দলছুট প্রজাপতি

রেহানা বীথি ১৩ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৮:২৮:১০অপরাহ্ন গল্প ২৩ মন্তব্য

দলছুট প্রজাপতি
———————————
তারারা ঝুমঝুমি বাজিয়ে যেন হেঁটে চলেছে পাশাপাশি। কিছু আবার আগুপিছু। চাঁদটা নিশ্চুপ। রূপালী আলোর বন্যা আকাশজুড়ে। ভেবে পায় না তিস্তা, এত মায়াবী রঙ দিনের বেলায় কোথায় লুকানো থাকে? দিনের সোনালীরঙে কোনো মায়া থাকে না তো! থাকে না মন কেমনের হিমেল হাওয়া। থাকে শুধু তুখোড় উত্তাপ, চোখ ধাঁধাঁনো, খাঁ খাঁ শূন্যতা। রাত এলেই যেন প্রশান্তি। কেন যেন রাতগুলোকে বড় আপন মনে হয় তিস্তার। যখন গাঢ় হয় আঁধার, চারিদিক যখন স্তব্ধ হয়ে যায়, সেসময় যেন খুঁজে পায় নিজেকে। নিজের অবয়বটা যেন অনেক বেশি স্পষ্ট হয় তখন নিজের কাছে। একে একে চোখের সামনে হাজির হয় টুকরো টুকরো ছবি। যেন হলে বসে সিনেমা দেখছে সে। আর হাজির হয় এক আশ্চর্য অবয়ব। সেই অবয়ব কুয়াশাচ্ছন্ন, মায়াময়। মায়ার ঘোরে আটকে যায় তিস্তা। চাঁদের আলোয় নিজেকে দেখতে দেখতে কখন যেন সেই অবয়ব এসে বসে তিস্তার কাছে। একাকার হয়ে যায় ওদের মনের মাঝে পুষে রাখা ভাবনাগুলো। চোখের সামনে সরু অন্ধকার পথ হঠাৎ করে আলোকিত হয়। তপ্ত দিন যেন বৃষ্টিমুখর হয় নিমেষেই।

টুটুলের ঘরের ছাদে ফুটো। বৃষ্টির পানি পড়ে টুপ টুপ করে বিছানাটার ওপরেই। খাটটা সরিয়ে নিয়ে পানি পড়ার জায়গাটাতে একটা প্লাস্টিকের গামলা পেতে রেখেছে। মা অনেকবার মানা করেছে এঘরে থাকতে। বিশাল এই বাড়িটায় ঘরের অভাব নেই। কিন্তু টুটুলের কেন যেন খুব মায়া এঘরটার ওপর। পুরোনো বাড়ির পুরোনো ঘর। একটা ভেজা ভেজা ভাব। বর্ষায় ভেজাভাবটা আরও প্রবল। এই কারণে কিনা জানে না টুটুল, একটা আপন আপন গন্ধ পায় ঘরটাতে। আর ওই বইয়ের আলমারিগুলো, ওগুলো যেন ওর প্রাণভোমরা। রাশি রাশি বই। ঘরের দু’দিকের দেয়াল জুড়ে আলমারি। একপাশের দেয়ালে লম্বা জানালা। জানালার পাশে রাখা ছিলো খাটটা। পানি পড়ার কারণে কিছুটা সরিয়ে নিয়েছে। তাতে করে গভীর রাতে বাইরের অন্ধকার কিংবা জ্যোৎস্নার আলো দেখতে অসুবিধে হচ্ছে একটু। কিন্তু কী আর করা যাবে! এই বর্ষাকালটাই তো। ঋতু বদলের সাথে সাথে খাটের অবস্থানও বদল হবে। তবু ছাড়বে না এ ঘর ও। এঘর জুড়েই তো কত রঙের খেলা প্রতিরাতে। আর ওই যে ওই সম্মোহনী রূপ, এঘর ছেড়ে গেলে যদি ছেড়ে যায় তাকে? না না, থাকতে পারবে না টুটুল এঘর ছেড়ে!

