জ্যাম-০৩ “ভালবাসার হঠাৎ মৃত্যু”

মনির হোসেন মমি ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, রবিবার, ০১:২৪:৩৫অপরাহ্ন গল্প ২৩ মন্তব্য

ফেরি হতে বরযাত্রীর গাড়ীগুলো নেমে যে যার মত আগ পিছ যাচ্ছেন।রাস্তা একেবারে খালি মনে হচ্ছে।জ্যাম মনে হয় নেই।তাই গাড়ীগুলো যে যার মত ছুটছেন।প্রায় সবার লক্ষ্য কে কার আগে যাবেন।ঠিক সে সময় বরের গাড়ীটা শাকিবদের গাড়ীটিকে অতিক্রম করে যেতে দেখে ড্রাইভারকে শাকিব অনুরোধ করছেন একটু দ্রুত যেতে।মজিদ বাধা দিলেও তার ওয়াইফ ব্যাপারটি বুঝতে পেরে শাকিবকে সাপোর্ট দিয়ে বললেন।

৴জ্বি ড্রাইভার ভাই, ঐযে বরের গাড়ীটা দেখছেন, আপনার আগে চলে গেল। ওটাকে ধরতে হবে একটু দ্রুত চালান।

ড্রাইভার গীয়ার চেঞ্জ করে গাড়ীর গতির স্প্রীড বাড়ালেন ততক্ষণে বরের গাড়ীটি চোখের আড়াল হয়ে গেল।এ দিকে মজিদ কেবল ফিস ফাস করে কথা বলছেন তার ওয়াইফের সাথে।

৴ কী বলছো তুমি! এ ভাবে গাড়ী চালানো ঠিক নয়!যে কোন সময় কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।

৴আর এদিকে যে কিছু একটা হয়ে আছে তা কী খেয়াল আছে তোমার?
-মানে?
-তোমার না বুঝলেও চলবে।
-তোমার এই একটা দোষ!কথার অর্ধেকটা বলো আর বাকীটা বলো না।আমাকে টেনসনে রাখতে তোমার খুব ভাল লাগে তাই না?
ভাবী শাকিবের দিকে আঁড় চোখে চেয়ে দেখল সে দু’হাতে কানে মুখে ধরে ইশারায় বিষয়টা ভাইকে না জানানোর অনুরোধ করছেন।ভাবীও বুঝতে পেরে দেবরের মান রাখলেন।কথা ঘুরিয়ে নিলেন অন্য দিকে।
-আচ্ছা! শায়লার(ছোট বোন) জামাইকেতো দেখলাম না গাড়ীতে উঠতে!বরের গাড়ীতেতো শুধু শায়লা আর ওর বাচ্চা।জামাই হায়দার তাহলে কোন গাড়ীতে,তুমি কী জানো?
-হ্যা,আছে পিছনের এক গাড়ীতে।
-কনের বাড়ী হতে যা যা উপহার সামগ্রী দিয়েছিলো তা সব গাড়ীতে উঠেছিলতো?
-ঐতো! ঐ গাড়ীতেই হায়দার আছে।ওসব বুঝে নিয়েছে।
-যাক, বাচা গেল।
সম্মুখে গাড়ীর সংখ্যা ক্রমশতঃ বাড়তে থাকল।গাড়ীর গতিও কমতে থাকল।এক সময় শাকিবের গাড়ীটি বরের গাড়ীর ঠিক পাশাপাশী এসে এক স্থানে জমে গেল।শাকিবের চোখ বরের গাড়ীর নূসরাতের দিকে।এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন নূসরাতের দিকে।নূসরাত অন্য দিকে চেয়ে আছেন।অথাৎ গাড়ীর পেছনের সিটে-শাকিব নজরে প্রথমে বর অতপর কনে তারপর শেষ- দরজার সাথে নূসরাত পাশাপাশি বসে আছেন।শায়লা তাদের ছোট বোন নিজ ছেলেকে নিয়ে ড্রাইভারের সাথে সামনের সিটে বসে আছেন।নূসরাত অন্য মনস্ক হয়ে শাকিবের বিপরীত মুখী চেয়ে রইলেন।গাড়ীগুলো এখন পুরোপুরি স্টপ।মনে হয় লম্বা জ্যাম।শাকিব সেই একই দিকে যে এক দৃষ্টিতে  চেয়ে আছেন তার আর চোখ ফেরানোর নাম নেই।এদিকে কনে ফেরি হতেই লক্ষ্য করছেন,এই একটা ছেলে কেবল তার দিকেই তাকিয়ে থেকে মাঝে মাঝে কী যেন ইশারায় বলতে চায়।চলন্ত অবস্থায় দুই গাড়ী পাশাপাশি হত যখন,তখনই শাকিব নূসরাতের সাথে ইশারায় প্রেম করলেও কনে তা মনে করতেন ছেলেটি-তাকেই যেন বিরক্ত করছেন।এখন যখন জ্যামে পাশাপাশি দুটো গাড়ী তখন শাকিবের নিরুত্তোর একই আচরণ তখন কনের মনে প্রশ্ন জাগে।তাই এ প্রশ্নটি করলেন তার সদ্য বিবাহীত স্বামীকেই খুব ফিসফিসিয়ে ।
-শুনছেন?
বরতো অবাক এতোক্ষণ কত চেষ্টাই না করলেন কনের মুখ হতে কথা শুনতে সাথে নূসরাতও চেষ্টা করলেন। অনেকটা হাসি তামাশা করলেন কনেকে নিয়ে বরের সাথে অথচ তখন তার মুখ হতে কোন কথাই বের হয়নি।এখন হঠাৎ তার কণ্ঠ শুনে অবাক হয়ে বললেন।
-কী? তুমি কিছু বলছো?
-হুম।
-বল?
ঐদিকে নূসরাতের সামনে এসে দাড়িয়ে আছে এক ফুল বিক্রেতা টোকাই কিশোরী।তার হাতে রজনীগন্ধা সহ কিছু ফুল।নূসরাতকে গছানোর চেষ্টা করছে ।
-ঐ যে…ঐ গাড়ীতে একটি ছেলে। সেই ফেরি হতেই আমার দিকে বার বার চেয়ে হাতের ইশারায় কী যে বলতে চাচ্ছেন।

