আয় স্পর্শ করি মেঘের জল...

তারপর তোর আর ফোন নেই বহুদিন। পুলকের সাথে কথা হলো। বললো, “ফোন দেয়ার সময় কোথায়? প্রেমে পড়েছে যে।” আমি শুনে অবাক। তুই যে কিনা অনেক স্বচ্ছতর সম্পর্ক বিশ্বাস করিস, সে বিয়ে-বহির্ভূত প্রেম! বিশ্বাস না করেও পারিনা পুলকের কথা। পুলককে বললাম ধ্যৎ তুই না যে কি! পুলক আর আমি অনেক জোরে হাসলাম। তারপর জানিস পুলক আমার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বললো, “তুই যে কবে বুঝবি। সবকিছুকে সত্যি ভেবে নিস।”  পুলকটা না পাজির পা-ঝাড়া। অনেক ব্যস্ততা অফিস-ঘর-বর-সন্তান, তাও মাঝে-মধ্যে তোকে খুব মনে পড়ে। কতোগুলো বছর দেখা হয়না। তুই বলতি, “মনের মধ্যে রাখিস, মনে করিস না।” হয়না রে তোর্ষা। নিনাদ আমাকে সুজাতা বলে ডাকে। আমি নাকি সুখে আছি। এটা ঠিক অন্য সব মেয়েদের মতো ঘাত-প্রতিঘাত খাওয়া উথাল-পাথাল জীবনের মুখোমুখি এখন পর্যন্ত হইনি। ছেলে-মেয়ে দুটোও বড়ো হয়ে গেলো। মেয়ে মুগ্ধতা কলেজ শেষ করে এবারই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হলো। আর ছেলে পুনশ্চ এবার ইন্টারমিডিয়েট দেবে। আমার বর মনোজ্ঞ সেদিন অফিস থেকে এসেই বলে, “এই দেখি দেখি! মনে হচ্ছে তোমার মাথার একটা চুল পেকেছে!” জীবনে কখনো গিন্নী বলে ডাকেনা, সেদিন বলে, “ও আমার বুড়ী গিন্নী এবার তোকে আমি ছাড়া আর কেউ দেখার নেই।” দুষ্টুমী যখনই মাথায় চাপবে অমনি তুই করে বলে। কেমন লাগে বলতো! আর ছেলে-মেয়ের সামনে বেশী বেশী বলে, ওরা তো বাবার এসব কথায় হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যায়। নারে আসলেই ভালো আছি। আর আমার বন্ধুদের যেভাবে সম্মান দেয়, অনেক বড়ো পাওয়া। একদিন অনেক রাত হয়ে গেলো শুতে যেতে, অমনি ফোনের শব্দ। অমনি বলে, “যাও ফোনটা ধরো, কেন জানি মনে হচ্ছে তোর্ষার ফোন।” প্রায় অনেকগুলো বছর পর তোর ফোন। প্রথমেই বললি, “ইচ্ছে করে এমন সময় ফোন দিলাম। কি আদর হচ্ছিলো নাকি?” আমি রেগে গিয়ে বললাম, চুপ কর। কই ছিলি এতোদিন? ফোন দিয়েই এসব কথা। কি ভাবিস তুই নিজেকে? ক্লিওপেট্রা? নাকি মেরিলিন মনরো? তুই ওপাশে চুপ। শুনেই গেলি। এরপর বললি, “নিজেকে আমি জোয়ান অব আর্ক ভাবি।” আমি বললাম, “সে আর বলতে! জোয়ান অব আর্ককে তো মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিলো, তুই তো মারিস আমাদের। আবার বললি, “দেখ পৌলমী ক্লিওপেট্রা তো পুরুষ নাচিয়েছে, আমার আবার ওসব ছ্যাঁছড়া পুরুষদের নাচাতে ভালো লাগে না। জানিস তো সেটা। মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করেছে নেশা করে। আর আমি নেশা ধরাই। বুঝলি?” তোর সাথে কথায় কে পারে! বললাম এতোটা দিন কেন ফোন দিসনি? তোর পুরোনো নাম্বারে ফোন দিলাম কিন্তু কিছুতেই সংযোগ হলোনা। হাসতে হাসতে শেষ তুই। কি এমন বললাম হাসির বোকার মতো সেটাই ভাবতে লাগলাম ফোনটা কানে নিয়ে। “পৌলমী তুই বেশ গিন্নী হয়ে গেছিস। আমার উপরে অভিভাবকত্ত্ব ভালোই ফলালি দেখলাম। মনোজ্ঞ কোথায়?” বললাম ও শুয়েছে। তুই সেই প্রথম থেকেই ওকে মনোজ্ঞ বলেই ডেকে গেছিস। কিন্তু কোনোদিনই সে খারাপ ভাবেনি। প্রশ্নটা বেশ এড়িয়ে গেলি। “শোন একটা দারুণ খবর আছে। আমার পাগলীটা যেটা ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়ছে, ও মডেলিং-এ সুযোগ পেয়েছে। জানিস নিজে নিজে বাংলা গানও শিখছে। দেশে থাকলে আজ হয়তো ভালোই গাইতো।” ও মা, তাইইইইইইইই??? আমাদের উষ্ণতামনি এত্তো বড়ো হয়ে গেছে? আর মুহূর্ত ও কি করছে রে? “মুহূর্তকে গান শেখাতে চাইলাম, মনে আছে বলতি অনেক সুন্দর কন্ঠ ওর? ওর মধ্যে আসলে ওর বাবার ছায়া। অনেক ভালো লেখা-পড়ায়।” সাথে-সাথেই বললি, “আর আমার সন্তানদের বাবা দিব্যি আছে। একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা এভাবেই থাকবো কেউ কারো ক্ষতি করবো না। কেউ কাউকে বিরক্তও করবোনা। যার যার দায়িত্ত্ব পালন করবো। বিশ্বাস কর, ভালো আছি। অন্তত ঝগড়া আর হয়না।” আচ্ছা তোর্ষা এভাবে কি জীবন চলে? প্রশ্নটা তুই বুঝে ফেললি। বললি, “জানিস একটা ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তুই এখন যে অভিভাবকত্ত্ব দেখাচ্ছিস মা মা লাগছে। ভয় পাচ্ছি বলতে।” কি হাসি পেলো। বুঝতে পারছিলাম তুই সেই আমাদের আনন্দবতী তোর্ষা এখনও একই আছিস। বললাম হয়েছে থাম, বলে ফেল। “বর ঘুমোবে না, যা পরে আবার ফোন দেবো। উষ্ণতার খবরটা এখুনি জানলাম, তাই তোকে না জানিয়ে পারলাম না। ওটাকে প্রথম কে কোলে নিয়েছিলো, মনে আছে তো”—-বলেই ফোনটা রেখে দিলি। যে নাম্বার উঠলো, সেটায় কল দিলাম। পুলক বললো ওটা নাকি ফোনকার্ডের নাম্বার। তবে ভালো লাগছিলো, নদীর মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সেই তোর্ষাকে পেয়ে। পুলককে বললাম, ও বললো তুই নাকি প্রেমে পড়েছিস। এতো ফাজলামী করতে পারে ওটা।

