দুঃস্বপ্ন

রুদ্র আমিন ২৬ জুলাই ২০১৩, শুক্রবার, ০১:১১:৩৫পূর্বাহ্ন গল্প ১৬ মন্তব্য

১৫ইং ডাঃ জামিল।
আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রী প্রাপ্ত একজন সাইকোলজিক্যাল ডাক্তার। নিজের চেম্বারে বসে আসেন। চোখে মুখে অসস্তির গাঢ় ছাপ। আসলে মাঝে মাঝে এই লাইনের ডাক্তাররা দির্ঘদিন মানসিক রোগি দেখতে দেখতে এক সময় নিজেরাই একটু কমবেশি মানসিক অস্তিরতায় ভোগেন। আর এটা তাদের কোন ব্যাপার নয়। আসলে ব্যাপারটা আজ তার বড় মেয়ের জন্মদিন। বড় মেয়েটা হয়েছে মায়ের মতন। প্রচন্ড জেদি আর একরোখা। বেলা ১:০০ টার আগেই যেতে হবে। আবার এদিকে হয়েছে রোগীদের নিয়ে ঝামেলা। একজন রোগী জরুরী তাকে দেখবার কথা আজ। রোগীটা গ্রামের—ডাঃ জামিলে ধারণা গ্রামের লোক খুব নরম আর লাজুক প্রকৃতির হয়। কিন্তু এ লোক তার ধারণার উল্টো। মানসিক রোগীদের আচরন গ্রাম আর শহর আলাদা নয়। ডাক্তার অবশ্য রোগীটাকে এখনো দেখেননি রোগীর সাথে যে মানুষ এসেছেন কেবল তার সাথেই কথা হয়েছে।
যা হোক ডাক্তার এবার রোগীটা দেখার জন্য প্রস্তুত। রোগী এবং তার সাথে থাকা দুজনই ঢুকলেন ডাক্তারের রুমে। ডাক্তার জামিল তো অবাক একজন বাঙ্গালি মেয়ে যে এতো লম্বা হয় তিনি আগে কখনো ভাবেন নি আজ তাই দেখছেন। আনুমানিক ৬ফুট ২ইঞ্চি। সারা শরীর বোরকায় আবৃত। হঠাৎ ডাক্তারের চিন্তা ভঙ্গ করে রোগীর খালাতো ভাই বলল—-ডাক্তার সাহেব বসতে পারি।
অবশ্যই–।
তা আপনার নামটা জানতে পারি—?
ডাক্তার সাহেব বেয়াদবি নিবেন না, রোগীটা আমার নয় আপনার।
ডাক্তার সাহেবের গ্রামের লোকদের নিয়ে নতুন একটা ধারনা জন্মালো। আসলে গ্রামের লোকদের স্বভাব কথায় কথায় ভুল ধরা। আচ্ছা ঠিক আছে রোগী আমার —–এখন নামটা বলুন।
আমার নাম আব্দুল কুদ্দুস আর আপনার রোগীর নাম মোঃ মতিন মিয়া।
এবার কিন্তু ডাক্তার সাহেবের চিন্তাভাবনা কিছুক্ষণের জন্যে তালগোল পাকিয়ে গেল। একজন মহিলা সদৃশ্য বোরকা পরিহিত পুরুষ মানসিক রোগীকে আগে কখনো দেখেননি। ব্যাপারটা বেশ রহস্যময় কিন্তু তার চেয়ে বেশি হাস্যকর।
কুদ্দুস ডাক্তারের চিন্তা ভঙ্গ করলনে। ডাক্তার সাহেব কিছু ভাবছেন—?
