জীবন চিতা-পর্ব৭ক

আবু জাকারিয়া ২ মার্চ ২০১৫, সোমবার, ০৭:০৪:৩৭পূর্বাহ্ন সাহিত্য ৬ মন্তব্য

পর্ব৭ক

জামিলা হঠাৎ খিল খিল করে হেসে উঠল। কালাচান কবিরাজ গান বন্ধ করল আর বলল, বল কোথা থেকে এসেছিস?
জানিলা আরো জোরে হেসে উঠল।
কালাচান বলল, বল কোথা থেকে এসেছিস, কেন এসেছিস?
জামিলা আবার উচ্চ শব্দে হেসে উঠল।
কালাচান কবিরাজ একটা বড় লোহা দিয়ে মাটিতে দাগ কেটে বলল, খুব আনন্দ লাগে তোমার, মানুষকে জ্বালাতে খুব আনন্দ লাগে?
জামিলা জোরে জোরে মাথা ঝাকিয়ে উত্তর দিল, হ্যা খুব আনন্দ লাগে।
-খুব আনন্দ লাগে?
-হ্যা খুব আনন্দ লাগে।
-দাড়া, আনন্দ বের করছি।
জামিলা হাসল আর মাথার চুলগুলো ঝাকিয়ে আরো এলোমেলো করল।
কালাচান কবিরাজ তার থলের ভিতর থেকে একটি বড় হাড়ের টুকরা বের করল। হাড়ের টুকরাটি আগুনে পুড়িয়ে জামিলার নাকের কাছে ধরল। হাড় পোড়ানোর কটু গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ল ।
জামিলা একটু পেছনে সরে গিয়ে নাক চেপে ধরে বলল, থুর থুর.. যতসব হারামি এসে জুটেছে..থুর থুর তোদের মত জানোয়ার আমার কিছু করতে পারবে না..থুর থুর থুর থুর..।
কালাচান বলল, আমি হারানি, আমি জানোয়ার? তাহলে তুই কি, তুই মানুষকে জ্বালাচ্ছিস?
জামিলা বলল, তুই আমাকে কিছু করতে পারবিনা, এখন আমাকে যেতে দে। বলেই জামিলা আবার হাসতে লাগল।
কালাচান বলল, ঠিকই যেতে দেব তোকে, তার আগে বল কেন এসেছিস, কোথা থেকে এসেছিস?
জামিলা আবার হেসে বলল, তোর জেনে কাজ নেই, তুই আমাকে কিছুই করতে পারবি না।

কালাচান আবার হাড়টি পুড়ে জামিলার নাকের কাছে ধরল।
জামিলা নাক চেপে ধরে বলল, ওরে হারামি, হাড় পুরে আমার নাকের ধারে ধরেছিস কেন? সরা তারাতারি সরা।
বলেই কালাচান কবিরাজের হাতটা চেপে ধরল। কালাচান কবিরাজ হাতটা ছাড়িয়ে পোড়া হাড়টি আবার জামিলার নাকের কাছে ধরল।
জামিলা চেচিয়ে বলল, থুর থুর.. কি গন্ধ! কত্ত বড় হারামি দেখ..এই কি বাজে গন্ধ!