এই তোর মনে আছে সেই বাস ড্রাইভারের কথা? তোর্ষা জানিস সেই বাস ড্রাইভারের সাথে দেখা হলো একদিন, বুড়িয়ে গেছে। বহুদিন হয়ে গেছে উনি আর বাস চালান না। ঠিক ওই রুটের বাসটাই সেই কন্ডাকটর চালায়। অবাক হয়ে গেছি দেখে তাকে। আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি। কিন্তু আমায় ঠিকই চিনে ফেললো।  জিজ্ঞাসা করলো, “আমাদের হাসি আপা কেমন আছেন?” যখন বললাম, শুনে খুব খুশী। এরপর বলে, “আপা অখন সেই আনন্দ নাই আর।” কথা বলতে পারিনি আর।

এরপর জানিসই তো, আমাদের ডাক্তার নিনাদ আর ইচ্ছা, ওদের মেয়েট ইনিনা সেও ডাক্তারীতে সুযোগ পেয়েছে। দুজনের প্রথম অক্ষর দিয়ে নামটা তুই-ই তো রেখেছিলি! আর আমাদের হলিউডি ফিগারের অদ্রিতা যা মোটু হয়েছে, কে বলবে ওর কাছে মডেলিং-এর অফার এসেছিলো! ওর বরকে তো এখনও ব্যাচেলর বলে চালিয়ে দেয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের তূর্য, সরকারের গোলামিতে ব্যস্ত। মানে রাজনীতি করে।তবে ও প্যাঁচকানি রাজনীতিক হয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হয়না। ভেতর-বাইরের মন যখন এক থাকে সে হয় পরাজিত একজন মানুষ। সত্যি-মিথ্যে না সাজিয়ে একটা মানুষ জীবন কাটিয়ে দিতে পারেনা। পুরোপুরি সৎ কোথাও নেই। কারুর মধ্যেই নেই। তূর্য আজোও বিয়ে করেনি। ওর প্রেম আজ অন্য ঘরের ঘরণী হয়ে সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ত। আর পুলকের কথা তো জানিসই। সেই একই।ও-ই আমায় তোর খবর দেয়। অথচ তোর সাথে নাকি অনেক বছরেও কথা নেই, দেখা নেই। এই মনে আছে তোর,পুলককে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমাদের আড্ডায়, তুই কি তোর্ষার প্রেমে পড়েছিস? তখন তুই একেবারে গম্ভীর হয়ে বললি, “কি বলিস? সত্যি?”  পুলক তার দ্বিগুণ গম্ভীর হয়ে বললো, “এতো দেরীতে বুঝলি? তোরা বন্ধুর জাতই না।” সবাই এমনভাবে হাসতে লাগলি আমি তো বোকাই বনে গেলাম। আসলে কি জানিস প্রেমে স্বার্থপরতার জন্ম হয়, কিন্তু বন্ধুত্ত্বে ভাগাভাগির কোনো হিসেব-নিকেশ থাকেনা। তাইতো সত্যিকারের বন্ধু কখনোই হারায়না। পাশে থেকে ছায়া দেয় বৃক্ষর মতো। আর তাই হয়তো পুলকের সাথে সবার যোগাযোগ আছে। খবর জানে ও। অথচ অনেক ব্যস্ত সে থাকে। ঘরে-বাইরে। একটি ব্যাপারে অবাক হই ওর বাসায় কখনো যেতে বলেনা। একদিন ফোন দিয়ে বললাম এই তুই কইরে? বললো ও নাকি বাসায়। বললাম বাসার নাম্বার বল তো, তোর এলাকায় এসেছি। সাথে সাথে বললো এখুনি নাকি বেড়িয়ে যাবে। বিশ্বাস করেছিলামও। কিন্তু জানিস কেন পুলক এড়ায়? সে তার কষ্ট-যন্ত্রণা কাউকে দিতে চায়না। নাহ তোকে বলবোনা আমি। কেন বলবো সব? ঠিকানা কিভাবে পেয়েছি সেও জানাবো না। তুই স্বার্থপর হতে পারলে আমি কেন হতে পারবোনা? তোর্ষা কেন রে এতো চেপে রাখা কষ্ট? জানালে