মাহবুবুল আলম //

কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কোন বিশেষণে ভূষিত করা যায় এ নিয়ে অনেক লেখকই ভাবনায় পড়ে যান। তিনি কি বিদ্রোহী কবি, নাকি প্রেমের কবি বা সাম্য কিংবা মানবতার কবি, অথবা অসাম্প্রদায়িক চেতনা বা জাগরণের কবি নাকি আবার বাংলা ভাষাভাষির কবি। না, তা করতে গেলে কবি নজরুল ইসলামকে একটা নিদ্দিষ্ট গন্ডির ছকে বেঁধে ফেলা হলো। তিনি যেমন বাংলাভাষায় সাহিত্য রচনা করে বাংলার বাঙালি কবি হয়ে ওঠেছিলেন; তেমনি বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কলম ধরে বিশ্ব মানসের কবিও হয়ে ওঠেছিলেন। কবি যখন জন্ম গ্রহণ করেন তখন পাকভারত উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশদের শাসন ও শোষনের নিগুঢ়ে বন্দি। তাই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সেই শোষণের সীমাহীন চিত্র। যা কবিকে চিন্তা ও চেতনায় দ্রোহী করে তোলে। তাই তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তিনি যে মনে-প্রাণে ব্রিটিশবিরোধী ছিলেন তা তাঁর অনেক লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। যা আরো ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘কান্ডারী হুশিয়ার’ এই চরণেই ‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা, জীবনের জয়গান/আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা দেবে বলে বলিদান।’ তাঁর অন্য একটি কবিতাতেও তিনি ব্রিটিশ বেনিয়াদের উদ্দেশ্য বলেছেন-‘দেশ ছাড়বি কিনা বল / নাইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ এর উদাহরণ অনায়েসেই দেয়া যেতে পারে। সে বিতর্কে না যেয়ে এ কথা বলা যায় কবি কাজী নজরুল এসেছিলেন বাংলা কবিতায় নতুন সুর ও ছন্দে এক অপূর্ব সমাবেশ নিয়ে। তাঁর কবিতা যেমন আমাদের স্থানকাল পাত্র দেশে দেশে শাসন শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহী করে তোলে; তেমনি আমাদের উপহার দেন গানের ভূবনে এক নতুন যুগের সন্ধান। তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহী তেমনি মানবতায় হৃদয় সংবেদী এক অন্য কবিও।

কাজি নজরুল ইসলামের চরিত্র বিশ্লেষণে আরেকটি দিক লক্ষ্য করা যায়, আর সে দিকটি হলো চঞ্চলতা ও স্থিরতার অভাব। আজ এখানে তো কাল ওখানে, কয়দিন রুটির দোকানে তো আবার কয়দিন লেটোর দলে। আবার কখনো ইমামতিও করতে দেখা যায় কাজী নজরুল ইসলামকে। তবে তাঁর চরিত্রের দেশপ্রেমের বিষয়টি চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, লেখাপড়া ছেড়ে ছুড়ে দিয়েই তিনি যোগ দিচ্ছেন সেনাবাহিনীতে। আর চরিত্রের মানবিকতার দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে অসাম্য, অসুন্দর ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন চরম অপোষহীন ও বিদ্রোহী। দ্রোহ, প্রেম, ও মানবিকতার বিচারে নজরুল একজন শ্রেষ্ঠ পুরুষ। অসম্প্রদায়িক চেতনা ও প্রগতির এক উজ্জল প্রেরণা কাজি নজরুল ইসলাম। পরাধীন ভারতে জন্মগ্রহণ করে নজরুল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন, পরাধীনতার যন্ত্রনা। যে কারণে বিদ্রোহের কবিতা বাণী ও সুরেও এনেছিলেন এক নতুন মাত্রা। এক্ষেত্রে নজরুল এক নবযুগের উন্বেষও ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রচিত অগ্নিবীনা, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান-এর মাধ্যমে পরাধীনতার শৃংখল ভাঙতে নব জাগরনেরও সৃষ্টি করেছেন। শুধু ঔপনিবেশিক শাসন-শোষনের বিরুদ্ধেই নয়, নজরুলের অনেক গান ও কবিতা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণার উৎস হয়ে আমাদেরকে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। তাই নজরুলের গান আজ আমাদের রণসঙ্গীত। যে সঙ্গীতের সুরে উদ্বেলিত হয়ে আমাদের দেশের সৈনিকেরা মাতৃভূমির অতন্ত্র প্রহরী হয়ে জেগে থাকেন পাহারায়। শুধু বর্তমানেই কালেই নয় কাল থেকে মহাকালে সকল অন্যায় অত্যাচার শোষণ ও বঞ্চনা, সামজিক বৈষম্য, যাবতীয় কুসংস্কার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তাঁর সাহিত্যকর্ম সকল মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করবে। তাঁর কবিতা, গান কী উপস্যাস, গল্পে সর্বত্রই মানবমুক্তির প্রেমময়বাণী আমাদেরকে সর্বদাই আলোর পথ দেখায়। ইসলামী ঐতিহ্য আর হিন্দু পুরাণের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য’ এমন দার্শনিক বাণী শুধু উচ্চারণ করতে পারেন একজন নজরুল ইসলামই।

