দেদাস্যিমনা শেষ পর্ব

রেজওয়ান ২০ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, ০১:৫০:৩৪অপরাহ্ন গল্প ১৫ মন্তব্য

ঘুম থেকে উঠে দেখি সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। রুম অন্ধকার হাতরে ফোন টা হাতে নিয়ে দেখি ৬:৩৭পিএম। ফোনের আলোতেই লাইটার আর সিগারেট খুজে জ্বালাতেই দিসু নড়েচড়ে উঠলো কিন্তু চোখ খুললো না। হয়তো গন্ধটা নিতে পারছে না বলেই নড়ে উঠছে ভেবে যেই বারান্দায় যাওয়ার জন্য বেড থেকে নামতে যাবো ওমনি আমাকে চমকে দিয়ে আদর মাখা ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো যদি ভাবেন স্মোকের জন্য বারান্দায় যাচ্ছেন তবে যাওয়ার দরকার নেই, আমি ঠিক আছি বলেই আমার কোমড়ের কাছে মাথা রেখে শুয়ে রইলো! আমি কিছুই না বলে শুধু ভাবলাম “মেয়ে তোকে লাই দিয়ে কি মাথায় উঠাচ্ছি?”

সিগারেট শেষ করে ফ্রেস হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে গেলাম, যাওয়ার সময় বলে গেলাম wake up & be ready to fresh, after dinner we will move. আড়মোড়া দিয়ে বললো স্যার আমি গোসল করবো না ঠান্ডা লাগে, শুধু হাত মুখ ধুবো! কিছু না বলে গোসল করে ফিরে এসে দেখি সে ফুল প্যান্ড আর টপস পড়ে বসে আছে!
-একি ড্রেসআপ তোমার? শর্টস না পড়লেও থ্রি-কোয়ার্টার পড়ে নাও!অনেক বৃষ্টি হয়েছেতো কাঁদা লাগতে পারে। আর শর্ট হ্যান্ড টপ্স না ফুলহাতা টি-শার্ট পড় তা নাহলে ঠান্ডা লাগবে তবে তাবুতে গিয়ে ফুল প্যান্ট পড়ে নিও।
-আচ্ছা বলে মুহুর্ততেই আমাকে পেছন ফিরতে বলে চেইঞ্জ করে নিলো। আশ্চর্য! লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছে নাকি? এই মেয়ে আমি কি তোমার বয়ফ্রেন্ড? যে এমন বিহেইভ করতেছো?
বয়ফ্রেন্ড না হলেই কি আমি তো আপনাকে অন্যভাবে দেখছি না। সেই ইন্টারভিউ টেবিল থেকেই একটা অদৃশ্য টান অনূভব করি, কিন্তু কেন জানি না। আপনি একজন পুরুষ, এবং এ ও জানি অনেক মেয়ের সাথেই অনেক গভির রিলেশনে গিয়েছেন! ভালবাসায় বিশ্বাস করেন না, নারী মানেই বিছানা সঙ্গী,নারী মানেই বিত্তের পেছনে ছোটে ব্লা ব্লা ব্লা…এরপরেও ভাল লেগে গেছে আপনাকে। কি করবো বলেন?
বাহ্ এই মেয়ে দেখি অনেক কিছুই জানে। কার কাছে শুনলো? ভাবছি আর ব্যাগ গুছাচ্ছি, গরম কাপড়, আইপড, হেডফোন, আগুন জ্বালানোর জন্য ফুয়েল, কিছু কয়লা সহ সাথে আছে ক্যামেরা,স্ট্যান্ড,লেন্স,ব্যাটারি, ইটালিয়ান রেড ওয়াইন, ব্যান্সন সিগারেট, লাইটার ও ছোট্ট একটা বাটারফ্লাই নাইফ! ব্যাগ গুছিয়ে বলে দিলাম চলে যাচ্ছি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বাহিরে, ইচ্ছা হলে ফোন নিও না ইচ্ছা হলে নিও না, আমি নিচ্ছি না বলেই বলকাম ডাইনিংয়ে আসো আমি যাচ্ছি! বাধ্যমেয়ের মত পেছন পেছন আসলো! কিছুই বললো না পিনড্রপ সাইলেন্টে ডিনার শেষ করে সোজা তাবুর উদ্দেশ্যে বের হলাম। বাহিরে এসে দেখি গাড়ি রেডি ই আছে, সাথে জয়নাল ভাই ও দাঁড়ানো আছেন। কাছে যেতেই হাতে একটা ওয়াকিটকি দিয়ে বললেন ফোনতো নিবেন না জানি এটা অন্তত নিয়ে যান। আমি কিছু না বলে নিয়ে নিলাম। মানুষ টা আমার সিকিউরিটির কথা চিন্তা করে কিন্তু আমি বাধা দেই বলেই কিছু করতে পারে না।
-গাড়িতে উঠে জয়নাল ভাইকে বলে দিলাম আমাদের নামিয়েই চলে আসবে, বাড়তি কোনো কথা না ঠিক আছে?
-জানিতো স্যার আমার কথা শুনবেন না আচ্ছা স্যার সাথে একজন সিকিউরিটি রাখলে কি এমন ক্ষতি?
-আছে তো এইযে দেদাস্যিমনা! ওই আমার এবারের সিকিউরিটি হাহাহা..

