দেদাস্যিমনা (প্রথম পর্ব)

রেজওয়ান ১৪ আগস্ট ২০১৮, মঙ্গলবার, ১০:১৮:২০পূর্বাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

ছোটবেলায় বাবার সাথে যেদিন প্রথম উড়ে ছিলাম হাওয়াই জাহাজে সেদিন ই দেখেছিলাম উত্তরাখণ্ডের সবুজ সমাহার। ছোটমাথায় সেদিন ই খেলে গিয়েছিলো এখানে ঘোরার জন্য সুযোগ করে নিতেই হবে যে কোনো মূল্যে।

বাংলাদেশের ছেলে হলেও বাবার ব্যাবসা দেখার উছিলায় অনেকবার ভারতবর্ষে বেশকিছু যায়গায় চিড়ুণী অভিযান দেয়া হয়েছে, ফাইনালি এই উত্তরাখণ্ডে আটকে গিয়েছি। বাবার টাকায় আর নিজের ইচ্ছায় ছোট্ট একটি বাংলো করেছি। নাম দিয়েছি “ঠিকানা”। মাঝে মাঝে অন্য দেশের বন্ধুরা যখন ঘুরতে আসে তখন ই জয়নাল ভাই খুলে দেন। তাছাড়া জয়নাল ভাই সেখানে থাকেন, ঠিকানার দেখাশুনা করেন।

আমার পাসপোর্ট, স্পেশাল পাস সব সময় সাথেই থাকে। এ্যামিকে নিয়ে যখন এসেছি বেলাপোলের কাছে তখন সেখানকার ইমিগ্রেশন অফিসার দেখেই চিনেছিলো আমাকে তাই ১ ঘন্টার মধ্যেই ভিসা, ড্রাইভিং রোড পাস সহ সব কিছুই হয়ে গেলো সাথে গিফট ২ বোতল রেড ওয়াইন ও ৬ টা বিয়ার। আমার সাথেও ছিলো ডেভিড অফ ডাবল R সিগার ১বক্স দিয়ে দিলাম মি. প্রিতাম সাহেবকে। উনিও খুশি আমিও খুশি..

এ্যামিকে ঘুম পারিয়ে কটেজে রেখে এসেছি, এমনিতেই অনেক বৃষ্টি তার উপর মেয়েটার জ্বর এসে গিয়েছে একটু জার্নিতেই। বেচারির জন্য খারাপও লাগছে আবার নিজের উপর জিদ-ও উঠছে। কেন যে আনতে গেলাম মেয়েটাকে!! ধুরররর ওর যত্ন নেবো নাকি প্রকৃতি দেখবো? কত্ত প্ল্যান করে এসেছিলাম, ভাল্লাগে না.. কোনো কিছুই হবে না হয়তো!

যদি নার্সিং ই করতে হয় তাহলে কাল-পরশু ঢাকা ব্যাক করবো ভাবতে ভাবতে গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে ভিজে এক সবুজ পাহাড়ে তাবুটা মাত্র পুতেছি মাউন্টেন্সের ঠিক পাশে এমন সময় কটেজের ড্রাইভার কে নিয়ে ৫ কিলোমিটার পথ হেটে হেটে হাজির হয়েছে এ্যামি।

-রাগান্বিত স্বরে.. কি ব্যাপার স্যার আমাকে একা রেখেই চলে এসেছেন কেন?
-জ্বর ছিলো তাই ডাকতে ইচ্ছা হয়নি। তাবুটা টাঙানো হয়ে গিয়েছে দুজনের হয়ে যাবে এক তাবুতেই। যাইহোক তুমি এসেছো কেন এখনিই চলে যাবোতো। লাঞ্চ করে ৬ ঘন্টার একটা বড় ঘুম দিবো তারপর ২ দিনের খাবার নিয়ে সন্ধ্যায় চলে আসবো এখানে। না থাকবে ফোন বা অন্যকোনো সোশ্যাল গ্যাজেটস শুধু একটা ওয়াকম্যান ছাড়া।
-কেন স্যার ফোনেও তো গান শোনা যায় আনলে সমস্যা কি?
-সমস্যা আছে আমরা এসেছি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের বাহিরে। তামাম দুনিয়া থেকে একটু দূরে, নিজের মত করে থাকতে। আমি চাইনা সোস্যাল মিডিয়ায় শুধু শুধু সময় নষ্ট করতে। ইমার্জেন্সির জন্য রেডিওতে যোগাযোগ করবো সমস্যা নেই। তাছাড়া আমার সাথে নিজেদের প্রোটেকশনের জন্য সকল প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে চিন্তার কোনো কারণ নেই বলে কটেজের উদ্দেশ্যে হাটতে হাটতে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার জ্বর আছে এখনো?
-না স্যার একদম নেই। আমি অসুস্থ নই শুধু একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম এই যা।
-থ্যাঙ্কস ম্যান আমি তো ভয় ই পেয়েছিলাম বলে মেয়েটার কপালে হাত দিয়ে দেখি জ্বরে গা পুরে যাচ্ছে!! এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি? এই অবস্থায় এখানে আসার কি খুব দরকার ছিলো স্টুপিড মেয়ে?
-আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি ঠিক আছি স্যার।
-একদম কথা বলবি না একদম চুম স্টুপিড মেয়ে! জয়নাল ভাই গাড়ি কোথায় পার্ক করেছেন?
-এইতো স্যার দুই কিলোমিটার সামনে। তাড়াতাড়ি চলেন মেয়েটার অনেক জ্বর বাংলোতে মির্জা সাহেবকে আসতে বলেন।
– জ্বী ভাই কল করে দিয়েছি আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ডক্টর মির্জা পৌছে যাবেন।

