জীবন নদীর বয়ে চলা_২

মাসুদ চয়ন ২৯ জুলাই ২০১৯, সোমবার, ০৩:৫৩:১৮অপরাহ্ন গল্প ১২ মন্তব্য

#গল্পঃ-জীবন নদীর বয়ে চলা//
(দ্বিতীয় পর্ব)
স্বামীর অনুপস্থিতিতে আছিয়া খানমের উপর নানা রকমের মানসিক টর্চার চলতে থাকলো।এমনকি তার নিজস্ব সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিলো।একদিন তিনি আঁড়তের তামাক বিক্রি করে দু’টি দুস্থ পরিবারকে দশ হাজার টাকা করে দান করার উদ্যোগ গ্রহন করেছিলেন।শশুরতো রেগে আগুন।ওই বেশ্যা মাগি!এগুলা কি তোর বাপের সম্পত্তি পাইছিস।হাজি না হয় বুইড়া কানা।মন চাইছে উইল করছে,তার মানে এই নয় যে,তুই যা মন চায় তাই করবি!এভাবে সম্পত্তি উড়াইলে কি চলবে!বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আয়,তারপর যা মনচায় কর!
আছিয়া খানম এমনিতেই প্রতিবাদী ঘরানার মেয়ে।তবে সেদিন একটু বেশিই প্রতিবাদ করে বসেন।শশুরের মুখের উপর পালটা জবাব ছুড়ে মারতে থাকে একের পর এক।
আপনি কেমন মানুষ শুনি!এ কেমন ভাষা ছেলের বউয়ের প্রতি।আপনিতো নিমোক হারামের চেয়েও জঘন্য কিছু,কমন সেন্স কি লুঙ্গির তলে!দুইটা পরিবার গত তিনদিন থেকে ঘর মেরামত করার জন্য মানুষের হাত পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে সহায়তা পাওয়ার জন্য।মানুষ পাঁচ/দশ টাকা করে সহায়তা করছে।ওই টাকা দিয়ে একটা বাঁশের পইয়ো তো ম্যানেজ হবেনা।এমন কাল বোশেখির দিনে ভাঙাচুরা খঁড়ের ঘর যখন তখন উড়ে যেতে পারে।আপনারা কি চান আসলে!মানুষগুলো দুর্যোগের কবলে নির্মম ভাবে ব্যথিত হয়ে মরুক। সারাদিন জুয়া খেলে অঢেল টাকা নষ্ট করছেন।আর আমি আমার অর্থ দিয়ে কি করছি না করছি তার পেছনে জমের মতো লেগে আছেন!শুধু কি আপনি!এই পরিবারের প্রতিটি চোখ নজর রাখছে শকুনের মতো।নষ্ট মেয়ে বলে মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছেন।আচ্ছা নষ্ট বা নষ্টা এসব কি আমার সাথে যায়,এমন উপাধি তো আপনাদের জন্য উপযুক্ত।
এমন অনধিকার চর্চার অধিকার কে দিয়েছে শুনি!
শশুর জমির চোধুরী মুখ চেপে রেগে রাগে কটমট করতে থাকেন,বৃদ্ধ শরীরে হায়েনার মতো তীীব্র ক্রোধ জমতে থাকে।কিছুতেই নিজেকে সংযত রাখতে পারেনা।
বসে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অঢেল জনতার সামনে আছিয়ার মাথায় সজোরে আঘাত করে বসেন ওই চেয়ার দিয়ে।ওই খানকি মাগি!তোর কাছে আমার জবাব দিতে হবে!এটা হাজী বংশ-মহিলা মানুষের মাতব্বরি চলবেনা।
তারপর চুলের মুট ধরে মাটিতে লুটিয়ে ফেললেন।এলোপাথারি লাত্থি আর কিল-ঘুষিতে নিস্তেজ করে ফেলেন।কেউ এগিয়ে আসেনি।সবাই যার যার মতো স্থান ত্যাগ করতে থাকে।
.
