ধারনায় -ধারনা

বন্যা লিপি ২৫ মার্চ ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১১:৩৩:৫১পূর্বাহ্ন বিবিধ ১৪ মন্তব্য

কিছু বিড়ম্বনা আছে, যা কোনোভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়না। ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড রাগ লাগে। খুব জিদ লাগে, ইচ্ছে করে, ইচ্ছামত কতক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে ফাটিয়ে ফেলি। আবার কিছু বিড়ম্বনা এমন আছে যে আমি নির্বাক হতবাক হয়ে মুষড়ে পড়ি। বিড়ম্বনার ধরন অনুযায়ীই  চলতে থাকে মানসিক তারতম্যের ওঠানামা। ধরে নেয়া যেতেই পারে সাইকোলজিক্যাল সমস্যা তাড়িত মনোজগৎ আমার। নিজস্ব অবস্থান ব্যাতিরেকে আপন যোগ্যতা সম্পর্কীয় ধারণাটুকু যতটা না নিজে ধারণ করি! তারচেয়ে কম বা বেশি যখন চারপাশের সুহৃদ্‌,আপনজন, বন্ধু,বান্ধব, ছোট ভাই বোন সম্পর্কীয় কাছের মানুষজন ধারনা নিয়ে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে মাপামাপি করতে উঠে পড়ে লাগে!  তখন চুপ থাকাও যা,না থাকাও তা। প্রমাণ দিতে গেলে গলার কাছে দলা পাকাতে থাকে বিষ-নিঃশ্বাস। খুব ভারী শব্দ ব্যাবহার বলে মনে হচ্ছে? কি করব, উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।

উপায় খুঁজে না পাওয়া যে কী পরিমান মনোকষ্টের কারণ! যে না ভোগে সে কী বুঝবে? ধারনার অধিক কেউ কিছু বহন করতে যেমন পারেনা, তেমনি অপর পক্ষ যখন আত্ম ধারণায় বিপরীত মন্তব্যে শারিরীক আঘাতের চেয়ে ভয়ংকর মানসিক আঘাত করে বসেন মুখের কথার বেত্রাঘাতে! তখন দুটো বিষয় খুব পরিষ্কার মত প্রকাশ পায়, আত্ম মস্তিষ্ক প্রসূত  ধারনা আপনি কারো উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন, শুধু তাইনা! সাথে সাথে আপনি আপনার সম্পর্কে ধারনাটুকুও প্রদান করছেন অপরপক্ষের কাছে।  তা কি কেউ ভাবে একবারও? ভাবলে কি আর বিড়ম্বনা শব্দের গর্ভ দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে ঢোল হতো? শুধু কি ঢোল? নয় মাস দশ মাসের দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই ভূমিষ্ঠ  করে ছাড়েন বিতর্কিত মস্তিষ্ক প্রসূত আন্দাইজ্জা ধারনা নামক মহা বিরম্বনার জারজ সন্তান! হ্যাঁ, এভাবেই বিশেষায়নে বিশেষায়িত করলাম।
কি ভাবছি আর কি হচ্ছে?
সবচেয়ে মজার বিষয় আমার কাছে মনে হয়, যুগ এমন গতিতে প্রবাহমান হচ্ছে যে নিজেদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। খাচ্ছি তো আসলে যুগে যুগে পাল্টানো যুগের গোলানো গরল মিশ্রিত ভেজাল খাদ্যদ্রব্য। মনন বলি আর শিক্ষিত বলি, সর্বপর্যায়ে ভেজালের দৌরাত্ম্য। একটা ছোট্ট কাহিনী মনে পড়ে গেলো এই মুহূর্তে:

