ঢাকায় আমার হারিয়ে যাওয়া

অরণ্য ২৬ জানুয়ারী ২০১৫, সোমবার, ০৩:০৩:১১অপরাহ্ন একান্ত অনুভূতি, বিবিধ ৩৬ মন্তব্য

ঢাকায় আমার প্রথম পা শাহাবাগ মোড়ে জাতীয় যাদুঘরের সামনে। এসেছিলাম শিক্ষা সফরে। যাদুঘর দেখলাম। দূর থেকে দেখলাম পি জি হসপিটাল (আই পি জি এম আর)। ঢাকায় প্রথম পা রাখার অনুভূতিটা পুরাতন ডায়েরীতে পাওয়া যেতে পারে। আমার কাছে এটি ছিল আমার অনেক পাওয়ার মধ্যে একটি। ছোটবেলায় একটা নাটক হতো “ঢাকায় থাকি”। খুব ভাবতাম কবে ঢাকা দেখব! তখন ভিউকার্ড-পোস্টকার্ডের যুগ। শাপলা চত্বর, অপরাজেয় বাংলা, শহীদ মিনার, সংসদ ভবন, স্মৃতিসৌধ – এ সবের ভিউকার্ডগুলো আমার শুধু ভালই লাগতো না, আমি সংগ্রহও করতাম। সেই ঢাকা ঘুরে বেড়ানোর জন্য ঘন্টা দুয়েকের মত ফ্রি টাইম দেয়া হলো। আসলে টাইমটি ছিল আমাদের মধ্যেকার ঢাকা পার্টিদের (যাদের বাসা ঢাকায় ছিল) পরিবারের সাথে একটু দেখা করতে দেয়ার সুযোগ মাত্র। আমার কোথাও যাবার নেই – ঢাকায় আমি কাউকে চিনি না। আমার এক বন্ধু বলল “চল, বাসে বসে না থেকে আমার সাথে চল আমাদের বাসায়”। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ঢাকায় কারও বাসায় প্রথম যাচ্ছি এও আমার কাছে সেদিন বেশ অনুভূতির ব্যাপার ছিল। একটা বাসে উঠে পড়লাম। নামার সময় ও সম্ভবত আট আনা (৫০ পয়সা) দিয়েছিল স্টুডেন্ট বলে – শাহাবাগ থেকে দৈনিক বাংলা। ওর বাসা ছিল আরামবাগ।

ফের আমার ঢাকায় আসা এইচএসসির পরে। মাঝখানে একবার এসেছিলাম দুই রাতের জন্য। সে ছিল আমার জীবনের অনেক কষ্টের রাতের একটি, আজ তা আর বলব না। কিন্তু আমি চাইলেই সেই রাত, সেই আমাকে, সেই আমার বন্ধুদের, আমার বন্ধুদের গার্ডিয়ানদের, আমার মাকে খুব স্পষ্ট দেখতে পাই, শুনতে পাই। সে যাগগে, চিঠিযোগে আগেই ঠিক করা ছিল আমি ঢাকায় উঠব ডি-১৩, সিভিল এভিয়েশন কলোনী, পুরাতন এয়ারপোর্ট এই ঠিকানায় – আমার বড় ভাইয়ের বান্ধবীর বাবার বাসায়। ভাইয়া চীন থেকে চিঠিতে মাকে অবশ্য জানিয়েছিল তাদের সম্পর্কের কথা এবং সে তাকেই বিয়ে করবে দেশে এসে তাও জানিয়েছিল। ব্যাপারটা আমার পছন্দ না হলেও এ ছাড়া আমার আর পথ ছিল না ঐ সময়ে। যদিও বলেছিল আমাকে কিছু আনতে হবে না তবুও আমি একটা কাঁথা এনেছিলাম আমার মা’র গন্ধমাখা। মজার ব্যাপার হলো কাঁথাটি এখনও বর্তমান আমার বাসায় কুড়ি বছর পরেও।

তখনও শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছি কি না ঠিক মনে নেই, তবে ঢাকা আমি চিনি না। চিনি শুধু ফার্মগেট, পুরাতন এয়ারপোর্ট আর দৈনিক বাংলা, সাথে জনতা ব্যাংক ভবন আমার নিশানা হিসাবে। জনতা ব্যাংককে ডানে রেখে বামের গলিতে ঢুকতে হয় আমার সেই বন্ধুটির বাসায় যেতে। আরেকটি জায়গা আমাকে মনে রাখতে হতো ওর বাসায় যেতে – আরামবাগ ক্লাবের পিছন দিয়ে পায়ে হাঁটা পথে যেতে হবে – তখন বক্স কালভার্ট রোড হয়নি। আগাতে থাকলে এক সময় পড়বে একটি ক্যাসেটের দোকান – অলির ভিসিআর, ভিসিপির দোকান। বাকিটা আর মনে রাখতে হয় না।

