ডায়েরিভর্তি দীর্ঘশ্বাস 

সন্ধ্যার আঁধারের সঙ্গে দুঃখের কোনো যোগসূত্র আছে হয়ত। নইলে রোজ সন্ধ্যায় আমার মনের আকাশে এমন ঘন কালো মেঘ নেমে আসে কেনো? একমাত্র পুত্র অয়নকে রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুইয়ে আমি যখন লিখতে বসি, আমায় শুধুই দীর্ঘশ্বাস তাড়া করে ফেরে। কত কী মনে পড়ে! বাবার কথা, মার কথা, ভাইবোনের কথা, আমাদের যে সুখী একটি পরিবার ছিল, সেইসবের কথা!

মায়ের ছোট্ট ডায়েরির কথা। মায়ের একটি ডায়েরি ছিল। বহুদিনের পুরনো হওয়ায় লালচে হলদেটে রঙ ধারণ করেছিল প্রতিটি পাতা। সেখানে আমাদের ভাইবোনদের জন্মতারিখ লেখা। বাংলা এবং ইংরেজিতে। মা শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। বিধায় সন্তানদের জন্মতারিখ ডায়েরিতে টুকে রেখেছেন গভীর যত্নে। কিন্তু কোনো মাকে যদি সন্তানের জন্মতারিখের পাশাপাশি মৃত্যু তারিখও লিখতে হয়, এরচেয়ে ভারী কলম বোধ হয় পৃথিবীতে আর অন্যটি নেই। লেখার সময়কালে মায়ের বুকচিরে বেরিয়ে আসা শ্বাস কত ভারী হয়েছিল, সে কেবল সে-ই জানে। 

শুনেছি, আমার মায়ের প্রথম সন্তান জন্মেছিল পুত্র। নাদুস নুদুস, কাঁচি হলুদের মতো গায়ের রঙ। নানার বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানতো সেই আনন্দ সহসাই অপার বেদনায় রূপ নিবে! মাত্র সাতদিন বেঁচে ছিল আমার না-দেখা সেই ভাইটি। গ্রাম শুদ্ধ সকলে বলল, জীনে ধরেছে। গায়ের রঙ হলদে হয়ে গিয়েছিল। এখনকার জমানায় হলে হয়ত বলা হতো জন্ডিজ হয়েছে। যাক্‌। ভাইটির মৃত্যুর পর আম্মা ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন, সজিব আরমান, জন্ম-১৪ই এপ্রিল, ১৯৭০, মৃত্যু-২১শে এপ্রিল, ১৯৭০। কত ছোট্ট একটি জীবন! কত সংক্ষিপ্ত! পৃথিবীর আলোবাতাসে এলো আর গেলো।

 

এরপর একে একে আমরা তিন বোন জন্মাই। বড় বোনটি সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ইউনিফর্ম পরে বড়বোনের স্কুলে আসা-যাওয়া দেখে মেজো বোন কান্না জুড়ে দেয়। যদিও মেজো’র স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি, তবুও তাকে শান্ত করতে অনেক বলে-কয়ে আম্মা একই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। বছর শেষে বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল জানা যায়। বড়বোন বীথিকা আশানুতীত ভাল ফলাফল করায় কিন্ডারগার্টেন থেকে এক লাফে ক্লাস টুতে প্রোমোশন পায়। মেজোবোন লিপিকা ক্লাস ওয়ানে। আমি যূথিকা তখন হাঁটি হাঁটি পা পা।  

বড় কন্যা সম্পর্কে আম্মা প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘বীথিকা এত মেধাবী শিশু ছিল যে, আমার ভেতরে একরকম ভয়ের অনুভূতি হতো। জ্ঞান, বুদ্ধি, ব্যবহারে এতটুকুন মানুষটি যেখানেই যেত, সকলকে তাক লাগিয়ে দিত। সকলের মন জয় করে নিত।’ আম্মার সেই ভয় একদিন বাস্তবে রূপ নিলো। মাত্র সপ্তাহখানেকের প্রবল জ্বরে ভুগে আচমকা একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো সে। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে হবে ভাব। হাসপাতাল থেকে নিথর দেহটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন আব্বা। মেঝেতে শুইয়ে দিলেন। শাদা কাফনে ঢেকে রাখা দেহটাকে লোকে যখন লাশ বলছিল, আমার আম্মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। ‘ ওইটা লাশ না, ওইটা আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন, বীথিকা। সেইদিন শেষ বিকেলে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছিল এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। পুরষ্কার গ্রহণ করতে ডাকা হলো স্কুলের সবচে মেধাবী ছাত্রীটিকে। বীথিকা আরমান। একবার, দুইবার, তিনবার…। কেউ একবুক গর্বে দুই বেণী দুলিয়ে মাথা উঁচিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো না পুরষ্কার নিতে। অভিভাবকের কাতারে বসা কোনো গর্বিত মা হাততালি দিয়ে ওঠেনি সেদিন। ততক্ষণে কেউ একজন খবর পৌঁছে দিলো। বীথিকার মৃত্যু সংবাদ। অনুষ্ঠানস্থলে নেমে এলো শোকের ছায়া। মুহূর্তেই মাঠভর্তি মানুষের আনন্দ রূপ নিলো বেদনায়। দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল ছোট্ট মফঃস্বল শহরের আকাশ-বাতাস। অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করে খ্রিষ্টান মিশনারী স্কুলের শাদা মেম’রা ছুটলেন তাদের ক্ষুদে শিক্ষার্থীকে শেষ দেখা দেখতে। চিরবিদায় জানাতে। 