কাজী নজরুল ইসলাম সব সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙ্গে বাংলা কাব্য ও গদ্যে নতুন এক ধারা সৃষ্টি করেছিলেন সেই নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রুশবিপ্লবোত্তর পরাধীন ভারতে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ এক ঝড়ের রাতে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিকেশিক শাসনের শৃংখল ছেড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যেন এসেছিলেন তিনি। তিনি যখন থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন তখন থেকেই তাঁর কবিতায় অসম্প্রদায়িক ভেদাভেদহীন, মানবিক সমতার সমাজ গড়ার তীব্র আকাঙ্খা মূর্ত হয়ে ওঠে।  যখন থেকে সাহিত্যক্ষেত্রে নজরুলের আত্মপ্রকাশ ঘটে তখন তিনি নাবালকত্ম ও সাবালকত্বের মাঝামাঝি পর্যায়ে। তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরুতেই ১৯২২ সালে ব্যথার দান, অগ্নিবীনাও যুগবাণী লিখে অনেকটাই হইচই ফেলে দেন। বিশেষ করে অগ্নিবীনার বিদ্রোহী কবিতা ‘চির উন্নত মম শির’ কবিতাটির মাধ্যমেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বেনিয়া শাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বিনা প্রতিবাদে চলতে দেবনা তোমাদের শোষনের রথ। কবিতাটির প্রতিকী ব্যঞ্জনা ও বহু চিত্রকল্পের মধ্যমে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আহ্বানের পাশাপাশি ব্রিটিশ-বেনিয়া শাসক-শোষকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছিলেন। আর ‘যুগবাণীর’ কাব্যগ্রন্থের নবযুগ কবিতার মাধ্যমে নবযুগ আসন্নের ইঙ্গিত করে যাবতীয় ক্লেদ ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সাহস ও শক্তি সঞ্চারের প্রতি ইঙ্গি করে বলেছেন‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ’ সে সময়ে কবি কাজি নজরুল ইসলামের লিখিত কবিতাগুলো বাঙালি জাতিকে শুধু উদ্দীপ্তই করেনি, তাদের মাঝে জাগরণের সৃষ্টি করেছিলেন। তাই ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে অগ্নিবীণা প্রকাশের একমাসের মধ্যেই ২৩ নভেম্বর ১৯২২ গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত এটি আর প্রকাশ হয়নি। না প্রকাশ হয়নি, বলাটা বোধ হয় ঠিক হবে না; প্রকাশ হতে দেয়া হয়নি বলাটাই সমীচিন। নজরুলের গ্রন্থ নিষিদ্ধ করেই ব্রিটিশ-বেনিয়ারা ক্ষান্ত হয়নি এজন্য কাজি নজরুল ইসলামকে কারাভোগও করতে হয়েছিল। ১৯২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত  নজরুল ইসলাম কর্তৃক সম্পাদিত ১২’শ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল ‘আনন্দময়ীর আগমনে’কবিতাটি। আর এ কবিতা লেখার জন্যই কাজী নজরুল ইসলামের এক বছরের জেল হয়েছিল। সাহিত্য যে যুগে যুগে কালে কালে স্থান কাল পাত্র ভেদে সকল শোষক ও নিপীড়ণকারীদের গায়ে সাপাং সাপাং চাবুকে আঘাত হানে তার জলন্ত উদাহরণ ছিল নজরুলের এই ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। ধূমকেতুতে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশের পর পুলিশ ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর ধূমকেতু অফিসে হানা দিয়ে নজরুলকে খোঁজতে থাকে। কেননা, তাদের হাতে তখন ছিল ফৌজধারী দন্ডবিধির ১২৪ ধারা মোতাবে রাজদ্রোহের অভিযোগ। এই কবিতাটির ওপর ইংরেজদের রুষ্ট হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। নজরুল ইসলাম এ কবিতার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর সৈনিকদের ত্যাগের মহিমা বর্ণিত হয়েছিল। বিশেষ করে যারা ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে জীবন দিয়েছিলেন, সেই বীরদের ত্যাগ ও গৌরবগাথা এ কবিতায় বিধৃত হয়েছে হৃদয়গ্রাহী চিত্রকল্পে। এদরে মধ্যে সিরাজদ্দৌলা, মীর কাসিম, টিপু সুলতান, ঝাঁসির রাণী, রাণূ ভবানী কথা উল্লেখ ছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার জন্যে গান্ধী, অরবিন্দ, চিত্ররঞ্জন, সুরেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ বারীণ ঘোষ প্রমুখকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয় ধর্মের নামে ভন্ডামী এবং অহিংসার নামে তাদের কাপুরুষতার প্রতি তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছিল। পাঠকদের কৌতুহল নিবৃত্ত করার জন্য এখানে কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করা হলো। গান্ধীর নিষ্কিয়তা নিয়ে লেখা হলো: বিষ্ণু নিজে বন্দী আজি ছয় বছরি ফন্দি করায়/চক্র তাহার চরকা বুঝি, ভন্ড হতে শক্তি হারায়।’ রাজনীতিক অরবিন্দু ঘোষকে উদ্ধেশ্য করে লেখা হয়েছিল,‘মহেশ্বর আজ সিন্দু তীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে/অরবিন্দ চিত্র তাহার ফুটবে কখন কে সে জানে।’ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্দেশ্যে লিখেছেন-‘সদ্য অসুর-গ্রাসচ্যুত ব্রক্ষ্ম-চিত্তরঞ্জনে, হায়/কমন্ডলুরশান্তি-বারী সিঞ্চি যেসব চাঁদ নদীয়ায়।’ সুরেন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন,‘সুরেন্দ্র আজ মন্দ্রনা দেন দানব-রাজার অত্যাচারে,/দম্ভ তাঁহার দম্ভোলি ভীম বিকিয়ে দিয়ে পাঁচ হাজারে।’ রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন,‘রবি শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে/সে কর শুধু পশলো না মা অন্ধ কারার বন্ধ ঘরে।’ তেমনি ভারতবাসীকে ভীতু ও বীর্যহীন খোজা গোলামের সাথে তুলনা করে বলেছেন,‘আজ দানবের রঙ মহলে তেত্রিশ কোটি খোজা গোলাম/লাথি খায় আর চ্যাঁচায় শুধু ‘দোহাই হুজুর মলাম মলাম।’

