সোনেলা দিগন্তে জলসিড়ির ধারে

টুকরো রহস্যময় ঘটনা।

সাবিনা ইয়াসমিন ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, ১২:৩৯:০১পূর্বাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

ঘটনাটি যখন ঘটে তখন রাত এগারোটা অতিক্রম করে ছিলো।জুন মাস ২০০৯ইংরেজি সাল।তার আগে টানা তিন/চারদিন অবিরাম বৃষ্টি হয়েছিলো।জলাবদ্ধতার কারনে চারদিকেই থৈথৈ টলমলে পানি জমেছে।রাস্তা,উঠোন,ঘর কোনো জায়গা আর বাকি নেই।আমাদের বাড়িটা একটি ছোটো রাস্তার ধারে।ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে প্রায় সারাদিন জানালার পাশে বসে বসে গৃহবন্দী হয়ে নানা রকম মানুষের চলাফেরা দেখতাম।এছাড়া আর বিশেষ কিছু করার ছিলো না।সিড়ির অর্ধেকটাই পানিতে ডুবে ছিলো।গ্যাস,বিদ্যুৎ এর সংযোগ বন্ধ করে রাখা ছিলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে।বিদ্যুতের আলো না থাকায় হ্যারিকেন আর মোমবাতির আলো-আধারী পরিবেশ,চারদিক চুপচাপ নিরবতা,,এর মাঝে হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকারে মানুষের চলাচল,তাদের পানিতে প্রতিধ্বনিত হওয়া কথা গুলো শুনে কেমন একটু ভয় ভয় অনুভুতি হতো।

সেদিন সকালে বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।সন্ধযায় ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠলো।ভয়টা দূর হয়ে গেলো।পানির উপরে রাস্তার বাতির আলোর প্রতিফলন দেখত খুব সুন্দর লাগছিলো।বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম।বাচ্চাদের বাবা বাইরে গিয়েছিল,পানি কতটা কমেছে,বাড়ির সদর দরজায় তালা দেয়া হয়েছে কিনা ইত্যাদি দেখতে।কিছুক্ষন পর হঠাৎ করে তিনি ঘরে এসে বললেন, তাড়াতাড়ি চলো এক্ষুনি নানার বাসায় যেতে হবে।তিনি মারা গেছেন।আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম।আমার নানার বাড়ি আমার বাড়ি থেকে হাটা পথে দশ মিনিটের পথ।রাত বেশি ছিলো।আমি বাচ্চাদের জাগালাম না।পাশের রুমে গিয়ে ভাবীকে বললাম ওদের একটু দেখবেন।আমি যাচ্ছি।গিয়ে দেখি,সেখানে প্রচুর লোকজন এসেছেন নানাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে।আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী ও নানার সংগী সাথিরা সবাই।কেউ বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন।রাস্তা ঘাটে তখনো প্রায় হাটুপানি।রাত ক্রমশ বাড়ছিলো।উপস্থিত সকলে মিলে ঠিক করলেন ফজরের নামাজের পর জানাজা নামাজ হবে এবং তার পর দাফন সম্পন্ন করা হবে।বাড়িতে অনেক মানুষ ছিলেন।আমি ঠিক করলাম বাড়ি চলে যাবো আর মেয়েদের নিয়ে পরে আসবো।তাছাড়া আমি না গেলে ভাবীও বসে থাকবেন।

আসার সময় একা আসতে ইচ্ছে করছিলো না।কার সাথে আসবো ভাবছি।উঠোনে অনেক লোকের ভীড় ছিলো।তার মধ্যে আমার ছোট ভাইকে পেলাম।ওকে বললাম আমার সাথে চলো বাড়ি যাবো।ও কোনো কথা না বলে সাথে এলো।হাটু পানিতে হেটে চলেছি দুই ভাইবোন।চারপাশে কোনো সাড়া শব্দ নেই।দোকানপাট বন্ধ।আমি সামনে ভাই একটু পিছনে।আমি যাই বলছি ও শুধু হু-হা করছে।ও বরাবরই ভাইটা আমার থেকে একটু পিছনে হাটে।আর কথা কম বলে।যাইহোক,,বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে ওকে বললাম এবার তুমি যাও,আমি ঘরে যেতে পারবো।আরো কিছু বলতে চাইছিলাম,পিছু ফিরে দেখি কেউ নেই!!চারদিক ফাকা, নিস্তব্ধ,শুধু পানির উপর দিয়ে চলাচলের ক্ষীণ একটি রেখা যেটা এখনো মিলিয়ে যায়নি।আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার ভাই এতো তাড়াতাড়ি দুই সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় পনের গজ রাস্তা কিভাবে পার করে চলে গেলো। আমি কোন রকম ঘরে ঢুকলাম।ঘড়িতে তখন রাত দুইটা বেজে আটত্রিশ মিনিট।

আমি ভাইকে ফোন দিলাম।কি ব্যাপার কোথায় তুমি?
ভাই উত্তর দিলো সে ও তার বন্ধুরা নানার দাফন,কাফনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনতে গেছে।প্রায় সব কেনা শেষ।একটু বাদেই এসে পরবে।আমি কিছু না বলে ফোন রেখে দিলাম।ঘন্টা খানিক পর আবার নানার বাড়ি গেলাম।মা বল্লো এতক্ষন কোথায় ছিলে? জামাই এসে তোমাকে খুজলো কোথাও পেলো না।(!)বাড়িতেও ছিলে না(!?!)। আমি বললাম বাড়ি গিয়েছিলাম।ভাইকে বকা দিতে চাইলাম আমাকে ভয় দেখানোর জন্যে।ভাই বললো ওর সাথে নাকি রাতে আমার দেখাই হয়নি।শুধু আমার ফোন পেয়েছিলো।কি বলেছিলাম ও কিছুই বুঝে নাই।

আমি সপথ করে বলতে পারি সেদিন রাতে কেউ আমার সাথে ছিলো।আমি তার উপস্থিতি অনুভব করেছি।আমি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনেছি।তার সাথে কথা বলেছি।কিন্তূ কে ছিলো আজও জানতে পারিনি।

* সমাপ্ত *

৭৩৮জন ৭৩৬জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য