দুষ্টুমিষ্টি মা

রোকসানা খন্দকার রুকু ১০ নভেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার, ০৮:১৮:২৩অপরাহ্ন রম্য ২৫ মন্তব্য

সকাল সকাল নেট অন করে পোস্ট ইন্জা ভাইজানের মা নেই। ভীষন কষ্ট পেলাম। আমাদের যাদের মা-বাবা এখনও বেঁচে আছেন আমরা সত্যিই ভাগ্যবান। শীত এসে গেছে, তার উপর করোনা প্রকোপ তাই বুড়ো বাবা-মায়ের একটু বেশি যত্ন নেয়া প্রয়োজন। নিজেরা আমরা বাইরে থেকে এসে অবশ্যই তাদের কাছে যাবার আগে করনীয় কাজগুলো করে নেব। বয়স হবার জন্য তারা শিশুদের মত হয়ে যান, উদ্ভট আচরন করেন তাই আমরা বাচ্চাদের যেমন যত্ন করি তেমনি যত্ন করব। গল্প করব, বেড়াতে নিয়ে যাব, সঙ্গ দেব। জীবনভর তারা আমাদের জন্য কষ্ট করেন শেষ বয়সটুকুতে না হয় আমরাও বাবা-মা হয়ে যাই তাদের!

আমার বাবা নেই; মা বেঁচে আছেন। মাকে নিয়ে লিখলে এ জীবনেও আর শেষ হবে না। মায়ের বয়স আশির উপরে। শরীরে আর আগের মত শক্তি নেই। তবে এখনও দূর্দান্ত প্রতাপশালী, আত্নমর্যাদাবোধ এবং বেশ অহংকারী সবটাই রয়ে গেছে। যেমন- ছেলেরা একটু বাড়াবাড়ি করলে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার চরম হুমকি দেন। কারন সম্পত্তি সব তার নামেই। আবার আমার কাছে তিনি থাকেন এটা মানতে নারাজ। অন্য ভাইবোন নিতে এলে বলেন,

– ও সংসার কিছু বোঝেনা, পাগল-টাগল, অগোছালো তাই পাহারা দেবার জন্য থাকি। আমাকে ওর প্রয়োজন। আমি হাসি আর বেশি বেশি পাগলামী করি যাতে আমাকে ছেড়ে অন্যত্র না যায়। অনেকের কাছে বাবা-মা বিরক্তিকর হলেও আমি বেশ ইনজয় করি।

লিখতে বসেছি যেহেতু রম্য তাই আজ মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া কয়েকটা রম্যই শেয়ার করি-

মেজ ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে মা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আর একবার মেয়ে দেখবেন। আব্বা আর বড়ভাইয়ার উপরে কোন ভরসা নেই। তো যথারীতি মা নিজেই আবার মেয়ে দেখতে গেলেন। তার আন্দাজ একদম ঠিকঠাক হয়েছে। মেয়ে মানে হবু ভাবীর সব ঠিক থাকলেও রং কালো। অহংকারী ভদ্রমহিলা কালো মানুষ দুচোখ্খে দেখতে পারেন না। টেনশানে একাকার হয়ে টলতে টলতে বাসায় চলে এলেন। বাসায় এসে দেখা গেল তার পা খালি। মানে স্যান্ডেল মেয়ের বাসায় ফেলে চলে এসেছেন।🤪🤪🤪

আমি কালো এটা তার বিরাট দুঃখের একটা অংশ। আমার বাবা ফরসা না এবং আমরা ভাইবোনরা সবাই বাপের মত। মায়ের ভাই বোনের ছেলে-মেয়েরা সব সোনম কাপুর, ঐশ্বরিয়া। মজা না, সত্যি সবাই অনেক সুন্দর।রঙ একেবারে দুধে আলতা। মা সারাক্ষন আমাকে ফর্সা বানানোর অনেক টিপস্ দেন। আমার সময় থাকলেও অলস কিংবা এটাই ভালো লাগে তাই কিছুই করিনা। সামান্য ফেসিয়াল করেই আমার জ্বর আসে। সেদিন বাইরে থেকে ফিরে দেখি একটা বাটিতে কি যেন নিয়ে মা বেশ খুশি খুশি। ভয়ে আমার কপাল কুঁচকে গেল।আমায় এগিয়ে দিয়ে বললেন,

– শারমিন এসেছিল তার কাছে জেনে নিলাম কি কি মাখলে ফর্সা হয়। এই নে মেখে দেখ। নাছোর বান্দা তাই মুখে হাতে পায়ে লাগিয়ে বসে আছি। মিনিট খানেক পরে শুরু হল

– ” ও বাবাগো, মাগো কে আছ বাঁচাও”। মা তুমি এইটা কি বানাইছ এত জ্বলে কেন?

