জীবনের দাম

রোকসানা খন্দকার রুকু ১১ আগস্ট ২০২০, মঙ্গলবার, ০৯:০৮:৫৫অপরাহ্ন সমসাময়িক ৩০ মন্তব্য

– চাচামিয়া যাবেন?

কোথায় যাবেন?

-গলাকাটা বাজার।

-চলেন।

-মা,এই বাজারের নাম  গলাকাটা কেন জানেন?

-আমি তো জানিনা তেমন,অল্প অল্প  শুনেছি।

শুনলাম ,রিকশাঅলা চাচার কাছে।বছর চল্লিশ আগে এক সকালে কে বা কারা একজন মানুষ এর গলা কেটে শুধু ধর ফেলে রেখে চলে গেছে।পুলিশ কোনভাবেই মাথা খুঁজে পায়নি তাই আর কেউ ধরাও পড়েনি কিংবা কোথাকার মানুষ কি তার পরিচয় কিছুই জানা যায়নি।আগে এই জায়গাটা ফাঁকা ছিল।কচুরীপানা ভর্তি বিশাল এক জলাশয় ।আশেপাশে বড় এলাকা জুড়ে বসতবাড়ি না থাকায় কেমন সুনশান নিরবতা।লোকজন তেমন একটা যাতায়াত করত না।দিনের বেলাতেই কেমন গা ছমছম করত।মধ্যরাতে গাঁজাখোররা বড় বড় গাছের তলায় বসে গাঁজা খেত।অপরিচিত কেউ পথ ভুলে চলে আসলেই বিপদ।তারসব কেড়ে নিয়ে মারধর করে ছেড়ে দিত।

চল্লিশ বছর আগের ঘটনা শুনতে শুনতেই এগোচ্ছি। আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলাম।

চাচা আরও জানালেন আমরা যে এলাকায় যাচ্ছি সেখানে ঈদের দিন বিকেলে দু’জনকে খুন করা হয়েছে আর কয়েকজন আহত।

এতক্ষন আগ্রহ তেমন একটা হয়নি।এবার সত্যিই শুনতে ইচ্ছে করল।

ঘটনার সুত্রপাত হয়,গতবছর রমজান মাসে। সাধারণত পুরুষেরা তারাবীর নামাজ মসজিদে গিয়ে আদায় করেন।পুরো মাস শেষ হওয়ার পর মুছল্লীদের কাছ থেকে কিছু কিছু করে টাকা নিয়ে মুয়াজ্জিন ও ইমামকে হাদিয়া স্বরুপ দেয়া হয়।এই হাদিয়ার কোন নির্দিষ্টতা নেই। মুছল্লীদের সামর্থ্য অনুযায়ী তারা দিয়ে থাকেন।

জনৈক আক্কাস আলীও তেমনি একজন মুছল্লী।পুরো রমজান মাস মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করছেন।সে গরীব কৃষকের ছেলে।জমিজমা থেকে কিছু আয় হয় আর অন্যের বাড়িতে কাজ করে তার সংসার চলে। তাঁর চাঁদা ধরা হয় তিনশত টাকা॥সেদিন তাঁর কাছে চাঁদা নিতে আসলে সে  দুইশ  পন্চাশ টাকা দেয়।তার কাছে আর টাকা নেই।বাকি টাকাটা যেন মাফ করে দেয় এই বলে হাত জোর করে।

মসজিদটি এলাকায় বেশ বড়সড়।লোকজনও অনেক হয়। মোটামুটি একটা চাঁদাও ওঠে।আর যিনি নামাজ পড়ান তিনি এলাকার জমিজিরাত অলা নামকরা হাজী সাহেবের ছেলে হাফেজে কোরআন। আক্কাসের পন্চাশ টাকা না পেলেও কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।

তারপরও মসজিদ  চাঁদা আদায়কারী আক্কাসকে জোর দিয়ে বলে টাকাটা যেন রেডি রাখে কাল নেবে। গ্রামে রমজান পরবর্তী সময়ে লোকজনের বেশ অভাব থাকে তাই পরদিনও সে টাকাটা দিতে পারেনা।

তৃতীয় দিন ইমাম তাঁর সঙ্গীদের পাঠিয়ে দেন টাকা নিতে।মাফ চাওয়ার পরও টাকা চাইতে আসায় আক্কাসের খানিকটা জেদ হয়।সে দিবে না তারা যা করার করুক।

শুরু হয় তর্ক। একপর্যায়ে সবাই মিলে আক্কাসের উপর চড়াও হয়।নিজেকে বাঁচাতে সেও খানিকটা কিলঘুষি মারে।

এতে করে ইমাম সাহেবের ইজ্জত চলে যায়। তাই তিনি স্হানীয় চেয়ারম্যানের কাছে বিচার দাবি করেন।তিনি দুপক্ষের সমঝোতা করে দেন।

-চাচামিয়া ব্যাপার তো মিটে গেল।তাহলে খুন কেন?