জেলে আটক রেখেও নজরুলের কন্ঠ স্তব্দ করা যায়নি, লেখা থেকে তাঁর কলমকে নিবত্ত করা যায়নি। জেলের পীড়াদায়ক নির্যাতনের মধ্যে থেকেও তিনি জেলখানায় আটক রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীদের মনে আনন্দ ও আশার সঞ্চার করেছিলেন। এভাবেই একসময় জেলখানার কয়েদীদের সাথে নজরুলের হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। এ কারণে নজরুলের হাতে পায়ে লোহার ডান্ডা-বেড়ি পরিয়ে অন্যান্য কয়েদীদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু গরাদের ভেতর থেকেওে তিনি গাইতে লাগলেন ‘শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল, শিকল পরে শিকল তোদের করবোরে বিকল।’ বা মাঝে মাঝে আবৃতি করতে লাগলেন ‘সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাড়ায়।’ নজরুল গণমানুষের কবি হিসাবে যেখানেই মানুষ ও মানবতার অবমাননা লক্ষ্য করেছেন সেখানেই তিনি প্রতিবাদ করেছেন তাঁর খুরধার লেখনীর মাধ্যমে। এ প্রসংগে কবি নিজেই বলেছেন,‘…আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তখনই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি- কাহারো তোষমমোদ করি নাই। প্রশংসা প্রাসাদের লোভে কাহারো পেছনে পোঁ ধরি নাই। আমি শুধু রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি  নাই সমাজের, জাতির , দেশের যা কিছু অন্যায় তার বিরুদ্ধে আমার সত্র তরবারির তীব্র আক্রমন সমান বিদ্রোহ করেছে।

