জীবন নদীর বয়ে চলা

মাসুদ চয়ন ২৮ জুলাই ২০১৯, রবিবার, ০৩:২৩:০০অপরাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য
  • ( প্রথম পর্ব)
    বেশ পুরনো এক গ্রাম।একসময় মঙ্গার কবলে পড়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতো।বছরের অধিকাংশ সময় জুড়ে বানের জলে ডুবে থাকতো চারপাশ।ডাইরিয়া ডেঙু টাইফয়েড ছিলো নিত্যদিনের যাপন সঙ্গী।
    আশেপাশে কোনো চিকিৎসা ইন্সটিটিউট ছিলোনা।ছিলোনা চাষাবাদের মতো উপযুক্ত জমি।নদী আর হ্রদের মিলনে অথৈ জলের সমাহার।মাছ শিকারই ছিলো জীবিকার প্রধান উৎস।এরপর শিল্প বিপ্লবের কল্যানে অন্ধকার প্রেক্ষাপটগুলো কেটে যেতে শুরু করলো।এখন আর মঙ্গায় মানুষ মরেনা।উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নাসিরান্দি গ্রামের আবহ চিত্র খুব বেশিই বদলে গেছে।
    বেশ কয়েকটি শিক্ষা/চিকিৎসা/সমাজসেবামূলক ইন্সটিটিউট মানব কল্যানে এৈকান্তিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
    সেই গ্রামের সরল ভাষী কিশোর ইমু আহমেদ কৈশোর শুরুর কাল হতে মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনা চালাতো।এর পেছনে অবশ্য ভয়ংকর এক ইতিহাস লুকায়িত রয়েছে।ও তখন ৩ বছরের বাচ্চা শিশু।ছোটো ভাই ইমরানের বয়স ৬ মাস।বাবা সিলেট শহরে ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে জব করতেন।কেবল ঈদের ছুটিতেই গ্রামে ফিরতেন।পোষ্টাল অর্ডারের মাধ্যমে ২/৩ মাস অন্তর টাকা পাঠাতেন।জামিল আহমেদের স্ত্রী আসিয়া খানম মানে ইমুর মা,সেইকালের ইন্টারমেডিয়েট পাশ।তাই গৃহের কাজের পাশাপাশি শিক্ষকতাও করাতেন।জামিল আহমেদ বিএ পাশ হলেও ওনার ছোটো দুই ভাই চার ক্লাসের গণ্ডিতেই আটকা পড়েছিলেন।একসময় ওই বংশের অনেক বিত্ত্ব সম্পদ ছিলো।
    থাকলে কি হবে!বেশির ভাগ মানুষের চিন্তা চেতনায় প্রগতিশীলতার ছোঁয়া ছিলোনা।
    .
    হাজি পরিবার বলে কথা।ভীষণ উচ্চাবিলাসী চেতনার মানুষ ছিলেন
    বংশগতভাবে।
    অবশ্য দানশীলতার উদাহরণেে অনন্য।মঙ্গা এলেই ধানের গোলা উন্মুক্ত করে দিতেন।এরপর গোলার সামনে আর্ত মানুষেের ঢল নামতো।যার যতটুকু প্রয়োজন নিয়ে যেতেন।হাজী রফিকুল সাহেব(জামিল আহমেদের দাদা)কাউকে বাঁধা দিতেননা।তবে মানুষটার অহমিকা ছিলো পাহার সমান।হাজার হাজার মণ ধান থেকে ২/৪ শ মণ ধান/চাল বিতরণ করতে কোনো সমস্যা হতোনা বটে,এক সাথে খাবার গ্রহন একই ধরনের আসনে বসে গল্প গুজব করাতে মারাত্নক রকমের আপত্তি ছিলো সেই আর্তদের সাথে।
    ওনাদের প্রথাগত স্বভাবটাই এমন।গরীব মানুষ মাটিতে বসবে।উচ্চ স্তরের মানুষদের জন্য চেয়ার টেবিল এমন আরকে,যে সকল শ্রেণী বৈসম্য একালেও বিরাজমান।
    .
    কৃষকেরা ঠিক ঠাক মতো কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতেন,মারধর করার নিয়মো প্রচলিত ছিলো।
    তবে মজুরির টাকা আটকিয়ে রাখতেননা।
    .
