জীবন এক অনিশ্চিত ভ্রমন

রিমি রুম্মান ২৭ জুলাই ২০১৯, শনিবার, ১০:১৩:৩৮অপরাহ্ন সমসাময়িক ১৭ মন্তব্য

পদ্মপাতায় এক ফোটা জল যেমন যে কোন সময় টুপ করে ঝরে যাবার ভয় থাকে, জীবন অনেকটা তেমন। যেখানে ভাগ্যের সাথে চলে বেঁচে থাকার লড়াই। কথাগুলো বারবার মনে পড়ছিল বাড়ি ফেরার পথে। ফিরছিলাম ম্যাডিসন এভিনিউ, পার্ক এভিনিউ পেরিয়ে লেক্সিংটন এভিনিউয়ের ছয় নাম্বার ট্রেন ষ্টেশনের দিকে। ফিরছিলাম ম্যানহাঁটনের মাউন্ট সিনাই হাসপাতাল থেকে। লেখক বন্ধু এইচ বি রিতাকে দেখতে গিয়েছিলাম সেখানে। রিতা অসুস্থ। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অচেতন অবস্থায় থাকাকালীন সময়ে কাকতালীয়ভাবে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায়। লিভার দানকারী একজন মানবিক মনের মানুষের মৃত্যু হলে তার লিভার রিতার সাথে মিলে যায়। অতঃপর চলে অস্ত্রোপচার, লিভার ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আর স্রষ্টার অসীম কৃপায় রিতা জীবনে ফিরে এসেছে। জ্ঞান ফেরার ৩/৪ দিন পর দেখতে গিয়েছিলাম তাকে। রিতা কিছুতেই আমার নাম মনে করতে পারেনি। প্রায় এক সপ্তাহ অচেতন অবস্থায় থাকা রিতা চেতনে ফেরার পর খুব ধিরে আধো আধো অল্প কিছু স্মৃতি মনে করতে পারছিল। আবার পর মুহূর্তেই তা ভুলে যাচ্ছিল। দুর্বল, কাঁপাকাঁপা হাতে তরমুজের ছোট টুকরা মুখে তুলে নিলো। অতঃপর ছোট একটি আঙুর মুখে দিতে দিতে জানতে চাইলো, তরমুজ কোনটা। বুঝলাম সে তখনো ফল চিনতে পারছে না কিংবা স্বাদ মনে করতে পারছে না। আমার আরেক লেখক বন্ধু যখন আমার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে জানতে চাইলো, বলতো ওর নাম কী। রিতা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে। ওর হাত আমার হাতে তখনো। সে চেষ্টা করলো মনে করতে। কিন্তু কিছুতেই তা না পেরে হতাশার স্বরে খুব ধিরে বলল, আমার কী হয়েছে, কেন এমন হচ্ছে ? অসহায় সেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আমরা উপস্থিত সকলে তাকে বোঝালাম, ‘ তোমার জটিল অপারেশন হয়েছে। আমাদের সবার দোয়া তোমার সাথে আছে। সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হবে। তুমি আবার লিখবে, আবার সবখানে যাবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা ‘। ফিরে আসবার সময় রিতার মাথায় হাত বুলাই, গালে গাল ছোঁয়াই। সে শিশুর মতো নিঃশব্দে হাসে। আস্তে করে বলে, ‘আমাকে কতো মানুষ ভালোবাসে !’ মিরাকল বলে কিছু যে আছে, সেটা জীবনে এই প্রথম দেখা আমার। খুব মিরাকলভাবে আমাদের লেখক বন্ধু রিতা জীবনে ফিরে এসেছে সত্যি, কিন্তু আমার বারবারই মনে হচ্ছিল আমাদের জীবনের পরিধি খুব ক্ষুদ্র। সমরেশ মজুমদারের কোন এক লেখায় পড়েছিলাম, ‘ মৃত্যু কী সহজ, কী নিঃশব্দে আসে, অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়।’ চারিদিকে কতো প্রতিযোগিতা ! কে কাকে পেছনে ঠেলে উপরে উঠবে, সেই প্রতিযোগিতা। অথচ সত্যিকারের জীবন তো প্রতিযোগিতার জীবন নয়। সত্যিকারের জীবন হচ্ছে সহযোগিতার। আমাদের আরেক লেখক বন্ধু আহমেদ হোসেন বাবু ভাইকে আমেরিকার ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট ( আইস) দেশে ফেরত পাঠিয়েছেন যেদিন, সেদিনও আমরা উপলব্ধি করি, বিদেশ বিভূঁইয়ের এই শহরে চারিদিকে যতই প্রতিযোগিতা কিংবা রেষারেষি থাকুক না কেন, একের প্রতি অপরের ভালোবাসা কিংবা মায়া কিন্তু কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। যান্ত্রিক এই শহরে হাজারো ব্যস্ততায় আমাদের হয়তো প্রতিদিন দেখা হয় না, আমাদের হয়তো কালেভদ্রে এখানে ওখানে দেখা হয়ে যায়। কিন্তু কারো বিপদে আপদে আমাদের মন কিন্তু ঠিকই কেঁদে উঠে। এই যে ক’দিন আহমেদ হোসেন বাবু ভাইয়ের ‘ পরিবার থেকে বিচ্ছেদের’ আচমকা এমন দুঃসংবাদে আমাদের মন বিষণ্ণ করে রাখলো, কিংবা এইচ বি রিতার ভয়ানক অসুস্থতার সংবাদে কী ভীষণ বিষাদময় হয়ে উঠেছিল সময়টুকু, এ কেবল অন্তরের অন্তস্থল থেকে একের প্রতি অপরের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। এই শহরের অচেনা থেকে চেনা হয়ে উঠা আপন মানুষগুলোর প্রতি গভীর এক ভালোবাসা বয়ে বেড়াই আমরা প্রতিটি মানুষ আমাদেরই অজান্তে। কী বৈচিত্র্যময় আমাদের জীবন ! আমরা তো পৃথিবীতে কচ্ছপের ন্যায় আয়ু নিয়ে আসিনি। পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। হাতে গোণা কিছু বছরই কেবল আমরা বেঁচে থাকবো এই সুন্দর ধরণিতে। এই যে বেঁচে আছি, এই বেঁচে থাকাটাই সুন্দর, আনন্দের।

