একঃ 
 
বৃষ্টিস্নাত সুন্দর সন্ধ্যায় কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে এলাকার টঙের দোকানটায় বসে সিগারেট খাচ্ছিলাম। এমন আবহাওয়ায় সিগারেটের স্বাদ যেন একটু বেশি বেড়ে যায়! মন না চাইতেও উদাস হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোর কথা !
 
হঠাৎ করেই ফোনটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল …
উদাসীনতার ভাবে ছেদ পড়ায় কিছুটা বিরক্ত হতে হয়। কপাল কুঁচকে ফোনটা পকেট থেকে বের করে নাম্বারটা দেখতেই থমকে গেলাম … !
নাম্বারটা এখন আর মোবাইলে সেভ করা নেই কিন্তু এই নাম্বার জীবনে কোনদিন আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব না। ভুলবই বা কিভাবে !
কতশত নির্ঘুম রাত পার হয়ে গেছে এই নাম্বারধারী মানুষটার সাথে কথা বলতে বলতে, তার কোন হিসাব জানা নেই।
 
কত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মানুষটার সাথে! আফসোস! মানুষটার সাথে আর সম্পর্ক নেই আমার। প্রায় দেড় বছর আগে পরিসমাপ্ত হয়েছে আমাদের ৩ বছরের সম্পর্কের। সেজন্য তার নাম্বারটাও ডিলেট করে দিয়েছিলাম ফোন থেকে কিন্তু মন থেকে কি করা যায় এত সহজে !
কিন্তু এতদিন পরে কি এমন হল যে সে আমাকে ফোন দিবে !
 
ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে দুরদুর বুকে ফোনটা রিসিভ করলাম …
“ হ্যালো! ” ‍
– জ্বি আসসালামু আলাইকুম! আমি মতিঝিল থানার এসআই শহীদুর রহমান বলছি।
অবাক হলাম তার নাম্বার থেকে এমন অপরিচিত পুরুষের কণ্ঠ শুনে …
সামলে নিয়ে বললাম,
“ জ্বি বলেন। আমাকে কি দরকার ? ”
– আপনি কি আব্দুল্লাহ ?
“ জ্বি। ”
– এই নাম্বারধারী ব্যক্তিকে আপনি চিনেন ? এটা কার নাম্বার ?
প্রশ্নটায় থমকে গেলাম। আসলেই কি আমি এই ব্যক্তিকে চিনি!
আমার নীরবতাটা ওপাশের এসআই সাহেবের সহ্য হল না। কিছুটা অধৈর্য্য হয়েই পুনরায় একই কথা বললেন …
“ হ্যাঁ চিনি। মেয়েটার নাম তিথী। ” এবার ইতস্তত জবাব দিলাম।
– কিভাবে চিনেন ?
“ ভার্সিটিতে একই সাথে পড়তাম, তাই চিনি। “
– ওনার ফ্যামিলির কারো কন্টাক্ট নাম্বার দিতে পারবেন?
“ না। কেন ? ”
– দেখুন আজ বিকালে ওনার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে।
“ কিইইই !!!! ”
এবার ভয়ানকভাবে চমকে গেলাম আমি!
 
– জ্বি, এই মূহুর্তে উনি ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে আছেন।
“ আচ্ছা আমি আসছি … ”
কিছু না ভেবেই আমি কথাটা বলে ফোনটা কেটে দিলাম …
 
ফোন রেখে দোকানের সামনে পার্ক করে রাখা বাইকটায় স্টার্ট দিলাম। ঢাকা মেডিকেল আমার বাসা থেকে বেশি দূরে না …
 
যেতে যেতে মনে পড়ে যাচ্ছে পুরানো দিনের কথাগুলো …
তিথী আর আমি একই সাথে ভর্তি হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম এক বছর বন্ধুত্ব তারপর কি করে যেন প্রেমের সম্পর্কে চলে গেল। অন্য দশটা সাধারণ সম্পর্কের মতই চলছিল আমাদের।
 
সমস্যাটা হয় যখন আমরা পাশ করে বের হব তখন। চাকরির বাজার সে সময় খুবই খারাপ। পরিকল্পনা ছিল বিসিএস দেওয়ার। আর ওর বাসায় বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল, আর আমার তখন বিয়ের দিকে যাওয়ার কোন রাস্তাই ছিল না। ফলাফল ছিল সম্পর্কচ্ছেদ। এখানের ঘটনাটাও খুবই সাধারণ ছিল।
 
