থ্রিলার গল্পঃ খেলা

ইসিয়াক ১৮ এপ্রিল ২০২০, শনিবার, ০৬:৪০:২৪অপরাহ্ন গল্প ২০ মন্তব্য
বাস থেকে নামতেই দুষ্টু বাতাসে হঠাৎ করে চুল গুলো সব এলো মেলো হয়ে গেলো।দুই হাতে দুই ব্যাগ ,সাথে যোগ হলো এলো চুল আবার এদিকে ওড়নাটাও গড়িয়ে পড়ে যায় যায় অবস্থা।রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে।অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম।
ভীষণ এক বিব্রতকর অবস্থা।আর লোকজনও হয়েছে তেমনি, কোথায় একটু সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসবে ,তা না ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।মনে হয় কোনদিন কোনকালে কোন মেয়ে দেখেনি।নিজেকে ভিন গ্রহের এলিয়েন মনে হচ্ছে।
সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারগুলো বেশ আরাম দায়ক।বসার জায়গা ,টয়লেট পারিপার্শ্বিক পরিবেশটা বেশ সুন্দর।বাস থেকে নেমে আমি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কিছুক্ষণ বসলাম,তারপর ফ্রেশ হয়ে কাউন্টারে জানালাম আমার একটা ট্যা্ক্সি চাই। ওরা জানালো ট্যা্ক্সি নয় প্রাইভেট কারের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।ভাড়া তেমন একটা বেশি না।আমি চাইলে নিতে পারি।
অল্প সময়ের মধ্যে আমি হোটেল ইন্টারন্যশনালে চেক-ইন করলাম।আসতে আসতে শহরটা দেখছিলাম।শহরটা অনেক বদলে গেছে। এটা আমার পরিচিত শহর। বাবার বদলীর চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের অনেক জেলা শহরে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
রুমে ঢুকে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম।তারপর জানালার গ্লাস সরিয়ে চোখ ভরে শহরটাকে কিছুক্ষণ দেখে নিলাম।হয়তো কোনদিন আর এ শহরটাকে এরকম ভাবে দেখার সুযোগ হবে না।প্রিয় কোন কিছু সবসময়ই প্রিয়।এক সময় আমরা এই শহরেই স্থায়ী আসন গাড়তে চেয়েছিলাম কত স্বপ্ন ছিলো কিন্তু অজানা এক কালবৈশাখী ঝড়ে সব তছনচ হয়ে গেলো। চিরজীবন মানুষ ভেবেছয় এক আর হয়েছে আরেক।
জার্নির ফলে ক্লান্তি কাটাতে লং শাওয়ারের বিকল্প নেই। আমি অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ার নিলাম। শাওয়ার নিতে নিতে নানা ভাবনায় মন পুলকিত হয়ে উঠলো।আজ প্রথম চয়নের সাথে আমার দেখা হবে। ভাবতেই মনের কোনে কোনে অজানা শিহরণ বয়ে গেলো।এতোদিন পরে আমার এই শহরে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে চয়নের সাথে দেখা করা।ওর প্রেমের সাগরে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া।আচ্ছা মানুষ প্রেমে পড়লে কি কবি হয়ে যায়? মনে হয় কবি হয়ে যায়। আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছা করছে। সব ঠিক ঠাক থাকলে আজ রাতে হয়তো একটা কবিতা লিখলেও লিখতে পারি।
চয়ন আমার ভালো লাগার মানুষ ভালোবাসার মানুষ,এক কথায় চয়নকে আমি খুব বেশি রকমের ভালোবাসি। আমাদের প্রথম পরিচয় ফেসবুকের মাধ্যমে,বছর দুয়েক আগে।এতোদিন ভার্চুয়াল প্রেম করে আজ সরাসরি বাস্তবে দেখা করবো চয়নের সাথে।সেই উদ্দেশ্যেই আমার এ শহরে ফিরে আসা। সত্যি সত্যি দারুণ উত্তেজনা কর একটা দিন।
