তানজীম দৌড়ে এল- ফুপি ভীষণ জরুরি। এখুনি চলো আমার সাথে। আমরা তখন বসুন্ধরায় সামান্য কেনাকাটায় ঢুকেছি। এবং আগে খাওয়া হবে না শাড়ি কেনা হবে এই ফ্যাকরায় আটকা।

বাইরে গেলেই ভাইয়ার ভীষন ক্ষিদে পায়। সে তিনি যতোই বাসা থেকে খেয়ে বের হন না কেন? দুবছরের ত্রপার হাগু পায়। যেহেতু সহকারী মনোয়ারা থাকে না তাই ও কাজে আমাকেই থাকতে হয়।

এদিকে ভাবী সাহেবার লং গাউন বা কয়েকটা শাড়ি পছন্দ হয়ে যায়। ভাইয়া এতো কিনতে নারাজ। যুগলের দেদারসে ঝগড়া চলতে থাকে। আমি আর তানজীম দর্শকমাত্র।

এ সময় আমাদের পক্ষপাতিত্বেও ভীষন বিপদ, বাড়ি ফিরে ডলা খেতে হবে। তাদের ডিসিশানের ফাঁকে কিছুক্ষণের জন্য আমরা হারিয়ে গেলাম।

ঘড়ির দোকানে গিয়ে তানজীম দাঁড়ালো। টাইটানের যে ঘড়িটা সে পছন্দ করেছে সেটি মেয়েদের। আমি ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই সে বললো- আরে মেয়ের জন্যই তুমি টাকা দাও, তারপর বলছি।

ঘড়ি কেনা শেষ। তানজীম আমায় জড়িয়ে ধরে ইউ আর গ্রেট ফুপি, থ্যাংকস এ লট ইত্যাদি। এ সময় পেছন থেকে ডাইনি মহিলা কঠোর গলায় হাজির।

– কিরে, অনিন্দিতা। এতো গলাগলি, ছড়াছড়ি। কি ব্যাপার, কি?

– না ভাবী, তেমন কিছু না। ওই মা- ছেলেতে ভালোবাসাবাসি আরকি!

– তুই কিন্তু ওর মাথাটা বিগরে দিচ্ছিস।

কে শোনে কার কথা, আমরা আবার উধাও। কারণ ঘড়ি রহস্য তখনও আমার জানা হয়নি। এতোগুলা টাকা খরচা করে তাকে ছেড়ে দেব তা তো হয়না। আমি তাকে ধরে ফেললাম।

তানজীম ইন্টার ফাস্ট ইয়ারে পড়ে। ক্লাসে তার প্লেস সবসময় পাঁচ এর মধ্যে থাকে। পড়াশোনার মতোই সবকিছুতেই তিনি একটু ফাস্ট। আজকের ঘড়ি যার জন্য কিনেছেন সামনে তেনার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা। এতো তারাতারী তার গফ হবে ভাবিনি।

– মেয়ে তো তোমার সিনিয়র? কিভাবে হল।

– একই কোচিং এ পড়ি। মা আসছে, সে যেন কোনভাবেই না জানে। আপাততঃ তোমার ব্যাগেই রাখো। ওকে নিয়ে তোমার বাসায় আসবো তখন দিও।

– আমার খরচা কিন্তু আবার বেড়ে গেল। কিছু খাওয়াতে পারবো না, আর কিছু দিতেও পারবো না।

– আরে, কিপটুস আর কিছু দিতে হবে না। আর দিলেই বা কি? তোমার আর খাবে কে?

– কেন পেটের জন যিনি বড় হচ্ছেন তার কি পেট থাকবে না নাকি?

