ঠিকানা জেনেভা ক্যাম্প

আজিম ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪, রবিবার, ০৯:৫৭:২০অপরাহ্ন গল্প ২২ মন্তব্য

স্কুল ছুটির দিনগুলোতে ছোট্ট শিশু নাজমা ওর বাবার দোকানে আসে। বাবা সেলিম মিয়া লুচি ভাজেন। বাবার লুচি ভাজার গরম তাওয়াটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ও। লুচি ভেজে বাবা রাখতেই নিজের সামনে রাখা কাগজের ঠোঙ্গায় তুলে রাখতে শুরু করে নাজমা। একটা একটা লুচির দুইপ্রান্ত দুই হাতের তালু দ্বারা খুবই আলতোভাবে উঠিয়ে ঠোঙ্গার ওপর ধরে তালু আলগা করে ফেলে ও এবং লুচিগুলো আপনা-আপনিই পড়ে যায় ঠোঙ্গার মধ্যে। এভাবে খরিদ্দারের চাহিদামতো লুচি দিয়ে চলেছে ও।

খরিদ্দার হচ্ছে আশপাশের মানুষ, মহিলাই বেশী। জেনেভা ক্যাম্প এটা। মোহাম্মদপুরের কলেজগেইট এলাকার এই ক্যাম্পের অতি ছোট্ট পরিসরে গাদাগাদি করে বাস করেন প্রায় দশ হাজার মানুষ। এক একটা পরিবারের ৪/৫ জন লোকের জন্য বরাদ্দ মাত্র সর্বোচ্চ ১৫০ হতে ২০০ বর্গফুট স্পেস, একটা বা দু’টা রুম। অতি কষ্টে বাস করেন এই মানুষগুলি। ক্যাম্পের মধ্যেই সকল রকমের নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান। এক পরিবার নাস্তার ব্যবসা করেন, আরেক পরিবার সবজির, রেষ্টুরেন্টের ব্যবসা আরেক পরিবারের। চায়ের দোকান, পান-সিগ্রেটের দোকান করেন আরেকজন, এইরকম।

কী নাই এখানে! মুরগীর নাড়িভুড়ি থেকে ফলসহ সকল প্রকার খাবারের দোকান, ফলমূল, সস্তা কসমেটিকস সবই পাওয়া যায়। ইনারাই ব্যবসায়ী, ক্রেতাও ইনারা। পন্যের বিনিময় সিস্টেম শুধু হয়না এখানে, টাকা দিয়েই সব লেনদেন হয়। প্রত্যেক পরিবারই ব্যবসা করেন এখানে, পন্যও কেনেন এদেরই কারো কাছে।

সেলিম মিয়া বলেন, একাত্তরের আগে মোহাম্মদপুরের অনেক এলাকায় আমাদের বসতবাড়ী ছিল, প্রভাবশালীরা সেগুলি দখল করে নিয়েছে। কাগজপত্র! তা-ও ছিল। তবে কথায় বোঝা গেল, পাকাপোক্ত কাগজপত্র ছিলনা তাদের। যেমন এখনও মোহাম্মদপুরে অনেক বিহারী পোক্ত কাগজের জোরেই নিজের বাড়ীতেই বাস করেন। এই জেনেভা ক্যাম্পের বিহারীদের সন্তানদের লেখাপড়া করা কষ্টকর। ক্যাম্পের ঠিকানা বললে ওদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি নেয়না। এরা তাই আত্মীয়, যারা এখনো মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় থাকেন, তাদের ঠিকানা ব্যবহার করে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করেন।

ঘিঞ্জি পরিবেশে বাস করেন ওরা, সেটা সয়ে গেছে; দারিদ্রতা ওদের নিত্যসিঙ্গী, সেটাও সকলের যখন একই অবস্থা, মেনে নেন অথবা নিয়েছেন ওরা। কিন্তু এদেশটা ওনাদের কী, প্রশ্ন করেন সেলিম মিয়া। বাধ্য হয়েই হোক কিংবা যেকোন কারনেই হোক, থাকেন যখন, তারা এদেশকে তাদেরই মনে করেন। কিন্তু অন্যরা, বাঙ্গালীরা! তারা কী ওনাদের এদেশী ভাবেন? ভাবলেও সেলিম মিয়ারা মনে করেন, ভাবেননা। এখানেই দুঃখ সেলিম মিয়াদের। তাদের একটি দেশ নেই। যেকোন মানুষের এটা একটা বিরাট মর্মবেদনায় জায়গা।

এই বেদনা নিয়েই লুচি ভেজে চলেন সেলিম মিয়া আর গণভবন সরকারী স্কুলের ক্লাস ওয়ানের বুদ্ধিদীপ্ত স্মার্ট ছাত্রী নাজমা তার মতো করে বাবার ভাজা লুচি কাগজের ঠোঙ্গায় ভরে চলে। একাত্তরে ওর বাবা শিশু ছিল এবং বাঙ্গালীদের সাথে কম মেশার কারনে মর্মবেদনা আছে তার, কিন্তু নাজমারা বাঙ্গালীদের সাথেই তো লেখাপড়া করছে, মিশছে। বাবার মতোই কী একই মর্মবেদনা সেও অনুভব করবে!

