জীবন নদীর বয়ে চলা_৩

মাসুদ চয়ন ৩০ জুলাই ২০১৯, মঙ্গলবার, ০৫:৪৮:৩৬অপরাহ্ন গল্প ৬ মন্তব্য

গল্পঃ-জীবন নদীর বয়ে চলা’
(তৃতীয় পর্ব)
রাত তিনটা বেজে সাতাশ মিনিট।ঘন্টা খানেক পড়েই সুবহে সাদেকের সূচনা প্রহর।অন্ধকার তার ঘনত্ব হারিয়ে আবছা অস্পষ্ট আলোর মতো জ্বলতে  শুরু করেছে। ধার্মিকেরা নামাজের প্রস্তুতিতে মগ্ন হবে কিছুক্ষণ পর।রাখাল/কৃষক/মজুরেরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সাথে নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে।আছিয়া বাড়ির মূল ফটক অতিক্রম করে বাহিরে চলে এসেছে।বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে।সারে চার বছরের সাংসারিক স্মৃতিগুলি খুব বেশি আবেগতাড়িত করে দিচ্ছে।অবশ্য এটাই স্বাভাবিক।একটি মেয়ের কাছে সংসার জীবনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।কে চায় এমন কিছুকে হারাতে,কেউ চায়না। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে রিক্সা চলার শব্দ শুনতে পেয়ে পাশের ঝাউগাছের আড়ালে লুকিয়ে যায়।অবশ্য বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে হলোনা।এতো হালিম চাচার রিক্সা।গ্রামে ওনাকে সবাই মুুুন্সিি নামে ডাকে। রমেমযে মানুষটা নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন।
প্রতিদিন একবার হলেও খোঁজ নিতে আসেন।কিন্তু একি!
রিক্সা সামনে আসার পর বিস্ময়ে থতমত খেয়ে যেতে বাধ্য হয় আছিয়া !ওনার পনেরো বছরের মেয়ে রিকসায় বসে ব্যথায় কোঁকড়াচ্ছে।
আছিয়া রাস্তার মাঝখানে চলে আসলে হালিম মঞ্জু রিক্সা থামিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন।অর মায়ে বইনের বাড়িত গেইছে।বাড়িত আর কাহো নাই।মাইয়্যা মোর গলাত দঁড়ি দিবার ধরছিলো।ট্যার পাছুং,নাহইলে সব শ্যাষ হয়া যাইতো।একটাই মাত্র কইলজার ধন।
দু’দুকুনা পোলা মঙ্গাত মরি গ্যালো।
আছিয়া কিছুটা ইতস্তত বোধ করতে থাকে মুরব্বির এমন আচরণ দেখে।
.
কেনো চাচা!কি এমন হয়েছে ওর সাথে?গলায় রশি দিতে গেলো কেনো?
হালিম মঞ্জু গলায় প্যাঁচানো গামছা দিয়ে ভেজা চোখ মুছে নেন,তারপর কান্না জড়িত কন্ঠে আবারও কথা বলতে শুরু করেন।জামান চৌধুরীর ছোটো পোলার লগে সম্পর্ক করছিলো।
বিয়ার প্রলোভন দেখাইছিলো।তারপর ফুসলায় ফাসলায় প্যাট(প্রেগন্যান্ট) বানায় দিছে।এখন নাকি বিয়া করবেনা!মাইয়াটা সেই কষ্টে ঝুইলা পড়ছিলো।আন্ধার থাকা অবস্থায় অর নানীর বাড়িত দিয়া আইসং।বিয়ান(সকাল) হইলে জানাজানি হইবে,কি হইবে অর আল্লাহ মাবুত জানেন !
