তৃপ্ত (৩য় পর্ব)

পাগলা জাঈদ ৬ অক্টোবর ২০১৩, রবিবার, ০৯:৪৭:৩১অপরাহ্ন বিবিধ ৪ মন্তব্য

নাস্তা খেতে বসে তৃপ্ত শুধু অবাক নয়, হতবাক, ৮/১০ টা বাটিতে বিভিন্ন রকম ভর্তা, ও এত পদ ভর্তার নামই ও জানেনা। মাটির চুলায় পিঠা ভাঁজা হচ্ছে, কিছু কিছু জায়গায়  ক্ষয়ে যাওয়া শীতল পাটি তে বসে তৃপ্ত গরম পিঠায় ভর্তা মাখিয়ে খাচ্ছে আর ঘাম মুছছে, খুব ঝাল হয়েছে ভর্তা গুলো। একটা ভর্তার টেষ্ট বেশ অদ্ভুত, ও জানতে চাইলো,
-মামী, এটা কিসের ভর্তা ।
-এইটা হইলো ইলিশ মাছের মাথা দিয়া কলা গাছের কচি মোয়ার ভর্তা,, ভাল হয় নাই বাজান ?
-খুব ভাল হয়েছে, আমি আগে কখনো খাইনি এটা। তুমি এক সকালে এত রকম ভর্তা কিভাবে বানালে ? কেন এত কষ্ট করতে গেলে ?
-তর্ মামা রে কইছিলাম কিছু সদাই পাঠাইতে, তিনি পাঠায়নাই , আইজ আহুক,  দুফুরে আইজ হের ভাত বন। আমি তর্ লাইগা কত কি বানাইতে চাইলাম।
বলেই সে মাথা নিচু করে ফেললো। তৃপ্ত’র মনে হল মামী তার মুখ আড়াল করছে কিছু একটা হাহাকারে। এদিকে টুকটুকি কে নিয়ে মহা যন্ত্রণা, সে ভর্তা দিয়ে পিঠা খেতে চাইছে, তৃপ্ত’র কোল থেকে নামতেই চাইছে না, হাত দিয়ে ধরতে না পেরে পা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে বাটি গুলো।

তৃপ্ত গলা পর্যন্ত পিঠা গিলে চায়ের কাঁপে চুমুক দিল,  কিন্তু কোন স্বাদ পেলনা,  শুধুই গরম,, কড়া ঝালে জিহবার বারোটা বেজে গেছে । চা টা রেখে ও বললো,
-মামী আমাকে যে যেতে হবে,  অনেক ভাল লাগলো তোমাদের কে, আমি কিন্তু মাঝে মাঝে এসে বেড়িয়ে যাবো।
-যেতে হবে মানে ? দুপুরে হাঁসের মাংস দিয়ে চালের রুটি খেয়ে যেতে হবে।
-না মামী, আমার খুব জরুরী একটা কাজ আছে, যেতেই হবে, কথা দিলাম আরেকদিন এসে খেয়ে যাব তোমার হাঁস। মামা কে ফোন দিয়ে আসবো।

অনেক কষ্টে মামীর কাছ থেকে সম্মতি নিয়ে বিদায় নেবার সময় হাতের আংটি টা খুলে ও টুকটুকির আঙ্গুলে পরিয়ে দিল, টুকটুকি মনে হয় এই অপেক্ষাতেই ছিল, ঢলঢলে আংটি টি আঙ্গুল থেকে নিয়ে ই মুখে পুরে দিল, সাথে পবিত্র একটা বাধভাঙ্গা হাঁসি।
রওনা হয়ে কেন জানি বিষাদে ছেয়ে গেল তৃপ্ত’র মন, ও দেখেছে মামীর চোখে পানি ছিল, কিভাবে মানুষ একদিনে সম্পুর্ণ অচেনা একজন কে এতটা ভালবাসে ? এতদিন শুনেছে, আজ জেনে নিল ও। সৃষ্টির রহস্য বড় অদ্ভুত। ভাগ্যিস সৃষ্টি কর্তা তার শত ভাগের মাত্র এক ভাগ মমতাই পৃথিবীতে বন্টন করেছিলেন, এর বেশি হলেতো বেদম মুশকিল হত।