ডিসেম্বর মাস স্কুল ছুটির এই সময়টাতে দিন পনেরো আমার ফ্রি থাকে।অনেক আগে থেকেই এইবার বন্ধের সময়টাতে আমি চয়নের সাথে দেখা করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম। চয়ন অবশ্য আমার কাছে যাবে বলেছিলো ।আমিই বলেছি না তুমি ব্যস্ত মানুষ তোমার কাছে আমি সময় মতো পৌছে যাবো্ ।তোমাকে অতটা কষ্ট করতে হবে না।চয়ন খুব লক্ষী একটা ছেলে,তার মতো কেয়ারিং ছেলে এযুগে খুজে পাওয়া মুশকিল।
শেষ বিকালের দিকে আমি চয়নের বাড়িটা অবশেষে খুঁজে পেলাম।পাড়াটা বেশ নিরিবিলি।এরকম নিরিবিলি জায়গা সবসময় আমাকে আকর্ষণ করে।সারি সারি বেশ কয়েকটা চার পাঁচ তলা বাড়ি। একেবারে শেষের বাড়িটার চারতলাতে চয়ন থাকে।
আগে থাকতেই সব ইনফরমেশন নেওয়া ছিলো চয়নের কাছ থেকে।
চয়ন আমায় বলেছিলো,
– এ্যাট লিষ্ট হোটেলের নাম বল তোমায় নিতে আসি।
আমি বলেছিলাম,
-আমাকে খুঁজে বের করার সুযোগ দাও। ঠিক দেখো,আমি তোমার ভালোবাসার টানে তোমাকে খুঁজে বের করবোই।এতোদূর যখন একেলা আসতে পেরেছি তখন তোমার বাসস্থল ও ঠিক খুঁজে বের করতে পারবো।
এতে অবশ্য চয়নও খুব এক্সসাইটেড। সে জানাতে ভুল করলো না বলল,
-এই জন্য তো তোমাকে এতো ভালোবাসি প্রিয়তমা।
নিচ থেকে ডোর বেল বাজাতেই ব্যলকনিতে চয়নের হাসি মুখ দেখা গেলো।শেষ বিকেলের আলোয় চয়নের হাসি মুখে অন্য রকম এক আভা খেলে গেলো যেন।এই প্রথম আমরা একে অন্যকে সামনা সামনি দেখলাম।তবু মনে হলো আমরা একে অপরের কত দিনের চেনা।
চয়নের ফ্ল্যাটটা দু কামরার।সামনে অনেকটা খোলা জায়গা ।সেখানে সারি সারি অপরুপ রুপে শীতের যত রকমের মৌসুমী ফুল ফুটে আছে। অসম্ভব মায়া মায়া পরিবেশে আমরা বাগানে ছাতার নিচে বসলাম।বিকাল ও সন্ধ্যার মাঝামাঝিতে আমরা কফি খেলাম।হালকা ঠান্ডা পড়ছে। আমরা দুজনে ঘনিষ্ঠ ভাবে বসলাম।পূব আকাশে অচিরেই চাঁদ উঠলো। মায়াবী চাঁদের আলোতে আমরা আরো বেশি ঘনিষ্ঠ হলাম।
কোন কোন ঘটনা জীবনে অন্য রকমের পরিপূর্নতা আনে। মনেই হলো না আমরা এতোদিন শুধু ভার্চুয়ালি প্রেম করেছি।মনে হলো আমরা দুজন দুজনকে চিনি জানি অনন্ত অনন্ত কাল ধরে।
নীরবতায় অনেক কথাই বলা হয়ে যায় যখন দুটি মন এক হয়।চয়ন আমার হাতের আঙ্গুলগুলো নিয়ে খেলা করতে করতে জানতে চাইলো্।
-আচ্ছা এই যে তুমি আমার টানে এতোটা পথ একা একা চলে এলে তোমার কি একটুও ভয় করেনি।
আমি হেসে বললাম,
-তুমি হয়তো জানো না ছোটবেলা থেকে আমার ভয় ডর একটু কম।আর তোমার ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। আমি জানি তোমার দ্বারা আমার কোনকালে কোনদিন কোন অনিষ্ট হবে না।
উত্তর শুনে চয়ন আরো বেশি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়লো,আলগোছে আমার হাতটা টেনে নিয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দিলো। আমি চুপচাপ মায়াবী আদরে শিহরিত হতে থাকলাম।
এর মধ্যে আমার মানা করা সত্ত্বেও ক্যাফে রোজ গার্ডেন থেকে খাবার আনিয়ে নিলো। চয়ন এবার বেশ অভিমানের স্বরে বলল,
-তুমি খামাখা টাকা খরচ করে হোটেলে উঠলে।
আমি ভালোবেসে বললাম,
-তোমার সাথে এই ফ্ল্যাটে রাত কাটালে তোমার তো মান সম্মান চলে যাবে। হাজার হলেও তুমি একজন কলেজের প্রফেসর। এলাকায় তোমার মান সম্মান আছেনা।
চয়ন মনে হয় যেনো সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলোসে দ্রুত হড়গড়িয়ে বলে ফেলল,
-চল আজই আমরা বিয়ে করে ফেলি।আমার আর ভালো লাগছে না।
আমি বললাম,
-ঠিক আছে তবে একটা শর্ত আছে।
-কি শর্ত ? আমি সব শর্তে রাজী।
-একটা খেলা খেলতে হবে ?
