টাকা দে চাদে যামু শেষ পর্ব

মনির হোসেন মমি ১৯ অক্টোবর ২০২১, মঙ্গলবার, ০৯:২৫:৫২অপরাহ্ন গল্প ৫ মন্তব্য

বাতেনের ছেলে মেয়েরা অসহ্য তার নাক ডাকোনিতে শান্তিতে বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে পারছেন না।তার নাক ডাকা ভয়ংকর শব্দের ভিন্নতায় মাঝে মাঝে তার বউ সারা রাত বসেই কাত হয়ে ঘুমান।আজ যেন বাতেন মিয়া নাক ডাকার শব্দ যেন একটু বেশীই করছেন,সেই সাথে হাত পা দেহের উতাল পাতাল পরিবারে কাউকে ঘুমাতে দিলো না। শেষ রাতে তারা ঘুমের ঘোরে বাতেন মিয়ার উৎদ্ভট অঙ্গ ভঙ্গিগুলো দেখছেন।বউতো দেখে রীতিমতো অবাক৴ঘুমের ঘোরে স্বামী আজ কাথামুরি দিয়ে ঘাটের এপাশ ওপাশ শুধু গড়াগড়ি খাচ্ছেন কেন? বাতেনের এমন পরিস্থিতি দেখে তাদের সন্তানেরা ভয়ে মায়ের বিছানায় এসে মাকে জড়িয়ে ধরে ঝিমুচ্ছে।কিছুক্ষণ পর বাতেনের গোঙানি শব্দ এবং সাথে কিছু অস্পষ্ট কথার শব্দ ‘না না না যামুনা…ছাড় আমারে ছাইড়া দে….. ইত্যাদি শব্দগুলো তার বউকে আরো ভাবিয়ে তুলল।

ভাবছেন৴এই মানুষটার আজ হলোটা কী! ভয়ে তাকে ডাকও দেয়ার সাহস পেলেন না শুধু চোখ বন্ধ করে “আল্লাহ তুমি রহম করো” বলে উদ্বিগ্নমন।এরমধ্যে বিকট শব্দে কাথা পেচানো বাতেন মিয়া ঘাট থেকে পড়ে গেলেন।
-আমি কৈ?

বউ অবাক হয়ে বললেন।
-কেন আপনি কী চাদে আছিলেন নাহি ?
-হ্ তাইতো!!আমি এহানে আইলাম কী কইরা ?
বউ আরো ঘাভরে গেলেন।
-ওরে আল্লাহ তুই রহম কর!
-এই বউ কী কছ এসব!!আমারে আরো টেকা দে চাদু যামু।।

বউ এবার বুঝে ফেলেছেন স্বামী মনে হয় পাগল না হইলেও পাগলের কাছা কাছি চলে গেছেন।এর মধ্যে মসজিদে ফজর নামাজের আযানের শব্দ কানে ভেসে এলো।বাতেনের বউ মাথায় কাপড়ের আচঁল দিলেন।বাতেন মিয়া গায়ে পেচানো কাঁথাগুলো ছুরে দিয়ে দুহাটু এক করে মাথা নীচু করে বসে রইলেন।পুরো এক দিন এক রাত পার হয়ে গেলো বাতেনের তেমন কোন চৈতেন্য ফিরে আসছে না।গতকাল যে চাদে জমি কেনার দলিল দেবার কথা সেই কথাও মনে হয় সে ভুলে গেছে।পর দিন সকাল বেলায় তার হঠাৎ মনে পড়ল চাদে জমি বিক্রেতার কথা।হুটহাট করে জামাটা কাধে রেখে ঘর থেকে বের হলেন বাতেন মিয়া।গৃহস্থলির কাজের ফাকে বউ বাতেন মিয়াকে দেখছেন।

গ্রামের মেঠোপথ ধরে বাতেন মিয়া চিন্তা করতে করতে মাথা নীচু করে হাটছেন।কেউ একজন তাকে সালাম দিয়েছিলো তা সে না শুনেই কেবল হেটে চলছেন আর মুখে বিরবির করে কী যেন বলে যাচ্ছেন।।এবার তাকে সালাম দিলেন তাদের গায়ের এক মাস্টার সাহেব।সালামের এই জবাবটায় বাতেন মিয়া উত্তর দিতে দাড়িয়ে গেলেন।৴অআলাইকুআসলাম….
বাতেন মিয়া মাস্টার মশাইয়ের হাত চেপে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে গাছের ছায়ায় দাড়িয়ে খুব আস্তে আস্তে বললেন ।
-আচ্ছা মাস্টার মশাই, আপনিতো জ্ঞানি মানুষ একটা কথা জিগাইতাম ?
-কী কন,সমস্যা নাই।
-আচ্ছা চাদে কী হাছাই মানুষ বউ পোলাপান লইয়া থাকতে পারবো ?
-দূর চাচা! কী যে কননা! চাদে আবার মানুষ থাকবো কেমনে? ওখানেতো পৃথিবীর মতো স্নিগ্ধ বাতাস- অক্সিজেন কিছুই নেই।
-অকজিকেন! এইডা আবার কী?
-আহারে আপনিতো দেখি কিছুই জানেন না।এই যে আমরা শ্বাস নিতাছি তাই হলো অক্সিজেন।এখন বলেন এই শ্বাস নেয়া ছাড়া কী আপনি বাচতে পারবেন? তাছাড়া চাদ দিনের বেলায় থাকে উত্তপ্ত মরুভুমির মতো গরম আর রাতে থাকে বরফের মতো শীতল সেখানে মানুষ থাকবে কী করে আপনিই কন?
-কী কও মাস্টার! আমিতো আমিতো পাগল হইয়া যামু…..।।
-আচ্ছা কী হইছে একটু খুইল্লা কনতো…।

আর কোন কিছুই জিজ্ঞাসা কিংবা মাস্টার মশাইয়ের উত্তর না দিয়ে সে শুধু সামনের দিকে দ্রুত পা চালাচ্ছেন।মাস্টার মশাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন।লোকটা কী পাগল টাগল হইয়া গেলো নাকি!!