তখন ইতিমধ্যে তিন বাচ্চার জননী হবার হয়ে গেছি। এইখানে আরেকটু যোগ করি- বাবা মায়ের কাছে সন্তান কখনোই বড় হয়না। কথাটা খুব স্বাভাবিক হলেও, এর আপেক্ষিক প্রেক্ষাপটের যে বাস্তব চিত্র তা বোধ করি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া লাগে কারো কারো।  সেখানে আমি আছি এক নাম্বারে( যদিও এটা আমার নিজস্ব ধারনা😊😊)। সন্তান সম্পর্কে বাবা মায়ের প্রথম এবং খুব স্বাভাবিক ধারনা যে, সন্তান কী কী করতে পারবে বা পারবে না সম্পর্কে। এখনকার সময়ে ভাবনা বা ধারনা কিঞ্চিত পরিবর্তন হলেও, অনেকখানি ক্ষেত্রে এখনো নেতিবাচক ধারনা টিকে আছে কোথাও কোনোখানে। আমার ব্যাপারে আমার পিতা মাতার ধারনা আরো প্রবল হওয়ার যথেষ্ঠ কারণও হয়ত তাঁদের কাছে ছিলো। আমি আত্মপক্ষ  সমর্থনে বা নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ ও হয়ত কখনো পাইনি। আমি সবসময়ই অকপটে সত্যটা স্বীকার করে আসছি। ছোটখাটো উদাহরণে উৎরে গেছি হয়ত কখনো সখনো।
আম্মা যেমন মনে করতেন, আমার দ্বারা ঘরসংসারের ভারী কাজগুলো সম্ভবই না। আব্বা যেমন মনে করতেন ইংরেজী বিষয়ে আমি একচোট লবডঙ্কা। এই বিষয়ে আব্বা সত্যিটাই ধারনা করেছেন সবসময়। তিন বাচ্চার মা হওয়ার পরও আমাকে পিটুনি খেতে না হয়, সেজন্য বেশ আতংকে থাকতাম বাপের বাড়ি বেড়াতে গেলে☺☺। আমার ছোট ছেলেটার বয়স দু কিংবা আড়াই বছর হবে হয়ত তখন। মেয়েটা ৬/৭ বছর। বড় ছেলেটার বয়স তখন ৪/৫ হবে। বাবা সকাল থেকে খবরের কাগজের তাঁর নিউজগুলো কাটিং করছেন সংগ্রহ করার জন্য। বাবার অভ্যাস সামনে টিভি ছেড়ে, টেপরেকর্ডারে রবী বাবুর গান ছেড়ে হয় লেখা নয় পরীক্ষার খাতা দেখা। আমিও বাপের বাড়ি গেলে মহা আরামে কাটাই। আর আব্বার পাশে বসে টিভি দেখা বা গান শোনা তো পুরোনো অভ্যাস। পুরোনো অভ্যাসে আরো একটা ভালোলাগার কাজ ছিলো,  তা হলো আব্বাকে খবরের কাগজ পড়ে শোনানো মাঝে মাঝে। বাবা গান শুনতে শুনতে কাজ করছেন। আমি আকাশ সংস্কৃতির ব্যাপক বিনোদন নিচ্ছি হিন্দী সিনেমায়। ডায়লগ তো অর্ধেক বুঝি, অর্ধেক বুঝিনা।  মাঝে মাঝেই তাতে রবী বাবুর সুর ঢুঁকে পড়ে বেদ্দপের মত। হঠাৎ ঘ্যাড় ঘ্যাড় আওয়াজ করে টেপরেকর্ডার বন্ধ হয়ে গেলো। আব্বা কপাল চোখ কুঁচকে বিরক্তির চরম রেখা টেনে টেপরেকর্ডারের দিকে তাকালেন। আমি বুঝলাম ক্যাসেট বাবাজির ফিতা জড়াইয়া গেছে রবিবাবুর আহ্লাদী সুরের দাপটে।  আব্বা টেপরেকর্ডার হাতে নিয়ে চেষ্টা করছেন ছাড়াবার। