চুমুক দেয়া বিকেল বেলার কফি...
চুমুক দেয়া বিকেল বেলার কফি…

পৌলমী,

কফি মগ হাতে নিয়ে বারান্দায় বেড়ুলাম মেইল বক্সটা চেক করতে। আমি ভাবতে পারছিনা, তুই, তোর এত্তো বড়ো চিঠি!! অবাক হয়ে গেছি আবার নাও। তোর মধ্যে আবেগ আছে, তেমনি বাস্তবতাও। তবে তুই যে এভাবে চিঠি লিখবি আমাকে, এটুকু সত্যি ভাবিনি। তখন আমাদের সেল ফোনের কোনো নাম্বার ছিলোনা। ছোট্ট চিরকুট ছাড়া খবরের আদান-প্রদান আর তো কিছু ছিলো না। তবে কিলোমিটার যখন ট্রেনের উপর ভিত্তি করে দাঁড়ালো, তোর চিঠি আসতো। ছোট্ট, খামটা খুলে চিঠিটা পড়তে সময় লাগতো বেশী হলে এক মিনিট। এখনও মনে আছে তোর চিঠি,

“এই কবে আসবি? শোন তাড়াতাড়ি আয়। ছুটি হয়ে গেলেই থেকে যাসনা ওখানকার বন্ধুদের সাথে ঘোরাঘোরি করার জন্যে। ভালো থাকিস, ভালো আছি।”
নাহ এক মিনিট কই? কয়েক সেকেন্ড। আমি রাগ করে উত্তর দিতাম না। কি লিখবো? লেখার কিছু থাকলে তো! সেই তুই এতো বড়ো চিঠি! অনেকগুলো বছর পর মেইলবক্সে শুধু বিলের চিঠি না, দেশের গন্ধ মাখা গোটা গোটা অক্ষরে স্বজনের চিঠি। নিঃস্বার্থ, নির্ভেজাল আর আন্তরিক স্পর্শ লাগানো চিঠি। তোর এই চিঠি আমার কুমির চোখকে ছলছল করে দিয়েছে, এই দেখ!

আমি জানতাম আমার ঠিকানা তুই খুঁজে পাবি। আমি তো আড়ালে রাখিনি নিজেকে। কেউ কেউ নিজেকে আড়াল করে রাখতে ভালোবাসে। আসলে আমায় কেউ খোঁজেনা, চাইলেই পেয়ে যায়। তাই খুব ইচ্ছে করতো আমাকে কেউ খুঁজুক। অস্থির হয়ে ভাবুক। তোরা সবাই এতো ব্যস্ত থাকিস তোদের ঘর-বর-সন্তান নিয়ে। আমিও থাকি। কিন্তু এখানে বিদেশের মাটিতে ব্যস্ততার আবার রুটিন আছে। তাই সময় বের করে নেয়া যায়। আর সেই সময়টা আটকে ধরে এমনভাবে মনে হয় যেনো শ্বাস চলে যাচ্ছে। ঘরটায় আমরা চারজন মানুষ। মেয়েটা একটু ফ্রী হলে আমার পাশে এসে বসবে। ওর বন্ধুদের গল্প, মন খারাপ, এসব শেয়ার করে। প্রেম করছে আমার উষ্ণতা। জানিস কি যে ভালো লাগে দেখে। আমি জানি ও ভুল করবে না আমার মতো। কারণ আমি ওকে সেই ভুল করতে দেবোনা। একদিন এসে বলে আমায়, “মামনি আমি একটা কাজ করে ফেলেছি।” বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো! মুখটা দেখেই আমায় জড়িয়ে নিয়ে বলে যা আমি ভাবছি সেসব কিছু নয়। উপমকে হ্যা করে দিয়েছে। হুম উষ্ণতা যাকে ভালোবাসে ওই ছেলেটার নাম উপম। সুন্দর না নামটা? ওটাকে আমি এতো ভালো করে চিনি, অনেক ভালো রে ছেলেটা। ফাঁকিবাজ লাগেনা। তবু ভয়। শুধু প্রার্থনা করি, আমার উষ্ণতা যেনো কষ্ট না পায়। ওর দিকে চাইলে আমি আমায় দেখি। আমাদের দিনের গল্প করি। ও শোনে, তবে এও বলবে, একই কথা কেন বলি যখনই গল্প হয়? বিরক্তও হয়। রেগে গিয়ে বলি, “যা তুই, ভাগ।” মজা বলো ও ভাগ বলতে পারেনা, বলে, “বাগ।” কি হাসি একা একা এসব কথায়।  আর পুনশ্চ যেমন ভাবতাম, অমন হয়নি। শান্তই বলা চলে, তবে ওর বাবা থাকলে মনে হয়না। আমার সাথে কথা হয়না বললেই চলে। যদি আমি না বলি। আসলে ওর জগতটায় আমি নেই। কিন্তু মা তো আমি, যতোদিন না একেবারে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে আমাকে দৃষ্টিটুকু তো রাখতেই হবে। ওর বাবা ওকে কিছুই শেখায় না বিজ্ঞান আর অঙ্ক ছাড়া। আমি ওকে বলি মেয়েদের সম্মান করতে। সেদিন বললাম তোর সাথে কথা আছে, আমার কাছে এসে বোস। একটু বিরক্ত হলো। তাও বসলো। বললাম তোর একটা বোন আছে। তুই কি ওকে ভালোবাসিস? হ্যা বললো। কেউ যদি ওর সাথে বাজে এমন কিছু করে তুই কি করবি? মেনে নিবি? নাকি ছেড়ে দিবি? নাকি শাস্তি দিবি? বললো “মেরে ফেলবো”। বললাম কেন মারবি? বলে, “আমার বোন ও। ওর অসম্মান আমি নিতে পারবোনা।” এভাবেই যদি আরেকটি মেয়ের সাথে এমন কিছু হয়, তুই কি একই কাজ করবি? আর কথা বলেনা। তখন বললাম একটা কথা মনে রাখিস এই যে পেট এখানে তুই ছিলি। হাতটা দে। আমি কিন্তু প্রথমে একজন মেয়ে, তারপর মা। প্রতিটি মেয়ে একদিন মা হয়। মেয়েদের সম্মান দিতে হয়। অন্য কোনো ছেলে যদি মেয়েদের অসম্মান করে প্রতিবাদ করিস। মেয়েদেরকে কখনো ব্যবহার করিস না। ছেলেদের শারীরিক চাহিদা বেশী। তাদের দৃষ্টি কোথায় পড়ে তুই ভালো করে জানিস। তোদের মনে কি চলে সেও জানিস। অমন করে অন্য কোনো ছেলে তোর মা আর বোনকে নিয়ে ভাবলে যদি তোর খারাপ লাগে, অন্য মেয়েদেরও তো লাগবে। তাই না?——–সব কথা বেশ মনোযোগ দিয়েই শুনলো। তারপর হেসে বললাম প্রেম-ট্রেম একটা কর। এতো লেখাপড়া করিস, এরপর তো রোবট হয়ে যাবি। হাসলো, বললো ওসব ভালো লাগে না।

