তৃপ্ত (৪র্থ পর্ব- প্রথমাংশ)

পাগলা জাঈদ ৯ অক্টোবর ২০১৩, বুধবার, ০৫:৩৯:১৫অপরাহ্ন বিবিধ ৫ মন্তব্য

কমলাপুর প্লাটফর্মে নেমেই বরাবরের মত এবার ও তৃপ্ত’র চোখে পরল হকারদের আহাজারি, অনেকের চোখেই এরা ধোঁকাবাজ, কিন্তু কেন এরা ধোঁকার আশ্রয় নেয়? কেউ খতিয়ে দেখেনা । একটা ৬ বছর বয়সী হকার কেন একটা গোলাপ ৩ টাকার বদলে ৫ টাকা বেচতে চায় ? একটা বৃদ্ধ ভিক্ষুক কেন আট আনা নিতে না চেয়ে ২ টাকার নোট টি বেশি পছন্দ করে ? আমাদের কাছ থেকে করুণা আশা করাটাই যেন মস্ত অপরাধ। আরে একটা ফুল ই তো কিনবো, হোকনা তা ২ টাকা বেশিতে, তবু তো ফুল। কিন্তু না, আমরা দেখবো না ফুলের পবিত্রতা, ভাববো না পবিত্রতার কোন মূল্য নেই, আমরা শুধু ভাববো “আরে ! ছেলেটা যে আমায় ঠকিয়ে দু’ টাকা বেশি নিয়ে নিল” কেউ কি ভাবেনি যে, তার ঘরে একটা পঙ্গু বাবা থাকতে পারে, অথবা এমন ও হতে পারে তার মা অসুস্থ, বিঁধায় তার বাবা আরেকটি বিয়ে করে এই ছয় বছর বয়সী ছেলের উপর একটি মা আর একটি ১ বছর বয়সী বোনের ভার দিয়ে গেছে। সে যদি এখন ফুলটি দু’ টাকা বেশি দামে না বেঁচে তবে যে তার মা কে আজ ও উপোস করতে হবে, অথবা বোন কে রাতে ফিডারে দেবার জন্যে ভাতের মার টুকুও জুটবে না। অথবা ঐ বৃদ্ধ ভিক্ষুকের, সে জানে একদিনে তাকে ২০ জনের বেশি লোকে ভিক্ষা দেবেনা, বিশ জন যদি তাকে দুই টাকা করে ভিক্ষা দেয় তবে সাকুল্যে হবে চল্লিশ টাকা, এক কেজি চাল আর এক ছটাক ডাল কিনেই সে টাকা শেষ। আজ তো আর শুক্রবার নয়, বেশি টাকা পাবার ভাবনাও তাই বাদ। তৃপ্ত জানেনা কেন এই অসভ্যতা, জানেনা সৃষ্টিকর্তার কেন এই বিরূপ মনভাব, এভাবেই চলে নগর জীবন, নিজের চেয়ে নিচু জাতকে এভাবেই আমরা ঘৃণা করি, তা কতটা সে নিচু বলে আর কতটা আমাদের উপরওয়ালার ঝাল নিচুদের প্রতি ঝেড়ে দিতে, তা তৃপ্ত’র জানা নেই।