তাবুর কাছে এসেই মনটা কেমন হয়ে গেলো সূর্য পরে গেছে কত্ত আগে কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় লাল আভাটা রয়েই গিয়েছে! ক্যামেরা বের করেই ছবি তুলে নিলাম বেশ কিছু। দিসুর অজান্তেই ওর আনমনে পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকার ছবি তুলে নিলাম! ক্যামেরা তাবুর ভেতরে রেখে বাহিরে এসেই একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ভাবছি প্রকৃতির কি অপরূপ সৌন্দর্য, এই পাহাড়টা যে গভির রাতে চাঁদের আলোয় নিলাভ রঙ ধারণ করবে!

এতক্ষণ পরে দিসু মুখ খুললো!এত সুন্দর যায়গা আমি আমার জীবনেও দেখিনী স্যার।
-আমার ছবি তুলে দিবেন না? এত সুন্দর যায়গায় নিজের ছবি না থাকলে যে পাপ হবে!
-আমি মানুষের ছবি খুবই কম তুলি জানোইতো! আর তোমার যা চেহারা-ছুরত এর ছবি তুললে প্রকৃতি কেঁদে দিবে হা হা হা..
-স্যার বলতে চাচ্ছেন আমি সুন্দর না? আমি দেখতে পঁচা?
-একটু দেড়ি হলেও বুঝছো এটাই বা কম কিসের?
-আপনার সাথে কথা বলবো না আমি বলেই গাল ফুলিয়ে তাবুর ভেতরে ঢুকে গেলো!

আমি আনমনে আরেকটি সিগারেট জ্বালিয়ে ঝিঝি পোকার ডাক শুনছি! সময় হয়তো রাত ৯:৩০/১০ হবে। এতক্ষণ দিসু তাবুর ভেতরেই ছিলো বের হয়নি। বেচারি মনে হয় অনেক রাগ করেছে যাই রাগ ভাংগাই তা না হলে রাগ করে বসে থাকবে সৌন্দর্যটাই মিস করবে!

