ধর্ম এবং অসুস্থতা

জিসান শা ইকরাম ১২ এপ্রিল ২০১৩, শুক্রবার, ১১:৪৫:০০পূর্বাহ্ন একান্ত অনুভূতি, সমসাময়িক ৯ মন্তব্য

ধর্ম এবং অসুস্থতা – ১
বাসায় আম্মা এবং আমার ছোট ছেলে বাদে সবাই অসুস্থ । আমি, স্ত্রী‌, বড় এবং মেঝ ছেলে পক্সে আক্রান্ত গত কদিন ধরে । দূর থেকে খবর শুনেই চলে এসেছেন ছোট খালা , একমাত্র ফুফু । সুরা ইয়াসিন , সুরা আর রাহমান ,আয়াতুল কুরসি পঠন চলছে বিরামহীন ভাবে । যখনই সময় পাচ্ছেন ৩ জেল পবিত্র কুরআন শরীফ পড়ছেন আম্মা ,খালা এবং ফুপু – আর তার পাশেই বসেই একমনে চোখ বন্ধ করে গিতা পড়ছেন আমাদের পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় একজন বৌদি । কিছুক্ষণ পর পর পানি , দুধ পানির ফোটা পরছে গায়ে সবার । মাথার নিচে হাত দিয়ে ফু দেয়া পানি , দুধ পানি পালা ক্রমে গভীর মমতায় সবাইকে খাইয়ে দিচ্ছেন চার জনই।
আমি এই আন্তরিকতার মাঝে কোন ধর্মকে দেখতে পাইনি। দেখেছি ৪ জন নারী আন্তরিক ভাবে চাচ্ছেন , ওনাদের স্নেহের মানুষ গুলো সুস্থ হয়ে উঠুক ।

এর বেশী তো ধর্মের কাছে আমাদের প্রাপ্যতা তেমন কোন কালেই ছিল না। যুগ যুগ ধরে এমনি ধর্ম চর্চা ই করে এসেছি । পাশাপাশি থেকেছি আমরা কাকা কাকি বৌদিদের সাথে মিলে মিশে। ধর্ম তো কোনদিন বিপন্ন হয়নি আমাদের । এর বেশী ধর্মের তো আমাদের দরকার নেই।

ধর্ম এবং অসুস্থতা – ২
আমার বড় ছেলে এবং পাশের বাসার নিখিলদার বড় ছেলে সম বয়সী। ৫ দিনের বড়/ছোট । পাশের বাসার ভাড়াটে। এই বাসায় আসার পরেই ধীরে ধীরে আন্তরিক সম্পর্ক হয়ে গেল দু’পরিবারের। দু’পরিবারের বড় দুই ছেলে এক বছর বয়স থেকেই একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠলো। দুজনে একসাথে খেলা ধুলায় মত্ত থাকায় – বাচ্চাদের মায়েরা বাচ্চা পালনে বেশ খুসিও । একজনে কান্না কাটি শুরু করলে – এক বাচ্চা তার মাকে ” মা বাবু কাঁদে , আমি যাবো ” । দুজনকে একসাথে রাখা মাত্র কান্না বন্ধ।
আমি আমার ছেলের জন্য কিছু কিনলে , নিখিল দার ছেলের জন্যও একই জিনিস কিনি। নিখিল দাও তেমনি।

৩ বছর বয়সে নিখিলদার ছেলের একবার প্রচন্ড জ্বর। দু’পরিবারেরই যেন বিপর্যয় । আমার ছেলে সারাক্ষণ তার বন্ধুর পাশে। আমার স্ত্রী নিখিল দার বাসায় রান্না বান্না করা নিষেধ করে দিয়েছেন। খাওয়া দাওয়া সব আমাদের বাসায়। আল্লাহ্‌র রহমতে নিখিল দার ছেলে এক সময় সুস্থ হয়।

আমার বড় ছেলে ৪ বছর বয়সের সময়ে দোতলার সিড়ি থেকে নামার সময় পড়ে যায় । গড়িয়ে গড়িয়ে নীচ তলায়। মাথা ফেটে যায় অনেকটা। সেলাই লাগে ঐ বয়সেই ৫ টা। আবার দু’পরিবারে বিপর্যয় । রান্না বান্না সব নিখিলদার বাসায়। সারাদিন সবাই আমার ছেলের বিছানার পাশে। ছেলের বন্ধু তো সারাক্ষণ।

প্রথম রাতে প্রচন্ড জ্বরে আমার ছেলে বার বার বলছে ” ঠাকুর ভালো করে দাও , খুব কষ্ট হচ্ছে আমার , প্লিজ ঠাকুর ভালো করে দাও “

প্রথমে কিছুটা চমকে উঠলেও ছেলেকে নিষেধ করিনি। ওকে ঐ সময় নিষেধ করলে ওর মনে প্রতিক্রিয়া হোত। ওর বন্ধুর অসুখের সময় শিখেছে এটা সারাক্ষণ বন্ধুর পাশে থাকার কারণে। বিপদে ঠাকুরকে ডাকতে হয়।
ঐ কচি মনে ধর্মের ভিন্নতা আমি আমার ছেলেকে শেখাইনি। ছেলে বড় হয়ে নিজে নিজে শিখেছে সব , শিখেই এখন সব পূজায় অংশ নেয় একজন বাঙ্গালী হয়ে , আর নিখিল দার ছেলেও শিখেই অংশ নেয় ঈদুল আযহা , ঈদুল ফিতর এ । রোজার ইফতারি না করলে ওর ভালোলাগে না।

আমি এবং নিখিলদার পরিবার কি ধর্মচ্যুত ? এভাবেই থাকতে চাই আমরা।

২১৩জন ২১৩জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য