ধাবমান যে প্রজন্ম : ১

আজিজুল ইসলাম ১৮ এপ্রিল ২০১৪, শুক্রবার, ০৯:০৮:২৫অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ৫ মন্তব্য

 

 

ভোরের আলো তখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। কিছুক্ষন আগে আযান হয়েছে মাত্র। মসজিদে মসজিদে এবং কিছু বাড়িতে পবিত্র ফজর ওয়াক্তের নামাজের প্রন্তুতি চলছে। একটি/দুটি মসজিদ থেকে কেরাতের সুমধুর সুর ভেসে আসে। পরিবেশ অতি শান্ত এবং শীতল। কোমনীয় এই পরিবেশে হঠাৎ করে গগনবিদারী চিৎকার ভেসে আসে একটি বাড়ী থেকে। বাড়ীর একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ট্রাকচালক মো: হারুন মিঞা চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মারা গেছেন হরতালের পক্ষের কিছু দুবৃত্তের ছোঁড়া ইটের আঘাতে। মোবাইলের মাধ্যমে খবরটি এসে পৌঁঁছতেই শুরু হয়ে যায় কান্নাসহ বিরাট হুলস্থুল । খবরটা শুনে হারুন মিঞার আপনজন এই বাসার তিনটি প্রানের একটি কখাই শুধু মনে হয়েছিল, জলজ্যান্ত মানুষ হারুন মিঞা আর কোনদিন এবাসায় আসবেনা, আসবে তাঁর লাশ? ভাবতেই চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন সবাই একযোগে। হারুন মিঞার স্ত্রী মূর্ছা খেয়ে পড়ে আছেন, আশপাশের দুয়েকজন জন মহিলা এসেছেন, তাঁরা ধরে আছেন তাকে। মুখে-চোখে পানির ঝাপ্টা দিচ্ছেন। একবার তিনি চোখ খুললেও বিলাপ করে কি কি বলে আবার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন।

 

হারুন মিঞার বাড়ি চট্টগ্রামেরই আরেক উপজেলা সিতাকুন্ডে। ঢাকা থেকে কক্্রবাজার ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করার কিছুটা আগে কিছু দুর্বত্ত চলমান উক্ত ট্রাকে ইটের একটি বড় দলা ছুঁড়ে মারে এবং দলাটি সরাসরি হারুন মিঞার মাথায় আঘাত করে। বেশিক্ষন বাঁচেননি তিনি। সিতাকুন্ডে বাসায় থাকে তাঁর স্ত্রী, এক কন্যা মিতা এবং এক ছেলে, নাম তরু। তরুই সবার ছোট এবং সবার বড় মেয়ে অনু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পরিবারে মিতা মেয়েটাই সবচেয়ে ঠান্ডা এবং শান্ত । বয়স আঠারো পেরিয়েছে, ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলো কেবল । কখাও বলে মেপে মেপে এবং কম। তবে প্রয়োজনীয় কখাই বলে সে। আজ এই মেয়ের কণ্ঠ থেকেই বিলাপ শোনা যাচ্ছে বেশী। আর বছর সাতেকের তরু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকছে একবার মা, একবার বোনের মুখের দিকে। অতি করুন তার চোখদুটি।

 

আস্তে আস্তে পাড়া-পড়শীর উপস্থিতিতে ভরে উঠছে বাড়ী। তাদের প্রিয়তম মানুুষ হারুন মিঞা আর এবাসায় আসবেনা, ছুটির দিনগুলিতে পাড়াময় তার ঘুরে বেড়ানোও আর কেউ দেখবেনা কখনও। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে পুরো এই গ্রাম। একসময় লাশ আসে মানুষটির এবং যথারীতি সকল মানুষের আন্তরিক সহায়তায় দাফন সম্পন্ন হয়।

 

দাফনের আগে অনুও এসে উপস্থিত হয়। বাবার মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিলনা তাকে। এসে বাবার লাশ দেখে তার অবস্থা যা হয়েছিল, তা আর বলতে চাচ্ছিনা প্রিয় পাঠক। ওদের বয়সে আমি পিতৃহীন হইনি, আমার পক্ষে এ-বর্ননা দেয়া সম্ভব হবেনা। সে উদ্দেশ্যে এ-গল্পের অবতারনাও নয়। আুিম হরতালের সাথে ডিফার না করলেও হরতালে সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও, এ-ধারণাকে প্রচন্ডভাবে ডিফার করি। আর হিংসাত্মক কর্মকান্ড করলে জনসমর্থন কমে আসে বলেও আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি। ব্যাপক গনমানুষের সম্পৃক্ততা না হলে কোন আন্দোলন সফল হয়না, হওয়া সম্ভবও নয়।

 

