তৃতীয় লিঙ্গ

আরজু মুক্তা ৯ আগস্ট ২০১৯, শুক্রবার, ০৯:২৩:৩১অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি ২৩ মন্তব্য
  1. “আস সালামু আলাইকুম, দয়া করে দরজাটা খুলুন।”

এই সাথী,দেখতো, কে এলো?

সাথী আবার আমার মেয়েকে বলছে,” আপু, তুমি একটু যাও।আমি ভাত খাচ্ছি।”

আমার মেয়ে দৌড়ে চলে এলো। আমি তো চমকালাম, কি ব্যাপার?

আম্মু, হিজড়া !

তো কি হয়েছে?  এভাবে কেউ ভয় পায়। ওর বাবাকে বললাম যাও তো! আমি একটু শুইছি।

না!!! কোনভাবেই ম্যানেজ করতে পারলো না। ঐ আমাকেই উঠতেই হলো।

ওমা! কি খবর? কেমন আছো?

ওদের সাথে আগে থেকেই পরিচয়। যেখানে কাজ করি, ওরা প্রায়ই সেখানে যায়। আমাদের চেয়ারম্যান স্যার ওদেরকে প্রায়ই কিছু না কিছু দেয়, আর বলে যাওয়ার সময় দরজায় দুটা লাত্থি দিয়ে যাস।

অন্ধবিশ্বাস, ওরা লাত্থি দিলে ভাগ্য নাকি খুলে যায়। যাই হোক এদের একজনের নাম সাঈদা, প্রায়ই কথা বলতাম। ওর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যেতাম। এ সমাজে ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে চলে। বাবা মায়ের সাথে থাকে। অথচ এরা নিজের বাড়িতেও ঠাঁই পায় না! ও বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান। ও যখন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এমনকি সুন্দর নাচও দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিতো সবাইকে। পাশের বাড়ির এক আন্টি, হঠাৎ বলে উঠলো ,আরে আপনার এই মেয়ে তো হিজড়া! আর যাই কই? একদিন ওর মা রেখে আসলো হিজড়া পল্লীতে, সমস্ত ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে।

আমি মনে করি, এটা বোঝাপড়ার সমস্যা! সমাজ তাদের জন্য কোন ব্যবস্থা করেনি। তারা অবহেলিত। তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই।

আগে তারা বিয়েবাড়িতে নাচ, গান বা নতুন শিশু জন্ম নেয়ার আশীর্বাদ স্বরূপ কয়েক ঘণ্টা মাতিয়ে রাখার কাজ করতো। এখন এ পেশা হারিয়ে গেছে। তারা আধুনিক নাচ নাচতে পারেনা। এখন পেট তো চালাতে হবে। তারা ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদাবাজি, বাস বা বাসা বাড়িতে গিয়ে গিয়ে টাকা তোলে। আমরাও অমানুষ, বুঝিনা ওরা কিভাবে চলবে? দেই রাগ ওঠায়। ওরাও গালিগালাজ করে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

হিজড়াদের প্রতি ছোটবেলা থেকেই বিরূপ ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠি। পৃথিবীতে পুরুষ ও স্ত্রী লিঙ্গ নামক দুই প্রকার লিঙ্গ যুক্ত মানুষ থাকলেও, মানুষের জটিল দেহগঠনে মাতৃগর্ভে বাচ্চার জেনেটিক্যালি নির্ধারিত হবার সময় লক্ষজন মানুষের ভেতরে ভুল হয় মাঝে মাঝে।

এখন উভলিঙ্গ মানুষের কথা বলবো। গ্রিক দেবতা হার্মিস আর আফ্রোদিতির এক ছেলেমেয়ে উভলিঙ্গ নিয়ে জন্মেছিলো। ধারণা করা হয় এদের দুইজনের নাম অনুসারে নামকরন হয় ইংরেজিতে হার্মাফ্রোজাইট বা উভলিঙ্গ। ঐ যে ভুলচুক বললাম, সেটা হলো, ছেলে নির্ধারণে ক্রোমোজোম xy  আর মেয়ে নির্ধারণে xx!  কিন্তু ক্রোমোজমে গোলযোগ হলেই xx বা xy না হয়ে xxx বা xxy বা xo বা xyy এরকম হয়ে থাকে। ১০/১২ বছর পর অদ্ভুত ভাবে এদের দেহে পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এবং এদের জননাঙ্গ জন্মের সময় ছেলেদের মতো হলেও পরে মেয়েদের মতো অথবা অদ্ভুত এক প্রকার হয়ে যায়! যাই হোক,  এরা প্রজনন ক্ষমতাহীন হয়।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বিকৃতী দেয়া হয়েছে ।পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট ও পাচ্ছেন তারা। স্কুল গামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে তুলতে চার স্তরে অর্থাৎ প্রাথমিকে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৮০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১০০০ টাকা এবং উচ্চতর ডিগ্রীতে ১২০০ টাকা করে সরকার উপবৃত্তি চালু করেছে। এছাড়াও ৫০উর্ধ্ব বয়সীদের ৬০০ টাকা করে ভাতা প্রদান চালু আছে।

“তুই ব্যাটা হিজড়া!” শিক্ষিত হলে এটা আর গালি হবেনা।

আমি আমার মেয়েকে বুঝালাম, ওরাও মানুষ আমাদের মতো। শুধু মনটাই আল্লাহ একটু ভিন্ন করে করে দিয়েছেন। বাকি আবেগ, অনুভূতি, হাসি, কান্না , আনন্দ , বেদনা সব আমাদের মতোই।

আসুন, ওদের পাশে দাঁড়াই। বাচ্চাদেরও শিখাই কীভাবে শ্রদ্ধা করতে হয়? যে যার মতো গালিগালাজ না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। ওরাও কারো না কারো ভাই বা বোন। মানবিক হই ।

২৯৫জন ২জন
61 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য