কালাচান কবিরাজ পোড়া হাড়টি তার টোপলার মধ্যে রেখে দিয়ে বলল, বুঝেছি, এতে তোমার কাজ হবেনা, তোমাকে মরিচ পোড়া দিতে হবে।
কালাচান তার থলের ভীতর থেকে কিছু শুকনো বিষ মরিচ বের করে আগুনে পুরিয়ে জামিলার নাকের কাছে ধরল।
জামিলা খুক খুক করে কেশে জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, ওরে কালাচানের বাচ্চা, তুইতো আলি আকবরের চেয়েও হারামি, তারাতারি আমার নাকের কাছ থেকে মরিচ পোরা সরিয়ে ফেল।
কালাচান কবিরাজ মরিচ পোড়া জামিলার আরো নাকের কাছে নিয়ে বলল, তাহলে আগে বল কোথা থেকে এসেছিস, কেন এসেছিস?
জামিলা গলা ফাটিয়ে কেশে বলল, বলছি, তার আগে মরিচ সরিয়ে নে।
-আগে বল তারপরে সরিয়ে নেব। কালাচানের শরীর ঘেমে গায়ের জামাকাপড় ভিজে গেছে। ফাকে একটা গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছে নিল।
জামিলা চেচিয়ে বলল, বলব না, কিছুতেই বলব না।
-তোর মত সয়তানকে কিভাবে কথা বলাতে হয় আমার ভাল করে যানা আছে।
জামিলা এবার খিল খিল করে হেসে উঠল আর নিজের এলোমেলো চুলগুলো সামনে নিয়ে এসে ভাল করে মুখমন্ডল ঢেকে ফেলল।
কালাচান কবিরাজ থলের ভীতর থেকে একটা মাদুলি বের করে তার মধ্যে একটা তাবিজ ভরে মাদুলিটা মোমের আগুনে গরম দিতে লাগল।
জামিলা সাথে সাথে ছট ফট শুরে করে দিয়ে মেঝের উপর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল।
কালাচান বলল, এবার না বললে তোর জান কবজ করে ফেলব সয়তান।
জামিলার কন্ঠ পাল্টে অল্প বয়সি মেয়েদের মত হয়ে গেল।
জামিলা চিকন কন্ঠে বলে উঠল, কি জানতে চাও বল?
-কোথা থেকে এসেছিস?
-চিতা থেকে, ৯ বছর আগে আমি মারা গিয়েছিলাম, আমাকে চিতায় পোরানো হয়েছিল, সেই থেকে চিতার কাছে থাকতাম।
-কেন এসেছিস?
-আমি নিজে আসিনি, আমাকে পাঠানো হয়েছে।
-কে পাঠিয়েছে তোকে?
-বৈকান্ত ওঝা, সাপের খেলা দেখায় সে।
-বৈকান্ত ওঝা তোকে কেন পাঠালো?
-জানিনা, আমি আসতে চাইছিলাম না, তারপরেও আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে।
-কিভাবে পাঠিয়েছে তোকে?
-একটা বোতলে ৭ দিন আটকে রেখেছিল আমাকে, বোতলটার মধ্যে আটকে থেকে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
-তারপর কি করা হল?
জামিলা চিকন কন্ঠে আরো কয়েকবার কেশে বলল, তারপর আমাকে নিয়ে একটা পেপে গাছের সাথে বেধে রাখা হয়।
-এবার বল তোর নাম কি?
-আমার নাম শ্রীমতি।
-তোর সাথে আর কে কে আছে?
-আরো তিনজন আছে আমার সাথে, তাদের দুইজন পুরুষ আর একজন মহিলা।
-ওরা তিনজন এখন কোথায় আছে?
-ওরা তিনজন আমার সাথেই আছে।
-ওদের নাম কি?
-পুরুষ দুজনের একজন সোলায়মান আরেকজন অর্জুন কর্মকার।
-আর মহিলার নাম?
-রানী, রানী দাশ।
কালাচান কবিরাজ মোমের আগুনে গরম করা তাবিজটা জামিলার নাকের কাছে ধরে বলল, কখন জাবি বল?
জামিলা আবার চিকন কন্ঠে বলল, আমি যাবোনা।
-কেন জাবিনা?
-আমার এখানে থাকতে ভাল লাগে, জামিলার প্রতি আমার মায়া হয়ে গিয়েছে।
কালাচান কবিরাজ চেচিয়ে উঠে বলল, ওরে হারামি চিতায় পোড়া সয়তান, তুই জাবিনা, জামিলার প্রতি তোর মায়া হয়ে গেছে।
জামিলা জোড়ে জোড়ে মাথা নেড়ে বলল, হ্যা মায়া হয়ে গেছে, আমি যাবোনা।
-তোর যেতে হবে চিতায় পোরা সয়তান, তোর যায়গা চিতায়, তুই এখানে থাকবি কেন?
-না, আমি এখানেই থাকব।
-তোকে আমি এখানে থাকতে দেবনা, তোকে পুরিয়ে মারব।
-আমি এখানেই থাকব, কিছুতেই যাব না।
-তোর যেতে হবে, না গেলে তোর জান কবজ করে ফেলব।
-না, আমি যাবোনা।
বলেই জামিলা চিকন কন্ঠে কাদতে শুরু করল।
কালাচান কবিরাজ হেসে বলল, কাদা অভিনয় করিশ? দেখি তোর চোখে পানি এসেছে কিনা?
কালাচান জামিলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোর চোখতো দেখি শুকনা, তুইতো কান্নার ভান করতেছিস।
অনেকেই জামিলার চোখের দিকে তাকাল, কিন্তু কেউ চোখে পানি দেখল না।
জামিলা চিকন কন্ঠে গুন গুন করে কান্নার শুর তুলছে।
কালাচান আবার তাবিজটা মোমের আগুনে গরম দিয়ে বলল, যাবি কিনা বল?
জানিলা আবার ছট ফট করতে করতে বলল, হ্যা যাবো, হ্যা যাবো। তাবিজ পোড়ানো বন্দ কর।
কালাচান কবিরাজ মমের আগুন থেকে তাবিজ সরিয়ে বলল, আর কোন দিন আসতে পারবি না।
-হ্যা, আর কোন দিন আসব না।
-এই এলাকায় আর কোন মানুষের ক্ষতি করবি না।
-হ্যা আর কোন মানুষের ক্ষতি করব না।
-এখন কি নিয়ে যাবি?
-জানিলাকে সাথে নিয়ে যাবো।
-না তুই জানিলাকে নিতে পারবি না, তোকে অন্য কিছু নিতে হবে।
-আচ্চা।
-এখন বল, কি নিয়ে এখান থেকে যাবি।
-একটা বড় গাছের ডাল।
-তাও নিতে পারবি না।
-তাহলে?
-তোকে পুরানো ঝাটা অথবা পুরানো জুতা নিয়ে যেতে হবে।
-আচ্ছা।
-কোনটা নিবি?
-ঝাটা।

★★★চলবে>>>

0 Shares

৬টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