ঠিক আছে রোগীর সমস্যা বলুন।
এবার বোরকা পরিহিত লোকটা মুখ খুলল—ডাক্তার সমস্যা যখন আমার আর যেহেতু অতি গোপনীয় —এজন্য আমি বলতেছিলাম কি —-কুদ্দুস এখানে না থাকাটাই ভালো। ঐ কুদ্দুইছা এইহানতন যা গা
এর পর মতিন মিঞা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসে ধরা গলায় বললো—-ডাক্তার সাব মাফ কইরা দিয়েন—অযথা একটা বেয়াদবি করলাম।
ডাক্তার কিছু না বলে ইশারায় কুদ্দুস আলীকে বাইরে যেতে বললেন। এরপর কোন সুযোগ না দিয়ে মতিন মিঞাকে বলেন—-এবার দয়া করে আপনার সমস্যাটা বলুন—? ডাক্তার সাহেবের কথা শেষ করতেই মতিন মিঞা চট করে গায়ের বোরকা খুলে ফেললো। ডাক্তারের নিকট আরো স্পষ্ট হলো—বিশেষ করে তার চেহারাটা—মুখটা গোলগাল ফর্সা, বয়স আনুমানিক ৩০ বৎসর, লম্বা চুল, মুখে খোচা খোচা দাড়ি সারা শরীর আর চোখে মুখে বিধ্বস্থতার লক্ষণ। চোখ দুটো রক্ত জবার মতো লাল আর চারিদিকে সর্তকিত চাহনি।
ডাক্তার সাহেব আমার সমস্যা মনে হয় সকলের চেয়ে আলাদা——
সেটা তো অবশ্যই। সকলের সমস্যা তো আর এক হতে পারে না। আর সেটা সম্ভবও না—।
তো এখন—? ঠিক আছে ডাক্তার সাব আর বাজে সময় নষ্ট করবো না । আমার কাহিনীটা শুরু করি—
আমার বাড়ী হল ফরিদপুরে। গ্রামের নাম সোনাদীঘি। আমার আব্বাজান গ্রামের মাতববর। আমি ৫ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তখন আমার বয়স আঠের। ঘটনাটা ঘটেছে আমার ছোট চাচার কারণে । ছোট চাচার চেহারা খুবই কুৎসিত ছিল। গ্রামের লোকেরা চাচারে খুব ডরাইতো। চাচা সব সময় বাড়ীতে থাকতো না। বাড়ীতে ফিরলে ভোর রাইতে ফিরতো। খাওন দাওন করতো না। একদিন আমাগো পাশের বাড়ীর সলিম চাচা জ্বরে কাপতে কাপতে আইয়া আব্বাজানরে কইল—–
মাতববর সাব–আপনে বিশ্বাস করেন আর নাই করেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না– কিন্তু কাইল রাইতে আমি যা দেখলাম তা সত্য। কাইল রাইতে পায়খানায় করতে বাইরাইছিলাম আপনার বড় ঘরের পাশে গোরস্থানের পেছনের জঙ্গলে। দেখলাম আপনার ভাই মাইনে ছোট দা রহমত চাচার কবর খুইরা চাচা লাশ বাইর কইরা মাংশ ছিরা খাইতেছে। তারপর আমার আর কিছু মনে নাই। সকাল বেলা আমার বিবি নাকি বাগানে গিয়া দ্যাখে আমি অজ্ঞান হইয়া জঙ্গলে পইড়া আছি। বাড়ীতে আননের কিছুক্ষণ পর আর জ্ঞান ফিরছে।
আব্বজান কিন্তু সলিম চাচার কথা বিশ্বাস করেন নাই। তার কিছুক্ষণ পর তিনি গোরস্থানে গেছেলেন। যাইয়া দেখেন ঘটনা সত্য। রহমত চাচার লাশ কবরে নাই। খালি নাড়ি ভুড়ি এইখানে ঐখানে ছড়াইয়া ছিটাইয়া পইড়া আছে। এরপর কয়েকদিন চাচার কোন খবর পাই নাই। আমাগো বাড়ীটা ছিল অনেক নির্জন। গোরস্থানের পাশে কেউ বাড়ী বানাতে চায় না। আমি ঘটনার কিছুই জানতাম না —বাবা মার নিকট থেকে শুনেছি। একদিন আব্বা আম্মা এই ঘটনার ব্যাপারে আলাপ করছিল। তখন আমি সব শুনেছি। তখন থেকেই সবসময় আমার কেমুন জানি ভয় ভয় লাগত। একদিন রাইতে প্রসাব করতে বাইরে বাইর হইছি। কোনহান থাইকা যেন একটা বিটকল গন্ধ নাকে আসতে লাগল।