অনু, মিতারা খুবই ভালো ছাত্রী। ছাত্র পড়িয়ে অনুর আয় করার অভিজ্ঞতা অনেক বছরের। মেধায় স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে সে নিজের খরচ নিজে চালাতে সক্ষম হয় শুধুমাত্র টিউশনির কারনে। অনেক আত্মবিশ্বাসী মেয়ে অনু। রাজনীতিও করে ও, ছাত্র ইউনিয়ন। জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে পারে। কলেজে তার বক্তৃতার সময় হলে অনুভুতিসম্পন্ন কিছু শিক্ষক এসে তা শুনতেন। বলতেন, তোমার কখা শুনতেই আসি শুধু, বিষয়ব¯ত’ যা-ই হোক না কেন। কাউকে কেয়ার করে কখা বলেনা ও, তবে গ্রামের সবাইকে ভক্তি করে খুব। সবাই তার উপর অতিমাত্রায় সন্তুষ্ট। বয়োজ্যেষ্টরা বলেই রেখেছেন তাকে, মা, রাজনীতি করলে এই গ্রামেই করিও, আমরা তোমাকে ছাড়তে চাইনা। কিছুই বলেনি অনু, শুধু চেয়ে থেকেছে মুখগুলি, ধৈর্য্য-কষ্ট-দু:খের এক একটি অভিব্যক্তিগুলি। ইনাদেরও তার অতি ভালো লাগে, অতি আপনজন মনে হয়। এঁদের সামনেইতো তার বেড়ে ওঠা। অভিভূত হয়ে পড়ে সে।

 

দুটি মাস পার হয়ে গেল ওদের বাবার মৃত্যুর পর । জগতের এটাই নিয়ম, কারো জন্য কিছু আটকে থাকেনা । হারুন মিয়ার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েেেছ, যদিও এই পরিবারটিতে একের সাথে অন্যের সম্পর্কটা ছিলো অত্যন্ত সহমর্মীতার । যা হোক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো মিতা, সেটাও হয়েছে সহজেই । আসলে ছাত্রী হিসাবে মিতাই ভালো অনূর চেয়ে । বাবার মৃত্যু-পরবর্তী এই সময়টায়, বইয়ের পোকা মিতার বইয়ের সাথে একেবারেই সম্পর্ক ছিলোনা । বাবার মৃত্যু এতোটাই মূষড়ে দিয়েছিল তাকে যে, ভর্তির কোন প্রস্তুতি-ই নেয়নি সে । পরিবারের অন্যরা ভাবতো ওর পড়াশোনায় হয়তো ছেদ-ই না পড়ে যায় । কিন্তু আত্মবিশ্বাসী বোন অনূর কারনে ছেদ পড়েনি, পড়তে দেয়নি অনূ ।

 

এই গ্রামেরই আরেক ছেলে, নাম ঝন্টু, প্রথম আলো পত্রিকা যাদের বলে অদম্য মেধাব’, সেই ঝন্টুও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। গ্রামে ভ্যান চালাতো ঝন্টু। সংসার বড় হওয়ায় বাবাকে ক্ষেতের কাজে সাহায্য করার পাশাপাশি ভ্যান চালিয়ে সংসারে আর্থিক সাহায্য করতো ও নিজের পড়াশুনার খরচ চালাতো ঝন্টু। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্টের পর তার অত্যধিক ভালো রেজাল্ট তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে দৈনিক প্রথম আলোর প্রত্যক্ষ সহায়তা। অনূ, ঝন্টু এবং মিতা প্রায় একই বয়সী। একসাথেই এই গ্রামে বড় হয়েছে ওরা। দু-চার বছরের হেরফের তাদের, বয়সে এবং লেখাপড়ায়ও। এরকমটা নয় যে তারা একসাথে চলাফেরা করতো, তবে তাদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ন একটা ভদ্র সম্পর্ক সবার সামনে পরিলক্ষিত হতো সবসময়। একের সাথে অন্যের দেখা হলে  সেভাবেই তারা কথা-বার্তা বলতো, একের প্রয়োজনে অথবা দুই পরিবারের মধ্যে কোন পরিবারের প্রয়োজনে তাদের মধ্যকার সহযোগিতার ভাব, সহমর্মিতার ভাব  পরিবার দুটিকে বেশ কাছাকাছি এনে ফেলেছে।

 

ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে অনূ এবং ঝন্টুর মধ্যে কথা বিনিময় স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেছে। দুজনকেই টিউশনি এবং নিজেদের পড়াশুনাতে ব্যস্ত  থাকতে হয়, কারো সময়ই হয়না একখানে বসে কখা বলার। জরুরী কিছু থাকলে মোবাইলেই সেরে নেয় কথাটা ওরা। রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনূ সিপিবির অফিসে গেলে ঝন্টুকে ডাকে। আসলে অনূ চায় ঝন্টু ওর মতো সিপিবির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত হোক। কারন গত দুই দশকের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি ধরে সে মনে করে, দেশের মঙ্গল এবং রাজনীতির গুনগতমান অর্জন করতে চাইলে দেশের বামপন্থী শক্তির উন্মেষ ঘটাতে হবে। কারণ হিসেবে সে বাম চিন্তা-ভাবনার মানুষের মধ্যে অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং স্বচ্ছ চিন্তা-ভাবনা কাজ করে বলে মনে করে। এই দলের মানুষগুলিকে তার ত্যাগী, কমপক্ষে ত্যাগ করার মানসিকতাসম্পন্ন বলে মনে হয়। এসমস্ত কারনে বামপন্থী রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধি করতে চায় অনূ এবং স্বপ্ন দেখে একদিন এই বামপন্থীরাই দেশকে সকল দিক থেকে সমৃদ্ধ করে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারবে।