অসম্ভব সুন্দরী এক তরুণীর অন্যকে আকৃষ্ট করার হরেক রকম কসরত দেখতে দেখতে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে একটা সিগারেটে আগুন বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তৃপ্ত, হঠাৎ সেই সুন্দরীর ই ডাক পরলো,
-এক্সকিউজ মি মিষ্টার, আপনি কি বলতে পারেন ক’টা বাজে ?
তৃপ্ত তার সভাব সুলভ উদাস কন্ঠে জবাব দিল,
-জি না ম্যাম, আমি ঘড়ি পরি না।
-তাতে কি মোবাইল তো আছে, সেটা তে টাইম নেই ?
-মোবাইল তো থাকে জরুরী ফোন আসার জন্যে তাতে টাইম থাকবে কেন ?
-ওহ, ঠিক আছে, বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত।
-কি অদ্ভুত, এইটুক কথায় তো দেশের প্রধাণ মন্ত্রী ও বিরক্ত হবেন না, আমি কেন বিরক্ত হব ? এতটা বিনয়ী আপনার মত তন্বীর না হলেও চলবে মিস, বিদায়, ভাল থাকবেন।
তৃপ্ত’র অবহেলা টুকু (আসলে অবহেলা নয়, তৃপ্ত এমন ই) বোধ হয় ঐ সুন্দরীর খুব লেগেছিল, তাই সে পিছু নিল, বলে উঠলো,
-আপনি দেখি যাচ্ছে তাই, নিজেকে এত স্মার্ট কেন ভাবেন ? কি ভেবেছেন ? মেয়েদের বাঁকা উত্তর দিলেই কি হিরো হওয়া যায় ? ট্রেনেও আপনি আমার পাশে বসেছিলেন অথচ একবার ভুল করেও আমার দিকে তাকান নি, সারাক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, ২/৩ বার উঠলেন তাও শুধু এক্সকিউজ মি বলেই চলে গেলেন, কিসের এত অহংকার আপনার ?
তৃপ্ত এই ব্যাপারটার জন্যে প্রস্তুত ছিল না, মেয়েদের সাথেও ওর তেমন সখ্য নেই, যাও ২/৩ জন মেয়ে বন্ধু আছে, ওদের কে ও বন্ধু ই ভাবে, কখনো ওদের সাথে পিয়াল বা সফিকের কোন পার্থক্য খুঁজে পায়নি। ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, “মেয়ে আর ছেলেদের পার্থক্য মনে হয় একটাই, মেয়েদের বুকটা উঁচু, তাই তাদের মমতা অসীম, আর ছেলেদের বুকটা নিচু, তাই তারা একটু বাস্তববাদী” , তার ওপর এই মেয়ে ওর পাশে বসেই এসেছে তা তৃপ্ত আসলেই খেয়াল করেনি, বৃষ্টির পর আসলে প্রকৃতি এত বেসি সুন্দর ছিল যে অন্য দিকে তাকানোর সময় ই পায়নি, নিজেকে এখন অপরাধী মনে হচ্ছে, অন্তত সৌজন্যতা দেখান উচিত ছিল ওর । হুট করে ও মেয়েটার কাছে গিয়ে হাতদুটো উঁচু করে দেখিয়ে বললো,
-দেখুন আমি ঘড়ি পরি না, আর এই দেখুন মোবাইল, এইখানে টাইম ডিসপ্লে করার অপশন টাই নেই, প্লিজ কিছু মনে করবেন না, আপনি মেয়ে মানুষ , আমি নারীদের শ্রদ্ধা করি, মেয়েদের সাথে আমি খুব কম কথা বলি্‌, তাই আসলে জানা নেই কি বললে তারা মনঃক্ষুণ্ণ হয়, আর ট্রেনে আমি একটু অন্যমনস্ক থাকায় আপনাকে লক্ষ করিনি, ভুল হয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, ভাল থাকবেন, বিদায়।
বলেই ও সোজা হাটা শুরু করলো, পিয়াল একবার বলেছিল “মেয়েরা ভয়ংকর, কিভাবে তোকে ফাঁদে ফেলবে বুঝতেই পারবি না, কখনো তা হবে ভালবাসার ফাঁদ, কখনো হবে শপিং এর ক্রেডিট কার্ড, সাবধান বন্ধু”।
এবার কিন্তু মেয়েটার অবাক হবার পালা, সুন্দরী হওয়াতে অনেকেই তার আগে পিছে ঘুড়ে, অচেনা অনেকেই সাহায্যের জন্যে পাগল হয়ে ওঠে, কিন্তু এই ছেলেটা কেমন যেন। এ’কি অহংকারী ? নাকি ব্যাথায় কাতর অচেনা পথিক ? যার দুঃখ বিধাতা ছাড়া কেউ বোঝার ক্ষমতা রাখেনা।