কি আরোও বেড়ে যায়? একটুও কি ক্ষতে প্রলেপ পড়েনা? কতো কাছের ছিলাম আমরা? মাথা ব্যথায় ভ্রূ কুঁচকে থাকতি। যেই চুলে হাত বুলিয়ে দিতে যেতাম, অমনি চিৎকার! চুলে হাত দেয়া একটুকুও পছন্দ করতি না তুই। ওইটুকুন চুল তাও কতো ভাব! ঠিক বুঝিনা পার্লারে গিয়ে কিভাবে চুল কাটাতি। এরপর একটু খারাপ লাগলে থুতনি চেপে বসার বৃথা চেষ্টা করতি। তুই তো চুপ করে বসে থাকার মতো মেয়ে না। আড্ডার মধ্যে সুযোগের অপেক্ষায় থাকতাম, কখন আসবে সেই সময় যখন আমি কথা বলতে পারবো। কিন্তু সত্যি তোর ওই পাগলামোগুলো এতো বেশী এনজয় করতাম আমরা সবাই। আমাদের ডিপার্টমেন্টের আরমান আলী স্যার তোকে মোটেও পছন্দ করতো না। প্রথম কথা তুই স্যারকে অনেক প্রশ্ন করতি, যার উত্তর উনার জানাই ছিলোনা। আর দ্বিতীয় হলো তোর হাসি স্যার খুবই অপছন্দ ছিলো উনার। আমরা অবাক হতাম যে হাসির জন্য সবাই তোকে ভালোবাসতো। যে হাসির জন্য প্রায় সব ছেলেরাই প্রেমে পড়তো। সেই হাসি স্যার কেন পছন্দ করতেন না? আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে এই আরমান আলী স্যারই আমাদের বিদায়ী সম্বর্ধনার দিন তোর কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, “এমন পাগলামী সবাই নিতে পারেনা, বুঝে বুঝে তোমার হাসিটুকু দিও মেয়ে।” এই স্যারের কাছে কোনো ছাত্র-ছাত্রী প্রিয় ছিলো কিনা জানিনা। কারণ উনি কারো নাম কখনো গল্পচ্ছ্বলেও বলেননি। তুই মেয়েদের কমন রুমে এক ক্যারম বোর্ড খেলা ছাড়া কখনোই থাকিসনি। সায়েন্স ল্যাবরেটরীর সামনের বারান্দায় নয়তো পুকুরের পাড়ে আড্ডা দিতি প্রিয় বন্ধুদের সাথে। একদিন প্রিন্সিপাল স্যার এসে বললেন, “তোর্ষা মেয়েদের কমন রুমে যাও।” তুই খুব সুন্দর করে বললি, “স্যার কমন রুমে গিয়ে কি করবো? দুটো মাত্র ক্যারম বোর্ড। সবাইকেই তো ভাগে ভাগে খেলতে দিতে হয়!” স্যার রেগে গিয়ে বললেন, “মেয়েরা একটা পিরিয়ড শেষের পর কমন রুমেই যেতে হয়।” তুই এবার বললি, “গিয়ে কি সমালোচনা করবো স্যার? ওখানে কি গল্প হয় জানেন আপনি?” স্যার তো কঢ়া চোখে চেয়ে—“স্যার ওখানে কি সব নিয়ে কথা হয় শুনুন তবে। তারপর আমায় বলবেন আমি যা করছি তা কি খারাপ? ওখানে আলোচনা হয়, কোন ছেলে কাকে কি প্রেমপত্র দিলো! কোন মেয়ে কোন ছেলের সাথে প্রেম করছে! কোন মেয়ে কেমন ভাবে সেজে এসেছে! আর আমি এখানে বন্ধুদের সাথে বসে অনেক ধরণের আড্ডা দেই। ভূগোল থেকে বিজ্ঞান। রাজনীতি থেকে সাহিত্য। আর প্রেম থেকে ফ্যাশন।” স্যার রেগে আবারও বললেন, “তুমি কি এ কলেজে পড়তে চাও?” তুই বললি, “স্যার এই কলেজে একদিন এভাবে আড্ডা না, জুটিতে জুটিতে বসে প্রেম হবে। তখন কি করবেন? আমি আজ যুক্তি দিচ্ছি, সেদিন হুমকি পাবেন। আমরা থাকবোনা।” স্যার রেগেমেগে একেবারে উনার রুমে। তুইও চলে এলি, আমরাও।