-কোন গাড়ীতে?
-ঐতো..সাদা একটি প্রাইভেট কার।
বর একটু ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলেন।শাকিবের চোখে চোখ পড়তেই বরকে শাকিব হাইও বললেন।বর বুঝতে পেরে মিটমিটিয়ে হাসছেন।কনের মনে এবার ভেজায় রাগ উঠল।আরে এ আমি কার কাছে কইলাম সেতো দেখছি উল্টো হাসছে।
-কী হল আপনি হাসছেন কেন?
-হাসবো নয়তো কী!আমিতো শালার লাকীম্যান বলতে হবে!এমন বৌ পেয়েছি যার রূপে সবাই পাগল… হা হা হা।
বর হেসেই চলছেন।এর মধ্যে গাড়ীর গতিও বেড়ে গেল।শাকিবের মন কাদিয়ে খুব দ্রুত দু’গাড়ী দুদিকে বিচ্ছিন্ন হল।এ জ্যামেও শেষ পর্যন্ত শাকিব নূসরাতে চোখাচোখী প্রে্ম আর হল না।

গাড়ীগুলো আবারো জ্যামহীন রোড পেল।চলছে হাওয়াই বেগে।কনের চোখে মুখে বেশ ক্লান্তি।গত কয়দিন যাবৎ কনের চোখে ঘুম ছিলো না।রাজ্যের সকল ঘুম যেন গাড়ীর ঝাকুনিতে কনের চোখের দুপাতায় এসে ভর করল।আনমনে বরের কাধে কনের ঘুমন্ত মাথাটা হেলে পড়তেই বর বুঝতে পারলেন ও’ বেশ ক্লান্ত।তাই সে কনের পিছন কাধ দিয়ে ডান হাতটি বের করে কনের কাধ বরাবর ডান হাতটি খানিক চেপে ধরে তার কাধে ঘুমোবার পুরো নিশ্চয়তা দিলেন। ঐদিকে নূসরাতও গাড়ীর গ্লাসের দরজায় মাথাটা হেলান দিয়ে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে জেগে রইলেন।আর গাড়ীতে সতর্কতায় জেগে রইলেন বর এবং তার বোন শায়লা।গাড়ী চলছে।

