জীবন যেখানে যেমন

শিপু ভাই ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, রবিবার, ০১:৩৪:৩০পূর্বাহ্ন গল্প ২১ মন্তব্য

এম এইচ চৌধুরী! পুরো নাম মোতাহার হোসেন চৌধুরী। এম এইচ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক
বিরাট ধনী ব্যক্তি। আজ আগেভাগেই বাসায় চলে এসেছেন। বড় মেয়ে জেরিন কানাডা থেকে এসেছে গতকাল। সাথে দুই বাচ্চা। জামাই আসতে পারেনি। মেয়ে এবার তিন বছর পর দেশে এল। ছোট নাতনির এবারই প্রথম বাংলাদেশে আসা। বাসায় উৎসব উৎসব ভাব। বাচ্চা দুইটা খুব আনন্দিত গ্রান্ডপা আর গ্রান্ডমাকে পেয়ে। মিসেস চৌধুরী কিচেনে ব্যস্ত মেয়ে আর নাতনিদের পছন্দের খাবার বানানো তদারকিতে। বাবুর্চিরা রান্না করছে। আজ সবাই একসাথে ডিনার করবে। চৌধুরী সাহেবের একমাত্র ছেলে সানিও বাসায়। বন্ধুদের সাথে পার্টি বাদ দিয়ে সানি বাসায় এসে বড় ভাগ্নির সাথে প্লে স্টেশনে গেম খেলছে!
খাবারের মেনু বিশাল- স্প্যানিশ ফ্রাইড রাইস, মাটন কারী, বীফ কারি, কালা ভুনাও আছে, ইলিশ এর দুই পদ, স্যুপ আছে, ভেজিটেবল, চিকেন ফ্রাই, স্যালাড, বড় নাতনির পছন্দের কিছু ডেজার্ট, মেয়ে পোলাও খায় না তাই স্টিমড রাইস, স্ক্রাম্বলড এগ, স্যামন….আরো কত কী! এক বোতল ওয়াইনও আছে টেবিলে।
খুব আনন্দ নিয়ে খেল সবাই। জেরিন আরাম করে খেতে পারেনি ছোট মেয়ের জ্বালায়!
খাওয়া দাওয়া শেষে বড় নাতনি তার আইপ্যাড নিয়ে রুমে চলে যায়। ছোটটা ঘুম। চৌধুরী সাহেব, তার স্ত্রী, জেরিন আর সানি লিভিং রুমে এসে বসে। কফি নেয় সবাই।
জেরিনঃ আই ওয়ানা সে সামথিং পাপা
চৌধুরীঃ হ্যা, বল মা
জেরিনঃ আমি আর ক্যানাডা ফিরে যেতে চাচ্ছি না।
মিসেস চৌধুরীঃ মানে কী!? কী বলিস এটা?
চৌধুরীঃ আহা, ওকে বলতে দাও আগে।
জেরিনঃ হ্যা বাবা, ইটস ভেরি ডিফিকাল্ট টু লিভ উইদ জামিল। আর নিতে পারছি না।
চৌধুরীঃ জামিল ইজ আ গুড বয় উই নো। বাট হোয়াট হ্যাপেন মাই ডিয়ার?
জেরিনঃ হি ইজ এনগেইজড উইথ এনাদার গার্ল। আই কান্ট টলারেট। গত দুই বছর ধরে আমাকে ঠকাচ্ছে। আমি দুই বাচ্চা নিয়ে সব সামলাচ্ছি। সংসারের প্রতি ওর কোন নজর নেই।
সানিঃ বিয়ের আগেই বলেছিলাম ওরা ছোটলোক। ব্লাডি সান অব পপার। সব ড্যাডির দোষ। পি এইচ ডি করা ভাল ছেলে বলে বিয়ে দিলে। এখন দেখো।
জেরিনঃ ফ্রম লাস্ট ওয়ান ইয়ার আমরা এক রুমে ঘুমাই না।
চৌধুরী ঃ মাই গড
জেরিনঃ আমি এমেরিকা চলে যাব বাচ্চাদের নিয়ে। আই ওয়ান্ট টু লিভ দেয়ার…

(আলাপ চলছে….)