যদি কাউকে হঠাৎ করেই প্রশ্ন করা হয় যে, কাজি নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মের কোন দিকটি আপনাকে বেশি উদ্দীপ্ত করে? তা জলে চটজলদিই কারো পক্ষে বলে দেয়া সম্ভব নয় যে, এ বিষয়টা বা ওই বিষয়টা আমাকে উদ্দীপ্ত করে। কেননা নজরুলের বিশাল সৃষ্টিভান্ডারে যেমন গান আছে, তেমনি আছে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক বা প্রবন্ধ-নিবন্ধ। এই বিশাল সৃষ্টি ভান্ডারের কোনোটাকেই আগপিছ করে বলা সম্ভব নয়। তাঁর প্রায় সব সৃষ্টিকর্মই প্রায় সমমানের। তাঁর বিদ্রোহী কবিতা যেমন আমাদেরকে শাসক-শোষকদের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার প্রেরণা যোগায়; তেমনি ভালবাসার গানেও অন্যরকম এক সুরের মায়াজালে আমাদের আবিষ্ট করে। আর যদি তার সাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিয়ে মানুষের বিভেদের বিষয়টি বিবেচনায় আনি তা হলে অনায়াসেই সামনে চলে আসে‘ জাতের নামের বজ্জাতি সবজাত জালিয়াৎ জাত জালিয়াত খেলছে জুয়া/ ছুলেই তোর যাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।’ বা হিন্দু না ওরা মুসলিম, ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন/কান্ডারি বল ডুবিয়াছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’ প্রেমে ও বিরহে আমরা যদি তাঁর কাছে হাত পাতি তা হলে তিনি আমদের দুহাত ভরে বিলিয়ে দেন প্রেম সুধা। এক্ষেত্রে ‘রক্ত ঝরাতে পারিনা তো একা, তাই লিখে যাই রক্ত লিখা।’ আবার নারী জাগরণের বিষয়ে নজরুল লিখেছেন, ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা, জাগো স্বাহা সীমান্তে রক্তটিকা’ ইত্যাদি ধর্মীয় কূপমন্ডকতার  বিরুদ্ধে সমগ্র বিশ্বের নারী জাতিকে জাগিয়ে তুলে। এই ভাবে তাঁর ছোটগল্পগুলো হয়ে ওঠে আমাদেরই কারো না কারো জীবনের না বলা গল্প যা নজরুল আমাদের হয়ে তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন স্বার্থকভাবে।

একটি বাঙালি দরীদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে কাজি নজরুল ইসলামের চরিত্রে যে বহুমুখি প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছে, তা অন্যের বেলায় তেমন ঘটেনি। তবে কি এ দারিদ্রতাই তার জীবনে সাহিত্যের অনুসঙ্গ বা আর্শীবাদ হয়ে এসেছিল? যে কষ্ট, দুঃখ হতাশায় তাঁর জীবন কেটেছে তা খুড়ে খুড়েই তিনি সাহিত্যের উপদান, কবিতার ছন্দ, অনুপ্রাস ও ব্যঞ্জনা, আর গানের সুরে দুঃখ-বেদনার চিত্র চিত্রনে এতটা সফলতা লাভ করতে পেরেছিলেন। তাই হয়তো এসব অনুসঙ্গকে সঙ্গি করেই তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন কোনো এক রোমাঞ্চের হাতছানিতে। পথভোলা এক পথিকের মতো বেছে নিয়েছিলেন এক বাউন্ডলে জীবন। সেই এইটুকুন বয়সেই কোলকাতা থেকে শুরু করে পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েছেন। এভাবে ঘুরেতে ঘুরতেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ একেবারে তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরুতেই। আমরা যদি নজরুলের চরিত্র বিশ্লেষণে যাই তা হলে দেখতে পাই, বাউন্ডলে হলেও তার মধ্যে ছিল, অপরিসীম জ্ঞানতৃষ্ণা। দারিদ্রের কারণে তেমন লেখাপড়া না করতে পারলেও যতটুকু লেখাপড়া করেছেন তাতে দেখা গেছে লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। লেখাপড়া করার সময় তিনি কোন ক্লাশে তো ফেল করেনইনি বরং দু একবার অটোপ্রমোশনও পেয়েছেন নজরুল।

গ্রামে ঘুরতে ঘুরতেই বাংলা লোকসঙ্গীতের সাথে ব্যাপক পরিচয় ঘটে। তাই তিনি যখন লেটোর দলের জন্য গান রচনায় মগ্ন হলেন, তখন অনেক গানেই লোক লোকসঙ্গীতের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। আমরা জানি যে কাজি নজরুল ইসলামের চাচা বজল ই করিম ভাল ফার্সি জানতেন, চাচার কাছ থেকেই তিনি ফার্সিভাষা শিখেছিলেন। এ জন্যেই নজরুলের অনেক গান ও কবিতায় ফার্সি ভাষার মিশেল লক্ষ্য করা যায়। নজরুল যতটুকুই লেখা পড়া করেছেন, সেই সময়েই তিনি বাংলা, সংস্কৃতি ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন।

