার সব লোক জড়ো হয়ে গেলো। আজরাঈল সাহেবের হাতে অন্য কোন অর্ডার ছিলোনা বলে হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক শব্দ তিনি নিজ দায়িত্বে বন্ধ করে দিলেন। তাতেই এলাকাবাসী বেশ চটে গেলো। নানা জন নানান কথা বলা শুরু করে দিলো। কেউ একজন বললো কিরে ব্যাটা চোখ পকেটে ভরে কি গাড়ি চালাস ? একজনকে বলতে শুনেছি পাশের জনকে বলছে দিমু নাকি একখান লাগাইয়া ? আমি কান বন্ধ করে দিলাম, আমার সাথে আর কেউ ছিলো না বলে আমি নিরুপায় হয়ে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি পরিচিত কেউ জুটে কিনা এই উদ্দেশ্যে এরই মধ্যে হাঁসের মালিক খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে কান্না শুরু করে দেয়ার মতো অবস্থা তৈরী করে ফেললো। এলাকাবাসী এখন হাঁস মালিকের অনুকূলে চলে গেছে। একটা হাঁস মেরেছি বলে এই অবস্থা, যদি একটা ছাগলের বাচ্চা মেরে ফেলতাম তাহলে আমার হাড় গোড় একটাও হয়তো আস্ত রাখতো না।

সবাই গোল হয়ে আমাকে ঘিরে রেখেছে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিলাম না তবে মনে মনে বললাম যে লোক লক্ষাধিক টাকা দামের জাপানী ইয়ামাহা আর এক্স মোটর বাইক চালানোর ক্ষমতা রাখে তার কাছে একশ টাকা দামের একটা হাঁসের ক্ষতি পূরণ দেয়া এমন কিছু নয়, বাপধন তোমরা আমার কাছ থেকে শ খানেক টাকা নিয়ে ছেড়ে যাও কিন্তু জনতার রোষানলে পড়ে যাবার ভয়ে কিচ্ছু বলছিলাম না। হঠাৎ পাশের একজন মানুষকে বেশ দরদি মনে হলো তিনি তার পাশের জনকে বলছিলেন এক্সিডেন্ট ত আর বলে কয়ে আসে না। যা হবার তা হয়ে গেছে। বাচ্চা মানুষ একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলছে এখন কিভাবে সমাধান করবে সেটা ভাবো। তখন বুকের মাঝে বেশ সাহস পেলাম আমি তখন তাকে বললাম চাচা ক্ষতি পূরণ যা দাবি করবেন আমি দিয়ে দেবো এটা আমারই ভুল হয়েছে আমি মেনেই নিলাম। তখন হাঁসের মালিক বললো আমার এটা ডিম পাড়া হাঁস প্রতিদিন একটা করে ডিম পাড়ে।

তখনি মধ্য বয়েসি একজন হাঁসের মালিকের উদ্দেশ্যে বললো “কুদ্দুস তোমার এই হাঁসটা কত দিন পর্যন্ত ডিম পাড়ে ?” হাঁসের শোকে মূর্তিমান কুদ্দুস কিছু না বললেও জটলা থেকে কেউ একজন উত্তর দিলো এসব হাঁস ছয় মাস পর্যন্ত ডিম পাড়ে। আমার তখন আক্কেল গুড়ুম অবস্থা। মনে মনে হিসেব করি ছয় মাসে ১৮০ দিন! ডিমের হালি ২০টাকা হলে প্রতিটা ডিম পাঁচ টাকা মানে ১৮০x৫=৯০০ টাকা ! +হাঁস ১০০টাকা ! সব মিলিয়ে ১০০০টাকার ধকল। আমার পকেটে এতো টাকা নেই। সব মিলিয়ে তিন চারশ টাকা হলেও হতে পারে। তখন পাশের আরো একজন বলে উঠলো এতো হিসেব টিসেবের কি দরকার শ’পাঁচেক টাকা দিয়ে কেটে পড়তে বলো। আমি তখন বুকের মাঝে বেশ সাহস পেলাম যাক মুলা মুলি করে আরো কিছু কমানো যাবে। এরই মধ্যে দেখি ভিড় ঠেলে একজন লোক জটলার মধ্যে ঢুকছেন।

অনেকেই তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে মনে মনে বেশ আতংকিতই হলাম না জানি কি আছে কপালে। তিনি প্রথমে আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে ? আমি খুব ভয়ার্ত ভাবে বললাম আমি বাইক চালিয়ে যাচ্ছি হঠাই একটা হাঁস রাস্তার পাশে থেকে দৌড়ে এসে আমার বাইকের সামনে পড়লো। কিন্তু আমি ব্রেক করার আগেই হাঁসের উপর দিয়ে বাইকের চাকা উঠে গেছে। তিনি তখন আমাকে বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলেন আমি বাড়ির ঠিকানা বলি। তারপর আমার আব্বুর নাম জিজ্ঞেস করলেন আমি তাও বলি। তখন তিনি জ্বিভে কামড় দিয়ে বললেন ও তুমি অমুকের ছেলে ? এখন থেকে গাড়ি ঘোড়া সাবধানে চালাবে। একটা হাঁস মারা গেছে এটা এমন কিছু না কিন্তু হাঁসের বদলে যদি একটা মানুষ মারা যেত তাহলে কি হতো ? এই কথা বলেই তিনি উপস্থিত সবাইকে ধমক দেয়া শুরু করলেন আমাকে কেন এতোক্ষণ থেকে আটকে রাখা হলো এই জন্যে। তারপর তিনি আমাকে বললেন যাও বাবা বাসায় চলে যাও, সাবধানে যেও। আমি তখন বললাম আংকেল হাঁসের দামটা আমি দিয়ে যাই তখন তিনি গলার স্বরটা বাড়িয়ে দিলেন আমাকে আরেক ধমক “তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবেনা, তুমি বাসায় চলে যাও”। আমি আর কিছু না বলে উনাকে সালাম দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

বাসায় পৌছেই দেখি আব্বু কার সাথে যেন মোবাইলে কথা বলছেন আমাকে দেখেই লাইনটা কেটে দিলেন তারপর আমাকে ডেকে নিলেন তার কাছে। এই প্যান্টটা হাঁটুর উপরে তোল। আমার বুঝতে আর বাকি রইলো না যে খবরটা তিনি পেয়ে গেছেন আমি সাথে সাথে বললাম আব্বু আমার কোন কিছু হয়নি। কিন্তু তিনি আমার কথায় বিশ্বাস করলেন না। আমার দুই হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট উঠিয়েই ছাড়লেন। তারপর আমাকে বললেন কোন ব্যথা ট্যথা পাসনি ত ? আমি বললাম কিচ্ছু হয়নি আব্বু। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলে দিলেন এবং বলতে লাগলেন তোর যদি কিছু একটা হয়ে যেত তাহলে… আমিও চোখের পানি আটকাতে পারিনি। এই প্রথম আমার আব্বুর চোখে পানি দেখলাম তাও আমার জন্য। আব্বুর এই চোখের জল আমাকে ব্যথিত করেনি বরং আমাকে আনন্দে ভাসিয়েছে বাবা আমার জন্য এতোটা মমতা পোষণ করে রেখেছেন তা এই ঘটনা না ঘটলে বুঝতেই পারতাম না।
[ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত]

জবরুল আলম সুমন
সিলেট।
১৭ই জুন ২০০২ খৃষ্টাব্দ।

২৯৪জন ২৯৪জন
0 Shares

১০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য