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি, আব্বার ব্যর্থতা দেখে। সাহসেও কুলাচ্ছেনা যে বলি, আমি পারি। আমি দেখার জন্য হাত বাড়াতেই আব্বা সেই পুরোনো অভ্যাসমত দিলেন জোরসে ঝাড়ি-‘ তুই ধরিস ক্যান? পারবিনা ছাড়!! কেমন অপমানডা লাগে তখন? ছোট ছেলেটা আব্বার ঝাড়িতে ভয় পেয়ে গেলো। আমার আঁতে লাগলো। জিদ চেপে গেলো। ছোট্ট একটু কাজ! অথচ আমাকে বিশ্বাস করে সুযোগটাও দেবার সুযোগ দিতে চাইছেন না। কতক্ষন চেষ্টা করে ছেড়ে দিয়ে আবার পেপার কাটিংএ  মনোনিবেশ করলেন। আমিও সুযোগ নিজ দায়িত্বে নিলাম যা হবার হবে ভেবে। দু’মিনিটের মাথায় ফিতা খুলে হাতে….. আব্বা ফের ঝাড়ি দিতে গিয়ে মাঝপথে থমকে গেলেন আমার হাতের দিকে তাকিয়ে।
এমন আশ্চর্যের বিষয় যে, আমার পিতা মাতার কাছ থেকে আমার কোনো কাজের কখনো কোনোরকম স্বীকৃতি স্বরূপ বাহবা বা প্রশংসা পাওয়ার কথা আমি আজো মনে করতে পারিনা। বাবা তো একদমই না। বুঝতেই দিতেন না কখনো তিনি আমার প্রতি কী এবং কোন কোন বিষয়ে কেমন কেমন বিশ্বাস রাখেন বা রাখেন না। একবার রেডিও হাত থেকে পরে গিয়েছিলো বলে মোটামুটি রকম বড় হওয়া মেয়েটার গালে ঠাস্ করে চড় বসিয়ে দিতে তাঁর একটুও মনে হয়নি তাঁর প্রথম এবং তখন বেঁচে থাকা একমাত্র কন্যা অন্ততপক্ষে ১৪ বছর পার করে ১৫ বছরের কিশোরি। আর এই বয়সি মেয়ের গালে এরকম রেডিও হাত থেকে পরে যাওয়ার দণ্ডে হঠাৎ ঠাস্ করে চড়থাপ্পড় মারাটা একরকম নির্দয় পিতার পরিচায়ত হতে পারে। তো সেখানে তিন বাচ্চার মা হয়েছে তো কি হয়েছে? ওই তিনটা বাচ্চা তাঁর নাতি নাতনী। তারাও বরং দেখুক তাঁদের নানাভাই এখনো তাদের মাকে কেমন করে শাসন, ধমক টমক দেন। আমার বাবা মা আমারেই বড় হইতে দিলোনা, তাগোর নাতি নাতনী বড় হইবো কবে? আমার বাচ্চারাও তাদের নানাভাইকে ভয় করতে লাগলো যমের মত।
আম্মা একবার কি বললেন? আমার ভাইটা ঢাকা থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নালিশ করেছিলো, ‘ আম্মা, তোমার মাইয়া আমারে বেলা তিনটার সময় ভাত খেতে দিছে’ আমি মায়ের কাছে বেড়াতে গেলে আম্মা জিজ্ঞেস করলেন এ কথা। যথারীতি আমিও বললাম’ ছুটির দিনে রান্না বান্না করে উঠতে একটু দেরিই হয় আমার। তারওপর কাজের বুয়া ছিলোনা, সপ্তাহের বাজার আসে,  সব গুছিয়ে কাটাবাছা করে রান্না শেষ করে খাবার দিতে ছুটির দিনে একটু দেরিই হয়। তারওপর মেজো জা অসুস্থ্য বলে কোনো সাহায্যের হাত নেই/ছিলোনা। ও কি একা বেলা তিনটায় খেয়েছে? বাসার সবাইই তো তাই!!’  আম্মা গলার স্বর এমন টানা দিয়া বইলা উঠলেন যে আমি বাকরুদ্ধ….. হহহহহ……. তুই এত কাজ করো?’ আমি হিসেবটা মেলাতে লেগে গেলাম। যে হিসেবটা আমি আম্মাকে এই একটু আগে দিলাম। ৪/৫ রকম মাছ, মুরগি কাটা বাছা করে সপ্তাহের সব রকম গ্রোসারি গুছিয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করা, তারপর বাচ্চাদের তদারকি,  ব্লা ব্লা ব্লা…. আম্মার গলার সুরে আমার যেন সব বানের জলে উল্টা পথে পিঠটান দিলো। আমি শুধু চোখের পাতা নামিয়ে বললাম, ‘ অবশ্য আপনার বিশ্বাস না হবারই কথা’। যে মেয়ে বাপের বাড়ির কুটোটা চিড়ে দুটো’টা করেনি কখনো, সে কিনা দিচ্ছে মায়ের কাছে দম বন্ধ করা কাজের ফিরিস্তি। ধারনার বিপরীত না? কোনো ধরনের নিয়মিত কাজে আমি কখনোই আমার যোগ্যতা প্রমাণে কিছুই করি নাই। যা ভালো লাগত করতে,  ইচ্ছে হলে হয়ত করতাম,  ইচ্ছে না হলো করতাম না। ইচ্ছের কথা যদি বলি তো এ ব্যাপারে লেখা সম্ভব হবে না। কিছু ঘাড়ত্যাড়ামী  তো বংশগত ভাবে বা উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া। বাবা অনেকটা বুঝতেন আমাকে। মা বুঝতেন খালি, আব্বা সহজে কোনোকিছু কথা শোনেন না, যদি কোনোভাবে লিপি বলে! তাহলো বাবা সেটা করেন। আর এই ধারনা বদ্ধ সত্য ধারণায় পরিনত হতে দেখে দেখে ধারনা দৃঢ়তর হয়েছে একেকটা কার্য হাসিল হতে।
কেউ হয়ত স্বাভাবিক ভাবে ভাবতে পারেনা কারো সম্পর্কে যে, কার জন্য কতটুকু ধারনা করা যেতে পারে। ধারনা বিষয়টাই আমার কাছে চরম বিরক্তি লাগে। আমি আমার বিপরীতে অবস্থানরত ব্যাক্তির কোনোভাবে কোনো নির্দিষ্ট মনগড়া ধারণায় বিচার করার অধিকার রাখিনা।এটা হওয়া উচিৎই না। এমনকি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনেও এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান দেয়া আছে। যেমন যদি ধরে নেই, আমাকে কে কয় জনে চেনে? এই চেনা কতটা জানা পর্যায়ে চেনা? কাছের মানুষজন, একটু দূরের কেউ, বন্ধু/ বান্ধবী, আত্মিয় স্বজন, দীর্ঘসময় যে মানুষটার সাথে সহঅবস্থানে সহধর্মিনী  হয়ে আছি! জরিপ করে দেখা গেলে বড় ভালো হতো। দিনকে দিন অতিবাহিত হতে হতে সাধারন ধারনায় হোঁচট খাওয়া খাওয়ির ভয় বা বিতর্ক থাকেনা। ধারনার বিপরীত ধারণাই যত নষ্টের মূল।

ক্রমশ এইসব পারা না পারার বিষয়গুলোর মাঝখানে নিজেকে দেখতে দেখতে কখনো ফিরে দেখা/বোঝা হয়নি, আসল বিষয় নিয়ে। যখন যা সামনে এসেছে উৎরে নেবার/ যাবার চেষ্টা করেছি আত্ম যোগ্যতা আনুযায়ী।  এক এক করে সময়ের সিঁড়িতে সময় পেছনে ফেলে বয়স বেড়ে বেড়ে ছেলে মেয়ের চোখ ও এখন ধারণায় অভিষিক্ত।  আম্মু কতটুকু কী করতে পারে বা না পারে……

আগামী পর্বে সমাপ্য।

২৬৯জন ১৬৮জন
9 Shares

১৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য