গতকাল কুড়িগ্রামে একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকার লাশ পাওয়া গেছে। গলায় ওড়না প্যাঁচানো একজোড়া কিশোর প্রেমিক প্রেমিকা!

বিষ্ময়কর লাগছে তাইনা? আসলেই বিষ্ময়কর। তবে তাদের মাঝের প্রেমটা বিষ্ময়কর নয়। বিষ্ময়কর হলো তাদের মৃত্যুটা। কিন্তু আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে কোনটা বলব? তাদের মৃত্যু নিয়ে কারো মুখে কোনো কথা নেই। কারণ, সবার অবচেতন মনে একটাই কথা তারা আকাম করতে গিয়ে মারা পড়েছে! আমার সামনে তো বেশ কয়েকজন বলেই ফেলল,”দুধের দাঁত পড়েনি এখনি প্রেম করতে গেছে, এরকম করে মারা পড়ছে ঠিক হইছে।”
আসলেই কি তাই? না, মোটেও তা না। আমরা তাদের আসলে ঠিক পথটি দিতে পারছি না। প্রতিটা জিনিসের আসলে একটা আলাদা আলাদা ব্যাপার থাকে।
গত কয়েকদিন আগে বগুড়াতে কিছু কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েকে ম্যাজিস্ট্রেটদের তত্বাবধানে ধরা হলো। এটার বিরুদ্ধেই অনেকের অনেক বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখলাম। আমার কাছে কথা হচ্ছে, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনি, আপনার এইটে পড়া বাচ্চার সাথে বিপরিত লিঙ্গের কারো হাত ধরে নিরিবিলি কোনো স্থানে বসে গল্প করতে দিবেন কিনা? আমি বলছি, আমি তো দিব না। এবং আমি জানি আপনিও দিবেন না। কারণ একটাই, আপনি জানেন আপনার সন্তান ওখানে বসে আসলে কি করবে বা করতেছে।
আপনি নিশ্চয়ই আপনার সন্তানকে বলতে পারবেন না, বাবা বা মা সেক্স করলে কনডমটা ব্যবহার করিও। আর ওটা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তাও নিশ্চয়ই আপনি শিখাতে পারবেন না।
যে কোনো ক্রিয়ারই একটা ফল আছে। নিরিবিলি বসে থেকে কিশোর বয়সি কোনো ছেলেমেয়ে যখন উত্তেজনা বসে কোনো কাজ করে ফেলে এরও একটা ফল আপনার সামনে খুব বিশ্রি এবং ভয়ঙ্করভাবে উপস্থিত হবে। আপনি বলতে পারেন না, আমার সন্তান মোটেও এরকম না। তাইলে আমি বলব, আপনি প্রকৃতিকে অস্বীকার করলেন। কারন, নর নারীর জৈবিক ব্যাপারটা পুরোটাই প্রকৃতিগত। ওটাকে কারো বাপের সাদ্ধি নেই আটকিয়ে রাখে। আপনার বাচ্চার এরকম কোনো ঘটনার পর তখন নিশ্চয়ই আপনি বলতে পারবেন না, আমার বাচ্চা একজন স্বাধীন মানুষ তাই সে সেক্স করেছে বলেই তার এই প্রেগনেন্সি ব্যাপারটা। আমি জানি আপনি রাতের আঁধারে কোনো এক নার্স বা আয়া দিয়ে তার এ্যাবার্শন করিয়ে নিবেন। আমি রিতু এরকম ঘটনা হাজার হাজার দেখেছি। হুম, আমি হসপিটাল কোয়ার্টারে বড় হওয়াতে এটার সাথে আমার একটা পরিচিতি আছে। আমি দেখেছি কিশোরী মেয়েদের কি নির্মমভাবে তার মা এ কাজটি করতে নিয়ে আসে।আর এখন স্বামীর প্রফেশন হিসেবে এরকম অনেক কিছুই সামনে চলে আসে।
সত্যি বলছি, আমি কিশোর বয়সের ছেলেদের সামনে দিয়ে চলাফেরা করতে ইদানিং বেশি আড়ষ্ট থাকি। কারন, যখন কোনো কারনে এতো টুকু টুকু বাচ্চাদের হাতের ফোনটি পাওয়া যায় আর তার ভিতরকার জিসিন দেখে আমি আৎকে উঠি।
তাই প্রচন্ডরকম ভয় পাই ইদানিং এ সমস্ত ছেলেদের।
কাগজে কলমে তারা কিশোর অপ্রাপ্তবয়ষ্ক কিন্তু তারা নিজেরাও জানে তারা আসলে কি ভাবছে নিজেদের নিয়ে।