মোতাহার হোসেন একজন ব্যাংকার। স্থানীয় একটা ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে আছেন। আজ আগে ভাগেই বাসায় ফিরেছেন। বড় মেয়ে জেসমিন রাজশাহী থেকে এসেছে গতকাল। সাথে দুই বাচ্চা। জামাই আসতে পারেনি। ছুটি পায়নি অফিস থেকে। মেয়ে এবার দুই বছর পর খুলনা এল বাবার বাড়ি। ছোট নাতনির জন্মের পর এই প্রথম আসা। বাসায় উৎসব উৎসব ভাব। বাচ্চা দুইটা পুরা বাসা মাথায় তুলে নিছে। মোতাহার সাহেবের স্ত্রী রান্নাঘরে ব্যাস্ত রান্না বান্নার কাজে। তাকে হেল্প করছে কাজের মেয়ে ফুলি। আজ সবাই একসাথে রাতে খাবে। মোতাহার সাহেবের একমাত্র বেকার ছেলে সূর্য বন্ধুদের সাথে রোজকার আড্ডা বাদ দিয়ে বাসায় এসে ছোট ভাগ্নিকে কোলে নিয়ে ঘুরছে।
খাবারের আয়োজন বেশ আজকে- দেশী মুরগী ঝোল, গরুর মাংস, দেশি রুই মাছ, পোলাও, সালাদ, পায়েস!!! মেয়ে ভর্তা খেতে চেয়েছে তাই ৪/৫ রকমের ভর্তাও আছে টেবিলে।
খুব আনন্দ নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে সবাই। জেসমিন অবশ্য ছোট মেয়ের জ্বালায় আরাম করে খেতে পারেনি।
খাওয়া শেষে সবাই ড্রইং রুমে সোফায় গিয়ে বসে। বড় নাতনি মায়ের মোবাইল নিয়ে নানুর রুমে চলে যায় ইউট্যুবে কার্টুন দেখতে। ছোটটা ঘুমিয়ে গেছে।
জেসমিনঃ আমি একটা কথা বলতে চাই বাবা।
মোতালেবঃ হ্যা, বল মা।
জেসমিনঃ আমি আর রাজশাহী যাব না…
মিসেস মোতালেবঃ কী বলিস এসব!? কী হইছে?
মোতালেবঃ আহা, ওরে বলতে দাও আগে
জেসমিনঃ হ্যা বাবা, অনেক সহ্য করেছি। আর না। জামিলের সাথে আমার পক্ষে আর সংসার করা সম্ভব না।
মিসেস মোতালেবঃ এই! কী বলছিস এসব?!
জেসমিনঃ ও অন্য এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক করছে দুই বছর ধরে। আমি ফেরানোর ট্রাই করছি। হয় নাই। উল্টা আমাকে মেন্টালি টর্চার করছে। সংসারের প্রতি কোন নজর নাই। তোমরা কষ্ট পাবে তাই ফোনে এসব জানাইনি।
সূর্যঃ শুয়োরটারে হাতের কাছে পাইলে পিড়িত ছুটাই দিতাম…
জেসমিনঃ গত এক বছর আমরা আলাদা রুমে ঘুমাই
মিসেস মোতালেবঃ ও আল্লাহ…
জেসমিনঃ আমি ঢাকায় চলে যাব। জব করবো। বাচ্চারা তোমাদের কাছে থাকবে।

(আলোচনা চলছে)

মোতা রিক্সা চালায়। ভাল নাম মোতালেব। আজকে রিক্সা আগেভাগেই গ্যারেজ করে বাসায় চলে আসছে। বাসা বলতে নতুনবাগ বস্তির দুইটা পাশাপাশি ঘর। বড় মেয়ে জরিনা রংপুর থেকে আসছে গতকাল। সাথে দুই বাচ্চা। জামাই আসে নাই। মেয়ে এবার তিন বছর পর ঢাকায় এল। ছোট মেয়ের জন্মের পর এইবারই প্রথম ঢাকায় আসা। দুই নাতনি ঢাকায় এসে খুব খুশি। গাড়িঘোড়া দেখে অবাক তারা। বস্তির অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে। জরিনার মা ঘরের সামনের চুলায় রান্না বসিয়েছে। জরিনা মায়ের পাশে বসে আছে। আজকে সবাই একসাথে খাবে। মোতার বখাটে পোলা সুরুজ আজকে এই সময় বস্তিতেই আছে। অন্য দিন কখন ফিরে তার ঠিক নাই। সুরুজ ছোট ভাগ্নির জন্য একটা ঝুনঝুনি নিয়াসছে কোত্থেকে জানি।
আইটেম বেশি না- সাদা ভাত, পাংগাস মাছ, ব্রয়লার মুরগী আলু দিয়া, ডাল আর জরিনার পছন্দের ডিমভাজা।
মোতার ঘরের চকি আর ফ্লোর মিলিয়ে ওরা খেতে বসে। নাতনিরা আর সুরুজ সহ মোতা চকিতে বসে আর জরিনার মা জরিনাকে নিয়ে নিচে পিড়িতে বসে খায়। খুব আনন্দ নিয়ে খায় সবাই। জরিনার দুই বছরের মেয়েটা নিজ হাতেই খেতে পারে।
খাওয়া শেষে সুরুজের ঘরে ছোট মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে বড় মেয়েকেও ঘুমানোর কথা বলে জরিনা বাপের ঘরে আসে।
মোতা আর তার বউ পান খায়। সুরুজ বইনের জন্য সেভেনাপ এনেছে।
জরিনাঃ আব্বা, একটা কতা কই?
মোতাঃ ক
জরিনাঃ আমি আর জামাইল্যার ভাত খামু না
মোতার বউঃ এগ্লা কিতা কস!?
মোতাঃ আহা সুরুজের মা, ওরে কইতে দেও আগে
জরিনাঃ আমি ম্যালা সইহ্য করছি আর না! জামাইল্যা আরেকখান বিয়া করছে গোপনে। আমি জিগাইলে আমারে মারছে। আমি মাইন্যা নিছিলাম। কিন্তু আমি আর পাররাছি না। ঠিকমত বাজারঘাট করে না। বাইত্তে আহে না বেশিরভাগ দিনই। মাইয়া দুইডারে চাইয়্যাও দেহে না….
সুরুজঃ খানকির পোলারে মাইরালামু….
জরিনাঃ আমি গার্মেসে কাম করুম। আমারে তোমাগো লগ দিয়া একটা ঘর লইয়া দেও…..
(আলোচনা চলছে)

৩৫৩জন ২৪২জন
6 Shares

২১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য