    সেদিন শুক্রবার ছিলো।হাজী সাহেব হজ্ব করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় যাত্রা করতে যাচ্ছেন।সেখান থেকেই সৌদি আরবের পথে যাত্রা।হাতে এখনো তিনদিন সময় রয়েছে।তিনি জুম্মার নামাজের শেষে সবার কাছে বিদায় নিলেন,ক্ষমা প্রার্থনাও করলেন।সবশেষে বড় নাত বউ আসিয়া বেগমের সরনাপন্ন হলেন।আসিয়া বেগমের সাথে উনি খুব একটা কথা বলেতেননা।তাছাড়া হীণমন্যতায় ভোগেন,কারণ,আর দশটা সাধারণ নারী চরিত্রের সাথে ওনার বিন্দুমাত্র মিল খুঁজে পাওয়া যেতোনা।নামাজ রোযা কোনোটাই পালন করতেননা সঠিকভাবে।আচার-আচরনে পরিপুর্ন নাস্তিকতার প্রতিরুপ,যদিও সরাসরি স্বীকার করতেননা।হয়তো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ভয়ে,হয়তো শিশু সন্তানদ্বয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে এই ভয়ে।হাজী সাহেব মাঝে মাঝে শরীয়া বিষয়ক ধারণার বীজ বপন করার প্রয়াস চালাতেন।তবে জোরজবরদস্তি করে চাঁপিয়ে দেয়ার মানুষ তিনি কখনোই ছিলেননা।
    প্রায় দু’মাস পর নাত বউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের দিকে তাকিয়েই অন্যরকম এক নারী চরিত্র আবিষ্কার করে ফেললেন।তিনি বেশ বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীল স্বভাবের মানুষ ছিলেন। মুখে বিন্দুমাত্র সন্মানসূচক উপলব্ধি দেখতে পেলেননা রমনীর।তিনি কিছু বলার আগেই নাত বউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।
    বিদায় নিতে এলেন দাদু ভাই।কিন্তু!থাক নাইবা বলি এমন কঠিন কিছু।এমন প্রহরে সইতে পারবেননা,এই বলে হাজী সাহেবের দিকে বিষন্ন অনুভবে চেয়ে রইলেন ।
    হাজী সাহেব কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর নরম গলায় প্রশ্ন করেনঃআসিয়া,যা বলতে চাও বলতে পারো।ফিরে তো নাও আসতে পারি।কঠিন হলেও বলে ফেলো,ভয় নেই।আমি দানব বা ধর্ষক নই,তোমার দাদুই।
    আছিয়া রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।অনেক প্রচেষ্টা চালিয়েও অশ্রু জল আটকিয়ে রাখতে পারেনি।
    .
    দাদা ভাই_এবারের মঙ্গাটা একটু বেশিই মাত্রাতিরিক্ত।গত তিন দিনে ৭/৮ জন মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে,অধিকাংশই পুষ্টিহীনতা রুগী,টাইফয়েড ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত এখনো অনেকে। কেউ কেউ না খেয়েই দেনার টাকা পরিশোধ করার তাগিদে মহাজনের কাজে নিমগ্ন।শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য কারোরই ছিলোনা,এখানো নেই।
    পরিবারগুলো কতটা নির্বোধ একবার ভেবে দেখুন!
    সব কিছু ঈশ্বরের কৃপায় অর্পণ করে দিয়ে নিরুপায় হয়ে কাল খেপন করে যাচ্ছে,অবশ্য বিকল্প উপায়ও নেই।সামনে এই মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে।এই সময় খাদ্যের পাশাপাশি উচ্চ চিকিৎসার সহায়তা একান্ত কাম্য পরিবারগুলোর জন্য।তাই এই সময়ে আপনার হজ্ব করতে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিনা।ওই অর্থ দিয়ে কয়েক’শ মানুষেের জীবন রক্ষা করতে পারতেন।বিত্ত্ববানদের সাথে নিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য উপযোগী টিম গঠন করতে পারতেন।
    ছেলে মেয়ে নাতি নাতনিকে জমিজমা ভাগ করে দিলেন।এসব কি মহামারী কেটে যাওয়ার পর করলে হতোনা।
    .
