ডাউন মেমোরি লেন -১

কমলিনী ২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার, ০৮:৫৪:২২অপরাহ্ন স্মৃতিকথা ৪৩ মন্তব্য

 

#ডাউন মেমোরি লেন – ১

 

বহুদিন দরজার বাইরে পা রাখিনি। ব্যালকনি দিয়ে ফালি করা আকাশ দেখি। হাত বাড়িয়ে আলো ছুঁই…  বাতাস মাখি। টবের গাছগুলোতে মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিই জীবনের। ছোটবেলার কথা হানাদারের মত আছড়ে পড়ে স্মৃতিতে তাদের অলঙ্ঘ্য দাবি নিয়ে। আমার ফুল কুড়োনো সকাল, পুকুর ঝাঁপানো দুপুর, মন্টুবাবুর আমবাগানে আমমাখা জড়ানো বিকেল। গৌতম মাস্টারমশাই এর টিউশন পড়ানো,  দুপুরে লুকিয়ে সার্কাসের তাবু দেখতে যাওয়া, সারা পায়ে বেতের দাগ… এখনো কী জ্বলজ্বলে…

 

আমার একটা ক্যাম্প খাট ছিলো। একফালির একটা ঘর, একটা টেবিল..  তাতে মায়ের নকশা বোনা টেবিল ক্লথ…এখনো তার ডিজাইনটা স্পষ্ট মনে আছে। আরো ছোটবেলায়…  ঠাকুমা আর পিসির সাথে বড়ো ঘরে শোওয়া। ঘুমনোর আগে বালিশে তিনবার ‘ আস্তিকমুনি, আস্তিকমুনি, আস্তিকমুনি ‘ বলে টোকা দেওয়া…  জানিনা আমার একশোর কোঠায় পৌঁছনো ঠাকুমার এখনো সে অভ্যাস আছে কিনা…  তোমার মত লাউয়ের পায়েস, বড়ি কেউ বানাতে পারেনা। ধামায় করে কলাই ডাল ধোওয়ার জন্য পুকুরে যাওয়া আর হবে না, তাইনা?

 

বসন্তকালের শেষের দিকে গ্রামীণ ভাঁটি পুজো। এখন আর কেউ করে না।আমরা জনা কয়েক আট দশ বছরের মেয়ে আগের দিন থেকে পুজোর উপকরণ গোছাতাম, মাদার ফুল,  ইঁদুরের মাটি,  ছেঁড়া চুল, শেয়াল কাঁটা আরও অনেক কিছু। আর প্রধান উপকরণ ভাঁট ফুল। একটা অশ্বত্থ গাছের ছড়ানো শেকড়ের এক একটা ফোকর আমাদের সকলের জন্য নির্দিষ্ট করে নিতাম। আগেরদিন গোবর দিয়ে নিকিয়ে রাখতাম। পরদিন ভোরবেলা উঠে পুজো খুকুপিসির বাড়ি।

 

খুকুপিসি আমার প্রথম দিদিমনি।এমন স্থিতধী শান্ত সৌম্য মানুষ খুব বেশি দেখিনি। একটু বড়ো হয়ে অবাক হতাম। একজন ছিমছাম রোগা গড়নের মিষ্টি মুখশ্রীর মানুষ জীবনের প্রতি এমন নির্মোহ কেন! ছাত্র পড়ানো আর বিধবা মা আর এক দাদা আরো ছোট দু বোন নিয়েই তার আবর্তন। অনেক বয়স পর্যন্ত খুকু পিসি বিয়ে করেনি। বয়ঃসন্ধির অদম্য কৌতুহলে জেনেছিলাম তার জীবনের প্রতারণার অভিশাপ। কাঁচা বয়সের সেই অভিজ্ঞতা তাকে বহুদিন ঘিরে রেখেছিল…  কেমন আছো খুকুপিসি? দেখো তোমার ‘ অ আ ‘ শেখানো ছাত্রী এখন কলম ধরতে পারে।

 

উড়ো ঝুরো ভাবনাগুলো কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়…  ছাড়াতে পারি না…  যাইহোক, ভাঁটপুজো সাঙ্গ হলে সামান্য বাতাসা নকুলদানার প্রসাদ বিলি করে মন্টুবাবুর পুকুরে সেই কুলো ভাসিয়ে স্নান করে ভিজে গায়ে দুলাল জেঠুর দোকান থেকে লাল মোড়কের জেলি লজেন্স আর চৌকো আকৃতির এলাচ মেশানো টী টাইম বিস্কুট বিস্কুটের মহোৎসব করে ঘরে ফেরা…

 

‘ ঘরে ফেরা ‘ বড়ো মনকেমন করা শব্দ…  বড়ো মায়াময়…  আজীবন এই ঘরে ফেরার আশায় থাকি আমরা…  কিন্তু কোন ঘর? আসলেই কি ঘর বলে কিছু হয়…

 

( ক্রমশ….)

৩২২জন ৬৯জন
0 Shares

৪৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য