কিন্তু এই সাধারণ ঘটনাগুলাও আমার জন্য অসাধারণ ছিল। কতশত রাত কাটিয়ে দিয়েছি তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে, হুট করে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা মনের মধ্যে কেমন জানি ভয়াবহ শূন্যতার সৃষ্টি করে …
কোন কারণ না থাকলেও মন খারাপ হয়ে যায় !
শুনেছিলাম তার বিয়ে হয়ে গেছে …
এখনো তাহলে আমার নাম্বার তার মোবাইলে রয়ে গেছে !
এইআই সম্ভবত সেজন্যই আমাকে ফোন দিয়েছে। কারণ আমার নামের বৈশিষ্ট্যের কারণে সাধারণত সবার কন্টাক্ট লিস্টের উপরেই থাকে।
 
আচ্ছা কি এমন দুর্ঘটনা হতে পারে! এসআইয়ের গলার স্বর ভাল ঠেকেনি। পুলিশের হাবভাব বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হয় না। নিশ্চয়ই কিছু আছে যা আমাকে ফোনে বলেননি।
 
আর একটা ব্যাপারও অদ্ভুত ঠেকলো। লোকটা মতিঝিল থানার এসআই। আর তিথী আছে ঢামেকের জরুরী বিভাগে। তারমানে দুর্ঘটনা ঘটেছে মতিঝিল থানার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার ভেতর। ওইদিকে তো তিথীর যাওয়ার কথা না!
সম্ভবত তার শ্বশুর বাড়ি হবে।
 
কিন্তু আমি কেন যাচ্ছি হাসপাতালে !
কর্তব্য রক্ষার তাগিদে নাকি প্রাক্তন প্রেমিকার মায়ার টানে !
সম্ভবত দুটোর জন্যই ……
দুইঃ 
১৫ মিনিটেই ঢামেকে পৌঁছে গেলাম। জরুরি বিভাগে যেতেই বসে থাকা পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া লোকটাকে চোখে পড়ল। কাঁধের র‍্যাংক আর বুকের নেমপ্লেট দেখে বুঝে গেলাম এই লোকই আমাকে তিথীর নাম্বার থেকে ফোন করেছিল।
কাছে গিয়ে বললাম, “ এক্সকিউজ মি, অফিসার! আপনি কি এসআই শহীদুল? ”
– জ্বি আমিই শহীদুল।
মুখ তুলে তাকালো লোকটা। চোখ দুটো খুবই ভয়ংকর।
“ আমি আব্দুল্লাহ। তিথীর মোবাইল থেকে আপনি আমাকেই ফোন করেছিলেন। ” 
– সেটাই তো দেখতে পাচ্ছি।
বলেই ফোনটা বের করলো লোকটা। একটা মেয়ের ছবি স্ক্রিনে এনে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ ইনিই কি আপনার তিথী ? ”
রক্তাক্ত শরীর, দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারছি মেয়েটাকে গুলি করা হয়েছিল। প্রচণ্ড রকমের ধাক্কা খেলাম আমি। তিথীকে কেউ গুলি করে হত্যার চেষ্টা করবে ! অসম্ভব!
 
“ কি হলো, কিছু বলছেন না কেন? ”
এসআইয়ের কথায় বাস্তবে ফিরে আসলাম। ধাক্কা সামলে নিয়ে বললাম,
“ হ্যাঁ ওই তিথী! আমার ভার্সিটির ক্লাসমেট। ”
– আজকে দুপুরের দিকে ওনাকে মতিঝিল সরকারি কলোনী কাঁচাবাজারের ওখানে কেউ গুলি করেছিল। ওনার সাথে কারো শত্রুতা ছিল, জানেন ?
 
থমকে গেলাম। ভার্সিটিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় মেয়ে ছিল তিথী। এমন কিছু ছিল না যাতে সে অংশ নিত না। পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার মেয়ে। সবার সাথে অনেক মিশতো। আমি ছিলাম পুরাই বিপরীত। কেউ ১০টা কথা বললে আমি উত্তর দিতাম ১টা কথার। ওর সাথে আমার সম্পর্কটা শুরুই হয়েছিল ঝগড়া দিয়ে। ভার্সিটি তে থাকতেও এমন চুপচাপ তাও আবার ছেলেমানুষ হয়ে, ব্যাপারটা সে মেনে নিতে পারত না কোনভাবেই।
 
