ধাবমান যে প্রজন্ম (৩য় পর্ব)

আজিজুল ইসলাম ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, সোমবার, ০৯:০৭:৩৭অপরাহ্ন গল্প, সাহিত্য ৪ মন্তব্য

অবশেষে তোপখানা রোডে দুইরুমের একটি অফিস নেয়া হোল, এটাই হচ্ছে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় অফিস । এখান হতেই পরিচালিত হবে দেশব্যপী সুশাসনের জন্য সকল আন্দোলন-সংগ্রাম ।

অফিস নেয়ার আগে গত দু’টো বছর চেষ্টা করেছেন আজিজ অনেককে একাজে উদ্যোগ নেয়ায় সংশ্লিষ্ট করতে, যেমন সুশীল সমাজের অগ্রবর্তী অংশকে, মিডিয়ার নিরপেক্ষ ব্যক্তিত্বগণকে, শক্ত লেখনীর লেখকগণকে এবং আরো অনেককে, অনেকভাবে । ইনাদের নিকট চিঠি পাঠিয়ে, সুশাসন সম্পর্কিত নিজের বিভিন্ন লেখা নিয়ে সশরীরে নিজে গিয়ে এবং আরো অনেকভাবে চেষ্টা করেছেন তিনি । কিন্তু না; অনেকে তাকে হতাশ করেছেন, সহমত প্রকাশ করেছেন অনেকে তবে এদেশে কিছু হবেনা বলে ফিরিয়ে দিয়েছেন, অনেকে আবার বলেছেন, আস্তে আস্তে সবকিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে, কিছু করতে হবেনা ।

কিন্তু সুশাসন যে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেনা দেশে, অবিচারে-অনাচারে-দুর্নীতিতে যে ভরে যাচ্ছে দেশ, তার কি হবে, আজিজের এ-প্রশ্ন এড়িয়ে কেউ বলেছেন, দেখেন, মানুষ সবাই সন্মান চায়, কোন অনুষ্ঠানে কেউ যদি মনে করে যে, তাকে মূল্য একটু কম দেয়া হচ্ছে, যদিও বাস্তবে তা হয়না, তাহলেই হয়েছে । অনুষ্ঠান থেকে একরকম বের হয়ে যান তিনি । অধৈর্য হয়ে পড়েছি আমরা আসলে । এই দেশে আপনি আবার কী করতে চান ?

বলেছিলেন আজিজও, কিন্তু দেশে তরুনদের স্বত:স্ফুর্ততাও তো দেখেছি আমি । যখনই কোন আন্দোলনের কথা বলেছি তাদের, যেমন, ঘুষ দিয়ে সরকারী চাকরীতে নিয়োগের চলমান-যে বিধান, সেটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা বলতেই সাধারন ছাত্র-ছাত্রী এবং কিছু ছাত্র-সংগঠনের নেতাকেও তো আমি অতি উৎসাহী হয়ে উঠতে দেখেছি । সরকারী চাকরীতে নির্জীব-হয়ে-পড়ে-থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও যখন বলেছি সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা অথবা চলমান ছাত্র সংগঠনের বাইরে যে বিরাট-বিশাল ছাত্রসমাজ রয়েছে এদেশে, তাদের নিয়ে প্রেশারগ্রুপ ধরনের কোন অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার কথা, আবেগী হয়ে পড়ে তখন তো তারা বলেছেন, হাঁ, এভাবেই হবে । এভাবেই সকল সময় সকল সরকারের উপর চাপ অব্যহত রেখে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হতে পারে ।

এছাড়া ব্লগেও অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন আজিজ, তরুন-সমাজের বিপুল সমর্থণ-সূচক মন্তব্যও পেয়েছেন তিনি তার বিভিন্ন লেখায় । এমন এমন মন্তব্য তিনি আসলে পেয়েছেন যে, তার মনে হয়েছে, কেউ যখন শুরু করার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নয়, তখন কিছু হবেনা এদেশে, এটার দোহাই দিয়ে কিছু না করে চুপ-চাপ বসে থাকাটা আসলেই অন্যায় হবে । আগে দেখাই যাক না কেন, কিছু হয় কি-না । না হলে তখন দেখা যাবে । কিন্তু কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকবেন আর বলবেন, কিছু হবেনা, করে কোন লাভ নেই, এটা অনীহার সামিল । তিনি মনে করেন, আর কিছু না হোক, সরকারকে চাপে রাখার যে ধারা সৃষ্টি হবে দেশে, তাতে তরুনদের মধ্যে একধরনের সচেতনতা তো সৃষ্টি হবে, মানুষের চিন্তায-মননে ‍সুশাসনের জন্য, শুদ্ধাচারের জন্য একধরনের তাগিদ অনূভবের জায়গা তো তৈরী হবে এবং এটা সরকারগুলোর মধ্যে চাপের অনুভূতি সৃষ্টি অবশ্যই করবে এবং অন্যায়-অণাচারমূলক কাজগুলো করতে সরকার অনেকবার, কমপক্ষে ভাববে ।