জমির চোধুরীর ভয়ংকরী তাণ্ডব দেখে আশে পাশে থাকা মানুষগুলোও কেটে পড়তে থাকেন।ওনাকে সবাই জমের মতো ভয় করে।কেউ এগিয়ে আসেনি তাই। আছিয়ার দুদেবর নাসির ও তাহের ছুটে এসে পিতাকে সংযত হতে বলেন,তাও সবকিছু ঘটে যাওয়ার পর।
বড় দেবর নাসির চোধুরী বৃদ্ধ পিতাকে শাসাতে থাকেন।আব্বা এটা আপনি চরম অন্যায় করেছেন।এতো অর্থ সম্পত্তি থাকার পরো কি জন্য সামান্য ১০/১২ লক্ষ টাকার জন্য বারবার খোঁটা দিচ্ছেন নিজের ছেলের বউকে!আল্লাহ ম্যালা দিছে আপনাকে!তাতেও কি হয়না!শেষ পর্যন্ত গায়ে হাত তুললেন।জামিল ভাই শুনলে অনেক কষ্ট পাবেন।কোনোদিন বাবা নামে ডাকবেননা।সব ঠিক ছিলো,কিন্তু আজকেরটা অতিরিক্ত হয়ে গেলো।আপনি সত্যিই পাপিষ্ঠ মানুষ।হৃদয়ে দয়ামায়া নেই।অতিরিক্ত অহমিকা আপনাকে অমানুষেে পরিনত করে দিয়েছে।
অথচ দু’দুবার ওমরাহ পালন করে হজ্বে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
.
দু’জন প্রতিবেশী মহিলা ছুটে এসে আছিয়ার কেটে যাওয়া ক্ষত স্থানে ব্যাণ্ডেজ করে দিচ্ছেন।আছিয়া মাথা নিচু করে অঝোরে কাঁদছেন।নিঃশব্দের ক্রন্দন,একটুও শব্দ নয়।কেবল দু’চোখের ছল ছল অশ্রু ফোয়ারা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে ঘাসে জমে থাকা শিশির বিন্দুর মতো।নাসির চোধুরী ভাবিকে ধরে রেখেছে।প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয়েছে।ছোটো দেবর সাইকেল নিয়ে সদরের পথে রওনা দিয়েছে ডাক্তার আনার জন্য।তা প্রায় চার কিলোমিটার দূরের পথ_ভাঙাচোরা এবড়ে থেবড়ে রাস্তার হিসেবে ১০ কিলো যাত্রার ব্যয়িত সময়ের সমান দূরত্ব।বাঁশঝার ঝোঁপ জঙ্গলের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা নির্জন পথ।অনেকে তো একা চলার সাহসো রাখেনা।
ছোটো দুই ছেলে মাকে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে যাচ্ছে।এই অবুঝেরা ঘুমিয়ে ছিলো।কিছুক্ষণ আগে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পেয়ে উঠে পড়ে।পাশের আমগাছের নিচে পাটি বিছিয়ে শুয়ে রাখা হয়েছিলো।বাহিরের শীতল স্নিগ্ধ বাতাস স্পর্শ করবে এই ভেবে।ওরা শুধু কাঁদছেই।মায়ের চোখের জল ওদের কাঁদতে বাধ্য করেছে।আর কিচ্ছু জানেনা ওরা,কিচ্ছুনা!
রক্ত ঝরা বন্ধ হলে আছিয়াকে নিজের রুমে নেয়া হয়।
২৫ বছরের শ্যামলা সুন্দর চেহারার যুবতী তিনি।দেহে এমন মারাত্মক ক্ষত এর আগে কেউ এঁকে দেয়নি।এটাই প্রথম_তাই মেনে নিতে পারছেনা।কষ্টটা যতটানা ব্যাথার,তার চেয়ে অধিকতর বেশি অপমানের।ওই মানুষগুলো তাকে অনেক ভালোবাসে সন্মান করে,বিপদে আপদে সহায়তার জন্য কাছে আছে,আছিয়া খানম সাধ্যমত সহায়তা করে,কখনো অর্থ সম্পদ দিয়ে কখনোবা কথায় অনুপ্রেরণায়।ছোটো শিশু ইমরান ঘুমিয়ে পড়েছে না খেয়েই।
এখনো বুকের দুধ খায়।
বড় ছেলে ইমু মায়ের বুকে মাথা রেখে আধো ঘুমন্ত হয়ে শুয়ে আছে।অনেক জোর জবস্তি করেও মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেয়া সম্ভব হয়নি।
সন্ধ্যার প্রথম লগ্ন অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে।রাত শুরু হতে চলেছে।ঝিঁঝি পোকার চ্ছিস চ্ছিস আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।কাজের মহিলারা চুলায় রান্না উঠিয়েছে।এ বাড়িতে শুধু রান্না করার জন্যই দু’জন মহিলাকে নিযুক্ত করা হয়েছে।তিনজন রাখাল সারাদিন গরু ছাগল আর জমিজমা নিয়ে পড়ে থাকে।ওরা সকলেই এই পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য। পরিবারের পুরুষেরা জুয়া খেলায় মেতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত,সাথে নেশাটাও চলে।আছিয়ার একমাত্র ননদ বিদেশে থাকে।তিন চার বছর অন্তর গ্রামে ফেরেন।
প্রত্যেকেই নিয়ম মেনে ইবাদাত পালন করেন,আছিয়াও করেন,তবে আঁড়ালে,আছিয়া ইবাদাতকে ব্যক্তিগত অধিকার মনে করে।অন্য ধর্মের প্রতিও তার সমান অনুরাগ।এ গ্রামেও অন্যকে ইবাদাত পালনে আমন্ত্রন করা হয়।তারা অধিকাংশই ধার্মিক ব্যবসায়ী মানে ধর্মকে ভাঙিয়ে জীবন যাপন করাই প্রধান পেশা।মুখে সুদর্শন দাড়ি,মাথায় ঝকঝকে টুপি-সাথে এক রঙা আলখাল্লা।এদের মধ্যে সবাই কিন্তু ভণ্ড নয়,কেউ কেউ অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়েছে।জীবন তো বাঁচাতে হবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই আছিয়া ঘুমিয়ে পড়ে।ইমু জেগে থাকে আর অঝোরে কাঁদে।
.
