টুইয়ের গল্প…

নীলাঞ্জনা নীলা ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫, মঙ্গলবার, ১১:০৪:৫১পূর্বাহ্ন গল্প ২৬ মন্তব্য

টুইয়ের আজকাল খুব মন খারাপ থাকে। বড়ো হলে নাকি মন খারাপ বেড়ে যায়, সৌম্যতা বলেছে। সেটা ও একটু একটু করে বুঝতে পারছে। আগে কাঁদলেই মামনি দৌঁড়ে আসতো, এখন দূর থেকেই বলে, “এই কি হয়েছে? এত্তো বড়ো মেয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে। লজ্জ্বাও নেই। চুপ কর!” এতোই কি বড়ো হয়ে গেছে টুই যে কান্না পেলে কাঁদতেও পারবে না! খুব মন খারাপ হয়ে যায়। যদিও বাপি অনেক আদর করে, অফিস থেকে এসেই ডাকবে, “আমার পাখীটা কইরে?” ওই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকে টুই। আর মামনি বলবে, “যত্তো আদিখ্যেতা! সারাটাদিন আমি যে কি নিয়ে থাকি, সে আমি-ই জানি।” বাপি কিছু বলেনা।

সেদিন কি হলো, স্কুলে যাবার জন্যে যেই রেডি হলো অমনি মাথা ঘুরে পড়ে পড়ে গেলো টুই। মামনি দৌঁড়ে এসে বকুনি, “দেখে চলতে পারিস না?” কি করে বলবে টুই হঠাৎ যেনো চারপাশ ঘুরতে লাগছিলো আর তারপর সব অন্ধকার। কপালের কোণা ফুলে ঢোল। গজগজ করছিলো আবার কোল্ড ব্যাগও চেপে ধরেছিলো ইন্দ্রাণী, টুইয়ের মা। স্কুলে ফোন দিয়ে ছুটি নিয়েছিলো। ইন্দ্রাণী যে স্কুলে চাকরী করে, টুইও সেই স্কুলেই পড়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যে আবার বমি করলো, আর প্রচন্ড জ্বর। ডাক্তার ডেকে আনা হলো। প্রচুর টেষ্ট, কিন্তু কিছুই পাওয়া গেলো না। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন ইন্দ্রাণীর অস্থিরতা-যন্ত্রণা। টুইয়ের কষ্ট হচ্ছিলো খুব। কেন যে এমন অসুস্থ হলো।
—“সোনা খুব কষ্ট হচ্ছে?
টুই দু’দিকে মাথা নেড়ে না বললো। —কিছু খাবি? যা মন চায় বল।”
টুই অবাক। মামনিকে অনেকদিন রাগ করতে দেখেনি। তাই বললো, “ভ্যানিলা-ম্যাঙ্গো ফ্লেভার আইসক্রীম খেতে ইচ্ছে করছে। খেতে পারবো?”
কিছুক্ষণের মধ্যেই আইসক্রীম উপস্থিত। টুই যথেষ্ট অবাক। অসুস্থতা অনেক ভালো, এতো এতো আদর। শুধু একটাই খারাপ খেলতে যেতে পারছেনা। স্কুলে অনেক গল্প-আনন্দ সবকিছু মিস হচ্ছে। কিন্তু মামনির এই আদরটুকু যে পাচ্ছে, এটা কম কি! সৌম্যতা ভুল বলে বড়ো হয়ে গেলেই যে মন খারাপ বেড়ে যায়। এই যে এখন ও কতো বড়ো, ক্লাশ টু-তে উঠেছে। তারপরেও কতো আদর।
—“মামনি, কাঁদছো কেন? তুমি আমার চেয়ে এতো বড়ো হয়ে কাঁদছো? ”
ইন্দ্রাণী হেসে ফেললো। বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বললো, “স্কুল যাবি? ডাক্তার বলেছে আবার তুই স্কুল যেতে পারবি।”
টুই চেয়ে রইলো। মামনি যখন শুধু বকতো, তখন একদিন বাপিকে বলতে শুনেছে,
—“আদর তো কম করোনা। এতো বকো কেন? কেজো আদরের চেয়েও অকাজের আদর সবাইকে টানে। মেয়েটাকে সেই আদর দিও।”

এভাবে কথা শোনা খুব বাজে। কিন্তু তাও সরে আসতে পারেনি। তবে কেজো মানে বোঝেনি। অকাজ শব্দটা মামনি প্রায়ই বলে, ওটাও বোঝেনা টুই। অবশ্য আর কিছু বোঝার দরকার নেই, এটুকুই চাওয়ার ছিলো। ইন্দ্রাণী আর টুইয়ের বাবা তিমির দুজনেই একসাথে টুইয়ের রুমে এলো। অনেক কথার মধ্যে টুই একটি প্রশ্ন করলো,
—“আচ্ছা বাপি কেজো আর অকাজের আদর কাকে বলে?”
—“কোথায় শুনেছিস কথাটা?”
—“তুমি মামনিকে বলছিলে শুনে ফেললাম। ইচ্ছে করে শুনিনি।”
—“দেখেছো কেন বকি তোমার মেয়েকে?” ইন্দ্রাণী বললো।
—“মামনি আয়াম স্যরি। এমন আর কখনো করবো না। প্রমিজ।”
ইন্দ্রাণী এবং তিমির হেসে ফেললো।

**জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ছোটদের জন্য একটা গল্প লেখার চেষ্টা করলাম। প্রথম গল্পটি আমার ছেলের জন্য লেখা ওর জন্মের কিছুদিন আগে।**

হ্যামিল্টন, কানাডা
২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ইং।

৪০৪জন ৪০৪জন
0 Shares

২৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