৩৮৩জন ৩৮৩জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

  • ছাইরাছ হেলাল

    প্যালেস্টাইন , নিজ দেশেই যারা উদ্বাস্তু।
    আপনার লেখার সাথে এ উদাহরণটি যায় না ,আমি যে জন্য বলিনি। যন্ত্রণা বোঝাতে চেয়েছি।

    প্রায় ভুলেই গেলেন!এমনই হয় এ রাজ্যে।

  • ব্লগার সজীব

    উদ্বাস্তু অবহেলা, বঞ্চিত থাকার একটি শব্দ। ভালো লিখেছেন ভাই। আমার জানা ছিলোনা যে নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুর দোকান এদের আবাসিক এলাকায় আছে, আর নিজেদের বাসস্থানের ঠিকানা দিলে এরা স্কুলে ভর্তি হতে পারেনা।

  • সাইদ মিলটন

    বিহারীদের নিয়া মানবতা দেখাইতে গেলেই আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় লাশের মিছিল , গলাকাটা আগুনে পোড়া লাশ সব । যুবক বৃদ্ধ শিশু ধর্ষিতা নারী সবাই আছে সে মিছিলে। তাদের কবর হয় নাই ,শ্যামপুরের ময়লার ডিপোতে পুতে দেওয়া লাশ সব। মীরপুরের শীয়ালবাড়িতে গনকবরে পুতে দেওয়া । স্যরি আপনাদের সুশীল মানবতা আমার অশ্লীল লাগে

     

  • আজিম

    ওরা এখনো পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ ওড়ায়, ব্যাপারটা আমার জানা ছিলনা। এটা করে থাকলে এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ, রাষ্ট্রদ্রোহিতার কাজ এটা বলে মনে করি।

    একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশে কিছু বিহারী বাস করতেন। অধিকাংশ-ই তারা ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আগত। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক তারা ছিলেন, এটা পাগলেও বিশ্বাস করবেনা। তবে আমাদের দেখার বিষয়, তারা বাঙ্গালীদের উপর অত্যাচার করেছিলেন কি-না। সব ভাষাভাষি জণগোষ্টীর‘ই কিছু মানুষ উগ্র থাকে। তৎকালীন এদেশে বসবাসরত বিহারীদের মধ্যেও কিছু উগ্র মানুষ অবশ্যই ছিল। তারা পাকিস্তানী সেনাদের সাথে হাত মিলিয়ে বাঙ্গালীদের উপর অত্যাচার-গণহত্যাও করেছিল, সবই সত্যি। আবার সব বিহারী সেই অত্যাচারে সামিল হননি এটাও ঠিক।

    সব মিলিয়ে একাত্তরে এদেশে বসবাসরত বিহারীদের একটা অংশের ভুমিকা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, যুদ্ধাপরাধমূলক, মানবতাবিরোধী ছিল। তাই বলে আমি সব বিহারীদের উপর এই দোষ চাপাবনা।

    আর আমার এই লেখার পটভূমি হচ্ছে, মিডিয়ার দুই বন্ধূ সহকারে এক কাজে গিয়েছিলাম ওদিকে। মনে হল, ওদের একটু দেখাই জেনেভা ক্যাম্পটা, লেখার যদি কোন কিছু পায় ওরা ওখানে। এটাই শুধু, আর কিছু না। জনাব সাইদ মিল্টন যদি মনে কোন ব্যথা পেয়ে থাকেন, তবে আমি স্যরি।

  • খসড়া

    আপনার কথার সাথে একমত হতে পারলাম না কিছুতেই না। এ আপনার নিজের বোঝার ভুল। আপনি কি বিহারী? যদি হন তবে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এদেশকে এ দেশের ভাষাকে কোন দিন নিজের বলে ভাবেছেন? কখনই না? আমি ১০০% জোর দিয়ে সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে আপমানে সমর্থন দেব। ওরা এদেশকে সেই আগের মতই ঘৃণা করে সেই আগের মতই পিছন থেকে ছুরি চালাবার জন্য অস্থীর হয়ে আছে ওরা নিজেরা ভিষণ হিংস্র একরোখা ও পাকিস্তান প্রেমিক। ভাব দেখায় ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না। আমি ওদেরকে দেখেছি সারা জীবন কিছুতেই পাড়িনি দেশকে ভালবাসাতো দূরের কথা বাংলা শেখাতে। প্রতিটি স্কুল ওদের নেয়, কে বলেছে নেয় না? না যেনে এমন পোস্ট কাংখিত নয়, এশুধু বিভ্রান্তি ছড়াবে।

  • আজিম

    আপনি একমত হতে না পারলে সেটা আপনার বিষয়।

    আমি বিহারী নই।

    অন্য ভাষাকে নিজের ভাষা বলে ভাবতে পারেনা কেউ; নিজেকে দিয়ে ভাবার চেষ্টা করুন।

    ”ওরা এদেশকে সেই আগের মতই ঘৃণা করে সেই আগের মতই পিছন থেকে ছুরি চালাবার জন্য অস্থীর হয়ে আছে ওরা নিজেরা ভিষণ হিংস্র একরোখা ও পাকিস্তান প্রেমিক। ভাব দেখায় ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না।” – এটা সম্পর্কে আমার ধারনা নাই।

    আর স্কুলে ভর্তি  না নেয়া সম্পর্কে  কথাটা ওদেরই একজন বলেছেন, সেটা বলা হয়েছে। এটা কী তদন্ত করে দেখে তারপর লিখতে হবে না-কি?