বাঙ্গালী বিয়ের রীতিনীতি অনুযায়ী কনেকে তার নতুন ঘরে প্রথম প্রবেশের সকল আনুষ্ঠিকতা শেষ করলেন বর পক্ষের ভাবী,বোন,বোন জামাই এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশী।কনেকে প্রথমে দর্শনার্থীদের জন্য একটি সাজাঁনো রুমে বসালেন। ঘোমটা মুখে বসে আছেন লাজুক নতুন বৌ।নতুন বৌ দেখতে ছুটে আসছেন এ পাড়ার-ঐ পাড়ার কত কত উৎসুক মানুষ।উৎসুক লোকজনকে দেখাতে নূসরাত বার বার নতুন বউয়ের ঘোমটাটা খুলছেন আবার মাথায় দিচ্ছেন।দেখে কেউ বলছেন-বাহ্ কী সুন্দর পরীর লাহান মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ।কেউ বা বলছেন- ইস্ নাকটা আরেকটু খাড়া হলে আরো সুন্দর লাগত।কেউ বলছেন বেশ মানিয়েছে বরের সাথে কেউ বা বলছেন আবার অন্য কথা।এমন ছেলে লাখে একটা তার সাথে এমন বউ! ভাল লাগল না- যাক তবুও ভাল। আল্লায় যার লগে যার জুটি রাখছেন।
দৃশ্যপতন।

বিবাহীত জীবনের প্রথম রাত যাকে আমরা বাসর ঘর বলি।খাট জুড়ে গন্ধরাজ ফুলের সামারোহে খুব পরিপাটি সাজাঁনো বাসরঘর।রুমে হালকা গোলাপী ড্রিম লাইট।পাশের টেবিলে একটি টেপরেকর্ডারে চলছে মৃদু সূরে একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক গান।নূসরাত সহ আরো অনেকেই নতুন বউয়ের সাথে বসে গল্প করছেন বরের অপেক্ষায়।নতুন বউও বাড়ীর সবার সাথে তার লাজুক ভাব নিয়ে খুব আন্তরিকতায় কথা বলছেন।রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে নতুন বউ এর নিকট হতে ভিড় করা লোকজন কমতে থাকল।এক সময় নূসরাতও চলে যায় নিজ শোবার ঘরে।এর মধ্যে বরের আগমন।রুমে ঢুকেই বর টুপিটা রাখলেন পাশের একটি টেবিলে।অতপর খাটে গিয়ে বসলেন তার পাশাপাশি।কনে খাট থেকে নেমে বরকে পা ছুঁয়ে সালাম করে পাশের টেবিলে রাখা এক গ্লাস দুধ এনে দিলেন।বর আধা খেলেন এবং কনেকে আধা খাওয়ালেন।অতপর উভয় এক এক করে বাথ রূমে প্রবেশ করে ওঁজু করে এসে দুজনে এক সাথে নামাজ পড়লেন।

অসংখ্য গাড়ীর হঠাৎ বিকট হর্ণে চমকে উঠে জেগে উঠলেন কনে।স্বামীর বুক হতে মাথা তুলে কনে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে তাকালেন এদিক ঐদিক। তারপর বললেন।
-আমরা কী এসে পড়েছি?
-না, মনে হয় আবারো জ্যামে পড়ছি।
নূসরাত কনেকে রসিকতা করে বলছেন।
-কীগো প্রানের সই- তুমি কী এতোক্ষণ প্রেমের রাজমহলে ছিলে?
-কী যে কস না! তোর মুখে বুঝি কিছুই আটকায় না!
-লে হালুয়া,বুঝলেন দুলা ভাই, উনি এতোক্ষণ আরামে আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে সব মজা শেষ করে নিজেই নিজের লজ্জায় পঞ্চভূত হয়ে আছেন অথচ আমরা কইলেই যত দোষ।
বর মিটমিটিয়ে হাসছেন।
-নারে সই,শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছিল তাই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি।
-অবশ্য এমন(বুক)আরামের বালিশ পেলে ঘুমতো আসবেই তাতে  তোর আর দোষ কীলো সই।
-যাহ্! বেশী বেশী হয়ে যাচ্ছে কিন্তু !!

