একথা বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের সমাজ ক্রমশ ধর্ষকামী সমাজে পরিণত হচ্ছে। সমাজ প্রতিনিয়ত ধর্ষণের কারণে কুলষিত, অশ্লীল, নোংরা এবং পঙ্কিল হয়ে উঠছে। হয়ে উঠছে নারী শিশু ও নারীদের বসবাসের জন্য অনিরাপদ। ধর্ষকামীতার বিকৃতরুচি যুবক থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত সকলশ্রেণী পেশার মানুষ, কিশোর থেকে ৭০/৮০ বছরের বৃদ্ধের মধ্যেও বিরাজমান এবং প্রকট। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমনকি মাদ্রাসা শিক্ষকরা পর্যন্ত অনৈতিক ধর্ষণকাজে, নারীদের যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতনে লিপ্ত হতে দেখা যায়। রাস্তা ঘাট, যানবাহন, শিক্ষাংগণ, কোচিং সেন্টার, অফিস আদালত, ব্যবসা বাণিজ্য কোথাও নারীদের নিরাপত্তা নেই। বড়কর্তা, সহকর্মী কারো কাছেই যেন নারীরা নিরাপদ নয়। যেকোনো বয়সের নারী যেকোনো সময় ধর্ষণসহ যৌন নিপীড়ন, হয়রানী এবং নির্যাতনের শিকার হতে পারে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল নারী, দৈহিক, মানসিক, বাক প্রতিবন্ধী নারী শিশু এবং নারী কেউই হায়েনাদের ভয়াল ভয়ংকর হিংস্র এবং জানোয়ারসুল্ভ থাবা থেকে মুক্ত নয়। গত ০৮ জুলাই’২০ তারিখের দৈনিক আজাদীতে একটি প্রতিবেদন দেখে হতবাক হতবিহ্বল এবং বাকরূদ্ধ হয়ে পড়েছি। মানসিক ভারসাম্যহীন এক পাগলী মা রাস্তায় একটি ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। ফুটফুটে সন্তানের মা পাগলী হলেও কেউ জানে না এই সন্তানের বাবা কে ? “গতকাল ( ০৭ জুলাই’২০)  ভোরে মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারী পতেঙ্গার ভিআইপি রোড এলাকায় একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। স্থানীয় যুবকেরা বিষয়টি দেখে পুলিশকে জানায়। পুলিশ নবজাতকসহ ৩৫ বছর বয়সী ওই মাকে সিএমপি-বিদ্যানন্দ ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে নবজাতকসহ মাকে ভর্তি করা হয়। পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উৎপল বড়ুয়া আজাদীকে বলেন, ভোরের দিকে এই ঘটনা ঘটে। মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে ফিল্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। তাদের নন-কোভিড ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মেয়েটির শারীরিক অবস্থা শংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় রক্ত দেয়া হয়েছে। বর্তমানে মা এবং সন্তান দুজনই সুস্থ আছে”। { সূত্রঃ দৈনিক আজাদী, ০৮ জুলাই’২০}। মানবিক অবক্ষয়ের এই দুঃসময়ে স্থানীয় যুবকেরা পুলিশকে খবর দিয়ে, হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশির প্রসূতিকে রক্ত দিয়ে সাহায্য করেছে। এই কিছু কিছু মানবিক মানুষের জন্যে মনে হয় পৃথীবিটা এখনো ঠিকে আছে।