    নিয়াজ হাজি শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন।
    তোমাকে তো নাস্তিক ভেবেছিলাম।আমিতো জানতাম তুমি গোপনে নাস্তিকত্বকে হৃদয়ে লালন করে যাচ্ছো।কিন্তু!একি দেখলাম আমি!আমার ঈমানদার ছেলেরাও যে চিন্তা করেনি,এ বিষয়ে কিচ্ছু বলেনি,তুমিই বললে!ওরা আসলে নিজেদের স্বার্থটাই বুঝেছিলো।তুমি কি সত্যিই নাস্তিক?অনুরোধ রইলো,সত্যিটা জানিয়ে দাও আমাকে।বিদায় বেলায় এটাই জানতে চাই তোমার কাছে।
    আছিয়া খানম হাজি সাহেবের চোখ নিঃশ্রিত অশ্রু মুছে দেয়।দাদু,আমি আস্তিক নাস্তিক কিছুই নই।একজন মানবিক মানুষ/এর চেয়ে বেশি কিছু বলার মতো নেই।মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।
    .
    হাজি সাহেব আছিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।।বেঁচে থাকো এক’শ বছর।বুঝতে পেরেছি।
    ধর্ম মানোনা,কিন্তু স্মৃষ্টিকর্তাকে ঠিকই মানো।এটা অবশ্য উন্নত চিন্তস চেতনা ফসল,আমিতো জানিনা ওপারে কি হবে তোমার বা আমার।তোমার চিন্তাবোধ অন্ধ ধার্মিক এবং স্বার্থান্বেষী নাস্তিকদের চেয়ে অনেক ভালো।প্রতি লক্ষে একজন স্বার্থহীন ধর্মপ্রাণ মানবিক মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়।বেশিরভাগ কমিউনিস্ট এর মূল উদ্দেশ্য বিদেশী ভিষা ।তোমার মতো মানুষো প্রতি লক্ষে ২/৪ জন চোখে পড়ে,এর বেশি নয় ।গুদাম ঘরের তামাকের আঁড়তটা তোমার নামে উইল করে দিয়ে যাবো।১০/১৩ লক্ষ টাকার পন্য মজুদ আছে।মানব কল্যানে কাজে লাগিয়ো।উকিলকে ফোন করে দিচ্ছি।এই কাজটা সম্পন্ন করেই রওনা দিবো।জীবনে অনেক পাপ কাজ করছি,মানুষেের জন্য কিছু করে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমাকে।তুমি ধর্মের নও এটা ঠিক, স্বয়ং ঈশ্বর প্রনীত।
    .
    হাজি সাহেব ঠিকই ফিরে এসেছিলেন হজ্ব শেষে ,কিন্তু লাশ হয়ে।
    প্রচণ্ড ভিড়ে পদদলিত হয়েছিলেন।বিভৎষ দেহটাকে চেনার কোনো উপায় ছিলোনা।ওনার পরপারগামী হওয়ার পর সেই পরিবারে আসিয়া খানমের প্রভাব কমতে থাকে।শশুর বাবা জুয়া খেলে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা উড়াতেন।দেবরদ্বয়ো সেই স্বভাবেরই।আর জামিল আহমেদ বিদেশে যাওয়ার নেশায় দালালদের খপ্পরে সর্বশান্ত হয়ে দেউলিয়া জীবনের স্রোতে ভাসতে শুরু করলেন।নিজের প্রাপ্ত সম্পত্তিও ভোগ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করলেন আসিয়া খানম।দেউলিয়া স্বামীর তিন/চার বছর কোনো খোঁজ নেই।তার উপর পুরুষ শাসিত প্রভাবশালী পরিবারে দুই ছোটো শিশু নিয়ে স্বামীহীন হয়ে পড়ে থাকা।তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন সব ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসবেন।দুই শিশু পুত্রকে প্রকৃত মানুষরুপে গড়ে তুলবেন।
    .
    এখানে এসেও সেই একই রকম সমস্যার সম্মুখীন হলেন তবে অন্যভাবে,মানে বহিরাগতদের কটুক্তিতে।স্বামী ছেড়ে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে।অপয়া মহিলা!আরও কতো কি!সাথে প্রথাগত কুসংস্কার তো আছেই।আছিয়া সবকিছু নীরবে সইতে থাকলেন।এভাবে ৭/৮ বছর অতিবাহিত হয়ে যায়।বড় ছেলে ইমু অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র,ছোটো ইমরানো পঞ্চম শ্রেণীতে।দু’ই ছেলেকে নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন লালন করে যাচ্ছেন তিনি।
২৬৯জন ১০০জন
12 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য