তার নিরুত্তাপ উত্তর- একটু জ্বললে কিছু হবেনা মা। ফর্সা হবি, একটু সহ্য কর। মরিচ বাটনায় বেটেছি তো তাই একটু জ্বলছে!!😭😭😭

দুধে আলতা রং না পেলেও মায়ের পরিবার থেকে কানা খেতাব পেয়েছি। মা নিজেও চশমা পরেন। চশমা হারানোটা যথেষ্ট ঝামেলার। এটা যারা চশমা পরে থাকেন তারা ভালো বুঝতে পারবেন। তাই ডাবল চশমা রাখা ভালো। সেদিন মায়ের চশমা হারিয়ে গেছে। কোথাও পাওয়া যায়নি। আমাকে ফোন করেছে। আমি এক্সট্রা চশমাটা কোথায় রেখেছি বলে দিলাম। একটা ক্লাস বাদ দিয়ে বাসায় ফিরলাম। মাকে দেখে আমি থ মেরে গেলাম। যথারীতি তার কানের পাশের দড়ি গলায় আর চশমা পিঠের দিকে ঝুলে আছে। চশমা পিঠে ঝুলিয়ে তিনি খুঁজে খুঁজে হয়রান। নির্বিকারে উত্তর- ফালতু দড়ির কারনেই এত সমস্যা। না হলে ঠিকই খুঁজে পেতেন।🤪🤪🤪

দুধঅলা এক এক দিন এক এক সময় দুধ দিতে আসে। সেদিন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে মাকে টাকা দিয়ে বাইরে গেলাম। দুধঅলাকে ফোনে জানিয়ে দিলাম মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাকিটা যেন  ফেরত দেয়। কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে মাকে দুধ গরম করে খেতে দিলাম।

– মা টাকা ফেরত দিয়েছে?

– হ্যাঁ ভালো কথা মনে করেছিস। দুধ রাখতে গিয়ে টাকাটাও ফ্রিজের ভেতর রেখেছি। নিয়ে নিস।

– মা পেলাম না। আমার একটা ফ্রিজ ঈদের জন্য বন্ধ থাকে। ভাবলাম হয়ত সেটাতে রেখেছে। গিয়ে পাশের বন্ধ ফ্রিজের ভেতরে খোঁজা খুঁজি করে ফেরত এলাম।

– তুই তো কানা। তারউপর পাগল। কয়দিন একটু ভালো ছিলি আবার পাগলে পাইছে।

– আরে বন্ধ ফ্রিজের ভেতরে খুঁজলাম তো নাই। আচ্ছা থাক পরে হবে।

– চল আমার সাথে। হিরহির করে নিয়ে গেলেন। ঘটাস করে চালু ফ্রিজের নরমাল থেকে টাকা বের করে দিলেন। টাকা ঠান্ডা হয়ে জমে যাবার উপক্রম।

– আচ্ছা মা, যে চালু ফ্রিজের ভেতর টাকা রাখে সে পাগল না যে খুঁজে পায়না সে পাগল।

– যে খুঁজে পায়না সে পাগল। আমি হতভম্ব।😜😜😜

আর একদিনের ঘটনা-

ল্যাপটপের মাউসটা খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি না।

– মা দেখেছ আমার মাউসটা।

– নাহ্। তোর ওইসব নিয়ে আমি কি করব। অগোছালো, উদাসীন লোকদের জিনিসে আমি হাত দেইনা। দেখ গিয়ে কোথায় ফেলেছিস।

– হ্যাঁ তাইতো। কোথায় যে রাখলাম কাজ করতাম। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। ভেবেই নিলাম হয়ত আমিই ফেলেছি কোথাও। একদিন রান্না করার আগে ফ্রিজ খুলে মাছ বের করছি। কালোমত কি যেন দেখা যায় দুধের বোতলের নিচে। টানাটানি করে বের করে দেখি আমার সেই প্রিয় মাউস।

– মা এটা ফ্রিজে কেন?

– ও এটা মাউস! আগে না লেজ ছিল। আমি ভাবলাম ছিঁড়ে গেছে আর কাজে দেবেনা, তাই দুধের বোতলটা পরে যাচ্ছিল বলে খুঁটি দিয়েছি।😇😇😇

নিজে এতকিছু করেও সব ভালোর দাবিদার। হ্যাঁ তিনি অল্প পড়াশুনা করলেও প্রচুর বই পড়েছেন, অনেক জানেন। গানের গলা সুন্দর। দুটো গান খুব বেশি গাইতে শুনি- “খোকা ঘুমোলো পাড়া জুরোলো বরগি এল দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে”।

” আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা। এ পৃথিবীর কেউ ভালেতো বাসেনা। এ পৃথিবী ভালো বাসিতে জানেনা, যেথায় আছে শুধু ভালো বাসাবাসি সেথা যেতে মন,,,,এ গান গাওয়ার সময় চোখের কোনে পানি জমে। হয়ত আমরা কেউই তার কষ্ট আজও বুঝতে পারিনি। প্রত্যেকটি মানুষেরই কিছু ছোট ছোট কষ্টের, যন্ত্রণার জায়গা থাকে সে তা কাউকেই বলেনা।

আসুন সবাই বাবা-মায়ের সঙ্গ দেই, তাদের ভালোবাসি, পাশে থাকি।

সবাইকে শুভরাত্রি। 🌹🌹🌹

ছবি- আমার মা।

১৭১জন ২জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য