রাত তখন ১০ টা অতিক্রম করতে চলেছে।নাসির চোধুরী গরুর খামারে খাদ্য পরিবেশনকারীদের দেখভাল করছে।তার ছোটো ভাই জুয়ার আসরে মত্ত্ব।কেউ গাঁজা টানছে,কেউবা তামাকজাত ধোয়া।গ্রামীণ জীবনে এটাই অনেক রাত,বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবহেলিত গ্রাম।দু’চারটা জমিদার পরিবার ছাড়া বাকিরা দিন এনে দিন খেঁটে খাওয়া মানুষ।এশার নামাজ শেষ করে ইজি চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছেন জমির চোধুরী।নিজের উপর ভীষণ রকম অনুতপ্ত তিনি।ওনার সহধর্মিণী বাক শক্তি হারিয়ে বিছানায় পড়ে আছেন দু’বছর থেকে,চিকিৎসায় কোনো কাজ হচ্ছেনা। কণ্ঠনালীর ক্যান্সার বলে কথা।দু’রকমের বেদনা দু’,দিক থেকে জাপটে ধরেছে অক্টোপাসের মতো।একবার উঠে দাঁড়ালেন আছিয়ার রুমে যাওয়ার জন্য।বিনয় অনুনয় করে ক্ষমা চাইবেন।পরোক্ষনেই থমকে দাঁড়ালেন-এতো রাতে নয়।কাল সকালে।এরপর আবারও ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে নুয়ে পড়েন।দু পাশের খোলা জানালা দিয়ে শিরশির করে বাতাস প্রবেশ করছে।
অন্ধকার রাতের ঝোঁপঝাঁরগুলোকে খুব গভীর ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট বলে মনে হচ্ছে।
আকাশের দিকে চেয়ে থেকে নিজের বয়স গননা করছেন।দেখতে দেখতে ষাট বছরের বৃদ্ধ বনে গেলেন।আর অল্প কয় বছরের অপেক্ষা।২/৪ বা পাঁচ।শরীর তো তেমনটাই ইঙিত করছে।প্রচুর পাপিষ্ঠ মানুষ আমি। জুয়া আর নেশা-জীবনটা এভাবেই শেষ প্রান্তে চলে এলো।
.
মধ্য রাতে ঘুম থেকে জেগে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র গুছিয়ে নিলেন আছিয়া বেগম।শেষ বারের মতো জামিল আহমেদকে(স্বামী)ডায়াল করলেন।ওপার থেকে ফোন বন্ধ থাকার চিরচেনা সংকেত ভেসে উঠলো।এক হাতে আট মাসের শুধু
শিশুকে কোলে তুলে নিলেন অন্য হাতে লগেজ।সাড়ে তিন বছরের শিশু পুত্র ইমু বিষন্ন মুখ নিয়ে মাকে প্রশ্ন করে-আমরা তো নানু বাড়িতে যাচ্ছি তাইনা আম্মু।দাদা ভাই তোমাকে মেরেছে,আমি তাতুর কাতে তুনেছি।তাতু বলেছে-আমাকে অনেক বলো মানুষ বানাবে,আমি গালিতে তরে বেলাবো।আছিয়ার বুকটা ধুক করে কেঁপে ওঠে।পুত্রের কপালে গালে একের পর এক চুম্বন দিতে থাকে_জি বাবা।
(মাসুদ চয়ন)

২৩৮জন ১০৩জন
4 Shares

১২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য