আলোয় আলোয়...
আলোয় আলোয়…

জীবনটাকে অর্থহীন লাগে কখনো কখনো। মনে হয় এই যে বেঁচে আছি, হাঁটছি-চলছি-ঘুরছি-ফিরছি, পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব কষছি, শুধু কি এজন্যেই এই পৃথিবীতে আসা? সময়ের বদলে একই মানুষকে একবার ভালোবাসছি, আবার ঘেণ্ণাও করছি। কি অদ্ভূত মানুষ আমরা! যে মানুষটিকে ছাড়া অসহ্য যন্ত্রণা বুকের ভেতর আর সেই সাথে শব্দহীন অনুভূতি অস্থির করে তোলে, তাকে ছাড়া আবার বেঁচেও থাকতে পারি আমরা সকলে। মানুষ কখনো যে কারো অভাবে জীবনকে থামিয়ে দেয়না। কথায় আছে না : প্রকৃতি জায়গা পূরণ করে নেয়। আমরা শোক নিয়ে বেশী সময় থাকতে পারিনা। যেমন আমাদের চোখের জলের ধারার স্থায়িত্ব পনেরো মিনিট। তারপর জল থেমে যায়, শুধু ফোঁপানোর শব্দটুকু থাকে। কেন আমরা বাবা-মা হারিয়ে যাবার পরেও বেঁচে থাকি? কেন হাসতে পারি? কেন পারি আনন্দ করতে? আসলে আমরা হারাবো বলেই মনের অজান্তে প্রস্তুত থাকি। একদিকে যতো হারাই, উল্টোদিকে পাইও কিন্তু। সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে যাই। কিন্তু যাদের সন্তান নেই, তাদের যন্ত্রণা কোনো কিছুর বিনিময়েও ফুরোয় না।

সন্তানধারণের মতো আনন্দ পৃথিবীর আর কোনো আনন্দের সাথে তুলনাযোগ্য নয়। একটা জীবন নিজের শরীরের ভেতর বড়ো হচ্ছে, এ যে কি এক অনুভূতি! যেদিন সন্তানের অস্তিত্ত্ব টের পেলাম, ডাক্তার বললো, চঞ্চল আমি, দৌঁড়ছুট মেয়েটা আমি নিজের যত্ন নেয়া শুরু করলাম। দায়িত্ত্ব পালন বলেনা ওটাকে। যেদিন প্রথম নেচে উঠলো জীবনে সব সুন্দর পাওয়া যেনো তখন ম্লান। আর তারপর ওর মুখ দেখা, আমার সন্তান। পুরোপুরি আমার। আমি আদর করবো, আমি বকবো। এমন অধিকার! যাক আজ সেই ছেলে তরকারী গরম করে ভাত টেবিলে নিয়ে এসে আমায় খেতে ডাকে। মাঝে-মধ্যে সকালে ওমলেট আর টোষ্ট বানিয়ে আমায় সারপ্রাইজ দেয়। যাক সেসব কথা। তখন মনে হয় জীবনটা অনেক সুন্দর। আজ সন্তানের কথা কেন বলছি, তার কারণ বলবো।

জীবনের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা আমার। বিশাল হতাশাগ্রস্ত সময়ে অনেকেই নিজেকে খুণ করেছে, আমি অপেক্ষা করেছি সুন্দর দিনের। অনেক ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিলো মাদার তেরেসা হবার। কি সুন্দর সাদা শাড়ী পড়ে! বড়ো হলাম কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করবো না। সেবা করবো মানুষের আর চাকরী করে বাপি-মামনির দেখাশোনা করবো। ‘পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে।’ পড়লাম প্রেমে।  তারপর ভাঙন। তারপর বিয়ে। পনেরো বছরের সংসার, তেরো বছরের ছেলে। বেশ চলে যাচ্ছে। কিন্তু স্বপ্ন কি স্বপ্ন দেখা ছাড়তে পারে? ডাক্তার হতে পারিনি, সেবা করাও না। কিভাবে জানি কানাডা এসে সে ইচ্ছেও পূর্ণ হয়ে গেলো। যখন এক একজন ক্লায়েন্টের কাছে যাই, নিজের কাজের বাইরেও কাজ করে দিয়ে আসি। মন ভালো হয়ে যায়। ভালোবাসা যে পাই, অমন ভালোবাসা পেলে মন খারাপ করে রাখার সময়টুকুই তো থাকে না। যখন প্রায় অনেক ক্লায়েন্ট অফিসে ফোন করে আমাকেই চায়, আর কি কোনো চাওয়া অপূর্ণ থাকে? এসব পেয়েই তো বেঁচে থাকার লোভ খুব বেশী হয়েছে। কিন্তু বেঁচে থাকা কি যায়? একদিন না একদিন চলে যেতেই হবে। আজ হোক আর কাল। আমি সবসময় প্রার্থনা করি সুস্থ অবস্থায় যেনো যেতে পারি। আর এখন তো আরোও বেশী বেশী করে করি। কেন করি? সেপ্টেম্বর মাসের এক তারিখে সব ফাইনাল করে এসেছি, আমার অর্গান ডোনেট করেছি। ভেবেছিলাম আগষ্টের ২৮ তারিখেই ফাইনাল করবো, কিন্তু খুব ব্যস্ত ছিলাম।