কিছু কিছু ইলেকট্রোনিক মিডিয়াতে গণমানুষের তাৎক্ষনিক সাক্ষাৎকার গ্রহনের কিছু অনুষ্ঠান দেখানো হয় । সাক্ষাৎকারগুলি দেখে সাবির্কভাবে মনে হয় যে, ওখানেই রয়েছে গণমানুষের আকাংখা । বিশেষ কোন ঘটনা সম্পর্কে, দেশের রাজনীতি সম্পর্কে গণমানুষ কী চায়, কী আশা করে, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় কিন্তু উক্ত সাক্ষাৎকারগুলো থেকে । টকশো গুলো থেকেও অনেককিছু যায় জানা-বোঝা । বড় বড় মানুষেরা কে কী ভাবেন, কার কী প্রত্যাশা, সমাধানের পথ কার মতে কী, সেগুলো বোঝা যায় । এসমস্ত আখ্যান-উপাখ্যান থেকে গণমানুষের প্রত্যাশাগুলি আমরা জানতে পারি শুধু, কিন্তু প্রত্যাশাগুলির বাস্তবায়ন নিয়ে কারো কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়না । মনে হয় জীবনকে সবাই বড় ভয় করেন । তাই কেউ কোন উদ্যোগ আসলে গ্রহন করেননা ।

এর মধ্যেও কিছু নেতা রয়েছেন, যারা মনে করেন, দেশে একটি তৃতীয় ধারার রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । তারা চান, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এই দুটি দলের পরিবর্তে প্রচন্ডভাবে জণসম্পৃক্ত তৃতীয় ধারার একটি দল গঠিত হলে তাতে সাবির্কভাবে দেশের মঙ্গল হবে । কিন্তু অনেকদিন ধরে চেষ্টা করা সত্ত্বেও সেরকম কোন দল গঠন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছেনা । কারন মানুষ যা শুনতে চান, যে কাজ দেখতে চান, তা যারা তৃতীয় ধারা গড়তে চান, তারা বলছেননা, করছেননা । অনেকের এনজিও-সংশ্লিষ্টতা দেশের আপামর মানুষ ভালো চোখে দেখেওনা । আর অপ্রিয় হলেও সত্য, মানুষের মনের আস্থার জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে রাজনীতিবিদদের জন্য । এছাড়াও মানুষ মনে করে যে, সৎ উদ্দেশ্যে কি কেউ রাজনীতি করতে আসে? যিনি টাকা বানাতে চান, তিনি রাজনীতিতে আসেন, যে টাকাওয়ালা ক্ষমতাশালী হতে চান, ক্ষমতা বাড়াতে চান, তিনি রাজনীতিতে আসেন । এভবেই চলে আসছে এবং এলো আমাদের স্বাধীনতার বার্ধক্যকাল । তেতাল্লিশটা বছর কেটে গেল এভাবে । আর কত ?

আগেকার দিনের কথাগুলো আমরা স্মরন করতে পারি । আগে একধরনের হলেও বিচার হোত । ছাত্ররা, বিশেষত: যারা রাজনীতি করতেন, অত্যন্ত নীতিবান ছিলেন তারা । নীতিআদর্শের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন অনূকরনীয় । কারন তাদের কোনরকম লোভ ছিলনা, লালসা ছিলনা । কারো কারো সেগুলি থাকলেও হিংস্রপথে সেগুলি অর্জনের কথা তাঁরা চিন্তাও করতে পারতেননা । আজকের প্রজন্ম, আজকের মানুষ যেমন করে ভবিষ্যতের কথা ভাবেন, আগের আমলের মানুষ সেরকম করে ভাবতেননা । এযুগের মানুষের কাছে নিজের নিরাপত্তাটাই আসল, অন্যের কথা ভাববার সময় কোথায় তার ? এর একটা কারন হতে পারে যে, জমি কমছে আর মানুষ বাড়তে বাড়তে ক্রমেই অসহনীয় পযার্য়ে চলে যাচ্ছে । জায়গা সকল ভরে গেলে আদরের সন্তান, যাদেরকে দুধে-ভাতে রাখার জন্য প্রানপাত চেষ্টা মানুষের, সেই সন্তান বাস করবে কোথায় ? আদরী-আদরিনীদের জন্য চাই যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো নিরাপত্তা-ব্যবস্থা । এ-ব্যবস্থায় কম হলে হবেনা । তাই করো লুটপাট, বানাও সম্পদ আর বংশধরদের পূর্ন নিরাপত্তার কজে তা ব্যয় করো ।