মানুষের মন-মানসিকতা, মানবিক চিন্তাধারা, নৈতিকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ কতটুকু নীচে নামলে এমন অমানবিকভাবে মানসিক ভারাসাম্যহীন নারী, দৈহিক মানসিক শারীরিীক প্রতিবন্ধী দৃষ্টিহীন নারী শিশু এবং নারীর ওপর এমন পৈশাচিক, নিষ্ঠুর, মর্মন্তুদ, হৃদয়বিদারক, পাষান্ড কর্মকাণ্ড করতে পারে একটা মানুষ নামের দানব। সমাজের অবহেলিত, অন্যের দয়া দাক্ষিণায়, ভিক্ষা করে যারা দু’বেলা দু’মোটো অন্নের জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে তাঁদেরকে অনেকেই সহানুভূতিশীল হয়ে দয়া করে কিছু দান সাদাকা দিয়ে থাকে কিন্তু বেশীরভাগ মানুষ দূর দূর করে এদেরকে ভিক্ষা না দিয়ে, সাহায্য সহযোগিতা বা সহানুভূতি না দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় সমাজের একশ্রেণীর লম্পট, চরিত্রহীন, দুশ্চরিত্রের মানুষ ভদ্রতার মুখোশ পড়ে এদেরকে ধর্ষণ যৌন হয়রানী যৌন নিপীড়ন করে মজা লুটে নেয়। আর এসব মুখোশধারী দুশ্চরিত্রদের পাপের ফসল হচ্ছে সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্ব। ফলশ্রুতিতে পৃথিবীতে পিতৃত্ব পরিচয়হীন ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত এবং দুঃখজনক জন্ম। এই নিষ্পাপ শিশুটির কি অপরাধ যে তার পিতৃ-পরিচয় নেই ? জন্মই যেন তার আজন্ম পাপ। সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষের পাশাপাশি স্কুল, মদ্রাসা, গৃহ শিক্ষক এবং কোচিং শিক্ষকরা জোর করে বা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেইলিং করে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কারণে দেশের আনাচে কানাচে কত শিশু নারী ও কিশোরী যে কিশোরী মা হিসেবে সন্তান প্রসব করছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। যে নারী শিশু ও কিশোরী এখনোও পুতুল খেলার সময় পার করেনি। জীবনকে সঠিক সুন্দরভাবে বুঝতে বা উপভোগ করতে পারেনি। জটিল কুটিল জীবন এবং মাতৃত্ব সম্পর্কে যার কোনো ন্যূনতম শিক্ষা বা জ্ঞান নেই  নিজের শরীর আর মাতৃত্ব কি জিনিষ তা বুঝার আগেই তাঁরা হয়ে যাচ্ছে মা  জড় পদার্থের পুতুলের পরিবর্তে তাঁদের হাতে এসে পড়ছে রক্তমাংসের মানুষ।একবার ভেবে দেখুন সুস্থ স্বাভাবিক জীবন আর পরিবেশে যখন একজন পূর্ণ এবং প্রাপ্ত বয়স্কা নারী গর্ভকালীন সময়টা কি ভয়ানক শারীরিক এবং মানসিক দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পার করে থাকে। এ সময় তাঁর খাওয়া দাওয়া চিকিৎসাসহ মানসিক সাপোর্ট একটা খুব জরুরি বিষয় হয়ে উঠে। পরিবারের সবাই তাঁর প্রতি আলাদা একটা যত্ন, সাহায্য সহযোগিতা সহমর্মিতা আর সহানুভূতি নিয়ে পাশে থাকে। এক তথ্য থেকে জানা যায়, “১৮ বছর পার হওয়ার আগে কিশোরী অবস্থায় মা হবার মতো মানসিক ও শারিরীক অবস্থা তৈরী হয়না এবং শিশুকে দুধ খাওয়ানো এবং লালন পালন করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আর বুদ্ধিও হয়না এদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে ——বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেটোম্যাটার্নাল বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, ‘যে তার নিজের যত্ন নিতেই ঠিকমতো শিখে নাই সে কি করে তার গর্ভাবস্থায় বাচ্চার যত্ন নেবে। শঙ্কার জায়গা হচ্ছে কিশোরীদের গর্ভপাতের সংখ্যা এবং গ্রভপাতজনিত জটিলতায় অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ, ইনফেকশন বা সেপটিক হয়ে অনেক কিশোরী মায়ের মৃত্যু হয় আবার অনেকে বেঁচে গেলেও রক্তস্বল্পতা রোগে ভোগে ও প্রদাহের কারণে তাঁদের প্রজনন ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলতে পারে”। {সূত্রঃ ইন্টারনেট}। পাশাপাশি অনেক গরীব দুঃখী অসহায় মানসিক ভারসাম্যহীন প্রতিবন্ধী কিশোরী এবং নারীর জীবন যাপন তখন নানামাত্রিক জটিলতায় দুর্বিষহ, অসহনীয়, অসহ্য হয়ে উঠে। চিকিৎসা সেবা, ঔষধপ্ত্রের অভাব, খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে অনেক কিশোরী মা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। অনেকে পঙ্গু বা বিভিন্ন জটিল রোগে সারাজীবন ভুগতে থাকে। এসব গরীব দুঃখী অসহায় মানুষগুলো সমাজে মান সম্মান ইজ্জতের ভয়ে, প্রভাবশালীদের অর্থ বিত্ত্ব আর বাহুবলের ভয়ে চুপ হয়ে যায় বা চুপ হতে বাধ্য হয়। অনেককেই আবার টাকার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে থাকে। পাশাপাশি অনেকক্ষেত্রে সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে অনেকের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়।

অপ্রাপ্ত বয়স্কা কিশোরী মাতৃত্ব আমাদের সমাজের আরেক অন্ধকার জীবন কাহিনী। নিঃস্ব অসহায় গরীব দুঃখী মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধী নারীদের সঙ্গে এমন দুষ্কর্ম করতে কি একাবারের জন্যেও মানুষ নামধারী ধর্ষক বা ধর্ষকদের বিবেক জাগ্রতা হয়না। মানবতা, নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসনের কথা চিন্তা করে মনে ভয় কাজ করেনা। সমাজের এসব দুষ্টু কীটদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় মানসিক ভারসাম্যহীন পাগলী, প্রতিবন্ধীরা এভাবে রাস্তা ঘাটে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের জন্ম দিতেই থাকবে। রাষ্ট্রপক্ষ এবং প্রশাসনকে সমাজের এসব অবহেলিত নারীদের ইজ্জত আভ্রু সম্ভ্রম রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সব জঞ্জাল, পঙ্কিলতা, নোংরামী, কুরুচিপূর্ণ অশ্লীলতা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ধর্ষকামী সমাজের ফসল হবে অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্ব যা একটি সুখী শুভ সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিরাট অন্তরায়।

 

৪৫৪জন ২৬০জন
14 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য