আধুনিক বাংলা গানের পঞ্চরত্ন হিসেবে যাঁদের পরিগনিত করা হয়, তারা হলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত (১৮৬৫-১৯১০), অতুল প্রসাদ ((১৮৭১-১৯৩৪), এবং কাজি নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। এই পাঁচজন সে সময়ের আধুনিক বাংলা গানকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁদের সময়কালে ভারতবর্ষে উচ্চাঙ্গ সংগীত উৎকর্ষতা লাভ করে। তাদের অবিরাম চেষ্টা ও সাধনায় আধুনিক বাংলা গানের চরম বিকাশ লাভ করে। তাঁরা বাংলাভাষায় রচিত গানকে ভাবে সুরে ও বাণীতে যে ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, এর পর বাংলা রাগাশ্রিত গানের তেমন প্রচার ও প্রসার লাভ করে নাই। এদের মধ্যে বহুমুখি এক প্রতিভার অধিকারী কাজী নহরুল ইসলাম যেন ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেন বাংলার শাস্ত্রীয় সংগীত জগতে। তাঁর রচিত খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা, গজল, ভাটিয়ালী ও মুরশিদীসহ নানান প্রকার, ঢং ও আঙ্গিকে প্রায় তিন হাজার গান বাংলা ভাষার গানে অক্ষয় ও অমর হয়ে আছে।

‘বাগিচায় বুলবুলি তুই, ফুল শাখাতে দিসনি আজি দোল।’ সম্ভবত কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম বাংলা গজল; যা রচিত হয়েছিল ১৩৩৩বঙ্গাব্দের ৮ অগ্রহায়ন। তিনি ১৯২৬ সালের শেষের দিকে এসে গজল রচনায় অধিক মনোনিবেশ করেন, যখন তিনি গ্রামোফোন কোম্পানীতে যোগদান করেন। দেওয়ান হাফিজের একজন ভাবশিষ্য হিসাবে তাঁর গানের বাণী, ছন্দ ও সুর নজরুলের মনে বিপুল রেখাপাত করে। কাজী নজরুল ইসলাম হাফিজ দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তা তিনি তাঁর নিজের লেখনীতেই বর্ণনা করেছেন এভাবে‘ তাঁহার অর্থাৎ পারস্য কবি হাফিজের কবিতার অধিকাংশ গজল গান বলিয়া লেখা হইবা মাত্র মুখে মুখে গীত হইত। ধর্মমন্দির হইতে আরম্ভ করিয়া পানশালা পর্যন্ত সকল স্থানেই তাঁহার গান আদরের সহিত গীত হইত। হাফিজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মতো কুলের পথিক  যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গলীলা দেখিয়া অবাক বিষ্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল তলের সন্ধানী ডুবুরি তাহার তলদেশে অজস্র মনিমুক্তার সন্ধান পায়। তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নর্তন, বিপুল বিশালতা, তেমনি নিন্মে অতল গভীর প্রশান্তি মহিমা।’ বিশ্লেষণ ও উপলব্দি থেকেই হয়তো  তার গজলে শেয়রের ব্যবহার হতো। তাঁর গজলের এই তালবিহীন শেয়র আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

নজরুল ইসলাম দীর্ঘায়ু হলেও তার সাহিত্য জীবন মাত্র ২৩ বছরের। এ স্বল্প সময়েও তিনি এমনসব সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে গেছেন যা আমাদের অমূল্য সম্পদ হিসাবে যুগে যুগে বিবেচিত হবে। আমরা যদি নজরুলকে আরো দীর্ঘসময় পেতাম তা হলে আমাদের বাংলাসাহিত্য আরো অধিক ঐশ্বর্যমন্ডিত হতো এ কথা আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়। তাঁর বহুমুখি প্রতিভায় বিমুগ্ধ হয়েই আচার্য প্রফুল্য চন্দ্র রায় ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁকে অবিভক্ত বাংলার কবি হিসাবে অভিহিত করেছেন। আবার স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে কলকাতা থেকে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। কবিকে ধানমন্ডির ২৮ নং সড়কের ৩৩০-বি বাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্ধ দিয়ে কবিকে যেমন সম্মনিত করেছেন, সম্মানিত করেছেন বাংলাদেশের মানুষকেও।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে তারিখে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারী আদেশ জারী করা হয়।

এরপর যথেষ্ট চিকিৎসা সত্ত্বেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে এবং বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে। জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নজরুল তার একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই / যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”:- কবির এই ইচ্ছার বিষয়টি বিবেচনা করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তার সমাধি রচিত হয়।

 

 

৪৪৯জন ২৮৬জন
40 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য