তুমি আসবে বলে!

রোকসানা খন্দকার রুকু ২৪ অক্টোবর ২০২০, শনিবার, ০১:২০:৩৯অপরাহ্ন ছোটগল্প ২৫ মন্তব্য

তনু শ্যামলা গড়নে হালকা পাতলা চেহারা। এখনকার মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। সাজসজ্জায় একেবারেই তার আগ্রহ নেই। কারন শ্যামলা মেয়েরা বেশি সাজগোজ করলে ভালো লাগে না। সাজগোজ দুধে আলতা ফরসা ঢংগি মেয়েদের জন্য। ছেলেরা দেখবে আর হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে  গরীলার মত। আচ্ছা এই বেটাছেলেরা মা থেকে শুরু করে মেয়েদের দেখতে দেখতেই বড় হয় তারপরও মেয়ে দেখলেই গরীলা হয় কেন?

 

ভার্সিটি পড়ুয়া বড় ভাই  আবির এ পর্যন্ত দশটা প্রেম করে ফেলেছে। গল্প শুনে শুনে তনুরও ভীষন শখ, আফসোস দুটোই হচ্ছিল। বন্ধু বান্ধবরা অনেকেই একাজে ডক্টরেট নিয়ে ফেলেছে। অথচ তনুর কলেজ শেষ হয়ে যাচ্ছে কেউ তাকে প্রপোজই করলনা। আনচান করা, অস্থির মন বেশির ভাগ সময়ই খারাপ থাকে। এতবেলা গেল একটু ইটিস পিটিসের অভিজ্ঞতা নেই এটা মানা যায়।

ভাইয়ের সাথে একটু বেশি খাতির হওয়ায় তার সব গল্পই শোনে। কিভাবে প্রেম হয় বা পরতে হয় বা বোঝা যায় কেউ তাকে পছন্দ করে এসব।

ভাইয়া বলেছে – কারও গোপনে লুকিয়ে তাকানো নাকি প্রেমের একটা মারাত্মক লক্ষণ। এরমধ্যে খেয়ালও করেছে ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি  তার দিকে মধুমাখা দৃষ্টিতে তাকায়। ভালোই লাগে তনুর। কিন্তু আর কিছুই বলেনা। মেয়ে হয়ে সেও তো কিছু বলতে পারে না। চিন্তা আর চিন্তা ক্যামনে যে কি হবে। মনটা উসখুস করতে থাকে।

কলেজ শেষে একটু ঢিলেঢালা হাটুনি দিয়ে বাকি বান্ধবী থেকে আলাদা হয়। যাতে দুষ্টু ছেলেটি কিছু বলতে পারে। এভাবে চলছিল। একদিন সুযোগ এসেই গেল। দুষ্টুছেলেটি চকলেট দিল তাকে। তনু দুএকবার না না করে টপাক করে নিয়ে নিল। পাছে যদি মিস্ হয়!

বেশ চলছিল চকলেট দেয়া নেয়া। মন কি আর তাতে ভরে। ভাইয়ের মুখে শোনা গল্পের বাকি গুলো কবে শুরু হবে। ভাইয়ের কাছে শুনেছিল কিভাবে পটাতে হয় আর বেশি ভালোবাসা পাবার জন্য কি কি করতে হয়।

“কোথাও বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়তে হবে। তারপর জীবন মরন চিৎকার করে ভাব করতে হবে। ছেলে রক্ষা করবে এবং তুমুল প্রেম হবে।”

কিন্তু তারা তো এখনও কোথাও যায়নি। মেয়েদের যেচে বলাটাও শরমের ব্যাপার। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দুষ্টু ছেলে একদিন বলেই ফেলল

– চলো কোথাও বেড়িয়ে আসি।

তনু মুখে তো না না। ভেতরে ভেতরে এটাই তো চাই। জায়গা নির্বাচন হল  জিয়া পুকুর। বিরাট বড় পুকুর সরকারী হলেও লোকজন তেমন নেই। কয়েকজন পাহাড়াদার থাকেন। সকাল সকাল গেল তারা বেড়াতে। কিন্তু মন ভরছে না। কারন এখনও “লাভ ইউ জান” বলেনি। জড়িয়েও ধরেনি আর চুমু তো পরের ব্যাপার। এসবের জন্য মন অস্থির, আনচান করছে।

ভাইয়া বলেছিল- বিপদে পরবি বুঝলি, একদম ইচ্ছে করে। যখন খুব কান্নাকাটি করবি দেখবি বুকে জড়িয়ে লাভ ইউ বলবে।