  • খসড়া

    “আপনি একমত হতে না পারলে সেটা আপনার বিষয়।” —না বিষয়টা জাতিগত, একা আমার নয়। এই পোস্ট আপনার গোপন ডাইরী নয় যে যা খুশি ভেবে লিখে রাখলেন। আপনি আপনার বক্তব্য জনসম্মুখে এনেছেন জাতির প্রশ্ন তুলে এটা বোঝার বয়স হয়েছে আশা করি।

    “অন্য ভাষাকে নিজের ভাষা বলে ভাবতে পারেনা কেউ; নিজেকে দিয়ে ভাবার চেষ্টা করুন।” —-খুব পছন্দ হয়েছে কথাটা । এটা আপনার মত ক্ষুদ্রমস্তিস্ক থেকে বের হওয়াই যথার্ত। যারা বাংলাকে অন্য ভাষা ভাবে তারা এ দেশে থেকে ১ম শ্রেনীর নাগরিক মর্যাদা কিভাবে পায়? তাদের নাগরিক মর্যাদা দেয়া কি উচিৎ?। কিন্তু আমরা দিয়েছি।
    তারা এদেশের খাবে, এদেশের পরবে, এদেশে উর্দূ বলবে ,পাকিস্তানের জন্য জান দিতে ছুটবে, এদেশে হাগবে ,মুতবে —-তারা এদেশকে পর দেশ ভাববে, এদেশের ভাষাকে পর ভাষা ভাববে ? কি আশ্চর্য (বিহারী না) আপনি।

    তদন্ত করেই লিখতে হবে। যখন কোন পোস্ট দেবেন যেখানে জাতিগত ভাবমূর্তি বিদ্যমান সেখানে যা খুশি তা লিখবেন না। ওদের কি দেয়া হয়নি? ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সবই দেয়া হয়েছে। তারা স্কুলে পড়ছে, কলেজে পড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, ইঞ্জিনিয়ারিং ডাক্তারী সব যায়গায় ওদের বাংলাদেশীদের মত সমান বিচরন। ব্যাবসা, বানিজ্য চাকুরী, স্কলারশীপ এমন কি সরকারী চাকুরীতেও তারা একই ভাবে আছে। যেখানে অন্য ধর্মের ঠাঁই নাই সেখানে বিহারীরা বহাল তবিয়তে আছে। বাংলার মানুষ বস্তিতে থাকে না?
    বাংলার মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে না? তাদের চোখে দেখেন না? আবার বলেন আমি বিহারী না।
    আগে জানুন তারপর লিখুন। মুক্তিযুদ্ধ কি আপনি জানেন? কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ শব্দটা শুনেছেন? অনেক বই আছে , অনেক তথ্য আছে সেগুলি দেখুন।অন্য কোথাও না পেলে আমার ব্লগে পাবেন। কিন্তু আপনার মত বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে আমি আমার লিংক দেব না, কারন তা বোঝার মত ক্ষমতা বা বুদ্ধি কোনটাই আপনার নেই, খুঁজে নিয়ে পড়ুন জানুন। আমার মন্তব্যের উত্তর দেবার আগে ভাল করে তদন্ত করে জেনে বুঝে উত্তর দেবেন নচেৎ নয়।

    • আজিম

      “ক্ষুদ্রমস্তিস্ক”! এ-ই তাহলে আপনার ভাষা!

      আসলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দ্বারা পরিচালিত এক ব্যক্তি, যে চেতনা বলে “মানবতাবাদ”, যেখানে আপনার চিন্তাধারার মতো উগ্র জাতীয়তাবাদের কোন স্থান নাই।

      বিহারীদের কোন দাবী নিয়ে প্রতিবেদনটিতে কিছুই বলা হয়নি, তাতে-ই যত কথা বললেন, আপনার সাথে আমি আর কোন কথাই বলবনা। অতএব আমার মন্তব্যের আর কোন উত্তর আপনি দেবেননা।

  • সাইদ মিলটন

      ওরা এখনো পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ ওড়ায়, ব্যাপারটা আমার জানা ছিলনা। এবং
    মিডিয়ার দুই বন্ধূ সহকারে এক কাজে গিয়েছিলাম ওদিকে।

    এই কথা দুইটা পরস্পর বিরোধী হয়ে গেলনা ? জেনেভা ক্যাম্পে ঢোকার মুখের এই সাইনবোর্ডে কি লেখা স্যার ?

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য