ধর্ম ও পোশাক -১

রোকসানা খন্দকার রুকু ১৪ এপ্রিল ২০২২, বৃহস্পতিবার, ০৪:১১:২৭অপরাহ্ন সমসাময়িক ৪ মন্তব্য

রুহ মির্জা। দুষ্টু চটপটে ছয় বছরের এক কিউটের ডিব্বা। সবে মাত্র ওয়ান শেষ করেছে। বয়সের চেয়ে বেশিই বুদ্ধি তার। আর তার এ বুদ্ধিদীপ্ততা মা প্রায়ই কাজে লাগান।

বাড়িতে গেষ্ট এসেছে তাকেই পাঠানো হয় পাশের দোকানে। সেও নির্ভূলভাবে বিস্কুট- চানাচুর নিয়ে হাজির হয়। বড় ভাই আর বাবা সাত সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে উঠে পড়ে। কোন কোন সকালে মরিচ শেষ, লবন শেষ, হলুদ শেষ। মা চট করে তাকেই পাঠিয়ে দেয় দোকানে।
সেদিনও সকাল ছিল। ঝকঝকে মনমুগ্ধকর এক প্রেমিক সকাল!
মা বললো, রুহ লবন নেই যাওতো পাশের দোকান থেকে নিয়ে আস।
সকাল বোধহয় একটু বেশিই ছিল। দোকানী মামা তখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। রুহ দোকানী মামাকে ঘুম থেকে ওঠার জন্য দোকানের ঝাঁপি ধরে ঠকঠক করতে লাগল। দোকানী ভেতর থেকে সারা শব্দ দিলে তারপর সে বেশ খুশি।
ভেতর থেকে দোকানী দুলাল মামা জানতে চাইলেন- বেটি তোমার কি লাগবে?
রুহ উত্তর দিলো- মামা এককেজি লবন লাগবে। মা রান্না চড়িয়েছে, তারাতারি দেন। দেরী হলে মা বকা দেবে। দোকানী মামা লবন সহ ঝাপের বাইরে মুখ বের করে দিল।
সকালের বাসি মুখ দেখতে সবার সুন্দর হয় না। কিছু মানুষের সুন্দর হয়। দুলাল মামার মুখের দুপাশ বেয়ে কেমন লালার দাগ লেগে আছে। চোখের কোটরে সাদা সাদা রাত ঘুমের পেচুল। খুবই কুৎসিত লাগছে দেখতে।
রুহ তারাতারি লবন নেবার জন্য হাত বাড়ালো। কাঁচা গু‘য়ের গন্ধযুক্ত মুখ বাড়িয়ে দুলাল মামা তার লকলকে সাদা জিহ্বা বের করে এগিয়ে এলো। হ্হেহে করে হেসে রুহের মসৃন নিস্পাপ কচি দূর্বাগাল চেটে দিল। বিশ্রী চ্যাটচ্যাটে লালাযুক্ত বাসি থুথু সকালের নির্মল বাতাসে মুহূর্তে ছড়িয়ে গেল। অল্প সময়ে তা গালে শুকানোর জন্যও প্রস্তুত!
দুলাল মামা লাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো- সাত সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলি। এজন্য তোকে শাস্তি দেয়া হল।
স্কুলের স্যার অপরাধ করলে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এটা শাস্তি। কিন্তু এটা আবার কেমন শাস্তি। সে তো কোন অপরাধ করেনি। বড় বিশ্রী অভিজ্ঞতা হয়ে গেল ছয়বছরের মেয়েটির।
হ্যাঁ, অপরাধ তার নারী, মেয়ে, জননী হবার। যে শরীরের কোটরে শত জন্মের দাগ! যা সৌভাগ্যের, তা কখনও কখনও শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষের যে কোন কাজের অপরাধ হিসেবে নারী তার শরীর পেতে দেবে এটাই নিয়ম!
রুহ পাশের পুকুরে খুব করে মুখ ধুয়ে নিল। বাড়িতে ফিরে এসে ঘটনা তার কাউকেই বলা হল না।
কিছু বছর পর, রুহ কালই বাড়িতে এসেছে। বিসিএস পরীক্ষা শেষ করে সোজা ঢাকা থেকে বাড়ি। বেশ কিছুদিন থাকবে। মায়ের সাথে সময় কাটাতে হবে।
খুব চেনা চেনা সাদা ধবধবে পান্জাবী আর দাঁড়িতে সাইকেল হাতে দাঁড়িয়ে একটি লোক। সাইকেলে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে। বেশ পরিচিত কেউ, সে মনে করতে পারছে না।
মা হাসিমুখে বেড়িয়ে এল- রুহ নিবি নাকি কিছু? তোর দুলাল মামা। এখন কাপড়ের ব্যাবসা করে। সাইকেলে ফেরি করে। ভালোই নাকি লাভ হয়। আর সে তো সৎ মানুষ। সৎ মানুষের ব্যবসা ভালো হয়।

