কাল দুপুরে ভাতের চাল জুটেছিল কিন্তু সাথে ছিল না তরকারী বা অন্য কিছু। তবুও ২ ছেলে ও ৪ মেয়ে নিয়ে মোটামুটি  ভাতের মাড় দিয়ে দুপুরের এবং রাতের খাবার হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা মাসের ৩০ টা দিনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দিন হয়। তবুও নিম্ন মধ্যবিত্তের এই সংসারে এক আশা আলতো করে জ্বলছে। এই জ্বলার মাঝে ভীষণ ধরণের জ্বালার আগুন রয়েছে ! মা-বাবার দিন কাটে সেই আশার আলোর কথা চিন্তা করে। বাচচারা তার মানুষ হবে একদিন। তখন আর এই কষ্টের বিরাট পাথরটি থাকবে না।

বড় ছেলে সবার বড়। নাম রাশেদ। পরেই পর পর তিনটি মেয়ে। ছোট ছেলেটি সবার ছোট বোনটির ২ বছরের বড়। নাম তার খালেদ । রাশেদ এবার মেট্রিক পরীক্ষা দিবে । গ্রামের মেধাবী ছাত্র। কয়েকটি টিউশনি করে সংসারের অভাব কিছুটা হালকা করে । মেয়েরা সবাই স্কুলে পড়ে। খালেদ এবার ৩য় শ্রেণীতে। সবাই ভাল ছাত্র-ছাত্রী ।

রাশেদ একের পর এক পরীক্ষায় চমক দেখিয়েছে । মেট্রিকে এবং এইচ এস সি তে গোল্ডেন এ + পেয়েছিল। আর সে সু্যোগে সরকারী বোর্ড টেলেন্টপুল বৃত্তি জুটে গিয়েছিল । সংসারে যা আরেকটু অভাবের বস্তা হালকা করেছিল । এবার ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় সে ১০ম হয়ে বাবা-মা আর ছোট ছোট ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারো স্বপ্ন পূরণের আশায় ভর্তী হল।

ভর্তী হয়েই সে কয়েকমাসের মধ্যে পেয়ে যায় কিছু ভাল টিউশনি। আর তাতে মাসে মোটামুটি তার খরচ বাদেও বাড়িতে ৫০০০ হাজার টাকা পাঠায় । হলে চোখের জলের মত ডাল অফুরন্ত ভাতের সাথে কেমিস্ট্রি করে সাথে কিছু ভর্তা উপাদেয় তরকারী দিয়েই তার খাওয়া হয়ে যেত। মাসের ২ বা ৩ দিন খেত মাছ বা মাংস । বাড়িতে বাবার স্বল্প আয়ের সাথে তার পাঠানো মাসিক কিছু টাকায় সবার মোটামুটি দিন ভালই চলতো।

এই স্বল্প টাকাকে কিভাবে বাড়ানো যায়, যাতে করে তার একটি ছোট ভাই আর বোনদের পড়ালেখায় কোন বিঘ্ন না ঘটে সে চিন্তায়ই সে নিজে খরচ করতো কম আর জমাতো বেশি। বিশেষ করে তার বোনদের যেন পড়ালেখায় কোন সমস্যা না হয়, আর টাকার অভাবে যেন বাবা তাদের পড়ালেখা বন্ধ না করে দেন সেই জন্যেই তার এই কষ্টে জীবন।

ছোট ভাইটি এবার ১০ম শ্রেণীতে । তুখড় ছাত্র। কিন্তু বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিশে মিশে একটু অন্য রকম হচ্ছে যেন দিন দিন। দেশের রাজনীতির সংকটময় অবস্থায় তাদের স্কুলে প্রায়ই গন্ডগোল হয়। প্রায়ি স্কুল বন্ধ থাকে। ফলে পরীক্ষা স্থগিত । বাসায় থাকতে থাকতে আর তার ভালো লাগে না, তাই প্রায়ই সন্ধ্যের সময় সে বাসায় আসে না। বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা মারে। সঙ্গ দোষে তার স্বভাবে কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