অবাক হলাম।তাও এক বছর পরে।

এ বছর করোনার জন্য তো নামাজ বাসায় হয়েছে। তাই ইমাম সাহেব বকেয়া টাকা তুলতে থাকেন।এ বছরও আক্কাস টাকাটা দেয় না।কারন হিসেবে সে বলে চেয়ারম্যান তো মিটমাট করে দিয়েছে।

ইমাম আবারও অপমানিত হয়।লোকজনকে দিয়ে হুমকি দেয় এবং এর একটা বিহিত তিনি করবেন।

ইমাম সাহেবরা চার ভাই।বড়জন বি ডি আর এ চাকুরী করতেন।বিডিয়ার বিদ্রোহের  আসামি ছিলেন তার চাকুরী চলে গেছে।মেজজন সাব-ইন্সপেকটর॥ছোটজন তেমন কিছু করেনা।মজার ব্যাপার হলো তার ভাই পুলিশ এই শক্তি তিনি সবখানেই প্রয়োগ করেন।

কোরবানি ঈদে সবাই বাড়িতে এসেছে।তিনিসহ সবাই বুদ্ধি করে আক্কাসকে মারধোর করবে।টাকার শোধ তো নিতে হবে।ঈদের দিন বিকেলে আককাস যায় বোনের বাড়ি।হাফেজরা চারভাই তাদের বাপ চাচা মিলে ধারালো অস্ত্র সহ বোনের বাড়িতে গিয়ে অতর্কিতে আক্কাসকে আক্রমন করে।বোন এসে ভাইকে বাঁচাতে টাকা দেয়,পা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কোন লাভ হয়না। টেনেহিঁচড়ে আঙ্গিনায় ফেলে মারতে থাকে। হাতে কোপ দেয়।হাত পড়ে যায়।আক্কাসের বউ এসে স্বামীকে রক্ষার জন্য গায়ের উপর শুয়ে পড়ে।তাকেও কিল ঘুষি মারে।

ইমাম বলতে থাকেন -এই ছুড়ি দিয়ে চারটা কোরবানি দিয়েছি তোরে না দিলে শান্তি নাই।তোরা ইসলামের শত্রু,ভালো কাজের টাকা থাকেনা?

এই বলে মাথা বরাবর কোপ দেয়।মাথার এক পাশ কেটে মগজ বের হয়ে যায়॥আক্কাসের বড় ভাই এগিয়ে এলে তাকে পেটে কোপ দেয়।এরপর সামনে যেই আসে তাকেই আহত করে। আক্কাসের মৃত্যু সাথে সাথেই হয়।ভাই মারা যায় হাসপাতালে আর দুবছর বিয়ে করা বউটির পেটের বাচ্চা  নষ্ট হয়ে যায়।

ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মোটামুটি ভালো একটা পরিবার যার স্বচ্ছলতা,চাকুরী ,ধর্মীয় শিক্ষা সব আছে অথচ একবছরেরও বেশি সময় আগের ঘটনা ধরে এতগুলো মানুষ মেরে ফেলল?তাঁদের শিক্ষা কতটুকু পরিপূর্ণ হয়েছে।হবেই বা ক্যামনে যে গুরুজনরা শি ক্ষা দেবেন তারা হাজী এবং মেম্বার হয়েও ছেলেদের মারামারির ইন্ধন যুগিয়েছেন।

এর পরবর্তী ঘটনা আরও মজার॥ সুযোগ সন্ধানী কিছু মানুষ ওত পেতে থাকেন যে কোন দূর্যোগে তাদের স্বার্থ রক্ত  উদ্ধারের। যেহেতু অনেক বড় ঘটনা তাই তারা রাতেই পালিয়ে যায়।এই সুযোগে অন্য গ্রামের লোকজন এসে তাদের বাড়ির সব লুটপাট করে নিয়ে যায়।ধান,চাল,গরু,হাসমুরগী ,টিভি,ফ্রিজ ঈদের মাংস সবকিছু।এক অন্যায়ের সুত্র ধরে আর একটা অ্ন্যায়ের জন্ম হয়। আমি সামনে একাত্তরের যে সব গল্প শুনেছি তাঁর চিত্র খুঁজে পাই।

মনে মনে বলি এত রক্ত, এত সম্ভ্রম ,এতকিছুর বিনিময়ে আমরা আজও কি স্বাধীনতা পেয়েছি?

নাকি “স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন?”

 

৩১৩জন ৯১জন
0 Shares

৩০টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য