আমার মেঝো মামী জীবনের শেষ কয়টি বছর ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচেছিলেন। প্রচণ্ড কষ্টদায়ক কেমোথেরাপি, যন্ত্রণাদায়ক রেডিওথেরাপি নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। তবুও বেঁচে থাকবার কী করুণ আকুতি করতেন। বলতেন, ‘ রোজ ভোরে ঘুম ভেঙ্গে একটি করে সকাল দেখি যখন, মনের আনন্দ ধরে রাখতে পারি না। স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নত হই। মনে হয় আরো একটি দিন বেঁচে আছি !’ নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে দেখতে দেখতে গিয়েছিলাম বেশ অনেক বছর আগে, যিনি স্বল্প জীবনের শেষ সময়টুকুতে শেষ চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ডাক্তাররা তার বেঁচে থাকবার সকল আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবুও ছেলেরা মাকে ব্যাথাহীন, যন্ত্রণাহীন কয়টি দিন বাঁচিয়ে রাখতে হাসপাতালে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখতে চেয়েছিলেন শেষ নিঃশ্বাস অবধি। কিন্তু তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, দেশে আমার আপনজনদের সান্নিধ্যে জীবনের শেষ কয়টা দিন কাটাতে চাই। শেষ আকুতি, শেষ অনুরোধ রাখতে অবশেষে ছেলেরা মাকে দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিদেশের বাড়িতে বসে একদিন আমি সেই আত্মীয়ের মৃত্যু সংবাদ পাই। চারপাশের মানুষদের এমন চলে যাওয়া কিংবা অসুস্থতা বারবারই মনে করিয়ে দেয়, আমাদের জীবন খুব ছোট। ছোট্ট এই জীবনে বেঁচে থাকা প্রতিটি দিন হোক আনন্দের। প্রতিটি দিন হোক মানবিক, হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত। আমাদের চারপাশের ভিনদেশি মানুষদের দেখে আমার কেবলই মনে হয়, ওরা বেঁচে থাকার প্রতিটি ক্ষণ নিজের মতো করে আনন্দে থাকে। সুন্দর উপভোগ্য জীবনের জন্যেই তাঁদের যত আয়োজন। রোজ ভোরে আমি যখন ছেলেকে নিয়ে কোচিং এ যাই, খানিক বিরতিতে পথে যে পার্কগুলো নজরে পড়ে, সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি খেলতে দেখি। কেউ দোলনায়, কেউবা স্লাইডে, আবার কেউ বল হাতে ছুটছে এ কোণ থেকে ও কোণের দিকে। দিনের শুরুতেই মুখরিত জীবন তাদের। আবার পার্কের সামনের ত্রিভুজাকৃতির যায়গাটুকুতে রোজ ভোরে কিছু নবীন প্রবীণ হাতে হাত মিলিয়ে সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে মিউজিকের তালে তালে অনেকটা নৃত্যের মতো করে শরীর চর্চা করতে দেখা যায়। এই যে সুন্দর সতেজভাবে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আয়োজন, জীবন তো এমনই হওয়া উচিত। যদিও প্রতিটি জীবনে চড়াই উৎরাই থাকবেই। টমাস মুরের একটি উক্তি মনে পড়ছে, ‘ নদীতে স্রোত আসে, তাই নদী বেগবান, জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, তাই জীবন বৈচিত্র্যময়। ‘ আবার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ভাষায়, ‘ জীবন এক অনিশ্চিত ভ্রমন ‘। তবুও এই অনিশ্চিত ভ্রমণটুকু আনন্দের হোক সকলের।

রিমি রুম্মান

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

১৫৯জন ২৭জন
16 Shares

১৭টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য