আছিয়া হালিম
মঞ্জুকে একটু দূরে সরে যেতে বলেন।চাচা আপনি একটু দূরে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকুন।ওর সাথে কিছু কথা বলবো।অন্ধকার কেটে যেতে শুরু করলেও ভয় নেই।আমরা গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি।সকাল সাতটার আগে এদিকে কোনো মানুষ আসবেনা।
হালিম মঞ্জুর নালার পাড়ের দিকে হাঁটতে থাকেন।বিষন্ন অনুভবে জলের দিকে চেয়ে কাঁদছেন।গরীব মানসের কাহোই নাই-সকলে হামার মরণ কামনা করে।ঈশ্বর,আপনি কি দেখছেন না!কিছু কন না ক্যান! ইমুকে রিক্সার একপাশে বসিয়ে নুপুরের মাথায় হাত বুলাতে থাকে আছিয়া খানম।এই নুপুর একদম কাঁদবেনা।আমি যে কথাগুলো বলতেছি মনোযোগ দিয়ে শুনবে তারপর অনুধাবন করবে।মাঝখানে একটা কথাও বলবেনা।তুমি অষ্টম ক্লাসে পড়ুয়া ছাত্রী। আশাকরি এই কথাগুলোর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারবে।অবশ্য অনুধাবন করার চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পালন করতে হবে তোমার নিজেকেই_
নুপুরের কান্নার বেগ কিছুটা কমে যায়।আছিয়ার ডান কাঁধে মাথা হেলান দিয়ে তার কথা শুনতে থাকে।তোমার সাথে সেক্স করেছে-জাস্ট এটুকুই ভাববা,এর বেশি নয়।সেক্স প্রতিটি মানুষের জন্য আরাধ্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদার নামো বটে।তোমার সাথে এমন কিছু ঘটেনি যার জন্য তোমার সুইসাইড করতে হবে।মনে করো কঠিন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে,এখন তোমার সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন।
এটা ঠিক যে তুমি অজান্তেই অনেক বড় ভূল করে ফেলেছো।যে ভূলের জন্য সমাজ তোমাকে কলঙ্ক দিবে_এখন প্রশ্নটা হচ্ছে কেউ কিছু বললে বা ভাবলে তুমি সেটাকে গুরুত্ব দিবে কেনো?জীবন তো তোমার,তারা বলার কে?তুমি স্বাধীন ভাবে বাঁচবে,এটা তোমার মৌলিক অধিকার।এসব অধিকার নিজ থেকে আদায় করে নিতে হবে।নিজেকে অসহায় অবলা ভাবার সময় শেষ।
.
নানুর বাড়িতে গেলে অন্য রকম পরিবেশ পাবে।এখানে আসার কোনো দরকারই নেই।এখানে কেনই বা আসবে!লেখা পড়াকেই জীবনের মূল উদ্দেশ্য করে নাও, সাথে ভালো লেখকদের বই পড়বে।মন পরিচ্ছন্ন হবে,ভয় দূর হবে।
জীবন আসলে জীবনের মতই।তুমি যেভাবে বয়ে নিয়ে চলবে সেভাবেই চলবে।তবে চলার পথে অনুপ্রেরণা এবং অর্থ লাগবেই।এ দু’টি জিনিস ব্যতীত জীবনের বয়ে চলা স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে।বাচ্চাটাকে নষ্ট করা যদিও উচিৎ হবেনা,তবুও বলবো নষ্ট করাটাই প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব।কারণ তুমি বাঙালী অন্ধকার সমাজের বাসিন্দা।যখন তুমি নিজেই নাবালিকা,আরেক শিশুর দায়িত্ব কি করে নিবে।ওই শিশুর পিতৃ পরিচয় থাকবেনা।সমাজের কটুক্তি শুনতে হবে সারাজীবন।তোমার ঘর সংসার করার এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির স্বপ্নটাও নিঃশ্বেস হয়ে যাবে।তুমি আপাতত নানুর বাড়িতে যাবে।এরপর সুস্থ হলে আমার বাবার বাড়িতে নিয়ে আসবো।ওখানে থেকে পড়াশুনা করবা,সাথে আমার বাবু দু’টার দেখাশুনা করবা।এই বলে নুপুরের হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দিয়ে নালার পাড়ে হালিম মুন্সির কাছে চলে আসে আছিয়া খানম এবং ওনাকেও সবকিছু বুঝিয়ে বলে।দু’জন মানুষকে একই কথা দুটি উপায় অবলম্বন করে বুঝালো আরকি।হালিম মঞ্জুুুকে সদরের এক মেডিকেলের ঠিকানা হাতে তুলে দিয়ে বললোঃডাক্তার আমার আপন বড় ভাই।আমি ভাইয়াকে ফোন করে দিবো।আপনি জাষ্ট সাক্ষ্যাৎ করবেন।
কোনো টাকা পয়সা লাগবেনা।আমার ফোন নাম্বারটা রাখুন।অবশ্যই নিয়মিত যোগাযোগ করবেন।নুপুরের কাছে কিছু টাকা দিয়েছি।অবর্শনের পর ডাক্তারের নির্দেশ মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবেন।বাকি টাকা ওর শিক্ষার কাজে ব্যয় করবেন।বছর খানেক পর ওকে আমার কাছে নিয়ে গিয়ে দ’শম শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দিবো।হালিম মুন্সি অশ্রু সিক্ত চোখ নিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকান আরেকবার আছিয়ার দিকে।
“মা আছিয়া,জীবনের আধমৃত সময় গুলোতে বহুবার আকাশের দিকে চেয়ে ঈশ্বরকে খুঁজেছিলাম।তিনি দেখা দেননি।কিন্তু আজ আমি যাকে দেখছি সে ঈশ্বর নয় বটে,তবে কি মমতাময়ী ঈশ্বরী।.