আগে কেউ ঘুষ খেলে মানুষ তাকে ঘৃনা করতো, তার থেকে নিরাপদ একটা দুরত্ব বজায় রাখতো, আত্মীয়তা করতে চাইতনা । আর আজ এসমস্ত লোকেরই খোঁজে মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরছে । আত্মীয়তা করতে আজকাল মানুষ হবু-আত্মীয়ের সম্পদ দেখে, সম্পদটা তার কীভাবে এল, অবৈধ না বৈধভাবে, তা দেখার কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব তো দুরের কথা চিন্তাও করেনা মানুষ । ঘুষ আর আজ দুর্নাম নয়, বরং যার যতো অর্থ-সম্পদ, তা সে যে-উপায়েই অর্জন করে থাকুক না কেন, সেটা কারো কাছে কোন ব্যাপারই নয় আজ । আপনি বড় কর্মকর্তা, আপনার কোন টাকা নাই, আপনাকে কেউ মূল্য দেবেনা, আপনার সাথে কেউ আত্মীয়তা করতে চাইবেনা, বলবে অযোগ্য । মানুষের মনের মূল্যবোধের এই পরিবর্তনটা ঘটতে বেশী দেরী হয়নি, কারন দ্রুত আমরা একটি প্রচন্ড ঘণবসতিপূর্ন দেশে পরিণত হতে চলেছি এবং এজন্যই হয়তো, অথবা অন্যকিছু, একটু স্বার্থপর এবং হিংস্রও হয়ে উঠছি আমরা । মানুষ খুন করতে আমাদের হাত কাঁপেনা । হায়রে মানবতা!

আপনার জন্য আমি উঠতে পারছিনা উপরে, আপনাকে সরাতে না পারলে আমি অগাধ সম্পদের মালিক হতে পারবনা, অগাধ ক্ষমতার আধার হয়ে উঠতে পারবনা । কোন চিন্তা নাই । মেরে ফেলার মন্ত্র আমি জানি, আপনাকে আমি মেরে ফেলতে দ্বিধা করবনা । মনকে প্রবোধ দেব, উপরে উঠতে হলে এক-আধটু অন্যরকম করতেই হয় । এটা কোন পাপ না । কীভাবে পরিবর্তন হবে মানুষ! অনেক মানুষ মনে করে, আমি না করলেও এই খারাপ কাজটা অন্যে করবে, সে আমার থেকে বড়লোক হযে যাবে । আর অন্যে অথবা কেউ না কেউ যখন করবেই, তখন আমি করলে দোষ কী ? টাকার পাহাড় কারো না কারো তো হবেই, আমার হলে ক্ষতি কী ?

এই যখন আমাদের সাবির্ক অবস্থা, তখন রাজনৈতিক দলগুলো এই মানসিকতার সহায়ক হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছে । বলা যায়, মানুষের মাঝে এই অনিরাপত্তাবোধের জন্মই হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর কারনে। দু’টি প্রধান দলই, এরশাদের নয় বছর ছাড়া তেতাল্লিশ বছরের বাকি সময় দেশের ক্ষমতায় ছিল । বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছর ছাড়া তারা ক্ষমতায় গেছে আর হাত ছেড়ে লুটপাটে মেতেছে । অবৈধ আয়ের বিভিন্ন পন্থা আবিষ্কার করে তারা সম্পদের পাহাড় গড়েছে, মানুষের জন্য, সুশাসনের জন্য তারা কিছুই করেনি । সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে তারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখতে চেয়েছে সবসময়, কখনই ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি । কারন ক্ষমতা ছাড়লেই অবৈধ আয়ের পথ বন্দ হয়ে যায় এবং বিগত সময়ের অনৈতিক কাজ করার জন্য না জানি জেলে যেতে হয় ।

আজিজ এবং কিছু নীতিবান মানুষ এই প্রেক্ষিতে মনে করেন, প্রতিবাদ করে যেতে হবে সবসময় । যেখানেই অন্যায়-অবিচারের ঘটনা ঘটবে, সেখানেই আন্দোলন, মানব বন্ধন ইত্যাদি কমর্কান্ডের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে যেতে হবে । প্রতিবাদ ততক্ষন পযর্ন্ত করতে হবে, যতক্ষন না অন্যায় কাজটি ন্যায়ে পরিণত হয় । সরকারকে ন্যায়ে পরিণত হওয়ার সুপারিশ দিতে হবে এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তা মানতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে ।

সরকার প্রতিবাদ করতে দেবেনা সেটাইতো স্বাভাবিক। আজিজরা তাই মনে করেন, সরকারী বাধা আসার আগেই প্রচন্ড শক্তি অজর্ন করে ফেলতে হবে এই প্রেশারগ্রুপকে।

এই লক্ষ্যে শুরু করা হয়, প্রতি জেলায় সৎ এবং প্রতিবাদী মানুষ খোঁজা। যার যার যেসমস্ত জেলায় পরিচিতি আছে, সেসমস্ত জেলায় প্রেসক্লাবে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত হয়, যদিও জানা যে, আর সব সেক্টরের মতো ওখানেও সকল সাচ্চা মানুষ পাওয়া যাবেনা। তবুও ওখানেই যোগাযোগের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয় মূলত: প্রেসক্লাবই হচ্ছে যোগাযোগের কেন্দ্র এবং ওখানে ভাল লোকের হার তূলনামূলকভাবে বেশী বলে। প্রেসক্লাবের মধ্যকার ভাল মানুষগুলোর সহায়তায় সারা জেলার তূলনামূলকভাবে সৎ এবং প্রতিবাদী মানুষগুলোকে খুঁজে বের করে জেলাব্যপী আন্দোলন-সংগ্রামের সূচনা করতে হবে, এরকমই সিদ্ধান্ত।

১৪২জন ১৪২জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য