ডাক্তার জামিলের এবার কিন্তু ধর্য্যের বাধ ভেঙ্গে গেল। দেখুন আমি কিন্তু এখানে গল্প বা কিসছা শুনতে বসি নাই। আপনি আপনার সমস্যাটা বলুন————-মুহূর্তের মধ্যে মতিন মিঞার মুখ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলো। ডাক্তার সাব আমি আপনারে কিসসা কইতাছি না। সব আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা। আপনি বিশ্বাস করেন আর না করেন। এঘটনাই আমারে কুত্তার মতো দৌড়াইয়া বেড়াইতাছে। খারাপ কথা বললাম কিছু মনে করবেন না। ভালো কথা আমার খুব তিয়াস পাইছে —-এক গ্লাস পানি হইবো–? ঠান্ডা পানি —ভিতরে সামন্য লবন অইলে ভালো হয়। পানি আসা মাত্রই মতিন মিঞা এক নিঃশ্বাসে সব পানি শেষ করে ফেলল। আসলে মানসিক রোগীদের কার্যকলাপ এরকম একটু হয়েই থাকে। এতে আশ্চার্যের হবার কিছুই নাই। যা হোক—-
গন্ধ যখন বেশি আসতে লাগল তখন আমি উইঠা দাড়াইলাম। হঠাৎ কইরা পেছনে তাকাইয়া দেখি—একটা লোক খাড়াইয়া আছে। চোখ দুইটা ইটের ভাটার মতো জ্বলতাছিল। লোকটা কেডা সেটা চিননের কোন উপায় ছিল না। সারা শরীরের অবস্থা দেহনের পর মনে হইতাছিল যেন তিন চার দিনের পচা লাশ। মুখ আর হাতেরতন মাংশ খইসা ঝুলতে আছে। তখন বুঝলাম গন্ধটা কোহানতন আসতাছিল। আমার গলা দিয়া একটুও শব্দ বাহির হইতেছিল না। একটু পরে লোকটা আমারে কইল আমি তোর চাচা–চিনতে পারতাছোস না—? তখন আমার আর বুঝতে কিছু বাকি রইল না। তারপরই চাচা আমারে এতো জোড়ে জড়াইয়া ধরলো যে আমার দম বন্ধ হইয়া আসতেছিল। মনে হতে লাগলো আমি চাচার শরীরের মধ্যে ঢুইকা যাইতাছি। তার পর আমার আর কিছু মনে নাই। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি আমি বিছানার উপর পইড়া আছি। দরজার ভেতর থাইকা বন্ধ। কিন্তু ঘরে আমি ছাড়া আর কেই নাই। দরজা খুইলা আব্বা আম্মারে ডাক দিয়া আমার ঘরে আনলাম। সব কিছু কওনের পর আব্বা আমারে কইল———-বুঝছি স্বপ্ন দেইখা ভয় পাইছিস। আরে খারাপ স্বপ্ন দেখবি না তো কি করবি। নামাজ কালামের ধারে কাছে যাওনের নাম নাই। সকালে হুজুরে নিয়া আসুমনে ঝাড়ফুক দিলে সব ঠিক হইয়া যাইবো।
তারপরেই আম্মা আব্বারে কইল —-
ক্যাগো মতিনের বাপ–গন্ধ কিসের–? ঘরের মধ্যে ইদুর মরছেনি।
আমি কইলাম—না আম্মা –ইদুরের গন্ধ না চাচার পচা মাংশের গন্ধ। তখনই আব্বা আমার গায়ের তন কাথা সরাইয়া দিল। দেখি আমার সারা জামায় পচা মাংশ লাইগা রইছে।
তারপর দিন থাইকা আসল ঘটনা শুরু———
তা আপনার চাচার কি হল—?
চাচারে এখন পর্যন্ত খুইজা পাইনাই।
ঠিক আছে তার পর কি হইল বলুন।
সারা রাইত ঘুম হয় নাই । সকালে আমি আয়ানার সামনে গিয়া যখন দাড়াইলাম—নিজের অজান্তেই এমন এক চিৎকার দিলাম যে আব্বা আম্মা দৌড়াইয়া আমার ঘরে চইলা আইলো।
তা চিৎকার করছিলেন কেন–?
চিৎকার করছিলাম সাধে না —যখন আয়নায় তাকালাম দেখি খর্বাকৃতির অতি কুৎসিত একটা মুখ। ঐ রাতে চাচার মুখটা যেমন ছিল ঠিক তেমন।
আপনি যখনই আয়নায় তাকান এই অবস্থা হয় নাকি–?
হ–ডাক্তার সাব। এর জন্য ১০ বৎসর যাবৎ আয়না ব্যবহার করিনা।
আয়নার মধ্যে যে কুৎসিত মুখ দেখা যায় সেটা শুধু আপনিই একা দেখছেন না অন্য কেউ এটা দেখছে–?
মতিন মিঞা মুহূর্তেই খুব্ধ হয়ে গেল।
অন্য কেউ এটা দেখছে–?
আমার আব্বা আম্মা দেখছে এটা। আম্মা তো এটা দেইখা ফিট হইয়া পড়ছিল। পরে আর জ্ঞান ফিরে নাই দুইদিন পর মারা গেছেন। এর পর মতিন কুদ্দুস আলীকে ডাক দিলেন। ব্যাগের ভেতর থেকে আয়নাটা নিয়ে আয় তো–।
আয়ানা আনার পর মতিন মিঞা ডাক্তার সাবকে তার প্রতিবিম্ব দেখালেন। জ্ঞান হারালেন ডাক্তার সাব—-জ্ঞান হারানো পর আর ডাক্তার সাবের জ্ঞান ফিরেনি। সোনাদীঘির মানুষ মতিন মিঞার নাম শুনলে তার চাচার মতো ভয় পায়।

২৪৯জন ২৪৯জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য