হাটছে দুজনে। কিন্তু বিপদে কিভাবে পড়বে এবং পড়ার মত কিছু পাচ্ছেও না। মনটা খারাপ হতে হতেই সে দেখল একটা গাছের তলায় লাল পিঁপড়ার বাসা। হায়! কপাল আর কিছুই কপালে ছিল না। লাল পিঁপড়া খুব কামড়াবে জেনেও সে একটু টলকে গিয়ে পড়ল পিঁপড়ার হাঁড়িতে। মুহূর্তে শত শত পিঁপড়া গা বেয়ে উঠে যেখানে সেখানে কামড় শুরু করে দিল। মজা কাল হয়ে সাজা হয়ে গেল। চিৎকারে আশপাশের লোকজন চলে এল। লাল পিঁপড়া জামার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। সুতরাং তনুকে রক্ষা করার কেউ নেই। উপায়ান্তর না পেয়ে দুষ্টু ছেলে তনুকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিল।

পিঁপড়া তো মরল। জামাকাপড় ভিজে লেপ্টে একাকার। তনু সাঁতার জানে তবুও উঠছে না। কারন যে ভালোবাসা পাবার জন্য এত রিস্ক নিল তারতো কিছুই হলনা। এখন দুষ্টু ছেলের দায়িত্ব তাকে পানি থেকে তুলে আনা।

সিনেমা হলে তো নায়ক লাফিয়ে পড়ত। তনু বড় দূর্ভাগা তার দুষ্টু ছেলে সাঁতার ও জানে না। বেচারী ভিজে নেয়ে একাকার হয়ে  জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে দিল। উপরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমিক কাটা মুরগীর মত ছটফট করেই গেল।

এভাবে কাটলো বেশ কিছুক্ষন। দুষ্টু ছেলে নিজের উপর ভীষণ বিরক্ত হল। এ জীবন তার অযথা। তনু কান্না করছে অথচ সে কিছুই করতে পারছে না। কাপুরুষের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। তার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা নেই। নিজের উপর ভীষণ রাগ হল। চোখে টলটলে পানি নিয়ে তনুকে পানিতে রেখেই হাঁটতে শুরু করে দিল। তনু চিৎকার দিচ্ছে- এই দুষ্টু ছেলে , এই জান, ও জানু তোমাকে উঠাতে হবে না। আমি উঠছি আমাকে ছেড়ে যেওনা। তোমার কিছুই বলতে হবেনা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তারপরও সে ফিরে তাকালো না। তনুকে এমন দুঃসহ মুহূর্তে ফেলে রেখে চলে গেল। এজীবনে আর প্রেম হলনা। যাও একটু সম্ভাবনা ছিল তাও বোকামি আর বেশি চাইতে গিয়ে ভেস্তে গেল। একবুক হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে একা একা বাসায় ফিরে দরজা বন্ধ করে গান শুনে জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো-

“দিল মে হো তুম আখো মে তুম

বলো তুমহে ক্যায়সে চাহুউ।

পুজা কারুউ সিজদা কারুউ

জ্যায়সে কাহো এয়সে চাহুউ।

জানু ও মেরে জানু, জানে জানা জানু”

বহু বছর পর-

তনুরা বেড়াতে যাবে। সে অনেকক্ষন গাড়িতে বসে আছে । অথচ বাবা মেয়ের কোন পাত্তাই নেই।

গাড়িতে বসে তনু চিৎকার দিল- এই তিতলী কি হল, তুইও তোর বাবাকে ডাকতে গিয়ে হারিয়ে গেলি নাকি? আয় তারাতারি।

ভেতর থেকে- মা একটু ওয়েট কর? বাবা কেরোসিন তেলের বোতলটা খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না। কোথায় যে রেখেছ?

– কেন তেল কি হবে?

– ওই বাবা বলছে, আমরা যেখানে বেড়াতে যাচ্ছি সেখানে যদি পিঁপড়ার বাসা থাকে! আর তোমাকে কামড় দেয়।বাবা তো সাঁতার জানেনা। তাই আগেভাগেই মারার ব্যবস্থা করবে।

তনু  মুচকি হেসে চুপ হয়ে গেল। এ বয়সেও মনে মনে শিহরিত হল। মনে পড়ে গেল কত মধুর স্মৃতি। কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল অথচ মানুষটা সেই একটা জিনিসই ভুলতে পারল না। আহামরি আহ্লাদে কোনদিন ভালোবাসাও প্রকাশ করেনি। কিন্তু সবসময় ভীষন কেয়ারিং এটা ভাবতে তার ভালোই লাগে।

ছবি- আমার

২০৯জন ৩৯জন
0 Shares

২৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য