সেদিনের গল্প বলি। হঠাৎ দেশ থেকে ফোন, বন্ধুর। কথায় কথায় বললাম আমার সাথে যাবি এক জায়গায়? বললো কোথায়? ফোনের ভেতর ওটার কন্ঠটাকে নিয়ে গেলাম সাথে। টিকেট নিতে গেলাম মহিলা জানতে চাইলো হেলথ কার্ড রিনিয়্যু করতে এসেছি কিনা! বললাম অর্গান ডোনেটের পেপারটা জমা দেবো। মহিলা এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন। টিকিটটা নিয়ে দুটি ঘন্টা বসে রইলাম ওন্টারিও সার্ভিস সেন্টারের হেলথ ডিপার্টমেন্টে। যখন আমার নাম্বার এলো, গেলাম। মহিলা বললো কার্ড রিনিয়্যু? বললাম অর্গান ডোনেট করবো, ফর্মটা জমা দেবো। আর একদিন যে এসে কথা বলে গেলাম, তোমরা ফর্ম দিলে। মহিলাও চেয়ে রইলো। বললো স্পেশ্যাল হেলথ কার্ড পৌঁছে যাবে। এই কার্ড দেয়া হয় যদি পথে এক্সিডেন্ট হয়, মরে যাই তাহলে…থাক বললাম না। জমা দেবার পর মনে হলো এ আরেক জীবন নিয়ে আমি শ্বাস নিচ্ছি। এ আরেক মাতৃত্ত্বের স্বাদ। আবার নিজের যত্ন নেয়া শুরু করেছি। বাঁচতে হবে সুস্থভাবে। আমি থাকবো এই পৃথিবীতে, নিঃশ্বাস ছাড়া হোক। তাও থাকবো। যদি না দিতাম কি হতো? ওই মাটিতে মিশে যেতে হতো। কি কাজে লাগতো মৃত এই শরীরটা? ভাবতে কি যে ভালো লাগছে সুন্দর এই পৃথিবী আমার এই চোখ দিয়ে অন্য কেউ দেখবে। অবশ্য চশমা রেখে যাবো। এই হৃদয়টায় অনেক ভালোবাসা সেও থেকে যাবে কারো বুকে। বন্ধুরা বলে অনেক সুস্থ আমার হার্ট। অনেক হাসি যে! কিডনিও দারুণ। প্রচুর জল খাই। বান্ধবী বললো, আমার ব্রেনটা যেনো কাউকে না দেই। তাহলে সে বেচারা/বেচারীর অবস্থা শেষ। অনেক হাসলাম। এখন আমি অকারণেও হাসি। এতো আনন্দ হয় ডোনেট করলে? ইস আগে যদি জানতাম! অনেক আগে সন্ধানীতে গিয়েছিলাম রক্ত দিতে, নেয়নি। কি কষ্ট! আজ পর্যন্ত রক্তদান করতে পারিনি। ঈশ্বর সত্যি আমার কোনো ইচ্ছে, চাওয়া বাকী রাখেনি। আর যা পাইনি এখনও তাও জানি পেয়ে যাবো। আমার সদিচ্ছাগুলো কোনোদিন অপূর্ণ থাকেনি।

আমারই বুকের অলিন্দ-নিলয়ে তুমি শ্বাস নেবে
কাঙ্খিত ইচ্ছেগুলো দাপিয়ে বেড়াবে কৈশোর কিংবা তারুণ্য;
অথবা লাঠির উপর ভর দিয়ে চলা, এক আস্ত সময় পাড়ি দেয়া
নুয়ে পড়া নিম্নবিত্ত বয়স।
হিম হয়ে যাওয়া শরীরটার হাড়গোড় মাটির সার
আর ভেতরের অংশে থাকা কাব্য-গল্প-উপন্যাস-নাটক সব ছাপার অক্ষরে
এদিক-ওদিক প্রকাশিত হবে অন্যভাবে।
অনাঘ্রাত জল ফিল্টার হবে তোমারই শরীরে।
আমি কোথাও যাবোনা
এ পৃথিবী ছেড়ে, তোমায় ফেলে কখনোই যাবোনা।
আলোড়িত হবো,
আলোক ছড়াবো—
তোমার ঘাসে-লতায়-পাতায়-সূর্যকণায়-মেঘ-বৃষ্টি-রাতের জোনাক পোকায়
পৃথিবী তোমার থেকে কি করে যাবো?
আমার সমস্ত অহঙ্কার গড়িয়ে গেছে যে তোমার বুকেই।

আলোড়ন...
আলোড়ন…

হ্যামিল্টন, কানাডা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং।

 

১৯৩৫জন ১৯৩৫জন
22 Shares

৩৪টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