.
চাচা আপনি রওনা দিন।আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছে_ভোর হওয়ার আগে কেনো বের হয়েছি।
আমি আসলে চিরদিনের জন্য বাপের বাড়িতে চলে যাচ্ছি।বহুকাল থেকে স্বামীর খোঁজ নেই।আর সবকিছু তো দেখেছেন এবং ভালোই জানেন।তাই আর মন সায় দিচ্ছিলোনা।
হালিম মঞ্জু আছিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে আশির্বাদ করেন।
তুমি চলে গেলে এই গ্রামের অনেক মানুষ না খেয়ে কিংবা চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে।তয় সিদ্ধান্তটা ভালোই নিছো মা।এমন পরিস্থিতিতে বাবা মায়ের সাথে থাকাটাই ভালো।তাছাড়া তোমার বাবার পরিবারের সবাই শিক্ষিত রুচিশীল মানুষ।
ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পরে লালমনিরহাট বাস স্টেশনে পৌঁছে যায় আছিয়া।ওই রিক্সাতেই উঠে পড়েছিলো।বিদায় বেলায় হালিম মঞ্জুরের হাতে আরও একশত টাকা ধরিয়ে দিয়েছিলো।হালিম মঞ্জুর না করেননি।ওনার পুরনো ভাঙাচোরা রিক্সায় এমনিতে প্যাসেঞ্জার কম ওঠেন।কাছের পরিচিত লোকজনই একমাত্র ভরসা।
স্টেশনের আশেপাশের নিয়ণ বতিগুলি এখনো নিভুনিভু জ্বলছে।ছোটো ছেলে ইমন পায়খানা করে প্যান্ট নষ্ট করে দিলো।প্রচণ্ড রাগে গজরাতে শুরু করলেন আছিয়া খানম।তারপর ছেলের’ পাছাায় চপেটাআঘাত করে মসজিদের ওযু খানায় পরিষ্কার করিয়ে নিয়ে এলেন।এরপর ইমুর শুরু হলো।ও আম্মু আগু কলবো।প্যান্ট কুলে দাও।
আরে বাবাহ!এখানে নয়।আমার আঙুল ধরো।
কিছুদূর হেঁটে গিয়ে মেইন রোডের নিচের ঢালু আস্তরণে ছেলেকে বসিয়ে দিয়ে মুখে রুমাল চেপে আঙুল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ইমন দুষ্টমিতে মত্ত।আম্মুর চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে।একটু আগের কান্নাটা নিমিষেই অদৃশ্য হয়ে গেলো।
ইমন আম্মুর দিকে তাকিয়ে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে।ও আম্মু পাছায় পিপলা কামলায়।চুলকাত্তে তোহ!ও মাগো!
এই বাবা এমন করেনা।এদিকে সরে বসো।দু’একটা লাল পিপড়ে।কিচ্ছু হবেনা।ভালো করে হাগু করে নাও।বাসের মধ্যে চিল্লাচিল্লি করলে অনেক মারবো কিন্তু।
(মাসুদ চয়ন)

১৬৯জন ৬৩জন
5 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য