– ও, ইতি আর আমি দেখে নেবো। তোমাকে ভাবতে হবে না।

– ও তেনার নাম ইতি। ফেসবুকে এ জন্যই ফুপি ফুপি ডেকে পাগল। আমি খুঁজে পাইনা যে এই মেয়ে আপু না ডেকে ফুপি কেন ডাকে। ওকে চলবে। একটু সর্ট তবে মেধাবী, এজন্য ক্ষমা কর হল।

 

তিনমাসে আমার এবরশান হয়ে গেল। হিমোগ্লোবিন লেভেল লো ছিল। বেডরেস্ট দরকার ছিল, তা তো হয়ইনি। উল্টা খেতেও পারছিলাম না।

ল্যাব এইড হসপিটালের বেডে লম্বা হয়ে শুয়ে আছি। চোখ ভারী, পা ভারী। তিনদিন পর কিছুটা সুস্থ। চোখ খুলে দেখি কিউট একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে বেডের পাশে। আমার মনে হলো অনেক দিনের চেনা কেউ।

এরপর কয়েক বছর আমার বাচ্চা কনসিভই করলো না। আমাকে ডাঃ পরামর্শ দিলেন টেষ্ট টিউব ট্রাই করার। শুরু হলো যাত্রা, সেই হুমায়ুন রোড চষে একেবারে চ্যাপটা করে ফেললাম। অবশেষে এলো সেই দিনক্ষন!

 

নদী শুকিয়ে যাবার পরও নিজেকে যেমন অসভ্য সুন্দর করে পানির আশায় শুইয়ে রাখে। আমিও তেমনি করে নিজেকে ডাক্তারের মেশিনের তলায় শুইয়ে দিলাম। ডাঃ রাশিদা তার মেয়েসহ উপযুপরি পিরিয়ডের আগে, পিরিডের পরে, পিরিয়ড চলাকালীন সময় আমার মাতৃজটর খুব ঘাটলো। আমার সেরকম কোন সমস্যা নেই, শুধু হিমোগ্লোবিন লেভেল বাড়াতে হবে। তবুও টেষ্টটিউব পরপর দুবার ফেইল করলাম।

চর পরে গেলে নদী বোধকরি আর স্থায়ী হয়না। তেমনি আমার জীবনেও পরে গেল আচমকা চর। শারীরিক,  মানষিক দুইই বেহাল অবস্থা। কি করবো ভেবে পাই না। শুয়ে থাকলে থাকি, বসে থাকলে থাকি। খাওয়া ঘুম সব অসহ্য, প্রচন্ড ব্যাকপেইন। টেষ্টটিউব ট্রাই করার চেয়ে বাচ্চার মা হওয়াও কিছুটা বোধকরি সহজ। তখনও আমি ডাক্তারের ঘরে এবং আশাবাদী।

আকাশ পাতাল ভাবা এক সন্ধ্যায় তানজীম হাজির, সাথে ইতি। কান্নারা বোধহয় আমার গলায় এসে আটকে ছিল। আমি ওকে শক্ত করে ধরে চিতকার করে কেঁদে উঠলাম। সেও আমাকে শক্ত করে ধরে আছে।

– ফুপি কেঁদনা, তোমার মনে আছে ডাক্তার মজুমদার কি বলেছিলেন। আমিই তো তোমার ছেলে। কেন আপন করতে পারছো না। ও সম্পত্তি সব লিখে দিতে হবে এই ভয়ে? কিছুই দিতে হবেনা। শুধু তুমি কেঁদনা। আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো, আমি শেষ সময়ও তোমার পাশে থাকবো, সারজীবন থাকবো।

এ সময় ডাক্তার এলেন। সাহসী ছেলে আমার বলে বসলো- আমাকে ঠকানোর এতো শখ ডাক্তার। তাই বারবার আমার ভাগীদার নিয়ে আসার ট্রাই করছেন। তাকে বিদায় দিন আমি নিয়ে যাই।

ডাক্তার অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- আপনি কে?