ফুটপাতের ফুলের দোকান থেকে একগোছা গোলাপ নিয়ে এসেছিলো আজ তিস্তা। শুকিয়ে না যায়, তাই পানির জগে জিইয়ে রেখেছে। জগে কেন? হোস্টেলে ফুলদানি নেই যে! তবু কেমন যেন মুষড়ে পড়ছে পাঁপড়িগুলো। কেন? ফ্যানের হাওয়ায় নয়তো! বন্ধই করে দিই তবে ফ্যানটা। বৃষ্টি হয়েছে আজ সারাদিনই। সন্ধ্যায় মুষলধারে। একটু গুমোট আছে, তবে থেকে থেকে শীত শীতও করছে। ফ্যান না চালালে খুব একটা সমস্যা হবে না বোধহয়। হয়তো একটু গরম গরম লাগবে মাঝে মাঝে। তা লাগুক, ফুলগুলোকে বাঁচাতে হবে তো!
আকাশ দেখে মনেই হচ্ছে না এখন, তুমুল ঝরেছে আজ সারাদিন। এমনকি সন্ধ্যাতেও যে ভারি বর্ষণ, তারও কোনো চিহ্ন নেই । ঝকঝকে আকাশে তারাদের মিছিল। জ্যোৎস্নার ভেজা রূপটাও বড় মায়াবী। এমন রাতগুলোর প্রতীক্ষাতেই থাকে তো তিস্তা। ঘুমায় না। রূপালী জ্যোৎস্নায় আহত হয়ে ঘুরে বেড়ায় ওই চৌরাস্তার মোড়ে। ঝাঁকড়া কৃষ্ণচূড়ার গাছটা পেরিয়ে হেঁটে যায় মেডিকেল কলেজের পাশ দিয়ে যে সরু পিচঢালা পথটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে, সে পথ ধরে। দেখা পায় এক আশ্চর্য অবয়বের! ইশারায় ডেকে ডেকে এগোতে থাকে সেই অবয়ব। সম্মোহিতের মতো অনুসরণ করে তিস্তা তাকে। চলতে চলতে অবশেষে থামে সে, থেমে যায় তিস্তাও। চারপাশে এক কুয়াশাময় প্রকৃতির মাঝে দাঁড়ায় ওরা। এক টুকরো জাফরানিরঙ মেঘ ওদের দু’জনের মাথার ওপর। যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঝরে ঝরে চুলগুলো রাঙিয়ে দেয়। এত ভালো লাগে তিস্তার! অবয়ব জানতে চায়,
খুশি তো?
— খুউব! তুমি খুশি নও?
— কোনো কথা বোলো না। চুপচাপ উপভোগ করো সবটুকু। ওই দেখো একটু দূরেই বিটপীলতায় জড়িয়ে আছে প্রেম!
— প্রেম!
— হ্যাঁ, তুমি নেবে বলে!
— আর তুমি? নেবে না?
— নেবো। তুমি দিলে নেবো। দেখো, উড়ে গেলো মৌটুসি! নিচু জারুলের ডালে বসেছে এখন।
— আহ্, কী সুন্দর!
— কী?
— মাথার উপর এই আকাশ আর ওই মৌটুসি বসা জারুল। ফুলগুলো অদ্ভুত লাগে জানো?
— কেন বলো তো?
— আগে কখনও ভাবিনি সবুজের মাঝে গাঢ় বেগুনী রঙ এত মোহময় হতে পারে। প্রথম যেদিন জারুল দেখি, চমকে গেছিলাম। এত মুগ্ধ হয়েছিলাম! সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে বেগুনীরঙ জারুল যেন চোখে ঘোর লাগিয়ে দিয়েছিলো।
— হুম।
— আচ্ছা, তোমারও কি তাই মনে হয়?
অবয়ব মৃদু হাসে। চাঁদের আলোয় খুব মায়া লাগে দেখে। তিস্তা এগিয়ে যায়। অবয়বের হাতটা কি একটু ছুঁয়ে দেয়া যায় না? বড় ইচ্ছে করছে যে!