তুই এসব কথায় রাগ করবি। কেমন মা আমি ছেলে-মেয়েদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলি। দেখ আমি আমার বাবাকে কিচ্ছু লুকোইনি। শুধু গোপন করেছিলাম প্রেমটা। তার কারণ, কেমন একটা লজ্জ্বা। ওই গোপন করাটাই তো কাল হলো। ব্যবহার করলো আমার নিষ্পাপ আবেগকে। আমি এসব বলেছি উষ্ণতা আর পুনশ্চকে। আমায় বলেছে উষ্ণতা, ওসব কিছু না। এ জীবনে যা আমি পাচ্ছি, সেটাই আসল। মেয়েটা বলে আমায়,  কেন এমন শাস্তি দিচ্ছি নিজেকে ওর বাবার সাথে থেকে? আমিও ভাবি। বহুবার ভেবেছি, এমনকি ডিভোর্স স্যুট ফাইলও করেছি। কিন্তু নিজের স্বার্থ। যে আয় করি, তাতে চলা সম্ভব না। হ্যা রে আমি এখন পুরোপুরি স্বার্থপর একজন মানুষ। কিন্তু তোদের কাছে এখনও সেই তোর্ষা।

কিভাবে বুঝিস আমার মন অনেক ভালো? প্রথম কথা তো জানিসই সন্তান। আরেকটি খবর আছে, রাগ করবি। বকবি। কিন্তু সত্যিটুকু তবুও বলবো। প্রেমে পড়েছি। যেই-সেই প্রেম না, গভীর প্রেম। তবে এক তরফা। তাকে আমি দেখিনি, তার কন্ঠ শুনিনি। হুম প্লাটোনিক প্রেম। নিঃসঙ্গতার  গল্পে গল্পে কিভাবে জানি আটকে গেলাম। অথচ আমার জীবনের একটি কথাও ওকে বলিনি। আমার বর আমায় কিছু বলতো না, কিন্তু আমায় নিয়ে কি সব আজে-বাজে বলে বেড়াতো। যদিও এখনও বলে। তারপর জানিস স্পাইগিরি করতো। ভালোবাসার স্পাইগিরি আমি জানি, কেমন। তার মধ্যে সরাসরি জিজ্ঞাসা করার কোনো সৎসাহস নেই, কিন্তু চুরী করার সাহস আছে। যাক ঠিক এমন চলছিলো জীবন। জীবনের ঠিক এমন সময়েই ওর আগমন। গত পাঁচটি বছর থেকে আমি ভালো আছি। উষ্ণতা জানে। মেয়েটা বলেছে ভালোবাসা খারাপ না, কিন্তু যে ভালোবাসায় কারো স্বস্তির ভাঙ্গন হয় সেটা খারাপ। “মা তুমি স্বস্তি হয়ে থেকো।” অনেক ভাগ্যবতী আমি আমার মেয়েটা বোঝে আমাকে। জানিস মানুষটা বিবাহিত, আর সে আমায় বন্ধু ছাড়া কিছু ভাবেনা। স্ত্রী এবং সন্তানকে এতো ভালোবাসতে পারে কোনো পুরুষ আমি তা জানিনা রে পৌলমী। ভালোবেসে যাচ্ছি, কিচ্ছু পাবার আশায় না। কিন্তু আজকাল ওকে দেখতে ইচ্ছে করে চোখের সামনে, ওর কন্ঠ শুনতে ইচ্ছে করে। প্রথম ভেবেছিলাম এসব বুঝি মোহ। সময় কাটানোর জন্য গল্প। কিন্তু মোহ কতোদিন টিকে থাকে বল? কতোদিন হয়ে গেলো ওর সাথে কথা হয়না, তবুও তো মনের ভেতরেই থাকে। আর ফেরা হবেনা আমার। সে বুঝে গেছি। ভালোবেসে ফাঁকি আর মিথ্যে পেয়েছি। এখন সেসব তো পাচ্ছিনা, যা পাচ্ছি সত্যি। বুড়ো বয়সের প্রেম বড়ো শক্ত হয়, জানিস তো!