আমার কাছে ইদানিং মনে হয় বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যাবস্থা কয়েকটা ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। তারা মনে করে তারা খুব বেশি আধুনিক অর্থাৎ খুব বেশি সভ্য। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় তারা বড় বেশি রুক্ষ। বহুরুপি। তারা কখনোই তাদের আচার আচরণ চিন্তা ধারাকে একই ধারাবাহিকতায় চলমান রাখে না। তারা তাদের বর্তমান আবাস আসলে আমি রাজধানীর কথা বলতে চাচ্ছি সেখানে একরকম থাকে আর বছরান্তে যখন মফস্বলে অর্থাৎ তাদের শিকড়ে আসে তখন আর এক রকম থাকে। এটাকে আমার ভন্ডামী মনে হয়।
এই মফস্বলের আমি যখন ঢাকা যাই। ঢাকা শহরটাকে মনে হয় অন্য এক রাষ্ট্র। বর্তমান হাতের মুঠোয় ছোটো একটা ফোনে তারা এসব আচার দেখছে সেরকম আচরন করতেও চাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের বেঁধে রাখছে মফস্বল শহরের সমাজ ব্যাবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, এ দৃষ্টিভঙ্গি হাজার বছরের পুরনো। তাই সবাই যে একযোগে সবকিছু রাতারাতি পাল্টে যাবে তা কিন্তু না। এটা কখনোই সম্ভব না। আসলে তারা শুধু উষ্কে দিতে জানে।
আমাদের সমাজ ব্যাবস্থা অনেক পুরানো। হাজার বছরের এক সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি আছে আমাদের। প্রতিটা জাতিরই আছে। আমরা আমাদের এই জাতীয়তাবাদ চিন্তা থেকেই কিন্তু অনেক শাষণ শোষণ থেকে যুদ্ধ করে বের হয়ে এসে এখনো টিকে আছি।
একটা জাতির সমাজ ব্যাবস্থা পাল্টানো এতোটা সহজ না। একটা পরিবারের যেমন নীতি থাকে একটা সমাজের তেমনই একটা নীতি থাকে। এই নীতি পাল্টানো সহজ কি?

প্রেমটাকে আমার খুব পবিত্র মনে হয়। প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ নেই। আমার মনে হয়, এই যে প্রেম ভালবাসার এক পবিত্র অনুভূতি তা শুধু এই বাংলার মানুষের মধ্যেই বেশি প্রকট। এ জাতি এ বিষয়টাকে খুব বেশি শ্রদ্ধাও করে।
কারো প্রেমে পড়া মানে কারো বন্ধনে আটকে পড়ে। এ আটকে পড়াটা কোনো শৃঙ্খল নয়। এটা মনের সাথে একটা মনের বেঁধে যাওয়া। একমুহূর্ত মনে হয় তাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট সহ্য করা যাবে না। প্রতিটা মুহূর্তে তাকে আগলে রাখার চিন্তা।
আর এ চিন্তা থেকেই সমাজের সব বাঁধা নিয়ম শৃঙ্খলাকে ভেঙ্গে ফেলতে চায় মানুষ। সকল বাস্তবতাকে ঠেলে ফেলে দেয় এক মুহূর্তে। কিন্তু আমার তাছে প্রেমের সংজ্ঞা আলাদা। যা শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাকে প্রচন্ড ভালবাসায় জড়িয়ে ধরাটা একান্ত আমার নিজস্ব। তাকে ভালবেশে গভির চুমু খাওয়াটাও একান্ত আমার নিজস্ব। হুম, শুধু চিৎকার করে বলতে পারি,” আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।”

কিছুদিন আগে ঢাকা টিএসসিতে এক জোড়া প্রেমিক জুটির চুমুর দৃশ্য ভাইরাল হলো। অনেকেই এটার পক্ষে বিপক্ষে।