চয়ন অবাক হলো।আমার চোখে চোখ রেখে বলল,
-খেলা? কি খেলা?
-আমি তোমার চোখ বেঁধে দেবো। তারপর তুমি আমাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় খুজে বের করে ছুয়ে দেবে। যদি খুঁজে বের করে ছুয়ে দিতে পারো তবে আজই বিয়ে। রাজী?
চয়ন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
-রাজী হবো না মানে? অবশ্যই রাজী।নাও তাড়াতাড়ি চোখ বাঁধো।
হঠাৎ করে আমার হাতটা কেঁপে উঠলো, মহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করলাম।এখন কিছুতেই ভুল করা যাবে না।আমি নিপুন ভাবে চয়নের চোখ বেঁধে দিলাম।ভালো করে পরীক্ষা করে নিলাম যাতে ও না দেখতে পায়।
চয়ন আদুরে গলায় বলল,
-না হয় একটু দেখতে পেলাম, তাতে কি এমন ক্ষতি হবে বলো তো। আলটিমেটলি আমরা তো স্বামী স্ত্রী হচ্ছি না কি বলো?
আমি জোরে হেসে উঠলাম,
-স্বামী স্ত্রী !!!!!!!!!!
আর বেশি দেরি করা ঠিক হবে না সজোরে চয়নের বুক লক্ষ করে বার কয়েক আপেল কাটা ছুরিটা দিয়ে এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে দিলাম।
তারপর বললাম হাপাতে হাপাতে পৈশাচিক উল্লাসে বললাম,
-আমাকে তুমি চিনতে পারছো চয়ন?
ঘটনার আকষ্কিকতায় এবং প্রচন্ডবেদনায় চয়ন অস্ফুষ্ট স্বরে বলল,
কে তুমি ?কেন আমাকে মারতে চাও।
-আমি সীমা ।মনে আছে ? আমি গদখালীর সীমা।তুমি আমাদের বাড়িতে লজিং ছিলে আজ থেকে ষোলো সতেরো বছর আগে। তুমি আমার শিক্ষক ছিলে ,মনে পড়ে? তুমি আমায় ফুসলিয়ে কিছু ছবি তুলে নিয়ে ছিলে। তখন আমার এগারো কি বারো বছর বয়স।তারপর সেই ছবি দেখিয়ে প্রতি রাতে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার সাথে সম্পর্ক করতে।প্রতি রাতে। আমার খুব কষ্ট হতো ।খুব কষ্ট হতো। কিন্তু আমি লজ্জা ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। । সব নিরবে সহ্য করতাম।আমি জানি আমার মাকেও তুমি সেই ছবি দেখিয়েছিলে। ব্লাকমেইল করেছিলে তাও জানতাম। মা আমার লজ্জায় অপমানে আত্নহত্যা করেছিলো। মনে পড়ে। আমি তখন ছোট ছিলাম তাই সব অপমান লাঞ্ছনা নীরবে সয়ে ছিলাম।অসহায় ছিলাম তোমার চক্রান্তের কাছে। ভাগ্য তোমার পক্ষে ছিলো, সময়ও তোমার পক্ষে ছিলো সেদিন কিন্তু আজ দিন বদলেছে ভাগ্য এখন আমার পক্ষে ,তোমার সব শয়তানির দিন শেষ।
সেদিন থেকেই আমার মনে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে যেদিন তোর ওই নিষ্ঠুর লালসার কাছে আমার মা হেরে গিয়ে আত্নহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। তুই ভেবেছিলি পালিয়ে বেঁচে যাবি। কেউ তোকে খুঁজে পাবে না।কেউ তোকে ধরতে পারবে না। পুলিশের চোখ এড়ালেও আমি ঠিকই তোকে খূঁজে বের করেছি।এতে আমার অনেক পরিশ্রম সময় দিতে হয়েছে ।তোর মতো নরপিশাচের সাথে ভালোবাসার অভিনয় করতে হয়েছে। জেনে রাখ পাপ বাপকেও ছাড়েনা। আইন আদালত তোর বিচার করতে না পারলে কি হবে। আমার হাতে ঠিকই তোর বিচার হলো।এবার তুই মর।
আমি চয়নের নিথর দেহটার উপর কয়েক দলা থুতু ছিটিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করে, সাথে রাখা বোরকা পরে দ্রুত নিচে নেমে এলাম। আজ রাতেই আমায় এ শহর ছাড়তে হবে।
১৪৮জন ২১জন
10 Shares

২০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য