কি ব্যাপার এখনো রাগ কমেনি? বলেই তাবুতে ঢুকে দেখি একা একা ওয়াইনের এক বোতল প্রায় শেষ করে দিয়েছে!
কিছু না বলে আবার ঢালতে গেলে বাধা দিয়ে বললাম ওয়াইন দিয়ে মাতাল হওয়া মানে ওয়াইনটা ই লস। এভাবে খেতে হয় না!
– তো কি করবো শুনি? আপনার সাথে আসছি আমার দিকে নজর ই দিচ্ছেন না ভাল কথা তাই বলে আমাকে পঁচা বলবেন? আমাকে ইগ্নোর করবেন? এর চেয়ে তো না আসাই ভাল ছিলো!!
-আমিতো আগেই বলেছি আমার সাথে গেলে বোর হয়ে যাবা তা সত্যেও আসছো আমি তো আনি নাই তাইনা?
-জ্বী আমার ই ভুল হয়েছে! সকালেই আমি চলে যাবো।
-থাক আর যেতে হবে না বাহিরে চেয়ার টেবিল পাতা আছে, হালকা খুধাও লাগছে নতুন একটা ওয়াইনের বোতল নিয়ে আসো আমি স্ন্যক্স আর ক্যামেরা নিয়ে আসছি!
-রাগে গজ গজ করতে করতে বেরিয়ে গেল! আমিও মুচকি হেসে বেরুলাম আত ভাবলাম আর চ্যাতায়ে কাজ নাই বাপু, পাছে রাত টাই না মাটি হয়ে যায়!

বাহিরে এসে টেবিল গুছিয়ে ক্যামেরাটা ওর সামনে দিয়ে বললাম সন্ধ্যার ছবি গুলো দেখবা না? না দেখবো না, আপনি সুন্দর ছবি নিয়েই থাকেন। যেখানে আমার ছবি নেই সেখানকার ছবি দেখে কি হবে? আমার চোখেই আমি প্রকৃতি দেখবো ছবি দেখবো না!
ক্যামেরা এগিয়ে দিতে দিতে বললাম একটু দেখো ভাল লাগবে! নিজের ছবি দেখে লাফ নিয়ে উঠে বললো আমার ছবি কখন তুলছেন? আর না বলে আমাকে কষ্ট দিলেন? পুরুষ মানেই কি পেইফুল প্রাণী?
-না পুরুষ মানে পেইনকিলার হাহাহা..
-হাসবেন না বলেই ছবি দেখায় ব্যাস্ত হয়ে পরলো! আমি দুই গ্লাসে ওয়াইন ঢেলে একটা সিগারেট জ্বালালাম। ছবি দেখে দিসু উঠে গেলো। কোথায় গেলো বুঝা গেলো না আমি উঠে কিছু ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পরলাম। একটু পর দিসু এসে আমার চেয়ারে বসেছে দেখলাম। ক্যামেরা রেখে ওয়াইনের গ্লাস হাতে নিয়ে টোষ্টের জন্য এগিয়ে দিলাম।ওর দিকে! দিসুও চিয়ার্স বলে চোখে চোখ রেখে গ্লাসে চুমুক দিলো!
-স্যার আপনি এতো রসকশহীন কেন? রোমান্স নাই, ভালবাসার মানুষ নাই! একা একা কিভাবে থাকতে পারে একজন মানুষ? আমি কিছু না বলে চুপ করে সিগারেট জ্বালানোর জন্য লাইটার খুজছি এখন সময় দিসু উঠে এসে আমার ঠোট থেকে সিগারেট সরিয়ে নিয়ে ঠোটে আলতো করে চুমু দিয়ে বললো এখন আর সিগারেট নয় আমার কথার উত্তর দিন তারপর বলেই আমার পাশেই বসে পরলো!
-আচ্ছা বলো কি প্রশ্ন?
-আপনার কি কখনোই গার্লফ্রেন্ড ছিলো না?
-ছিলো এক সময়।
-তো কি এমন হয়েছিলো সব বলেন আমাকে।
-আসলে নিজেই সেই মেয়েটাকে গার্লফ্রেন্ড ভাবতাম, আমাকে সে বয়ফ্রেন্দ ভাবতো না। নিজে নিজেই তাকে নিয়ে গল্প সাজাতাম, কল্পনায় হারিয়ে যেতাম। ভাল একটা বন্ধু ছিলো ও। তবে জানতাম না ওর বয়ফ্রেন্ড আছে! আসলে আমি ই ভাল বন্ধু মনে করতাম, সে করতো না তো তাই কিছু বলতো না। সুন্দর একটা নাম ও দিয়েছিলাম তার জানো?
-কি নাম দিয়েছিলে আদি?
(আপনি থেকে তুমি,স্যার থেকে নামে চলে এলো!!) মেয়েটা চায় কি? ওর সাথে প্রেম করি বা ওকে বিয়ে করি? কোনোটাই তো সম্ভব না এখন আমি এগুলো নিয়ে ভাবার সময় ই যে পাই না। চুপ করে ভাবতেছি আবার জিজ্ঞেস করে উঠলো কথা বলছো না কেন?
-হুহ..চাঁদ! ওকে আমি চাঁদ বলেই ডাকতাম। যেদিন জিজ্ঞাসা করলাম তুমিতো আমাকে অনেক বুঝো আমার কাজে সাহায্য করো, সঙ্গ দাও, গার্লফ্রেন্ড হবে আমার? সে অটঠাসি দিয়ে বললো আমার বাগদত্তা আছে দু’মাস আগেই বয়ফ্রেন্ডের সাথেই আংটি বদল হলো!
-ও ওয়াও! আংটি বদল করে নিলে আর জানালেই না? আমি না তোমার বন্ধু।
-বন্ধু হলেই যে সব জানাতে হবে এমন তো কোনো।নিয়ন নেই তাই না? তাছাড়া আজ আমি বলতে এসেছি আমার সাথে যোগাযোগ করো না আর, আমার উড বি হাজবেন্ড পছন্দ করে না আমি তোমার সাথে কথা বলি!! বলেই চলে যাচ্ছিলো। আমি পেছন থেকে হাতটা ধরে বলছিলাম আর একটু থাকো সে ঝাড়ি দিয়ে চলে গিয়েছে!
এরপর থেকে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি। অনেক মেয়ে আমার সাথে চলেছে, শুয়েছে, হয়তো পরেও শুবে,থাকবে আমার সাথে তবে আমি এই ভালবাসা নামক খেলাটা খেলতে পারি না ভয় পাই বলে সিগারেট টা জ্বালালাম। দিসুও কিছু বললো না বরং আমার বুকে মাথা রেখে চুপ করে রইলো!

