জীবন জীবনের কাছে খুন হয়ে যায়

মাসুদ চয়ন ২২ আগস্ট ২০১৯, বৃহস্পতিবার, ০৯:৩৪:৫৫পূর্বাহ্ন গল্প ১১ মন্তব্য

২০১৬ সালের ঘটনা।আমার নিজ এলাকার ক্যান্সার আক্রান্ত আশঙ্কাগ্রস্থ রুগীকে ঢাকায় নিয়ে এলাম।খুবই দারিদ্র মানুষ।স্ত্রী বাবা মা মৃত।একমাত্র মেয়েকে নিয়েই ওনার জীবন চক্র।অন্যের জমিতে চাষাবাদের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।মেয়েটাকে ব্র্যাক স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।রান্না বান্না কাপড় ধৌত উঠোন পরিষ্কারসহ যাবতীয় কাজ নিজেই সম্পাদন করতেন।মেয়েকে অনেক আদর যত্নে রাখতেন সবসময়।লক্ষ লক্ষ টাকার চিকিৎসা খরচ কোথায় পাবেন তিনি?এ জন্য নিজের চিকিৎসার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।ঘটনার বিবরণ এতো সহজ স্বাভাবিকতায় দিচ্ছিলেন,যেনো ওনার কিছুই হয়নি।ঘটনা শোনার পর নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি।মেয়েকে রেখে আসবেননা,এ জন্য মেয়একেও সাথে নেয়া হলো।
.
ঢাকায় অর্থ সংগ্রহের জন্য তহবিল গঠন করা হলো।বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ইউনিট থেকে ভালোই সহায়তা আসছিলো।আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে অর্থ সংগ্রহের কাজে নিমগ্ন হলাম সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত।কারণ,হাতে খুব অল্প সময় ছিলো।আসলে এমন পরিস্থিতিতে কোনো কিছুতেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।এভাবে তিনদিন চলার পর অবস্থা আরও ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হচ্ছিলো‌_খুব দ্রুততার সাথে ওনাকে আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।আমার সাথে আরও দুজন বন্ধু ছিলো-ওনার ৯ বছরের কন্যাও ছিলো।মেয়েটা বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে।খুব কাঁদছিলো।কান্নার শব্দ ছিলোনা_চোখ মুখ গলিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরছিলো।জোর করে খাইয়ে দিলে খেতো,নাহলে মুখ ভাড় করে বসে থাকতো বাবার হাত ধরে।মেয়েটার চোখের দিকে তাকালেই বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠতো।নক্ষত্রের আধো আলোর মতো শৈল্পিক সুন্দর শিশু।অথচ মুখে তার হাসি নেই একটুও।
..
অবশেষে মেডিকেলে ভর্তি করানো হলো।মেয়েটা বাবাকে শক্ত করে বুকে ধরে রেখেছে।আধো আলো আধো অন্ধকারে আচ্ছন্ন একটি রুম।একটি জানালা খুলে রাখা-জানালার ওপারে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নাইট ডিউটি শুরু হয়ে গেছে।প্রচুর শব্দ দূষণ।এক রুমেই ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে ছয় ছয়টি বেড।মানে এক রুমেই ছয়জন ক্যান্সার আক্রান্ত রুগী।একজনের সামনেই আরেকজনের ট্রিটমেন্ট চলছে।কি নিবিড় নিস্তব্ধতা চারপাশে।কেউ কাউকে চেনেনা।প্রত্যেকেই নির্মম নিয়তি মেনে নিয়েছে হয়তো।একটা টিভি সেটেরো ব্যবস্থা নেই।তখন পর্যন্ত তহবিলে সংগৃহীত অর্থের পরিমান ছিলো চল্লিশ হাজারের মতো।দু’মাসের অগ্রিম চার্জ পেইড,এ্যাডমিশন অনুমোদন,ব্লাড,বডি চেকআপ সব মিলে ৩০ হাজার খরচ হয়ে যায়।
..
কয়েক ঘন্টা পর ওনার অবস্থার চরম অবনতি হলে_ডাক্তারের রুমে আমার ডাক পড়ে।মানে খুব দ্রুততার সাথে শরীরের ব্লাড ট্রান্সফার করতে হবে।সাথে প্লাটিপ্লেটের ব্যবস্থাও করতে হবে।মেডিকেলে প্লাটিপ্লেট সংকট চলছে।তারপর রেডিও থেরাপি রেডিয়েশন দিতে হবে।না হলে অবস্থার অবনতি রোধ করা সম্ভব হবেনা।সময় যতই এগিয়ে যাবে বিপদ ততই কাছে আসবে।
এর মধ্যে দু’জন মৃত রুগীর লাশ তাদের পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হলো।আহ!কি নির্মম কান্নার রোল ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে।
আমি ডাক্তারের দিকে বিষন্ন মুখ নিয়ে চেয়ে আছি।উনি বললেন এক্ষুনি বিল পেইড করে অনুমোদন নিয়ে আসুন।দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।
আমি বেশ আতঙ্কিত হয়ে ওনাকে প্রশ্ন করলাম।মোট কতো টাকার কেইস?
উনি না শোনার মতো ভান করে মৃদু স্বরে উত্তর দিলেন এএএ এক লক্ষ দুই/চার হাজারের মতো-রুগীকে থেরাপি দেয়ার পর আইসি ইউতে নিতে হতে পারে-এ জন্য আরও তিন চার লক্ষ টাকা রেডি রাখবেন।এতো টাকা এই অল্প সময়ে কিছুতেই ম্যানেজ করা সম্ভব ছিলোনা।অবশেষে হেড অফ ডিপার্টমেন্টে দরখাস্ত পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম।টাকা পরিশোধের জন্য তিন/চারদিন সময় চাওয়া হয়-সেই শর্তে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।উত্তর আসেনি।হ্যাঁ বা না কিছুই জানা হয়নি।অথচ আমরা ৪ ঘন্টা ধরে অপেক্ষারত ছিলাম।মধ্য রাতের দিকে প্রচুর রক্তপাত শুরু হয় ওনার।নাক কান মুখ পায়ু ছিদ্র দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছিলো।রুগীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
আশেপাশে অন্যদের চিকিৎসা হচ্ছিলো জোরসে।এতোবার মিনতি করেও ওদের মন গলেনি।
..
অথচ এতো এতো বিশেষজ্ঞ ক্যান্সার ইউনিটের সামনে মানুষটা গলা হাত পা পাকস্থলীর জ্বলনে নিভে গেলো।কেউ তাকিয়েও দেখলোনা,কেউ না!আমরা চারজন ছাড়া আর কেউ রুগীর শরীরে হাত দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ওনার নয় বছরের মেয়েটা সেদিন থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন।এখনো সেই অবস্থায় রয়ে গেছে।ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে ঘোরে।পথবাসীদের সাথে ঘুমায়।অনেকে ওর সাথে শারিরীক মিলনো করে রাতের অন্ধকারে।মানে রাত্রিকালীন পতিতা দালালরা খাদ্য দেয়ার বিনিময়ে তার শিশুতোষ দেহ হতে সুখ আহোরণ করে। আমার সাথে নিয়মিত দেখা হয়_ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি,কিন্তু লাভ হয়না।_আমাকে দেখলেই খুনি খুনি বলে চিৎকার করে ছুটতে থাকে।এ নিয়ে পত্রিকা অফিসে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম।তারা প্রকাশের প্রয়োজন অনুধাবণ করেননি।তাই হাল ছেড়ে দিয়েছি।
(মাসুদ চয়ন)

১৮০জন ৫৬জন
17 Shares

১১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য