সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

দরিদ্রতা

দালান জাহান ১৮ আগস্ট ২০২১, বুধবার, ০৫:০১:৩৮পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ৬ মন্তব্য

 

 

সফু মিয়া গরীব কৃষক। তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার জীবন সংসার। নিজের জমি বলতে চার রাস্তার মাথায় দশ শতাংশের একটি ডোবা আছে। সফু মিয়া পরের জমি চাষ করে ফসল ফলায়। তাতে তার ভালোই চলে। 

ছেলেরা গ্রামের স্কুল কলেজ পাশ করে শহরে পড়ে। এখন তাদের খরচ আর তার দিতে হয় না। মেয়েটিরও চাকরি হয়েছে প্রাইমারিতে এতে সে মহাখুশি। মেয়েটির বিয়েও দিয়েছেন এক স্কুল শিক্ষকের কাছে। 

তিন-চার বছর আগে চার রাস্তার মাথায় নতুন বাজার হয়েছে। দেখতে দেখতে দোকান পাটও হয়েছে অনেক।  বেড়েছে জমির দামও। সারাদিন কাম কাজ সেরে গ্রামের মানুষেরা সন্ধ্যায় বাজারে আসে আড্ডা দেয় চা খায়। সফু মিয়াও আসে বাজারে বসে চা খায় আড্ডা দেয়। 

গত ঈদে মেয়ে তাকে সাদা সিল্কের পাঞ্জাবি দিয়েছেন। ছেলেরা দিয়েছেন লুঙ্গি তাদের মায়ের জন্য দামী তাঁতের শাড়ী। মেয়ে বলেছেন , এখন থেকে তুমি ছেঁড়া শার্ট পড়ে বাজারে যাইবা না। প্রতিদিন পাঞ্জাবি পইড়া বাজারে যাইবা। 

সফু মিয়া হাসে আর বলে, পাঞ্জাবি পড়লেই কী! আর নাগড়া পড়লেই কী! আমি সফু মিয়া। সফু মিয়াই থাকবো!  মেয়ে বলেন না বাবা তুমি নিজেকে এতো ছোট ভাইবো না। তুমি একজন কৃষক আর কৃষকরা দেশের মেরুদণ্ড। ছেলেরাও তার বাবাকে সাহস দেয়। 

সফু মিয়া অল্প শিক্ষিত মানুষ। কৃষকের মর্যাদাটা সে জানে, কোথায় লেখা থাকে কৃষকের কথা। সুলতানের ছবির ইতিহাসও তার অজানা নয় কিন্তু তারচেয়েও বেশি জানা বিষয় হলো, যারা বইয়ে কাগজে কৃষকদের কথা লিখেন। তারাই আবার কৃষকদের শোষণ করেন, ছোটলোকের বাচ্চা বলে গালি দেন। তাদের দৃষ্টি দেখলে সফু মিয়ার মনে হয় তাদের দৃষ্টি থেকে কেমন জল কাদার গন্ধ বের হয়। 

এই যেমন এলাকার চেয়ারম্যান তার

ছোট বেলার সহপাঠী। নির্বাচনের আগে জনসম্মুখে যে কথাটি প্রথম বলেছিলেন, তাহলো,  “কৃষক ভাইয়েরা আমার , আপনারই আমাদের দেশের মেরুদণ্ড, আপনারাই হাতের পেশি বুকের বল” আপনাদের ছাড়া দেশ অচল মানুষ অচল! এইসব। নির্বাচনের ভোট চাইতে এসে সে কৃষকের মাঠে নেমে আসেন, ধানের চারা হাতে নেন, কৃষকের সাথে ধান রোপণ করেন জমিতে। সহজ সরল মানুষগুলো আফসোস করে, “আহারে এক্কেবারে মাটির মানুষ।”

নির্বাচন শেষ হবার পর সেই চেয়ারম্যানকে আর দেখা যায় না। যারে দেখা যায় তারে চেনা যায় না। তার রাস্তা আলাদা হয়ে যায় তার ডানে বামে চোর সামনে বাটপার পেছনে বিশ্ব বাটপার। মানুষেরা তাকে এখন ভয়ই পায়। 