রুহ কিছুই বলল না। শুধু খেয়াল করল, মার কাছে এ লোক বেশ বেশি দাম রাখল।
ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার আগে পোশাক পরিবর্তন জরুরী। পান্জাবী পড়া লোক সৎ হবে, সত্য বলবে এমনটাই আমরা মনে করি। তাই এমন দোকানীর কাছে ভীর বেশি হয়। তারাও দিব্যি দাঁড়ি, টুপি, পোশাকের আবরনে রমরমা বাণিজ্য করে। বাসে, ট্রেনে হকাররা মাথায় টুপি দেয়। কিন্তু অনবরত যা বলে সবই প্রায় মিথ্যা।
মা তাকে সৎ বলছে কারণ সে তার মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই জানে না। আরও জানে না যে এ লোক কতদিন রুহকে ছোঁক ছোঁক করে ধরার আশায় ছিল। এখন নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করে সে তার ফায়দা উঠাচ্ছে। এইসব লোকেদের জন্য একজন সৎ মানুষেরও করুন পরিনতি হয়। বিশ্বাস হারিয়ে যায়। সমাজ মনে করে পান্জাবী টুপি মানেই ধর্মের দেনাদার কিংবা জঙ্গি।

বহু বছর আগের সবকিছুই মনে পরে গেল। আর কখনোই সে সেই দোকানে সাতসকালে যায়নি। এবং এ লোকটা আজকের মতোই হেসে হেসে তাকে অনেকবার চকলেট দেবার চেষ্টা করেছিল। ডেকেছিল আড়ালে, লাল জীহ্বা বের করে এগিয়ে এসেছিল।
রুহ ভাবতে থাকলো লোকটার হাসি। আজও সে হাসি বদলায়নি। মায়ের সাথে দাঁত বের করে কিরকম ব্লাউজের কাপড় দেখাচ্ছে।
বুকের দিকে তাকিয়ে বলছে- বুবু তোমার একগজেই হয়ে যাবে। তুমি তো পাতলা। আর তোমার যে দুধে- আলতা রঙ তাতে মেরুন রং খুব ভালো যাবে। মা/নারী, পুরুষ প্রসংশায় ভীষণ খুশি।
রাতে খেতে খেতে মা গল্প করছিল দুলাল মামার। লোকটা অনেক ভালো পরহেজগার, দ্বীনদার। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। সামনে হজে যাবার নিয়ত করেছে। সারাজীবন পাপ করে, শেষ বয়সে হজ্জ কর! পাপমোচন।
এলাকার চেয়ারম্যান তার বয়স এখন প্রায় ৭০ এর ঘরে। এলাকার হিন্দু মহিলাকে তার পছন্দ। সুবিধা করতে লোক লাগিয়ে তার স্বামীকে মেরে ফেললো। এরপর নিরুপায় সেই মহিলাকে প্রতিদিন টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করতে থাকলো। তিনি বছর পাঁচেক আগে হজ্জ করেছেন এখন দাঁড়ি টুপিতে তাবত ইসলামী ব্যক্তিত্ব।
রুহ ভাসতে থাকে পোশাকে। জীবনের সমস্ত অপকর্ম ঢাকতে পোশাক খুব জরুরী। পোশাক বদলে ফেল, হজ্জ পালন করো। তাহলে সে মানুষ আর মানুষ থাকে না। সব অপকর্ম মাফ হয়ে নিস্পাপ হয়ে যায়। আর মধ্য বয়েসের পর নিজেকে বদলানোর সহজ উপায় হলো পোশাক।
আসলেই কি পোশাক ধর্ম, ঈমান নির্ধারণ করে?
উত্তর, কখনোই না! হলেও বোকা মানুষ পোশাকের প্রেমে পড়ে যায়। মনে করতে থাকে পোশাকী এ মানুষটা খুবই উন্নত চরিত্রের! যদিও ধর্ম কোন পোশাক নির্ধারণ করেনি। তবুও ধর্মব্যবসায়ীরা নিজের স্বার্থে পোশাককে ধর্ম বানিয়েছে। আর তার জালে ভালো মানুষরাও ফেসে যাচ্ছেন।
তাই আমাদেরও চিন্তা চেতনা বদলে পোশাককে পোশাক হিসেবে নেয়া দরকার। হোক সে পান্জাবী, হিজাব বা প্যান্ট শার্ট কিংবা শর্টস্। সেখানে যেন কোন ধর্মের নাম না আসে। আমরা বিচার করবো মানুষকে তার কর্মে। আর এই যে পোশাক নিয়ে চলছে মাখামাখি, উস্কানী তা বন্ধ করা দরকার। কেননা এভাবেই জল গড়াতে গড়াতে অনেক দুর যায়।
তাই আসুন আমরা পোশাক ব্যবহার করি আমাদের প্রয়োজনে, ইচ্ছায়, স্বাধীনতায়।

ছবি – প্রতিকী

১৪৮জন ৪৫জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য