পৃথিবীতে তখন ভোরের স্নিগ্ধ, শীতল হাওয়া। একটি শাদা এ্যাম্বুলেন্সের মেঝেতে শুইয়ে আমার বড়বোনকে নিয়ে আমরা অশ্রুজলে ভাসতে ভাসতে দাদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পুরোটা পথ শতাব্দীর নিস্তব্ধতা বুকে নিয়ে বসে রইলাম বোনহারা আমরা দুই বোন। যদিও তখন আমার ‘মৃত্যু’ কী, তা বোঝার কথা না। দুপুরের কিছু আগে দাদা-বাড়ির বড় উঠোনে পৌঁছালাম। পারিবারিক কবরস্থানে আমার দাদার কবরের পাশে তাকে শুইয়ে দেয়া হলো চিরতরে। পৃথিবীর সব ঝড় একসময় থামে। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। জীবন চলে জীবনের নিয়মে। আমার পরিপাটি আর সৌখিন আম্মাও ব্যস্ত হয়ে ওঠে অফিস, সংসার, আর আমাদের লেখাপড়া নিয়ে। কোন বিষয়ে আমরা দুর্বল, কোন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে, কীভাবে নোট লিখলে ভালো নাম্বার পাওয়া যাবে, এইসব ভাবনায় রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলে সময়। আমাদের দিনগুলো নীলাকাশে শাদা মেঘের মতো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আমি তখন স্কুলের গণ্ডী পার হবার শেষের দিক। একদিন ডায়েরি খুলে দেখি সেখানে জন্মদিনের পাশাপাশি আরেকটি মৃত্যুদিন লেখা হয়ে গেছে। বীথিকা আরমান, জন্মঃ ১৫ই জুন ১৯৭১। মৃত্যুঃ ১৬ই জুলাই ১৯৭৬। আহা, মাত্র ৫ বছর, ১ মাসের জীবন! পৃথিবীর রূপ-রস কিছুই দেখা হলো না বালিকার!

আম্মাকে দৃশ্যত অনেকের চেয়ে সুখী মনে হতো। অনেকদিন পর পর আমি যখন বিদেশ থেকে দেশে বেড়াতে যাই, দিনভর আমার পছন্দের কত কী রান্না করে খাওয়ায়! ভরদুপুরের অলস সময়ে জমে থাকা গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। অধিকাংশই শুনে আমি হো হো করে হাসি। সংক্রামকের মতো তা মায়ের মুখেও ছড়িয়ে পড়ে। মা-মেয়ের মুখের উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে পড়ে আমাদের গৃহকোণে।

কিন্তু মধ্যরাতে হু হু করে কান্নার আওয়াজ কানে আসে। আমার ঘুম ভেঙে যায়। চিরতরে হারিয়ে ফেলা পুত্র-কন্যার কথা ভেবে প্রায়শই গভীর রাতে ডায়েরিটি হাতে তুলে নিতেন আম্মা। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অক্ষরগুলোয় হাত বুলাতেন অন্ধকারে, একাকী হুহু করে কাঁদতেন। বিড়বিড় করতেন আনমনে। মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যের পৃথিবীতে সেই বিড়বিড়িয়ে বলা প্রতিটি শব্দ, বাক্য আমি স্পষ্টই শুনতে পেতাম। বলতেন,’জীবন হল দীর্ঘ  এক যাত্রাপথ।  যেতে যেতে কতজনের সঙ্গে দেখা হয়! পথে পথে মায়া বাড়ে, স্মৃতি জমে। সেইসব স্মৃতি কুড়িয়ে বোতলে মুখবন্ধ করে সাথে নিয়ে চলে মানুষ! একসময় শরীর ক্ষয়ে যায়। অবসাদ ঘিরে ধরে। ক্লান্তি বাড়ে। পথের শেষপ্রান্তে এসে জিরিয়ে নেয়া পথিক বোতলের ঢাকনা খুলে দেয়। ধোঁয়ার ন্যায় কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে আসে একে একে স্মৃতিরা। ছায়ার মতন ভেসে উঠে সব। দেয়ালে, আকাশে, শূন্যে যেদিকে তাকায় একটি ছায়া এক পা, দু’পা করে হেঁটে যায় অতীতের দিকে। অতঃপর বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়া ছায়ার সন্ধানে কেউ শহরে, গ্রামে, গঞ্জে মাইকিং করে বলে না, ‘এ পথে একটি ছায়া হারিয়ে গিয়েছে। কেউ সন্ধান পেলে জানাবেন।’

রিমি রুম্মান
কুইন্স, নিউইয়র্ক

৭৩জন ১৮জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