বাবা হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় রাশেদের আয়ে সংসার কোনমতে চলে। ফলে বোনদের ও পাশের বাড়ীতে টিউশনি করে সংসারে কিছু অবদান রাখতে শুরু করেছে । আর অন্য দিকে খালেদের অভাবের সংসারে থেকে থেকে টাকার প্রতি তীব্র আকর্ষণ দেখা দিয়েছে । সে ও সংসারে কিছু অবদান রাখার জন্যে পাড়ার কিছু বন্ধুর সাথে প্রায়ই মিছিলে যায়। জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিয়ে সে প্রতিটি মিছিল থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়। মিছিলের প্রয়োজনে মাঝে মাঝে গাড়ী ভাংচুর করে । রাস্তা অবরোধ করে। আরো কত কি !

এদিকে রাশেদের গ্রাজুয়েশন শেষ। একটা দেশী কোম্পানীতে ৩০০০০ টাকার চাকরী পায় । চাকরী যে সে পেয়েছে, তা সে বাসায় কাউকে জানায় নি। মাসের প্রথম টাকা পেয়েই বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে তার সেই প্রথম চাকরীর পুরো টাকা তুলে দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিতে চায় সে।

এই চাকরী পেয়ে সে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে। বাড়িতে গিয়ে ঘর মেরামত করতে হবে, অসুস্থ বুড়ো বাবাকে আর কাজ করতে দিবে না। আর বাসার কেউ না খেয়ে বা আধ-পেট খেয়ে ঘুমোবে না। ভাই –বোনদের আর পরিবারের জন্যে পড়ালেখার ক্ষতি করে টিউশনি করতে হবে না। মা-কে আর সেই পুরাতন শাড়ী পরে বছর কাটাতে হবে না। বাবাকেও সেই পুরাতন লুঙ্গি-জামা পড়ে বছর কাটাতে হবে না। ভাই বোনরাও আর ঈদের সময় পুরাতন জামা দিয়ে ঈদ পালন করতে হবে না। এবার সংসারের দুঃখের দিন ফিরবেই !

দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভোটের সময় থাকে সবচেয়ে গরম। খালেদ মিছিল মিটিং করতে করতেই একটি দলের বেশ কর্মঠ কর্মী হয়ে গেল ।  তার দলের বিভিন্ন নেতাদের সরকারী দল কারাগারে বন্দি করে রেখেছে । আর সেই জন্যেই তাকে প্রায়ই রাস্তায় বিভিন্ন মিছিল মিটিং এবং ভাংচুরে অংশ নিতে হয় ।

দিনটি ছিল মাসের ৫ তারিখ ! রাশেদ গতকালই বেতন পেল। বাড়ির জন্যে কিছু কেনাকাটা করে সে রাতের বাসে রওনা হল । গত তিনদিন হরতালে জন্যে অনেক গাড়ীই স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় নি। কোন মতে একটি বাসের টিকেট সে পেল জানালার ধারে । রাতের বাসে সে রওনা হল তার অনেক স্বপ্ন নিয়ে আর বাড়ির সবাই কে সারপ্রাইজ দিবে সে চিন্তা করতে করতেই তার রাতে বাসে আর ঘুম হল না।

রাত তখন ৩ টা। খালেদ দলেরই কর্মসূচী মোতাবেক বাসা থেকে চুপি চুপি বের হয়ে গেল। আরো কিছু লড়াকু কর্মী আগেই ছিল তৈরী । আজ রাতের টার্গেট হচ্ছে বিশ্বরোড ! হরতালের শেষ আচড় খানা ভাল ভাবেই দিতে হবে-উপরি আদেশ । তাই খালেদ তার কর্মী নিয়ে মোটর সাইকেলে করে আসল বিশ্বরোডের এক কোনে । শুরু টা তাকেই করতে হবে। দূর থেকে একটি গাড়ীর হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে । সে আশপাশ খুঁজে একটি পাথরের টুকরো হাতে নিল। যেইনা বাসটি পাশ দিয়ে গেল, তখনই সে পাথরটি ছুড়ে মারল বাসটিতে। বাস থেকে “আহ্” করে একটি আর্তনাদ আসল । খালেদের কাজ শেষ হলেই, সে বাসায় তখনই ফিরে আসল ।