শটেশন থেকে বের হয়েই তৃপ্ত পরলো হরতালের মায়াজালে, রিকশা পায়নি বলে হেটেই কমলাপুর থেকে এতদুর এলো, ভেবেছিল হরতালেও কিছু বাস চলে, তার একটা ধরে মিরপুর চলে যাবে, কিন্তু টানা ৩৬ ঘন্টার হরতালে আজ দেখছে বিদিক পিকেটিং। পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকেই ধরে গাড়িতে বসাচ্ছে। কি আজব এই দেশ, বি এন পি ক্ষমতায় থাকলে পুলিশ আর বুদ্ধিজীবী গুলো তাদের পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করে, আর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে সেই বি এন পি কেই লাথি মেরে আওয়ামী পন্থিদের পেছন দিকে চুমু দিতেও দ্বিধাবোধ করেনা।
“কত রঙ্গ জানো রে মন” গানটা গুনগুন করতে করতে একটা হোটেলে ঢুকে চায়ের ওর্ডার দিল ও। পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
-মামা ঐ টেবিলে দুটো চা দিন।
অবাক হয়ে তৃপ্ত খেয়াল করলো, সেই মেয়েটি, একি রিকশায় এলো ? নাকি পায় হেটে ? একটা ইয়া বড় ব্যাগ নিয়ে তো তার এত দ্রুত এখানে পৌছাবার কথা না, আর তৃপ্ত যখন কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে বের হয় সেখানে কোন রিকশাও ছিল না। প্রকৃতি সত্যি বড় রহস্য ময়, তা না হলে ঐ মেয়ে এত জলদি এখানে পৌছাত না, আর তৃপ্ত ও এই হোটেলেই চায়ের ওর্ডার দিত না।
সামনে বসে মেয়েটি পা নাচাতে শুরু করে বললো,
-হাই, আমি শিলা, বি বি এ সিক্সথ সেমিস্টারে পড়ছি ব্রাক ইউনিভার্সিটিতে, বাড়ী সিলেট, এবার আপনার কথা বলুন।
তৃপ্ত কখনোই অপরিচিতদের সামনে সাভাবিক ছিলনা, এখন তো আরও না, অস্ফুটে বলে উঠলো,
-আমি তৃপ্ত।
পারিপার্শ্বিকতা ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠে শিলা বললো,
-আমাকে দেখে যে কেউ ই তৃপ্ত হয়, আর আপনাকে তো পুরো বায়োডাটা দিয়ে দিলাম, তৃপ্ত হবার ই কথা।
-জি ? জি না, মানে আমার নাম তৃপ্ত,
-বাহ, বেশ মিষ্টি নাম তো আপনার, কে রেখেছিলেন এই নামটা ?
-জানিনা যে, কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়নি, মনে হয় জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই।
-কেন ? সুযোগ নেই কেন ?
চা চলে আসলো এর মাঝেই, তৃপ্ত চায়ে চুমুক দিয়ে বেয়ারা কে ডেকে বললো – মামা, অর্ধেক চা ফেলে দিয়ে শুধু লিকার ঢেলে দিন, মিষ্টি টা বেশি হয়ে গেছে।
শিলা জানতে চাইল,
-আপনি কি করেন ? পড়াশুনা ?
-না’তো, আমি কিছুই করিনা, ঘুরি ফিরি আর খাই দাই, ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে কেমেষ্ট্রিতে মাস্টার্স করেছিলাম, এরপর আর পড়াশোনা হয়নি, কেন ?
-এই যে মিস্টার, ভাববেন না আমি যেচে পরে কথা বলছি বলে আমি হ্যাংলা টাইপ মেয়ে, কাল আমার একটা এক্সাম আছে, তাই বাধ্য হয়ে ঢাকা আসতে হল, এসে হরতালে আটকে গেছি, আপনাকে ষ্টেশনে দেখে ভাল মানুষ বলে মনে হল, কোইনসিডেন্সলি এখানেও দেখা হয়ে গেল বলে কথা বলছি, বোঝেন ই তো আমি এই মুহুর্তে একা, আর হরতালের পিকেটং এর জন্যে খুব ভয় হচ্ছে, আপনার ভাব দেখে মনে হচ্ছে খুব বিরক্ত হচ্ছেন, থাক আমি চা টা শেষ করেই উঠে যাব।
কথাগুলো বলে কেমন যেন একটা ঠোঁট ফোলানো ভাব করে চুপ হয়ে গেল মেয়েটা, তৃপ্ত’র একটু মায়া হল শিলার জন্যে, সত্যিই তো- এই হরতালের এমন একটা পরিবেশে মেয়েটা কত যেন অসহায় বোধ করছে, অসহায় কাউকে দেখলেই ওর মায়া হয়, জানতে চাইল,
-আপনি এখানে থাকেন কোথায় ? একা যাওয়া ঠিক হবে না, আমি পৌছে দিব আপনাকে, যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।
-আমি নাখাল পাড়া থাকি, আমার বড় খালার বাড়িতে, থাক আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, আমি যেতে পারবো, (এটা ভদ্রতা সূচক কথা ছিল, ও ভয়ে কাতর হয়ে ছিল, তৃপ্ত’র কথা শুনে ধরে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল ও )
তৃপ্ত বলল-
-না না সমস্যা নেই, আমি মিরপুর যাব, আপনাকে পৌছে দিতে সমস্যা হবে না আমার।

চা শেষ করে উঠে দাড়ালো দু’জন, তৃপ্ত’র পকেটে টাকা নেই, একটা মেয়েকে নিয়ে গেলে নিশ্চই ভাড়া টা ওর ই দেয়া উচিত, ও বললো,
-আপনি একটু বসবেন এখানে ? এই ধরুন ১০ মিনিট, আমাকে একটু একটা বন্ধুর সাথে দেখা করতে হবে, ২/৩ টা বিল্ডিং পর ই ওর দোকান।
শিলা কিছু না বলে মুখ কালো করে শুধু মাথা দোলালো, তৃপ্ত বেড়িয়ে এলো হোটেল থেকে, ফকিরাপুল কাঁচা বাজারে গিয়ে ওর বন্ধু শহীদের সাথে দেখা করে ৫০০ টাকা চাইল, শহীদ অবাক, সে জানে তৃপ্ত একজন এডিক্ট, কিন্তু কখনোই তৃপ্ত টাকা ধার করেনা, টাকা না থাকলে সে নেশাই করে না, আজ হঠাৎ কি হল কে জানে, জিজ্ঞেস করলো,
-কিরে হঠাৎ টাকা দিয়ে কি করবি ?
তৃপ্ত সব খুলে বলার পর শহীদ হো হো করে হেসে উঠে বললো,
-তাহলে বিড়ালের গলায় ঘন্টা ঝুললো এবার ?
-ধুস শালা, তোরা সব কিছুতে বাড়াবাড়ি করিস, টাকা দিবি নাকি বল, মেয়েটা একা আছে, আমাকে যেতে হবে, নাহলে ও ভয় পেয়ে যাবে।
শহীদ টাকা বের করে দিয়ে বললো,
-নাম কি রে মেয়েটার ?
তৃপ্ত রুদ্ধ্বঃশ্বাসে বিদায় নিতে নিতে বললো, মনে নেই। জানিস না আমার কারো নাম মনে থাকেনা।

২০৫জন ১৯৪জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য