সেই চেয়ারম্যান সফু মিয়ার গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি দেখে সহ্য করতে পারলেন না। 

বাজারে সবার সামনে বলেই ফেললেন , “মাইট্যা কৃষক অয়াও তুই সিল্কের পাঞ্জাবি পইরা বাজারে ঘুরস। দেশ কতো উন্নত অইছে দেখছচ।” সফু মিয়া কথা কয় না মাটির দিকে তাকায় আর বলে, “আমি কৃষক তুই চেয়ারম্যান কিন্তু মনে রাহিস, চেয়ারম্যান অওয়ার আগে তুই কিন্তু কৃষকের লগে ধান লাগাইয়া কৃষক অইছছ, তারপরে চেয়ারম্যান অইছছ, আর মানুষের হাছা বন্ধু অইলো মাটি 

আমরার সবার গন্তব্য মাটির দিহেই মাটিই আমরার শেষ ঠিহানা, তাই মাইট্যা কইবে না। 

মাইট্যা তো তোর বাফ ও ছিলো তোর চৌদ্দ গোষ্ঠী কৃষক ছিলো অহনও কৃষক আছে তোর ঘরে”! কাউন্সিলর বুঝতে পেরে কথা ঘুরিয়ে বলে, “সফু তুই রাগ করছছ কেরে?  আমার তো তোর পাঞ্জাবিটা খুব পছন্দ অইছে! তাই বলেছি। এইডা তুই আমারে দিয়া দে।”

 “তোর কি পাঞ্জাবির অভাব আছেরে সাদা পাঞ্জাবি শোক দিবসের কালা পাঞ্জাবি লাল সবুজ দেশপ্রেম পাঞ্জাবি তাছাড়া হইলদা বসন্ত রঙ্গের কত কী! তোর পাঞ্জাবি  লাগবো ক্যা? 

“না পাঞ্জাবি দেওন যাইবো না। এটা আমার মেয়ে আমারে কিন্যা দিছে!অন্য কিছু চা দিয়া দিবাম! “

“সত্যিই দিবে তো!”

“হ দিয়া দিব ক তুই কি চাস? 

কইতাম পড়ে না করবে না তো! 

“না করব ক্যান?  কী আছে আমার দেওয়ার মতো আর ? “

“আছে! আছে! আমি তোরে ট্যাহা দিয়াই নিবো মাংনা নিবো না দোস্ত

বাজারের নিচের ডুবাডা আমারে দিয়া দে, যা মূল্য আছে আমি তোরে দিয়া দিবো! 

সফু মিয়ার চোখ ছোট হয়ে যায়। আবার মাটির দিকে তাকায়। 

“এতো জমি পাকা বাড়ি শহরে বাড়ি , এতোকিছু থাহার পরেও , আমার শেষ সম্বল একমাত্র ভূমি, শত বিপদে যারে সন্তানের লাহান আগলায়া রাখছি বিক্রি করি নাই, সেইডা তোর চাই “।

“আমি তো ভাবতাম আমিই এলহা গরীব মানুষ। অহন দেখতাছি তোর যতো সম্পদ অইতাছে তুই ততোই গরীব অইতাছছ। এতিমের জমি নিছছ তুই,  এতিমের চেয়ে এতিম পরমান করছছ। বিধবার জমির দখল নিয়ে তুই বিধবার চেয়ে অসহায় অইছছ। জোর দখল কারা কারি মারামারি কইরা তুই , তোর অভাব দেহাইছছ। তুই সবচেয়ে বড়ো দরিদ্র সমাজে পইড়া গেছছ। তুই সবচেয়ে নিচ তুই সবচেয়ে গরীব। 

তোর এই দরিদ্রতা। তোর এই লোভ কোনদিন শেষ অইবো না।”

 

 

দালান জাহান 

২৭.০৭.২১

 

১৯৮জন ২৭জন
0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য