যে বাজারে চাদে জমি বিক্রয়তার সাথে জমি কেনার রেজিস্ট্রি করেছিলেন সেখানে গিয়ে একটু দূর থেকে দেখলেন দোকানটা খোলা আছে।আত্মায় যেন পানি ফিরে এলো তার।সে এবার দোকানটির খুব কাছে গেলেন।দোকানে ডেকোরেসন সাইনবোর্ড পরিবর্তন দেখে মাথা চক্কর খেল।এতো অন্য সাইনবোর্ড।একটাতো দর্জির দোকান।তাহলে !তাহলে, সে কই গেলো কই ? দর্জির দোকানদারদের ডাকলেন।
-এই ভাই এই ভাই…
একজন বেরিয়ে এলেন।
-কী চাচা পাঞ্জাবী বানাবেন?
-আরে দূর মিয়া রাহেন আপনার পাঞ্জাবী!! এখানে ঐ লোকটা কৈ?
-কোন লোক? নাম কি?
-নাম…নামতো জানিনা তয় মুখ চিনি।
-তাইলে এখানে খারাইয়া থাহেন হেয় আইলে চিন্না লইয়েন।
বলে লোকটি দোকানের ভেতরে চলে গেলেন।বাতেনের মাথা নষ্ট টাকা হারানো শোকে শরির অবশ হয়ে আসছে, জানা বিষয়গুলোও যেন ভুলতে বসেছেন।হঠাৎ বাতেন মিয়া দর্জি দোকানের ভেতর ঢুকে গিয়ে সেই লোকটিকে বলতে লাগলেন।
-আমার টাকা দে ..তোরা সব বাটপার আমার টাকা ফেরত দে…
-কীসের টাকা?
-আমি চাদে জমি কিনবো টাকা দিছি হেই টাকা দে….
-আরে চাচা ছাড়েনতো….কারে টাকা দিছেন আপনি? আর চাদে জমি কৈ যে কিনবেন?যান যান এখানে পাগলামী করার জায়গা না।

৴কি আমি পাগল!!

দুজনের ধস্তাদস্তি শুরু হয়ে গেলো।দুজনের জামা দুজনেই ছিড়ে ফেললেন।দর্জি লোকটির এক ধাক্কাতে মাটিতে পড়ে কাদায় বাতেনের জীবন শেষ।কাদায় ল্যাপ্টে বাতেন মিয়া হয়ে গেলেন জ্ঞানশুন্য ব্রেনআউট।পূর্ব বর্তমান কিছুই আর তার মনে পড়ছে না।ভবিষৎ কি তাও তার অজানা।কাদায় সিক্ত দেহটাকে কোন মত মাটির উপর দাড় করালেন।আকাশপানে বিজলির চমকানি দেখে বাতেন খিলখিলিয়ে হাসেন।

৴ঐঐঐতো হাহাহাহা ….আমার জমি  ঐতো৴যামু কেমনে টাকা দে৴চাদে যামু টাকা দে৴৴৴।

শুধু এই একটি কথা ছাড়া তার মুখে এখন আর কোন বাক্যই আসে না।টাকা দে চাদে যামু… জমি কিনমু।

খুব শ্লো হাটছেন বাতেন মিয়া।ছেড়া জামা আর কাদায় দেহের অবস্থা ভুতুরে ।মাথার চুলগুলো কাদায় বিশ্রী অবস্থায়।সামনে কিছু দুষ্ট পোলাপাইন বাতেনকে এ অবস্থায় দেখে বলতেন থাকল৴ওপাগলা তোর পাগলি কই? কেউ কেউ আবার জামা ধরে টান দেয়।হিতাহিত জ্ঞানশুন্য বিচলিত বাতেন মিয়া।

 

লোভে পাপ পাপে মৃত্যু প্রচলিত কথাটার সত্যতার প্রমান এই পৃথিবীর এই জমিনেই অসংখ্য রয়েছে৴ তাই কোন কিছু পাওয়ার অতি লোভ করতে নেই।স্রস্টার শ্রেষ্ট জীবন মানুষ। অক্ষর জ্ঞানহীন হলেও ন্যুন্নতম কমনসেন্স সবার মাথায় থাকা উচিত।চিলে কান নিয়ে গেলো বলে যেমন চিলের পিছনে দৌড় দেয়াটা ঠিক হবে না তেমনি মানুষের সব কাজই যে সঠিক তাও ভাবা অবান্তর।

পড়তে পারেন গত পর্বটি

 

৪১৫জন ১৭৭জন
0 Shares

৫টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য