ঝিনুক (সোনেলা ম্যাগাজিন ২০২২)

মুক্তা ইসলাম ১১ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১২:৫৪:০৬পূর্বাহ্ন ছোটগল্প ৪ মন্তব্য

জানালা দিয়ে কনকনে হিমেল হাওয়া হুহু করে ঘরে প্রবেশ করছে। কনকনে হাওয়ার হিমেল পরশে কাঁপতে কাঁপতে চোখ খুললেন আখলাক সাহেব। শীতের সকাল। চারিদিক ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। এখন সকাল না সন্ধ্যেবেলা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেননা তিনি।

তার মাথা বরাবর এখনো একশত পাওয়ারের সাদা আলোর দুটি বাল্ব জ্বলছে। আখলাক সাহেব পুরোনো দিনের মানুষ। তাই তার বাড়িটিও অনেকটাই পুরোনো ধাঁচে তৈরি। চারিদিক ঘন ঝোপঝাড় আর আগাছায় ঢেকে থাকায় বাড়িটিকে বাইরে থেকে দেখলে অনেকটাই ভৌতিক বাড়ি বলেই মনে হবে। বাড়িটি তার পিতৃসূত্রে পাওয়া। এক তলার এই পুরোনো বাড়িটির তিনটে কামরার সবচেয়ে বড় কামরাটিকে তিনি একই সাথে তার বসার ঘর এবং চ্যাম্বার বানিয়েছেন। আখলাক সাহেব পেশায় একজন সাইক্রিয়াস্ট্রিক। বয়স ষাঁট ছুইছুই।

তার স্ত্রী একজন সমাজকর্মী। সুখী সংসার তাদের। তবে সুখী এই দম্পত্তির কোন সন্তান নেই। ইদানিং এই ঘরটিই আখলাক সাহেবের শোবার ঘরে পরিণত হয়েছে। বয়সের কারণে তিনি তার শরীরে আর আগের মত জোর পান না। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পরেন। ঘন ঘন ক্ষুধা লাগে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে দেরিতে উত্তর দেন। কয়েকদিন যাবত প্রচন্ডরকম মানসিক ডিপ্রেশনে ভুগছেন তিনি। আখলাক সাহেবের ঘুম ভাঙ্গার পর পরই সোফার সামনের টেবিলে রাখা দৈনিক পত্রিকাটি চোখে পরল তার।

তিনি বিড়বিড় করে বলছেন, “আজকের পত্রিকা? তার মানে এখন সকাল হলো মাত্র।” আখলাক সাহেব কখনোই পত্রিকার প্রথম অথবা শেষ পাতা পড়েন না। তিনি পড়েন মাঝামাঝি পাতার সংবাদগুলো। পড়তে পড়তে প্রথম পাতায় পৌছান। পত্রিকা পড়তে পড়তে হঠাৎই একটা আত্মহত্যার সংবাদ পরে তিনি থেমে গেলেন। রাজধানীর নাম করা একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর আত্মহত্যা। মেয়েটির নাম আর ছবি দেখে চমকে উঠলেন আখলাক সাহেব। তার হাত পা কাঁপতে শুরু করল। এই শীতেও তার কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে।তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেছে তার।

মেয়েটি তার পরিচিত। তার খুব কাছের একজন মানুষ। আত্মার মানুষ। আখলাক সাহেবের এখনও স্পষ্ট করে মনে আছে ঝিনুক যেদিন তার বাসায় প্রথম এসেছিলেন। তাদের সেদিনের আলাপচারিতার কিছু অন্তরঙ্গ মুহুর্ত। ঝিনুকের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল এস.এম.এসের মাধ্যমে। ঝিনুক বহুদিন যাবত হিস্ট্রিয়োনিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছিলেন।কোন এক বন্ধুর কাছ থেকে ঝিনুক তার ঠিকানা পেয়ে তার সাথে যোগাযোগ করেন। এস.এম.এস চালাচালির মাধ্যমেই তাদের যোগাযোগ হয়। সেই থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। প্রথম দিন তার বাসায় এসেই ঝিনুক বলেছিল, “আখি আমাকে কিছু খেতে দাও তো। আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। তুমি পরে আমার চিকিৎসা করো। ঝিনুকের কথা শুনে আখলাক সাহেব মুচকি হাসলেন। যথাসময়ে ঝিনুকের জন্য নাস্তা এলো। তিনটে লাল আটার রুটি আর এক বাটি সবজির তরকারী। ঝিনুক বায়না ধরল। তুমি আমায় খাইয়ে দাও। আখলাক সাহেব মুচকি হেসে ঝিনুককে বাচ্চাদের মত রুটির টুকরোয় সবজি মিশিয়ে খাওয়াতে শুরু করলেন। ঝিনুক খুব মন দিয়ে সবটুকু রুটি আর সবজি খেলেন।

এবার আখলাক সাহেব একটা খাতা আর একটা কলম নিয়ে ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে বসলেন। আখলাক সাহেব ঝিনুকের মুখের দিকে চেয়ে বললেন, তোমার এই সমস্যাগুলো কতদিন ধরে তুমি উপলব্ধি করছো ?