রিকশা পাওয়া গেলনা, একটা ভ্যান গাড়িতে বসে আরাম করে একটা সিগারেট জ্বালালো ও । টুকটুকি সারাক্ষণ ওর কোলে থাকায় স্মোক করার সুজোগ ই ছিলনা। তৃপ্ত আর যাই হোক বাচ্চাদের সামনে কখনোই সিগারেট খায় না। ভ্যান এর ড্রাইভার যুবক, মনে হয় নতুন প্রেমে মজেছে, একটার পর একটা গান গেয়ে চলছে, সব গুলো ক্বারী আমিরুদ্দিনের গান যিনি সিলেটের কিংবদন্তি শিল্পী। তৃপ্ত’র খুব প্রিয় একজন শিল্পী। তৃপ্ত বলল,
-ভাই আব্দুল করিমের একটা গান করেন না, যদি পারেন,
গেয়ে চলল চালক-
“কোন মিস্তরী নাও বানাইছে

কেমন দেখা যায়

আরে ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে

ময়ূর পঙ্খী নায়”

ষ্টেশনে এসে সোবাহানের দোকানে গিয়ে ও বলল,
-মামা ঝাঁকাস একটা চা দেনতো, এক প্যাকেট সিগারেট দেন আগে।
সোবহান বলল -মামা একটু ওইদিকে চলেন।
আড়ালে নিয়ে সোবহান ওর হাতে একটা ফেন্সিডিলের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বলল, খান মামা।
-কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই, আমি’ত একদিনের জন্যে এসেছিলাম, থাক আজ আর খাবনা।
-আমি জানি মামা, অনেকদিন ধরে দেখতেছি আপনারে, একটু তো চিনি, এইটা মনে করেন উপহার, আপনে আমার মেহমান না আইজকা।
আর কোন কথা না বলার সুযোগ দিয়ে সোবহান চলে গেল দোকানে। তৃপ্ত হতভম্ব অবস্থায় সেটা খেয়ে নিয়ে দোকানে গিয়ে চায়ে চুমুক দিল। জোর করে চা আর সিগারেটের দাম দিয়ে দিল, বললো,
-মামা এটা আপনার ব্যাবসা, ব্যবসা তে কোন ছাড় দিতে নেই। আরেকটা কথা মামা, আজ মনে হয় দুপুরে আপনি খেতে পাবেন না, মামী খুব রেগে আছে।
-হায় হায়, আমি ভুলে গেছি, ও আমারে ২/৩ পদ শুটকি আর টাকি মাছ নিয়া যাইতে বলছিল,কইছিল, টাকি মাছের ভর্তা খাওয়াইবো আপনারে। ইস, আমার স্বরণ ছিলনা মামা, আইজকা আমি শেষ, বউ আপনারে অনেক পছন্দ করছে মামা। আমগো তো আর আত্বীয় কুটুম্ব নাই। সারা রাইত ঘুমাইতে দিল না, খালি আপনের প্যাঁচাল।
-তাই নাকি ? কি বলল ?
-কিছু কয়না, খালি জানতে চায়, আপনে এমন সুপুরুষ, এত্ত ভালা মানুষ, তাইলে নেশা করেন কেন, আমি ক্যান আপনারে আগে নিয়া গেলাম না বাসায়, আরও মেলা কথা, বাদ দেন মামা, আরেক কাপ চা দেই ?

কোন একটা ট্রেনে চড়ে ঢাকা রওনা হল তৃপ্ত। নামটা জানা নেই আমার, তৃপ্ত বলেনি, ওর আবার নাম মনে না থাকার বাতিক আছে।  উঠেই খাবার বগিতে চলে গেল, গিয়ে আবার চায়ের অর্ডার দিল, চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে ডুবে গেল অলস ভাবনার অতল গহ্বরে। যেন হিমালয় থেকে মাটির উদ্দেশ্যে উড়াল দিল এক নিঃসঙ্গ চড়ুই।

দুপুরে সোবহান যখন বাসায় গিয়ে পা রেখেই বলল,
-কইগো নিতুর মা, ভাত দে’।
তার স্ত্রী এসে মুখ গোমড়া করে শুধু একটা কথাই বললো,
– আইজ ভাত নাই, হোটলে খান গিয়া, আর আমারে নিতুর মা ডাকবেন না, আইজ থাইকা টুকটুকির মা ডাকবেন।

(চলবে)

 

২৪৫জন ২৪৫জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য