আমি এটার বিপক্ষে। কারন, তারা কি জানে যে তারা দুজনে সারাজীবন একে অপরকেই শুধু চুমু খেয়ে কাটিয়ে যেতে পারবে। না, মোটেও বিষয়টা ঠিক তা না। তারা অবশ্যই অন্য কোথাও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হবে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু যদি হয়, তবে সে যখন প্রথমবারের মতো অধীকার নিয়ে কারো শরীরে হাত রাখবে, পৃথিবীর সবাইকে জানিয়ে চুমু খেয়ে উত্তেজনা বোধ করবে তখন হঠাৎ করে ফেলে আসা এই মুখটি তার মনে পড়বে। মনের মাঝে উঁকি মারা মুখটি তখন কিছু সময়ের জন্য বাঁধা দিবে শরীরের উত্তেজনাগুলোতে। সে হয়তো তার সামনের মানুষটিকে এই ব্যাপারটি বুঝতে দিতে চাইবে না। তাকে স্পর্শ করার সময়ও হয়তো এরকম কোনো ফেলে আসা মানুষের কথা মনে পড়েছিলো। যার মুখের অবয়ব হয়তো কিছু সময়ের জন্য যৌনতাকে রুখে দিয়ে নষ্টালজি করে দিবে।
এক কালে শতো কথা দেয়া মানুষটাকে রেখে যখনি অন্য কাউকে চুমু খাবে তখনই একটা খুন করার গ্লানিবোধ থামিয়ে দিবে যৌণতা। কেউ জানবে না। জানবে শুধু সে। এ কথাগুলো কখনোই কেউ কাউকে বলতে পারে না। কথাতেই আছে, জীবনে প্রথম প্রেম, শরীরে প্রথম স্পর্শ কখনো ভোলার নয়। ভোলা যায়ও না।
যদি অপরপক্ষ এরকম কোনো সম্পর্কে না জড়ায় তবে চরমভাবে তাকে ঠকানো হলো। আর এটা পৃথিবীতে সব থেকে বড় একটা অপরাধ।
হুম, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি লাইফের প্রেম হলো প্রচন্ড আবেগ জড়ানো। এখানে তার আবেগ হলো, র খৈয়ামের কবিতার মতো—–
এ জীবনের আর কটাদিন,
কাটিয়ে দিব প্রিয়ে
সঙ্গে রবে সুরার পাত্র, একটুখানি আহার মাত্র।”
একটা সময় এসে এই প্রচন্ড প্রেমের আবেগে পুড়ে যাওয়া মেয়েটি জীবনের বাস্তবতার কাছে হার মেনে, একটি গোছানো স্বচ্ছল আশ্রয়ের জন্য বাবা মায়ের পছন্দে বিয়ে করে ফেলে। কারণ, তার একটি সত্বা বাস্তববাদী। সেই সত্বা তকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেয়,’আর যাই হোক একটুখানি আহার দিয়ে জীবন পার করা যায় না। তাই তো বছরের পর বছর গভির প্রেমে ভেসে যাওয়া মেয়েটি মাত্র কয়েক মিনিট আগে পরিচিত সমাজে প্রতিষ্ঠিত কোনো পাত্রের সাথে ঘর বেঁধে ফেলে। প্রেম পড়ে থাকে প্রেমের যায়গায়। স্বামী পুরুষটির জন্য তার তৈরি হয় এক অভ্যস্ত জীবন। এদিকে যদি সে জানতে পারে তার সেই প্রেমিক পুরুষটির সারাদিন খাওয়া হয়নি, তখন সে চেষ্টা করবে স্বামী পুরুষটির পকেট কেটে প্রেমিকটিকে একবেলা খাবারের ব্যাবস্থা করার।

অনেক কথার শেষ কথা হলো, আমি যদি আমার সন্তানকে একটি সঠিক বয়সের আগে ছাত্রজীবনের মূল তপস্যা বাদে অর্থাৎ পড়াশুনা বাদে বেপরোয়া অতি স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে চলাফেরা করতে না দেই, তবে অতি আধুনিকতার নামে অন্যকে এ বিষয়ে উষ্কানি দেওয়াও ঠিক নয়। আর যারা এটার পক্ষে কাজ করে তাদের দিকে আঙ্গুল তোলাও ঠিক নয়।