– ও আল্লাহ জানেনই না। আমি তার ছেলে। সে আমার সাথে রাগ করে নিজের এ হাল বানাতে এসেছে।

 

আটবছর বয়সে তানজীম ভীষণ অসুস্থ হয়েছিল। আমি তখন রংপুরে। সারাক্ষণ হার্টবিট হয় জোরে জোরে।হার্টস্পেশালিস্ট ডাঃ মাহবুব তখন সপ্তাহে একদিন ঢাকা থেকে আসেন। তাকে পাওয়া গেল না। অগত্যা ডাঃ মজুমদারকে দেখানো হল।মজুমদারের লম্বা সিরিয়াল, পেতে পেতে রাত একটা। শীতের রাত। তানজীম আমার কোলের ভেতর ঢুকে বসে আছে। ডাক্তার মজুমদার অনেকক্ষন গলার পেছনে হাত দিয়ে দেখলেন। পেছনে অনেকগুলো সিস্ট। তিনি তো মহা ক্ষ্যাপা।

– এসব কেমন করে হলো। বাচ্চা মানুষ, শরীর হবে মসৃন। তা না, আপনি কি তাকে গলা টিপে ধরেন বা গলা ধাক্কা দেন। মা হয়েছেন এসব করতে।  কোন রেসপন্সিবিলিটি নেই।

আমাকে অনবরত বকা দেবার পরও আমি চুপ। এবার তানজীম বললো,

– ডাক্তার ওকে এতো বকছেন কেন? ওতো আমার মা না, ও আমার ফুপি।

– ও আচ্ছা। কিন্তু মা আর ফুপি আলাদা নয় বুঝলেন। বাচ্চা ভীষন অসুস্থ, এরপর থেকে তার প্রপার টেককেয়ার করবেন।

– জী, ডাক্তার। অবশ্যই।

বেশ সময় লেগেছিল তানজীমের ঠিক হতে। সে সময়টা আমিই তার পাশে ছিলাম। ভাবী তখন এ টি ও তে। বদলীর চাকুরী, তার উপায় ছিল না।

অতটুকু ছেলে মায়ের জন্য মোটেও খারাপ লাগা নেই। সকাল বিকেল দিব্বি ডিম পোচ দিয়ে আমার হাতে ভাত খায়। এক বাটি মুরগী সুপ ঢকঢক করে খেয়ে তিথীর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। তখন থেকে বড় মেয়ে বোধহয় তার পছন্দ।

– কিরে, তানজীম কি দ্যাখো।

– আপুটা কি সুন্দর দেখতে ! চোখগুলো সবচেয়ে সুন্দর। গালে আবার টোলও পড়ে।

– হুম, তোমার চোখও তো সুন্দর। তোমার গালেও টোল পড়ে।

তানজীম এল,এল,বি জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটি। তার গফ ঢাকা ভার্সিটি সাইকোলজি। সে আমার কাছেই থাকে। আমাদের সারাক্ষণ নানারকম ডিল চলতেই থাকে। আমার লেটেস্ট ল্যাপটপ দরকার, সে খোঁজ খবর দিয়ে কিনে দেবে। তার বদলে তার দুটো টি- শার্ট লাগবে।

আমার ফোনের পাসওয়ার্ড হারিয়ে গেছে। খুঁজে দিতে দুপ্লেট ফুচকা, সাথে তার গফকে ভার্সিটি থেকে বের করে আনতে হবে। কারন অনেকরাত ঘোরার জন্য আমি সাথে থাকলে রিস্ক কম।

আমি তার গফকে বাসায় খাওয়াবো তার জন্য সে সেদিনের বাজার করে দেবে, কাপড় ধুয়ে লন্ড্রি করে দেবে।

প্রচন্ড জ্বর আমার। জ্বরের ঘোরে কাতরাচ্ছি। সে বিছানার পাশে আমার প্রিয় ‘ মেমসাহেব ‘ হাতে।

ভার্সিটি থেকে ফিরে বিষন্ন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আমিকে খুঁজে বের করে জোর করে কফি বানিয়ে নিয়ে খাবে।

কথা দিয়েছে ব্যারিস্টারী শেষ করে আমায় নিয়ে জঙ্গলে বেড়াতে যাবে। আমি অবশ্যই পাতা দিয়ে বানানো পোশাক পরবো। কিন্তু কোন টাইপ পাতার পোশাক পরবো এটা এখনও ডিসাইড করতে পারছি না। আপনারা বলবেন প্লিজ!!

ছবি- প্রতিকী।

২০৫জন ২৭জন
0 Shares

১৯টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