বইটা এখন আর টানছে না। রাত কত হলো? বেডসুইচটা টিপে বাতিটা নিভিয়ে দিলো টুটুল। বিছানা থেকে নেমে এলো জানালার ধারে। জানালার ওপাশেই নারকেলপাতার ফাঁক গলে জ্যোৎস্নার উৎসব চোখে পড়ে। মিছিলের অগুনতি তারা মিটমিটি। এ শহরে আজ বৃষ্টি ঝরেছিলো বেশ। ভিজে আছে জ্যোৎস্না এখনও। মাদকতা মেশানো কোনো সুবাস ভেসে আসছে। একটা মৌটুসি শিষ দিয়ে এসে বসে জানালায়। ঠোঁটে তার বেগুনী রঙের ছোট্ট এক থোঁকা জারুল। ঠোঁট থেকে খসে পড়লো টুটুলের পায়ের কাছে। ঝুঁকে তুলে নিলো সেই জারুল। চাঁদটা যেন মিটিমিটি হাসছে তাই দেখে।
বললো টুটুল, হাসছো কেন?
— হাসছি না, ভাবছি।
— ভাবছো?
— ঘরে প্রেয়সী রেখে ফুল হাতে জানালায় দাঁড়িয়ে আছো কেন?
— প্রেয়সী, কোথায়?
— ওই তো তোমার খাটে। বসে আছে পা ঝুলিয়ে। কপালে লাল টিপ। হাতে লাল চুড়ির রিনিঝিনি।
ঘুরে তাকালো টুটুল। কপালের লাল টিপটা যেন জ্বলজ্বল করছে ওই মায়াবী মুখে। কী সুন্দর! উঠে দাঁড়ালো মায়াবী। পরনের তাঁতের শাড়িটার মৃদু খসখস আওয়াজ। চুড়িগুলো বাজলো।
— ফুলগুলো পরিয়ে দেবো খোঁপায়?
— দাও।
— কিন্তু কখনই তোমাকে পুরোপুরি পাই না যে! যেন তুমি আছো, তবু নেই। যেন স্বপ্ন।
— স্বপ্নই তো! তোমার খুব নিবিড় একটা স্বপ্ন আমি। যেমন তুমি আমার!
— আমিও তোমার স্বপ্ন?
— হ্যাঁ, স্বপ্ন!
— কিন্তু তা কী করে হয়? আমরা তো চিনি না কেউ কাউকে! দেখিনি কখনও কাউকে!
— দেখিনি ? নিজেদের ভেতরটা দেখিনি কী আমরা! ওখানেই তো বসবাস আমাদের।
আমরা চাই একে অপরকে, নিবিড়ভাবে। স্বপ্নে কিংবা চেতনায়! জ্যোৎস্নার মায়ায় চিনে নিই একান্ত আপন।
কোনো এক অচেনা নদীর ধারে তুমি থাকো আমার সাথে! নিশিথে যখন চাঁদ জাগে, জেগে থাকি আমরাও। পাশাপাশি কত রাত হেঁটেছি! চাঁদের আলোয় চলে গেছি এক আশ্চর্যলোকে, একসাথে! সবুজ অরণ্যের শীতলতা মেখেছি নিজেদের গায়ে!

— ঠিক, ঠিক! বহুবার হারাই অন্তর, আমি তোমার মাঝে। তুমিও হারাও তেমনই। চাঁদ জাগে আমাদের সাথে! অপার আনন্দে ভাসি আমরা একসাথে। এমনটা কেউ ভাসাতে পারেনি আমাদের। দুঃখে ভাসাতে পারে অনেকেই। আমরা ভাবি দুঃখ বুঝি সবসময়ের সঙ্গী । কিন্তু না। এই দেখো, আমরা কেউ কাউকে দুখী দেখতে পারি না। তোমার বিষাদ ছুঁয়ে যায় আমায়, আমার বিষাদ তোমাকে। এই গভীর গোপন রাত, আর ওই চাঁদের আলো দেখো কতো কাছাকাছি নিয়ে এসেছে আমাদেরকে!
তবু কেন অস্পষ্ট সব? তবু কেন ছুঁতে পারি না তোমাকে? মায়াবী?

— আমিও যে ছুঁতে পারি না তোমাকে! বড় ইচ্ছে হয়। তবুও পারি না। কেন পারি না? তুমি যেন একটা অধরা অবয়ব। অথচ কত আপন! এক সম্পূর্ণ অচেনা ভূবন দেখি আমি তোমার সাথে। দেখি অসংখ্য রঙের সমাহার, বিচিত্র বাহারী ফুল। যখনই দেখি তোমায়, যেন দু’টো ডানা পাই। যেন শূন্যে ভেসে বেড়াই। তুমি হয়তো দেখোনি কোনোদিন, আনন্দে কেঁদে ফেলি আমি। ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে যাই।

— তোমার কান্না দেখেছি আমি মায়াবী! অবাক হয়ে দেখেছি। নিজের চোখের জল আমি তোমার চোখে গড়িয়ে পড়তে দেখি প্রতিদিন। একই ভালোলাগা, একই মুগ্ধতা যে আমারও!
জ্যোৎস্নাহত দুই মানব মানবী আমরা। তুমি আমার মায়াবী, আমি সেই মায়াবীর অবয়ব।

— কিন্তু অস্পষ্টতা কেন? কুয়াশার চাদরে মুড়ে রয়েছে কেন মায়াবী আর তার অবয়ব? আমরা কি ওই দু’টো নাম হয়েই থেকে যাবো একে অপরের কাছে? আজীবন!

— হয়তো তাই! কিংবা হয়তো সমাজের দেয়া পোশাকী নামগুলো সামনে আসবে আমাদের। কিই বা এলো গেলো তাতে?