আপনি আপনার সন্তানকে একটু হলেও শাষনে রাখুন। শাষণ মানেই শোষণ নয়। তার সাথে প্রচুর কথা বলুন, তাকে কাউন্সিলিং করুন। জানতে চেষ্টা করুন সে কি করছে। কতোটুকু সময় তার স্কুল টাইম। সে টাইমে কেনো সে বাড়ি ফিরছে না, সে কার সাথে মিশছে তাও জানার চেষ্টা করুন। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের এই অবাধ স্বাধীনতাটুকু না দিতাম তবে কিশোর গ্যাঙ তৈরি হতো না। কিশোর অপরাধ বেড়ে যেতো না। এতো এতো মাদক বিক্রি হতো না। আজ যদি তরুর মা জানার চেষ্টা করতো তার বাচ্চা কি করছে তবে হয়তো তরুর মৃত্যুটা ওরকম হতো না। আজ যদি কুড়িগ্রামের কিশোর কিশোরির বাবা মা তাদের স্কুল টাইম পার হবার পরপরই খোঁজ করতো তবে তারাও হয়তো এরকম নির্মমভাবে খুন হতো না।
আজকাল ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় যতোগুলো সিট থাকে নূন্যতম যে মার্ক পেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থাকে তা পূরণ হয়না। অনেক সময় কেউ উত্তীর্ণই হয়না। আমি এটাতে খুব অবাক হই। আরো অবাক হই, যে মায়েদের দেখি শিশু অবস্থায় অর্থাৎ ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বাচ্চাদের পড়াশুনা নিয়ে একেবারে অস্থির হয়ে যায়। এক মার্ক কম পেলো কেনো বাচ্চার গাল টেনে আর কিছু রাখে না। স্কুলগুলোতে সে কি তুমুল যুদ্ধ! কিন্তু বাচ্চা যেই প্রাথমিক গন্ডি পার হলো অমনি তার অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে বসলো। মাকে সে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা ম্লান হতে হতে পড়াশুনার জন্য মায়ের সেই উদ্যেগ শুন্যের কোঠায় নেমে আসে।
আমি দুই কিশোর সন্তানের মা। এ ঘটনাগুলো আমাকে প্রচন্ড ভেঙ্গে দিয়ে যায়। আমি প্রচুর কথা বলি আমার দুই সন্তানের সাথে। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত ওদের পড়াশুনা নিয়ে আমার তেমন উদ্যেগ থাকে না। এটা নিয়ে কথা যে শুনতে হয়নি তা না। ওদের পিছিয়ে পড়া রোল নিয়ে প্রচুর কথা শুনতে হয়েছে। আমার উদ্যেগ শুরু হয় ক্লাস ফাইভে এসে। কারন, তখন বোর্ড একটা পরীক্ষা সামনে চলে আসে। বড় ছেলেটা ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি নিয়ে আজ ক্যাডেটে পড়ে। ছোটো ছেলেটাও আল্লাহর রহমতে ভালো করছে। সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। আমার বড় ছেলে আমাকে বলে, আমি তার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি তাদের এরকম অবাধ স্বাধীনতাটুকু দেই নাই। তাদের ছাত্রজীবন পুরোটাই আমার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি।
এর একটা কারনও আছে। ধরুন একদম মফস্বল গ্রামের একজন বাবা ছাত্রজীবন খুবই কষ্ট করে পড়াশুনা করে আজ দেশের প্রথম শ্রেণীর উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা। ছাত্র জীবনে সে যে পরিশ্রমটা করেছে, সে বুকে হাত দিয়ে বলুক তার সন্তানও সে পরিশ্রমটা করছে কিনা। যারা করছে এ সংখ্যা খু্ই কম।
তার কঠোর পরিশ্রমের কারণে আজ তার সন্তান প্রচন্ড সুখ সমৃদ্ধির মধ্যে দিন যাপন করছে। কিন্তু এ সন্তান কি পারবে তার সন্তানকে ঠিক এ সুখটি দিতে? উত্তর হলো, পারবে না।
ছাত্রজীবন অবাধ স্বাধীনতা বা অবাধ মেলামেশার জীবন নয়।
ছাত্রজীবনে তাদের কঠোর পরিশ্রম আর বাবা মায়ের প্রচন্ড ভালবাসার বন্ধনে বেড়ে উঠুক প্রতিটি সন্তান।
সবার জন্য শুভকামনা।

৪৬২জন ৪৬২জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