তোর্ষা অনেক লিখে ফেললাম। চিঠিটা পড়তে গিয়ে বিরক্ত না এলেও তুই বলবি, “কতোদিনে এ চিঠি লিখেছি!” আসলে বেশীদিন থেকে না। আমাদের বয়স এখন বেয়াল্লিশ, তাই না? সময় কই অতো বসে লেখার? মুগ্ধতা আর পুনশ্চ ওরা হলে ওদের স্টাডির জন্য। বরটা কনফারেন্সে। কাজ শেষ করে বাড়ী ফিরে এসে সেভাবে কোনো ব্যস্ততা নেই। চিঠিটা পেয়ে প্লিজ একটা ফোন দিস। কেমন আছিস, কোথায় আছিস। একটা কথা কি জানিস তোর্ষা যারা অপেক্ষায় থাকে, তাদের মতো কষ্ট কেউ পায়না। আর যাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে কোনো মানুষ তারা অতোটুকু বোঝেনা। এতো বেশী দেরী করিস না বুঝতে, যখন তোর পৌলমীর সময় থাকবে না সেভাবে। বুঝলি? এটুকু জানি তোর ভালো থাকার সময় চলছে এখন। কেন জানি মন বলছে।

তোর পৌলমী

পাহাড়ী নদীর বুকে পাথরের রাজত্ত্ব...
পাহাড়ী নদীর বুকে পাথরের রাজত্ত্ব…

 

শেষ কি হয় অতো সহজে
সহজ-সরল গল্প?
থেকে যায় কতো কিছু
জটিল যে জীবন-অঙ্ক।
তবুও সেই সরলতা
আজীবনই থাকে
বোঝে কেবল সে বন্ধুরাই
যারা ভালোবাসে।

চলবে—

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৮ মে, ২০১৫ ইং।

তোর্ষা আমার বন্ধু, নদী এবং জল…একটি চিঠি : দ্বিতীয়াংশ

৪১৯জন ৪১৯জন
0 Shares

২৮টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

সাম্প্রতিক মন্তব্যসমূহ

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