“ কি হল? চুও করে আছেন যে! ”
চিন্তার মধ্যে আবারও ব্যাঘাত ঘটালো উর্দিধারী লোকটা। কোনভাবেই মনোনিবেশ করতে পারছি না বর্তমানে। সোনালি অতীত বারবার পিছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে।
– নাহ। শত্রুতা ছিল বলে কোনদিন শুনি নাই। সবার সাথে তার ভাল বন্ধুত্ব ছিল। সবসময়ই সবাইকে সাধ্যমত সাহায্য করত। কারো কোন ক্ষতি করেছে বলে শুনি নাই।
“ ইন্টারেস্টিং! ” বলে মাথা দোলাল লোকটা।
আবার কিছুটা আনমনা হয়ে গেলাম আমি। তিথীকে প্রথম প্রথম আমার মোটেও ভাল লাগত না। কেমন জানি মেয়েটা! সারাদিন লাফালাফি, হরিণের মত তিড়িং বিড়িং। সবচেয়ে রাগ লাগতো তার খিলখিলে হাসিটা। আবার আমি কেন চুপচাপ সেটাও তার সমস্যা। তার উপর রাগ থাকার যথেষ্ঠ কারণ ছিল আমার। পরে হুট করেই তাকে ভাল লেগে যায় অবশ্য, সেটার পিছনে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন কিছু ঘটনা ছিল …
খুক খুক করে কেশে উঠলো এসআই শহীদুল। বুঝলাম আবার কথা বলবে লোকটা। আরো একবারের জন্য ভাবনার জগত ছেড়ে বাস্তবে আসলাম।
 
আমাকে তার দিকে তাকাতে দেখেই বলল, “ ওনার ফ্যামিলির সাথে যোগাযোগ করার কোন অপশন জানা আছে? ”
– নাহ। ওর মোবাইলে তো থাকার কথা। চেক করেননি?
“ খুঁজে দেখেছি। ভুতুড়ে ব্যাপার হচ্ছে কোন নাম্বার সেভ করা ছিল না। ”
– তাহলে আমার নাম আর নাম্বার কোথা থেকে পেলেন?
“ ওনার ব্যাগে একটা ছোট্ট কাগজে পেয়েছি। ”
 
আবারো অবাক হলাম। শুধু অবাক না, ভীষণ রকমের অবাক।
আমার নাম্বার কেন ও কাগজে লিখে রাখবে! পুরা ঘটনাটাই কেমন বিদঘুটে জানি। কোন কিছুর সাথে কিছুই মিলছে না।
“ কথা হচ্ছে, আপনার নাম্বারই কেন উনি কাগজে লিখে রেখেছিলেন? ”
– কোন ধারণাই নেই এ ব্যাপারে।
“ পুরা ব্যাপারটাই গড়বড়ে। উনি কি এরকম ভেজালের মানুষ ছিল? ”
– না। মোটেও না। খুবই সহজ সরল মিশুক একটা মেয়ে ছিল। এমন মেয়েকে কেউ কেন গুলি করবে সেটা আমিও বুঝে উঠতে পারছি না।
“ উনি মনে হয় আপনার অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল? ”
– ক্লাসমেট হিসেবে যতটুকু থাকা দরকার ততটাই ছিল। এরবেশি কিছু না।
সত্যটা নিতান্ত ব্যক্তিগত বলে প্রকাশ পেতে দিলাম না। পেশাদারি অভিজ্ঞতা থেকেই মনে হয়েছে এ সত্যটুকু আপাতত এসআই সাহেবের না জানলেও চলবে।
 
“ আচ্ছা এত কথা বলে ফেললাম আপনার সাথে কিন্তু আপনি কি করেন সেটাই তো জানা হল না। শরীর তো মাশাল্লাহ তামিল নায়কদের মত! ”
রসিকতা করে পরিবেশটা হালকা করার চেষ্টা করল লোকটা।
প্রথম সাক্ষাতেই আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে ফেলেছে। এ পর্যন্ত একটা ফালতু কথাও বলেনি। এই সার্ভিসে আছে প্রায় ১৬ বছর। স্পষ্ট বুঝতে পারছি মারাত্মক ঝানু একজন লোক!
 
নিজের উপরেও কিছুটা রাগ হল আমার। এ ধরণের পরিস্থিতিতে আমি এতটাই হতভম্ব হয়ে গেছি যে নিজের পরিচয় টা পর্যন্ত দিতে মনে ছিল না। অথচ এটাই প্রথমে দেওয়া উচিত ছিল! গলা একটু ঝেড়ে নিলাম। সিনিয়র অফিসারদের পরিচয় একটু ভারিক্কি ভাবেই দিতে হয় …
“ আমি এএসপি আব্দুল্লাহ, সহকারী পরিচালক, অ্যান্টি ড্রাগস অ্যান্ড স্মাগলার ইউনিট (এডিএসইউ), বাংলাদেশ পুলিশ। ”
চলবে …    
৪০১জন ৪০১জন
0 Shares

১৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