বাংলোতে এসেই দেখি ডক্টর এসে বসে আছেন। সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষ করে এ্যামিকে দেখে বললেন তেমন কিছু না অনেক বেশি উত্তেজনা থেকে জ্বর এসেছে। ঔষধ দিয়ে দিয়েছি আজকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যাবে। তারপর বলো কতদিনের জন্য এসেছো?
-চিন্তা করেছিলাম থাকবো ৬/৭ দিন তবে যে অবস্থা কি যে করি!!
-এখানে এসেছো যখন বাংলোটার মেরামত করাও, আফটারঅল তোমার ই তো সব…
-শুসসসস কি বলছেন এইই সব চলেন কফি খেতে খেতে ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলি।
-কেন মেয়েটা জানে না এটা তোমার বাংলো?
-না ভাই জানে না, ইচ্ছা করেই বলিনি। এখানে আসি একটু একা থাকতে নিজেকে নিয়ে ভাবতে কিন্তু এবার এই মেয়েটা ছাড়লোইনা। খানিকটা জোড় করেই এসেছে!
-স্পেশাল কেউ নাকি আদিত্য?
-স্পেশাল তো অবশ্যই তবে আপনি যা ভাবছেন না নয়। দেদাস্যিমনার পরে এখনো কাউকে সেভাবে নিতে পারিনি।
– সেই দিনের ঘটনা এখনো মনে রেখে কেন নিজেকে কষ্ট দাও বল? সে তো তোমার যোগ্য ছিলো না তাই চলে গিয়েছে।
-আমি তো তার বক্ষবন্ধনীর নিচের চর্বিখন্ড টুকু চাইনি, চর্বিখন্ডের গহিনে থাকা হৃদয় টা চেয়েছিলাম। ভাল বেসেছিলাম কিন্তু সে আমাকে ভালবাসেনি। যখন বললাম আমি গরিব ছেড়ে গেলো বড় নিঃস্বাস নিলাম।
-হুম ভেবেছিলো তুমি তার যোগ্য নও তাইতো তোমার সাথে সবকিছু হওয়ার পরেও অন্য ছেলের সাথে চলে গিয়েছিলো তোমাকে ফেলে! হয়তো ভেবেছিলো তুমি তাকে দেখভাল করতে পারবে না।
– বাদ দিন ভাই। অন্যকিছু বলুন, কেমন চলছে আপনার সমাজসেবা?
– হুম সেটাতো ভালই চলছে তবে মেডিসিনের অনেক সংকট এখানে।
-কি কি মেডিসিন লাগবে লিষ্ট করে দিবেন প্লিজ আমি ঢাকা গিয়েই পাঠিয়ে দিবো।
– আচ্ছা তাহলে আজ উঠি ৩/৪দিন পর এসে দেখা করে যাবো।
আড়াল থেকে এ্যামি সব শুনছিলো আমাদের কথা এখন বেড়িয়ে এসে আমাদের সামনে জিজ্ঞাসা করলো “স্যার এই বাংলো আপনার? এটাকে কটেজ বলেন কেন?”
মির্জা সাহেব উঠতে গিয়েও বসে পরলেন এ্যামিকে দেখে। আমি বলেই ফেললাম দেখেছেন ডাক্তার কি বিচ্ছু মেয়ে আড়াল থেকে আমাদের কথা শুনছিলো!!
-তোমার গেষ্ট তুমি ই সামলাও।আমি আজ আসছি, পড়ে কথা হবে।
ডাক্তার কে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলামঃ
-এই মেয়ে তুমি জানো না আড়াল থেকে কারো কথা শুনতে হয় না?
-শুনেছি বেশ করেছি। আমার জানতে হবেনা আর কি কি আমার কাছ থেকে লুকিয়েছেন? এমনকি আমিতো এটাও জানিনা আপনি কোন ধর্মের মানুষ। কোনোদিন কোনো প্রকার প্রেয়ার্সও করতে দেখিনি।
-যাও রেডি হও লাঞ্চের জন্য।
-আপনি আমাকে সব খুলে না বললে আমি কিছুই মুখে নিবো না।
-দেখ মেয়ে বেশি কথা বলবা না। তুমি সুস্থভাবে থাকলে আমরা এখানে ২ সপ্তাহের মত থাকতে পারি। যা জানার পরে জিজ্ঞাসা করবে এখন চুপচাপ খাওয়ার জন্য রেডি হও।
কিছু না বলে রাগে গজ গজ করতে করতে খাবার টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়ালো মেয়েটা। এই প্রথম আবিষ্কার করলাম মেয়েটা রাগলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। মনে চায় গাল টিপে আরো রাগ বাড়িয়ে দেই।

লাঞ্চ টেবিলে গিয়ে দেখলাম ছয় রকমের ভর্তা আতপ চালের গরম ভাত আর ডাল। আহা দেখেই চোক জুড়িয়ে গেলো। এ যেনো অমৃত। জয়নাল জানে আমার কি কি খাবার পছন্দের তালিকায়। সব খুজে খুজে আমার জন্য রান্না করবে। যেমন গাড়ি চালায় তেমনি রান্নাও করতে পারে। দুবাইয়ের এক ৫তারকা হোটেলের সেফ ছিলো এক সময়। ভিসা শেষ হওয়ায় চলে এসেছে। মানুষটার আমার পরিচয় হওয়ার পেছনে এক মজার কাহিনী আছে!খাওয়ার আগে ছোট্টকরে বলেই ফেলি কি বলেন?

চলবে -{@

১৫৪জন ১৫২জন
0 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য