— অনেককিছুই এসে যায়। এই যে আমি ছুঁতে পারি না তোমাকে। এত আপন আমরা, আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালোলাগাগুলো অনুভব করি দু’জনেই। কখনও তো ইচ্ছে করে এই অনুভব পূর্ণতা পাক স্পর্শে। ঠোঁট ছুঁয়ে যাক ঠোঁটে! আলিঙ্গনে শিহরিত হোক ভেতর অব্দি। যদি দিনের আলোয় দেখা হয় কখনও, সম্ভব হতে পারে তো সেসব! কেটে যেতে পারে এ কুয়াশা।
— কিন্তু মায়াবী!
— কোনো কিন্তু নয়। মূর্ত হোক আমাদের কল্পনা। আমরা হাত ধরে চলে যাই ওই ইছামতির পাড়ে, হয়তো মধ্যাহ্নে কিংবা জ্যোৎস্নারাতে।
— কিন্তু কল্পনা কি কখনও বাস্তব হয় মায়াবী?
— হবে না কেন? অবশ্যই হবে। দেখে নিও তুমি!
— কিন্তু তখন যদি চিনতে না পারি কেউ কাউকে?
— মুগ্ধতাই চিনিয়ে দেবে, এ যে ভালোবাসার মুগ্ধতা। এ মুগ্ধতা মিথ্যে নয়।

মেডিকেল কলেজের লম্বা করিডোর। ওটা পেরিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি। এবারের ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস এর আগে কখনও নেয়নি টুটুল। আজই প্রথম। কে জানে কেমন এবারকার ব্যাচটা। ভর্তির পর প্রথম প্রথম খুব চঞ্চলতা দেখায় সবাই। আবার ধীরে ধীরে পড়ার চাপে তা কেটেও যায়। অনেকে তো টিচারদেরকে নিয়ে নানান রসিকতা করে। ঝাড়ি দিয়েও বিশেষ লাভ হয় না। টিচারদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হওয়ায় টুটুলকে নিয়ে রসিকতার মাত্রা যেন একটু বেশিই। তারওপর আবার অবিবাহিত। কোনো ছাত্রীর দিকে একটু বেশি মনোযোগী হলেই সেরেছে। সেই ছাত্রীকে জড়িয়ে বিভিন্ন আকার ইঙ্গিত, টুটুলকে দেখলে হেসে গড়িয়ে পড়া ইত্যাদি চলবে। টুটুলও ঠেকে শিখেছে অনেক। এখন আর ছাত্রীদের দিকে তাকায় না তেমন।

ক্লাসের বাইরে ইতস্তত ছাত্রছাত্রীরা বুঝতেই পারেনি টুটুল তাদের শিক্ষক। সেজন্য ওদের দোষ দেয়া যায় না মোটেও। টুটুলই দায়ী। ওর ওই কচি কচি রোমান্টিক মার্কা চেহারা দেখে আর যাই হোক, শিক্ষক মনে হয় না। আর সারাক্ষণের ঘোরলাগা চোখদু’টোতে মনে হয় বিরহী কবি। যেন স্বপ্ন লেগে আছে ওই চোখদু’টোতে। ক্লাসরুমে গিয়ে যখন বসলো চেয়ারে, তখন সবার হুশ হলো। আর তার কিছুক্ষণ পর ছাত্রছাত্রীরা যেন মোহিত হয়ে গেলো। কী সুন্দর বাচনভঙ্গি! ওরা নিশ্চিত হয়ে গেলো , ছাত্র পড়ানোও একধরণের শিল্প। এমনকি ডাক্তারি পড়ানোও!
একমনে নিজের লেকচার শেষ করে বের হতে যাবে টুটুল ক্লাসরুম থেকে, তখনি দৃষ্টি চলে গেলো রুমের একেবারে মাঝামাঝিতে। একটি মুখ, ভীষণ আনমনা… যেন কতদিনের চেনা! সেই মুখে কিছু একটা আছে। এমনকিছু যা সম্মোহন করে প্রবলভাবে।
এবং…… এবং হঠাৎ করেই ওর মনে হলো, ওই সম্মোহনী শক্তির সাথে পরিচিত টুটুল গভীরভাবে। বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা শূন্যতার অনুভব টের পেলো! থমকে যাওয়া টুটুল ভাবলো কয়েক সেকেণ্ড। ডাকবে কি ওকে?