না এ যাত্রায় জ্যাম তেমন একটা থাকল না।কিন্তু গাড়ীর গতিও তেমন বাড়াছে না।শ্লো গতির কারনে শাকিবদের গাড়ীটা আবারো বরের গাড়ীর পাশাপাশি এসে পড়ল।এবার নূসরাতের চোখে চোখ গিয়ে পড়ল শাকিবের দিকে।শাকিব ইশারায় আই লাভ ইউ যখন বলছেন ঠিক তখনিই কনের চোখ গিয়েও পড়ল শাকিবের দিকে।কনের চেহারা রেগে লাল টকটকে।ঐ দিকে নূসরাতও ইশারায় আই লাভ ইউ বলছেন আর তা রিসিভ করছেন এদিকে শাকিব।এর সব দিকই চুপচাপ লক্ষ্য করছিলেন বর।অতপর কনের চোখে চোখে চোখ রেখে বর ইশারায় দেখালেন শাকিব নূসরাতের প্রেমের উপন্যাসের অংশ বিশেষ। অবশেষে নতুন বউও লক্ষ্য করলেন ঘটনা তাহলে এটা।সইয়ের কানমলে বললেন।
-ওরে প্রানের সই আয় তর লগে মনের কথা কই…তাহলে এই হল তোর সেই স্বপ্নের ঠিকানার হিরো!
-এই ছাড়না! লাগেতো? কী করব বল-তুইতো থাকবি তোর বরকে নিয়ে আর আমি একা একা তাহলে কী করব!আমার কী সাধ ইচ্ছে থাকতে নেই???
-আচ্ছা ঠিক আছে, বাসায় গিয়া লই তোরে আর যাইতে দিমুনা বুঝলি?তা হিরোটা কে শুনি? নাম দাম পরিচয় ?
-তেমন জানি না!তবে ভাল মানুষ।
-এ কেমন কথা! অজানা একজনরে এ ভাবে ভাল মানুষ বলে দিলি!
এর মধ্যে বর কথার সূত্র ধরে টান দিলেন।
-ওআমার চাচাত ভাই মানে তোমার দেবর।আমরা এক সাথেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বের হয়েছি।ওএখনো বহু চাকুরীর অফার পেলেও কোন চাকুরীতেই জয়েন করেনি তবে ওদের আর্থিক অবস্থা অনেক ভাল চাকুরী না করলেও চলবে।
এদিকে সামনের সিটে বসা ছোট বোন শায়লাও যেন ঘটনার কিছুটা আচ করতে পেরে বললেন।
-কেরে ছোট ভাই?
-কেউ না,,ঐ তোর ভাবীদের বাড়ীর এক ছেলের কথা বলছিল।
-না, কী জানি বললি ঐ যে ইঞ্জিনিয়ার না কী?
-ধূর!তোর এতো দিকে কান না দিলেও চলবে,আকাশে চাদ উঠলে তখন দেখতেই পাবিনে।
-ওআচ্ছা আমাকে লুকাচ্ছিস….
হঠাৎ ড্রাইভার একটা গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে অনেকটা রিক্সে পড়লে ড্রাইভার কষে ব্রেক চেপে নিজ গাড়ীটিকে নিয়ন্ত্রণে আনলেন।সবাই ড্রাইভারের প্রতি ক্ষেপা।
-আরে ভাই মারবেন নাকি?

গত পর্ব-০২

চলবে….

২৩৪জন ১১৮জন
32 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য