 

ঝন্টুও চায় দেশের মঙ্গল এবং গভীরভাবেই চায়। মানুষে মানুষে, বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের মধ্যে চলমান যে হানাহানি  নিরন্তর এদেশে, তার সমাধান রাজনীতির মাধ্যমেই সম্ভব বলে সে মনে করে, তবে তা চলমান রাজনীতি দিয়ে সম্ভব নয় বলেও সে শুধু মনেই করেনা, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসও করে। গ্রামে ভ্যান চালাতে চালাতে অনেক মানুষের কথাবার্তা শুনেছে সে, ভ্যানে চড়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষের বিভিন্নরকমের কথাবার্তা শুনেছে সে। রাজনীতির আলোচনাগুলি ইচ্ছা করেই শুনতো ও, শুনতে ভালোই লাগতো। দুহাজার চার থেকে নয়, এই পাঁচ/ছয়  বছরে তিনটি সরকারের বিভিন্ন ধরনের কর্মকান্ড, কর্মকান্ডের বিশ্লেষন শুনেছে ও এভাবেই, গনমানুষের কাছ থেকে। আলোচনাগুলির কোথাও সে ওদের মতো দরিদ্র মানুষের সুখবর আছে, এমন কোন কথা বড় মানুষদের কেউ কোনও ফোরামে আলোচনা করেছেন বলে শুনেনি। শুনতে পেযেছে শুধু ওদের নিজস্ব দ্বন্দগুলি, যেমন কে কাকে ল্যাং মেরে ফেললো, কে কোন কৌশল অবলম্বন করে কাকে ঘায়েল  করে এগিয়ে গেলো ইত্যাদি ইত্যাদি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর রাজনীতির পাঠ নিতে গ্রামের চায়ের দোকানে রাত জেগে অনেকদিন টক্ শো শুনেছে ও। কিন্তু না! যা শুনতে চেয়েছে, দুয়েকজনের কথাবার্তা ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে তা শুনতে পায়নি। কঠিন একজন মেধাবী ছাত্র আসলে ঝন্টু, কষ্টকর শ্রম করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, উভয় পরীক্ষাতেই ও গোল্ডেন এ-প্লাস অর্জন করেছে। যূক্তি ছাড়া কোন কথা মানতে রাজী নয় সে। রাজনীতি খুব একটা যে বুঝে, তা-ও নয়, তবুও তার মনে হয়, চলমান এই রাজনীতিতে দেশের আপামর মানুষের জন্য কিছুই নাই। মানুষ, বিশেষত: দরিদ্র যারা, আপামর সেই সমস্ত মানুষের জন্য এই রাজনীতি কিছুই দিতে পারবেনা, দিবেওনা। দেয়ার ও নেয়ার যা কিছু, তা শুধু হবে নিজেদের মধ্যে। সহানুভূতি জিনিসটা আস্তে আস্তে মানুষের মধ্য থেকে উঠেই যাচ্ছে, বিশেষ করে ক্ষমতাশালীদের মধ্য থেকে। অনূও জানে এসমস্তই। অনূর কলেজে এবং ঢাকাতেও তাদের মধ্যে এবিষয়গুলি আলাপ হয়েছে। অনূ তবুও ভাবে, ঝন্টুকে পেলে বামপন্থার রাজনীতির ভালো হবে এবং সেইজন্য তাকে আহ্বান করে সে।

 

ওদের মতো মিতা রাজনীতি নিয়ে ভাবেনা। অনূ তাকে রাজনীতির বিভিন্ন কথা বলতো, বলতো রাজনীতি করিসনা, বিষয়টা কি শুনে-বুঝে দেখ, দেশ-সমাজ সম্পর্কে জানা, বোঝা প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। চলমান রাজনীতির সাথে বামপন্থী রাজনীতি তথা সিপিবির রাজনীতির পার্থক্যটা বেশ ভালোভাবে বুঝিয়ে দিত অনূ তাকে। তবুও তাকে টানতে না পেরে শেষে বলতো, তোর মত ভীতুর ডিম দিয়ে রাজনীতি হবেনা; যা, বাবা-মার সেবা করিস তুই।

 

আর তুমি! প্রশ্ন করতো মিতা।

আমাকে দিয়ে বোধহয় ওসব হবেনা রে। দেশের লক্ষ-কোটি বাবা-মা আমাকে টানে যে। তাদের কথা আমার চিন্তায় আসে। ভয় পেয়ে যায় মিতা, বলে আমাদের ভুলে যেওনা আপু, আর, বাবা-মা —, আর বলতে পারেনা ও; কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মুখ লুকায় বোনের কাঁধে।

 

ঝন্টুর কথা ভালো লাগে মিতার।(tin khonder prothom khondo)

২২৩জন ২২২জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য