অবাক হয়ে দেখছিলো তিস্তা। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে পড়ানো, চেয়ারে বসে থাকা, বসে থেকে উঠে দাঁড়ানো। পড়ার ফাঁকে দৃষ্টি যেন ঘুরে বেড়াচ্ছিলো কোন্ সুদূরে। যেন খুঁজে চলেছে কিছু একটা। এ সবই তো খুব চেনা তিস্তার। ওই অবয়ব, ওই বিষণ্ণতা, ওই সুদূরের চাহনি, ওই জাদুকরী ক্ষমতা ! কত পথ হেঁটেছে একসাথে! কত সুধা পান করেছে তো তারা একসাথে! পাখিদের গান, ভোরের স্নিগ্ধতা, গোধূলির মায়া কিংবা জ্যোৎস্নার মাদকতা উপভোগ করেছে অভিন্ন হয়ে! চিনতে পারছে না কেন তবে? কেন তবে একবারও রাখছে না তিস্তার চোখে চোখ? অবশেষে তার যাওয়ার সময় উপস্থিত। চলে যাচ্ছে…. বেরিয়ে যাবে কি দরজা দিয়ে? দেখবে না তার মায়াবীকে?
বুকের মাঝে তার কিছু একটা বিঁধলো বুঝি! যেতে যেতে চোখ ফেরালো সে। দাঁড়ালো থমকে কিছুক্ষণ। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে বোধহয়! বড় বিক্ষিপ্ত হৃদয় নিয়ে তিস্তাকে দেখছে। দোটানায় আছে কী? থাকতেই পারে। এভাবে এখানে খুঁজে পাবে মায়াবীকে ভাবনাতেই আসেনি তার। যেমন আসেনি তিস্তার। সেই ধোঁয়াটে অবয়ব কুয়াশার ঘোর কাটিয়ে ধরা দেবে এমন করে , কেমন করে জানবে তিস্তা? ধরা দেবে একসময়…. কিন্তু আজই! ভাবেনি তো তিস্তাও। ভেতরে এক অদ্ভুত কাঁপন। যেন এক অদ্ভুত আবেশে অবশ হয়ে আসছে সারাশরীর মন। উঠে দাঁড়ায় অবশ মনে। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় তিস্তা ওর আপনজনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কোথায় সে? শূন্য দরজাটা হাওয়ায় দুলছে।

কয়েকটি স্তব্ধ মিনিট কাটিয়ে টুটুল পা বাড়ায়। দ্বিধায় দ্বিখণ্ডিত মন তার। কাকে দেখলো সে? এত চেনা, এত আপন! আবছা দেখা সেই মুখ, সেই মায়া, সেই সম্মোহন! এ কী কোনো মায়া? চোখের ভুল? অদ্ভুত এক অনুভূতির অতলে যেন তলিয়ে যাচ্ছিলো সে। মস্তিষ্ক যেন অকেজো, অসাড়। খেয়ালই করলো না সেই মুখে স্পষ্ট আলোর রেখা। চিনতে পারার আনন্দ। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগলো। হেঁটে হেঁটে কোথায় চলে গেলো বুঝতেই পারলো না। হঠাৎ এক দিগন্তবিস্তৃত মাঠে আবিষ্কার করলো নিজেকে। তখন সন্ধ্যা ঘনায় প্রায়। বাড়ি ফিরে এলো সে। মনে মনে গভীর রাতের প্রতীক্ষা।

অবশেষে রাত এলো, বড় আকাঙ্ক্ষিত রাত। পিচঢালা পথ পেরিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলা নদীর ধারে বালির ওপর পায়ের ছাপ। ছাপ ধরে ধরে এগিয়ে গেলেই পাবে তার দেখা। হয়তো কিছুক্ষণ আগেই এসেছে সেই মায়াবী, প্রতীক্ষায় রয়েছে হারাবার, কোনো এক অদৃশ্যলোকে! সাথে এই আশ্চর্য অবয়ব আর অভাবিত প্রকৃতির স্বপ্নিল রঙ। কমলা এক ময়ূরের গাঢ় নীল পেখমে ভর করে ওরা চলে যাবে বহুদূর। যেতে যেতে জেনে নেবে চিনেছে কী তারা নিজেদের? জানতে পেরেছে কী মনকুঠুরির অপূূর্ব রূপ? যেখানে বিষাদও সৌন্দর্যময়!
তারপর…… একদিন ফাঁকা ক্লাসরুমে মুখোমুখি হবে দু’জন। হাত বাড়াবে টুটুল। স্পর্শ করবে তিস্তার পালকের মতো নরম হাত। আমূল কেঁপে ওঠবে দু’জনেই। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলবে টুটুল…
চিনতে পেরেছো তো আমায়? মায়াবী!

৩১১জন ১৪৫জন
26 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য