ঝিনুক :- কোন সমস্যা ?                                                আখলাক সাহেব :- এইযে তুমি হঠাৎ করে রেগে যাও।সবসময়ম অস্থির থাকো। যে তোমায় পাত্তা দেয় না তার পিছনে ছুটতে থাকো। অথচ,যারা তোমায় ভালবাসে তুমি তাদের সময়ই দাও না। নিজের ইচ্ছে মতন সবকিছু আশা কর। মনের মত না হলে বাচ্চাদের মত কান্না কর।

ঝিনুক একটু গম্ভীর স্বরে মাথা নীচু করে বলল, “আমার তো কোন সমস্যা নেই, আমি খুব ভাল আছি। আমি তো শুধু চাই আমার আশেপাশের মানুষগুলো বদলে যাক।”

আখলাক সাহেব অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন ঝিনুকের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তিনি তার হাতের কলমটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন আর মনে মনে ভাবছেন,মেয়েটার মধ্যে অদ্ভুত একটা ব্যাপার আছে। গত ত্রিশ বছরে আমি বহু রোগীর চিকিৎসা করেছি। রোগীরা ব্লেড দিয়ে নিজেই নিজের হাত-পা কেটে রক্তাক্ত করেছে।চিৎকার-চেঁচামেচি করেছে। সেদিনও আমার বাসায় এসে এক মহিলা রোগী আমার সখের দামী ফুলদানীটা ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো করেছেন সেই সাথে তার স্বামীর কলার ধরে টেনে ভদ্রলোকের শার্টের প্রত্যেকটা বোতাম এক এক করে কামড়ে কামড়ে ছিড়েছেন। অথচ, এই মেয়েটি কি শ্বান্ত ! কি নির্মল ! দেখতে কি সুন্দর। দৈর্ঘ্যে বেশ বড় নয়, মাঝারী গড়ন, শ্যামলা গায়ের রং এর উপর কালো মিশমিশে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ঘাড়ের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে।মেয়েটির দীর্ঘ কালো কুচকুচে চোখগুলো দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত অন্জলী দিয়ে বিধাতা যেন ওর চোখের কুটুরীর ভেতরটা লেপ্টে দিয়েছেন। কি সাধারণ ! কিন্তু উজ্বল!জ্বলজ্বল!

ঠিক যেন এক টুকরো “কালো হিরে”। মেয়েটির হাসি-খুশি প্রানবন্ত চেহাড়ার স্নিগ্ধতায় যেন পৃথিবীর সব সুখ ওকে ঘিরে রেখেছে। কিসের এত কষ্ট ওর ? কিসের এতো অভিযোগ পৃথিবীর মানুষগুলোর উপর? আমি কি পারব ঝিনুকের সব কষ্ট দূর করে ওঁকে নতুন একটা জীবন উপহার দিতে ?

আখলাক সাহেব কাঁদছেন। তিনি এবার খুব জোরে জোরে কাঁদছেন আর বলছেন, “ঝিনুক তুমি এটা কি করলে ? কেন করলে ? প্রিয় ঝিনুক ! তুমি আমার ঝিনুক ! তুমি ভাল থেকো।খুব ভাল থেকো তোমার নতুন পৃথিবীতে। সরি! তুমি আমায় মাফ করে দিও। আমি তোমার আশেপাশের মানুগুলোকে বদলাতে পারিনি। শুধু বদলে দিয়েছি তোমাকে। বদলে দিয়েছি তোমার জীবন।”

আখলাক সাহেবের চোখের পানি তার গাল বেয়ে পত্রিকার পাতার উপর টপটপ করে এক ফোটা এক ফোটা করে গড়িয়ে পরছে। আখলাক সাহেব এবার রবীঠাকুরের ‘মধ্যবর্তিনী’গল্পের এই লাইনগুলো বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন, “মনে যখন একটা প্রবল আনন্দ একটা বৃহৎ প্রেমের সঞ্চার হয় তখন মানুষ মনে করে, ‘আমি সব করিতে পারি’। তখন হঠাৎ একটা আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা বলবতী হইয়া উঠে। স্রোতের উচ্ছাস যেমন কঠিন তটের উপর আপনাকে সবেগে মুর্ছিত করে তেমনি প্রেমের আবেগ, আনন্দের উচ্ছাস, একটা মহৎ ত্যাগ, একটা বৃহৎ দু:খের উপর আপনাকে যেন নিক্ষেপ করিতে চাহে।” ————————

১০৪জন ৩৪জন
0 Shares

৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