পুরান ঢাকার এক চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি। দোকানদার শামীম ভাই আমার খুব পরিচিত। তিনি আমাকে রোজ বিকেলে যত্ন করে চা খাওয়ান। কখনো টাকার কথা মুখেও আনেন না।টাকাটুকা যা পান তা যখন সুযোগ পাই তখন দেই। অর্থাৎ তার কাছ থেকে সব সময় বাকিতেই চা খেয়ে আমি অভ্যস্ত।আজো এসে বসলাম। তিনি চা বানিয়ে কাপে ঢেলে দিলেন। কি্ন্ত আমার হাতে দিলেন না।

বললাম- ভাইজান,চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসে আছেন কেন?দেন খাই।

তিনি মাথা নেড়ে বললেন- না,না। আজকে আর বাকিতে চা হবে না। আগে টাকা ছাড়ো। তারপরে চায়ের কাপ হাতে নিবে।

আমি তো তাজ্জব বনে গেলাম।বললাম,শামীম ভাই কি মশকরা করছেন?

তিনি আবারও মাথা নেড়ে বললেন,না না । মশকরা করবো কেন? আপনাকে একটা ঘটনা শুনাই। তাহলে বুঝবেন কেন আমি বদলে গেছি।

আমি বললাম, আচ্ছা এই নিন টাকা। চা খেতে খেতে বলেন তো গল্পটা শুনি।

উনি আমার হাত থেকে টাকাটা নিলেন। আমি তার হাত থেকে চায়ের কাপ নিলাম।

উনি একটা দ্বীর্ঘ শ্বাস টেনে নিয়ে গল্প বলা শুরু করলেন।

‘‘ বুঝলেন? অনেক দিন আগের কথা। আফ্রিকার উগান্ডার পাশে একটা দেশ আছে  নাম বুগান্ডা। রাজধানীর নাম লোগান্ডা। সেই লোগান্ডার একদম প্রাণকেন্দ্রে রাকেশ নাথের বাড়ি।’’

আমি প্রতিবাদ করে বললাম, না না বুগান্ডা নয়। ওটা রুয়ান্ডা।

তিনি রেগে গিয়ে বললেন- গল্পের ভিতরে বাম হাত ঢুকাইবেন না। ওই একটা হলেই হল। বুগান্ডা-রুয়ান্ডা নামে কি আসে যায়?

আমি চুপ করে রইলাম । তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন-

ত্রিশ বছরের যুবক রাকেশ নাথকে সবাই চিনে। কারণ, সে যে কখন কি করে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। একদম পাগলাটে স্বভাবের রাকেশ হঠাৎ করেই একদিন সবাইকে বলে বেড়াতে লাগল যে সে বাবা হয়েছে।

দেশজুড়ে দ্রুতই সেই খবর ছড়িয়ে পড়ল। কিন্ত বুগান্ডাবাসী এই খবর শুনে অবাক হয়ে গেল। তারা ভাবতে লাগলো যে, যেই ছেলেটি এখনো বিয়ে করেনি সে কিভাবে বাবা হলো? যাহোক,তারা দলে-দলে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে রাকেশের বাড়ির সামনে ভীড় করতে লাগলো। কিন্ত রাকেশ তো বাড়িই ছিল না। সে তো চাদর গায়ে দিয়ে শহরের বাইরে এক পাহাড়ের গর্তে চলে গেছে। লোকেরা তো খুব অবাক। সে বাবা হয়েছে,তো তার শিশুটি কোথায়? সে শিশু নিয়েই গেছে নাকি একাই গিয়েছে। তারা তার সন্ধানে পাহাড়ে গেল। অনেক খোজাঁর পরে তারা তাকে একটা পাহাড়ের গর্তে ধ্যানরত অবস্থায় পেল।

শামীম ভাই গল্পটা এই পর্যন্ত বলে থামলেন। তারপর আবারও ভালোভাবে শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলেন- এরপর বুগান্ডাবাসী যখন রাকেশের দেখা পেল তখন কিন্ত তাদের ভুল ভাঙ্গল। রাকেশ কোন সন্তানের বাবা হয়নি। সে হয়েছে সাধু। খুব মস্ত বড় সাধু । সে এখন আর উল্টা-পাল্টা ‍কিছু করে দিন কাটায় না। সে এখন খুব ভালো কথা বলে। সবাই কে উপদেশ দেয়। বুগান্ডাবাসী খুব তাড়াতাড়িই তার ভক্ত গেল।

আমি হেসে বললাম-শামীম ভাই সবই তো বুঝলাম। কিন্ত আপনি এর থেকে শিক্ষনীয় কি পেলেন?

শামীম ভাই হেসে বললেন- রাকেশ নাথ কি বলেছে সেটা তো আগে শুনে নাও।

আমি বললাম- কি বলেছে সে গুহাবাসী উল্লুকটা?

শামীম ভাই যতটা সম্ভব ধরা গলায় বললেন- উল্লুক বলবে না। সে মস্ত বড় জ্ঞানী লোক। সে বলেছে- নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূণ্য থাক।

আমি বললাম- কি?

তিনি হেসে বললেন- ঠিকই । আর কত বাকি খাবে? তাই আজকে গল্প বানিয়ে টাকাটা ঠিকই আগেভাগে আদায় করে নিয়েছি।

এই শুনে আমি শামীম ভাইয়ের কাপ নিয়ে দৌড় দিলাম। শামীম ভাই চিৎকার দিয়ে বললেন- আরে! আরে !! তুমি আমার কাপ নিয়া কোথায় যা?

বললাম, বুগান্ডা যাচ্ছি। আপনার সাধু বাবা রাকেশ নাথের সাথে বসে চা খাবো।

(সমাপ্ত )

 

১৫৭জন ১জন
17 Shares

২৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য