এবার পুলকের কথায় আসি। ও কোনোদিন কাউকে বলবে না। আমাকেও বলেনি। ওর বৌ মারাত্মক অসুস্থ। প্যারালাইসড। একটা মেয়ে হয়েছিলো, আমায় ছবিও পাঠিয়েছিলো। বৌ-মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলো, বিশাল এক্সিডেন্ট। অনেক টাকার প্রয়োজন ওর, কিন্তু নিতে চায়না। আমায় মেডিকেলের কাগজ-পত্র পাঠিয়েছিলো, এখানকার ডাক্তার দেখে বলেছিলো অপারেশন করালে ঠিক হবার সম্ভাবনা মোটামুটি আশি ভাগ। খরচ অনেক দেশে। চেষ্টা করেছিলো জোগাড় করতে, পারেনি। নেয়ওনি। আর এখন যা বয়স আর কিছু হবে না। তবুও আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। একটা খবর দিয়ে রাখি, অক্টোবরে দেশে আসছি। থাকতে দিবি তোর বাসায় নাকি হোটেল বুকিং দেবো? আমার ওই বাড়ীটায় যেতে মন চায়না রে, বাবা-মা যেখানে থাকেনা সেখানে কিছুই থাকেনা আর। পুলককে বলিস চোখের সামনে দাঁড়ালে পারবে আমায় ফেরাতে? ফোনে কিংবা চিঠিতে ফেরানো অনেক সহজ। ডিজিটাল বন্ধুত্ত্ব না আমাদের, একেবারে মারামারি করা বন্ধুত্ত্ব। আমি যখন আসবো, সেই তোর্ষা হয়ে আসবো। শুধু ভুল বুঝিসনা এই যে প্রেমে পড়েছি। পৌলমী আমি হেসে বাঁচতে চাই। মুখ গোমড়া করে, অভিনয়ের হাসি টেনে নেয়ার মতো জীবনে আমি আমায় কখনো থাকতে দেবোনা। এর জন্যে যদি সবাই আমায় খারাপ বলে বলুক। ভালোবাসার জন্য বয়স না, আবেগ চাই। আর সেই আবেগ আমি দিব্যকে দিয়ে ফেলেছি। ওর নাম দিব্য। পুলককে নিয়ে কষ্ট পাসনা, সব ঠিক হবে। মন থেকে চাওয়া কখনো অপূর্ণ রাখেনা সৃষ্টিকর্তা, দেরী হলেও পূর্ণ করেন।

আবেগ ভরা গল্প এবং স্পর্শ খামের ভেতর...
আবেগ ভরা গল্প এবং স্পর্শ খামের ভেতর…

তোদের তোর্ষা

বিকেল বেলায় দে-ছুট, ওই দূরে
কোথায় জানি ফুল ফুঁটেছে;
ম’ ম’ গন্ধ।
খেলাচ্ছলে গল্প বলা, বাঁশীর সুরে সুরে
আড্ডা তখন পুরোদমে জমছে
দুঃখ-দ্বার বন্ধ।
সাঁঝের তারা উঠলো হেসে, ঝিকিমিকি
আকাশ ওই সাজলো রঙে
হাওয়ায় লাগলো ছন্দ।
ও বন্ধু কোথায় তোরা, জীবনটাই ফাঁকি
যে আজ, মন শুধু জানে
চারদিকে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।

বিঃ দ্রঃ  তুই আমায় লিখিয়ে নিলি কবিতা। গত বিশ বছর লিখিনি আমি। ভুলেই গেছিলাম একসময় আমার লেখার নামেই আমায় চিনতো।

দরোজা দে খুলে...আমায় নে তুলে...চিঠি
দরোজা দে খুলে…আমায় নে তুলে…চিঠি

হ্যামিল্টন, কানাডা
২০ মে, ২০১৫ ইং।

তোর্ষা আমার বন্ধু, নদী এবং জল…একটি চিঠি : তৃতীয় এবং……

৪২২জন ৪২২জন
0 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