দুটি বাস খুব ভাল করে চিনতাম তিন নম্বর বাস ফার্মগেট যাবার জন্য আর আট নম্বর বাস দৈনিক বাংলা যাবার জন্য। তিন নম্বর বাস আরও কতদূর যায় আমার তেমন জানা ছিল না। একদিন গেলাম সেই বন্ধুর বাসায়। অনেকক্ষণ থাকলাম। রাতে খেলামও ওদের বাসায়। রাত একটু বেশি হয়েছে – দশটার কাছাকাছি হবে। বন্ধু আমাকে এগিয়ে দিতে এলো। কোন কোন গলির ভিতর দিয়ে ও একটা চওড়া রাস্তায় নিয়ে এলো। রাস্তার ওপাশে একটা বড় বাস দাঁড়ানো। “দোস্ত, দৌড় দে। উঠে পড়, ডাইরেক্ট চলে যাবি” বলেই বন্ধুটি একটু ধাক্কা দিল আমাকে। আমিও কিছু না বলে বাসে উঠে গেলাম। বাসের সামনে লেখা ‘৬ নং’। এ বাসে আমি কখনও চড়িনি। বাস ছেড়ে দিল। আমি খুব চেনার চেষ্টা করছি আমার পার হয়ে আসা রাস্তার কোথায় আছি আমি। নাহ, কিছুই চেনা লাগছে না। আমি চিন্তায় পড়লাম, কোন বাসে উঠলাম আমি? কোন ভুল করছি না তো?  আমি কিছুই চিনতে পারছি না কেন? বাস একটু দূরে গিয়ে আবার থামল। এবার আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম। আমি শাপলা চত্বরে কেন? ওর বাসায় যেতে তো কখনও শাপলা চত্বর পড়েনি! তাহলে আমি কোন বাসে? এই চত্বরে তো অনেক রাস্তাই মিশেছে দেখছি! আমি তো যাব ফার্মগেট, পুরাতন এয়ারপোর্ট। এ তো যাবে গুলশান শুনছি! আমি কিছু একটা ভুল করছি। আমি মনে হয় হারিয়ে গেছি! খুব ভয় করছে আমার। কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও আমার ভয় করছে, যদি বুঝে ফেলে আমি হারিয়ে গেছি! নাহ, কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। আগে বাস থেকে নামতে হবে আমাকে। আমি হারিয়ে গেছি। হুড়মুড় করে বাস থেকে নেমে গেলাম। প্রথম শাপলা চত্বরে পা আমার।

এদিক ওদিক তাকালাম। নাহ, কিছুই চিনি না আমি। রাস্তার ধারে এক দোকান থেকে সিগারেট জ্বালিয়ে ভাবছি কাউকে জিজ্ঞেস করি “ভাই, এখান থেকে ফার্মগেট যাওয়ার বাস আছে কি না”। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হলো না। দেখলাম একটা ছোট বাস থেমেই ডাকছে “ফারামগেট, ফারামগেট, ডাইরেক্ট ফারামগেট”। ধড়ে যেন পানি পেলাম। সিগারেট ফেলেই উঠে পড়লাম বাসে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাস ছেড়ে দিল। আমার ভয় একটু কমেছে কিন্তু চিন্তা রয়েই গেছে, আমি এখনও চিনতে পারছি না কেন? আমার চেনা নিশানার কিছুই চোখে পড়ছে না কেন? হ্যাঁ! মেলাতে পেরেছিলাম প্রেসক্লাব আসার পরে। শাহাবাগ আসার পরে বুকে আরও জোর পেলাম। নেমে গেলাম ফার্মগেট, তখন বাজে রাত সাড়ে দশটার মত। হারিয়ে যে যাইনি এই খুশিতে তিন নম্বর বাস বাদ দিয়ে হেঁটেই চলে গেলাম পুরাতন এয়ারপোর্ট, আমার ডি-১৩। আন্টি সেদিন নাকি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন “ছেলেটা কিছু চেনে না, কোথাও হারিয়ে গেল না তো?”

এখন বুঝি সব। ঘটনাটি মনে পড়লে মাঝে মাঝে হাসি পায়। আমার সেই সন্দেহের ‘৬ নং’ বাসটি যে কমলাপুর হয়ে আরামবাগ ঘেঁসে মতিঝিল-গুলিস্তান হয়ে আমার পুরাতন এয়ারপোর্টের বুকের উপর দিয়ে গুলশান যায় তা আমার জানা না থাকাটাই ভাল হয়েছে। তা না হলে ঢাকায় হারিয়ে যাওয়ার স্বাদ আমি পেতাম কি করে?

৪০৬জন ৪০৬জন
0 Shares

৩৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