অনেক্ষণ পর..

-আচ্ছা আদি তুমি কি আমায় তোমার সাথে রাখবে সারাজীবনের জন্য?
-থাকতে চাও আমার সাথে? লিভটুগেদার??
-যেভাবে তুমি রেখে খুশি আমি সেভাবেই থাকবো। কোনো চাহিদা থাকবে না আমার, শুধু তোমায় ভালবাসবো। বিনিময়ে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাবো। রাখবে আমায় তোমার সাথে??
-থাকতে পারো তার আগে আমার একটা গোপন কথা শুনে নাও!
-কি? বলো?
-আমার স্মোকিং,ড্রিংক্স করা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। আর ঈশ্বর/আল্লাহ্/ভগবান বা গড নিয়েও কিছু জিজ্ঞাসা করবে না ঠিক আছে??
-নাস্তিক নাকি?
-হুম তা বলতে পারো!
-আচ্ছা আমার সমস্যা নেই, আমি শুধু তোমার সাথেই থাকতে চাই!

চেয়ারের নিচেই ওয়াইনের বোতল ছিলো দু’টো চুমুক দিয়ে বলে দিলাম আমি এই সম্পর্ককে লিগ্যাল করতে চাই, ঢাকায় ফিরেই সিভিল কোর্টে বিয়ে করে নিবো!

মেয়েটা হয়তো তার জীবনে এত খুশি হয়নি তবে মুখ ফুটে কিছুই বললো না শুধু শক্ত করে জ্বড়িয়ে ধরে বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে রইলো! আর আমি সিগারেটে বড় একটা টান দিয়ে আকাশপানে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বললাম- better three hours too soon than a minute too late.

সমাপ্ত🌹

২১১জন ২০৮জন
0 Shares

১৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য