কখন যে রাশেদ ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা সে জানে না। সুপারভাইজারের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে রাশেদের। তার গন্তব্যে প্রায় চলে এসেছে। তাই সে রাতের আকাশটা ভাল করে দেখে নেয়ার জন্যেই জানালা দিয়ে বিশাল আকাশটা দেখতে লাগল। চাঁদটাকে আজ অসম্ভব সুন্দর লাগছে । আর কিছুক্ষন পরেই মা-বাবা, ভাই-বোন সবার সাথে দেখা হবে এই খুশীতে তার মন ছটফট করছে । হঠাৎ একটা পাথর উড়ে এসে লাগল রাশেদের মাথায়। ফিনকী দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হল। তার এই সুন্দর আকাশটি ভন ভন করে ঘুরতে লাগলো। সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসল, সাথে তার ছটফট করা স্বপ্ন গুলোও !

ভোরের দিকে বাড়িতে পুলিশের গাড়ী আসল। তাদের সাথে রাশেদের লাশ ! রাশেদের লাশটি তার পরিবারকে দিয়ে যাওয়ার সময় তার মৃত্যুর কারণ বলে গেল । বাড়ির সবাই শোকে মুহ্যমান। কেবল খালেদের চোখে পানি নেই। তার দলের স্বার্থে অনেক ভাংচুর, মারামারী করতে হয়েছে। অনেকেরই প্রাণ গিয়েছে সেই সংঘর্ষে। তখন তার দলের দাবীর চেয়ে মানুষের প্রাণ বড় মনে হয় নি। কিন্তু আজ কি হল? তারই দলের স্বার্থে দুষ্কর্মের জন্যেই তার একমাত্র ভাইকে প্রান দিতে হল তারই হাতে ! মনে পড়ল তার ভোররাতের অপারেশনের কথা । সেই “আহ্” আর্তনাদটি কি তার প্রিয় ভাইটিরই ছিল? যার যায় সেই বুঝে আর তাই এতদিন পর খালেদ বুঝতে পারল মানুষের জীবনের চেয়ে দল নিতান্তই তুচ্ছ । মানুষের জন্যেই দল, দলের জন্যে মানুষ নয় !

সকাল বেলার সূর্যোদয় হচ্ছে, তাই পুব আকাশে হালকা এক রক্তিম আভা দেখা দিয়েছে । এ কি রাশেদেরই রক্ত নয় আকাশে ? হুম তারই রক্ত, স্বপ্ন গুলোর মর্মান্তিক রক্ত । দারিদ্রতার দূর করণের প্রচেষ্টার রক্ত। এই রক্ত বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের প্রিয়জন হারানোরই রক্ত। এই রক্ত… এই রক্ত…… বন্ধন ছিন্ন করারই রক্ত ! এই রক্ত সেই মানুষগুলোরই রক্ত যারা ক্ষমতারই কোন্দলে পড়ে পৃথিবী থেকে বিদেয় নিয়েছে । যারা পরিবারে দুবেলা খাওয়ার জন্যেই হাজার হরতাল অবরোধের মধ্যে দিয়েই অন্নের ব্যবস্থা করার জন্যেই সকালে কিছু না খেয়ে বাসা থেকে বের হয়, আর রাতে আগুনে পুড়ে, বুলেটের আঘাতে, ছুরিকাঘাতে, লাঠীর প্রহারে প্রান দিয়ে তাজা লাশ হয়ে নিথর দেহে বাসায় ফেরে । তারা কি সত্যিই ফিরে ?

 

২২৯জন ২২৯জন
0 Shares

৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য