জীবনের টান

আরজু মুক্তা ২১ জানুয়ারী ২০২১, বৃহস্পতিবার, ১১:২৮:১৬অপরাহ্ন গল্প ২৩ মন্তব্য

লিফট যতোই নীচে নামছে ততোই আমার মাথা চেপে বসছে কর্পোরেট অফিস, ব্যস্ততা, শহরের টান পোড়নের নানা অধ্যায়। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম জানান দিচ্ছে অতীতের পাতার নীরবতা। কি যেনো গলা পেঁচিয়ে আসছে!  উফ!  কী যন্ত্রণা!  মুক্ত বাতাসের স্পর্শ পেতে দ্রুত ফার্স্ট ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামছি।

” ড্রাইভার গাড়ি বের করো। ”

আজ বোর্ড মিটিং বসবে। কথা হবে আমাকে নিয়ে। যার সততার আড়ালে সবকিছু চাপা পরে যাবে কালকের ঘটনা। কেমনে পারলাম আমি?  একটা রাত!  না না।  মাত্র কয়েক ঘণ্টা। নিমিষেই সবকিছু ওলট পালট। কতো স্বপ্নের কবর রচিত হবে! অথচ এই স্বপ্নের জন্যেই সাদা মনের বাবা ভাই ভাবি —– তাদের অনুরোধ ছেড়ে নগরে প্রবেশ।

গাড়ি আজ কোথায় এসে থামলো। চেনা লাগছে পরিবেশটা, ঝুল বারান্দা, বাহারি পাতাবাহার, ফুল গাছ। আমি তো ড্রাইভারকে এখানে আসতে বলিনি। আবৃত্তির কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

” কমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিলো। ”

আস্তে আস্তে পা ফেলে  চলে আসি লিভিংরুমে। বা দিকের ঘরটার চৌকাঠে পা রেখে দেখি, আমার বড় ভাই আবৃত্তি শেখাচ্ছেন। কতো যে ভরাট কণ্ঠ !  ছেলে মেয়ে গুলো সমস্বরে বলছে তার সাথে সাথে। ঘরে কেমন জানি একটা প্রশান্তির ভাব। ফুলের সুবাস মৌ মৌ করছে। পাখির কলতান। পাশের বাসা থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্র সংগীত, ” তুই ফেলে এসেছিস কারে মন, মন রে আমার!”

আহা,  কী অপূর্ব,  কী মায়া!

” কী হলো তোমরা আবৃত্তি করছো না কেনো? ”

ভাইয়ার কথা শুনে একটি মেয়ে দরজার দিকে ইশারা করে।

” ভাইয়া বললো, আমার ছোট ভাই। আমাদের খোকা। ”

” কী রে তুই কখন এলি? ”

আমি কথা বলছি না দেখে ; ভাইয়া বললো,  “আজ ছুটি।  কবিতাটা সবাই চর্চা করবে।”

বড় ভাই গায়ে হাত দিয়ে বলে, কী রে হাঁপিয়ে গেছিস!  চল ছাদে যাই। নির্মল বাতাসে মন জুড়াবে।

এক একটা সিঁড়ি পেরুচ্ছি আর জীবনের মলাটের পাতা আওড়াচ্ছি। আমরা চার ভাই বোন।  বড় ভাই ১ ম শ্রেণি থেকে এম, এ সবখানেই ফার্স্ট। দু বোনও ভালো চাকরি করে। আমার তাদের ভাষা, সেকেলে চলাফেরা ভালো লাগতো না। কেমন জানি বাড়াবাড়ি। সকালে ওঠো, হেঁটে আসো, সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো। কোথাও যেতে হলে বাবা মায়ের আশীর্বাদ নাও। এক সঙ্গে খেতে বসো। খাওয়ার আগে প্রার্থনা করো, আবৃত্তি শিখো। এতো সব মানতে ভালো লাগতো না। আমার চোখ  ঐ দূরের ১৫ তালাতে আটকে থাকতো। মনে হতো উপর থেকে জীবন উপভোগ করা সহজ।

” কী রে কি ভাবছিস?  আমার জীবন?  আমি হয়তো অনেক বড় চাকরি পেতাম। কিন্তু এই যে সকালে উঠে রোদমাখা,  একটু বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখা, গাছের পাতা চেনা, আনমনে গুনগুন করে গান করা। এটাই বা কম কীসে?  কলেজ যাই। ক্লাস নিই। ছাত্র ছাত্রীরা আমার কথা প্রাণ ভরে শোনে। এই ভালো লাগাটা কি তুই পেয়েছিস? ”

ভাইয়ার কথা শুনে, শুধু তাকাই।

” বাবা,  আমি শহরে যাবো। কলেজের চাকরি,  আমার ভালো লাগে না। তাছাড়া ব্যাংকের এই লোভনীয় অফারটা মিস করতে চাচ্ছিলাম না।”

বাবা বলে, ” তুমি অনেক পড়ালেখা শিখেছো। আমার থেকে বেশি বোঝ। তুমিই সিদ্ধান্ত নাও। ”

“রুমে এসে দরজা লাগিয়ে সজোরে চেয়ারে একটা লাথি দেই। এদের কথা ভাবলে উপরে ওঠা যাবে না। কালকেই লাগেজ গোছাতে হবে।”

রোদ মেখে দেখছিস তোর কতো ভালো লাগছে। দেখবি সব বিষাক্ত পদার্থ কিছুক্ষণের মধ্যে তোর গা থেকে চলে যাবে।

ভাইয়ার কথা শুনে,  আমার চোখ বেয়ে পানি আসতে চাইলো। আমি কাঁদতে পারছিনা। কণ্ঠরোধ।

স্মৃতি শুধু টানছে। পরদিন গাড়ি ডেকে লাগেজ উঠিয়ে চলে গেলাম। চাকরিতে জয়েন করলাম। আট তলার ফ্ল্যাট বরাদ্দ। কর্পোরেট জব। স্যুট টাই!!  টাকা আসে। ফার্ণিচারও বদল হয়। জীবন ঘুরতে থাকে বৃত্তের বাইরে গিয়ে। জীবন সঙ্গিনী বাসায় থাকে। তবুও খুঁজি কর্পোরেট ভালোবাসা। এখানে লোডশেডিং হয় না। নীল লালচে রঙিন আলোর ঝলকানি।

আমার স্ত্রী রুবা,  ও থেমে নেই। সুন্দরি, সপ্রতিভ, মার্জিত, নিখুঁত ইংরেজি ফ্রেন্স বলার কারণে প্রতিটি অনুষ্ঠান ফিরে পায় সজীবতা। সবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পুরুষদের চোখে অবশ্য প্রশংসা ছাড়া অন্য কিছু থাকে। আর রুবা সেটা বোঝে।  সেই অহংবোধটা সে ললিপপের মতো চুষে খায়। আমিও কিছু বলি না। নিজেই তো সময় দেই না।

এখন বুঝি,  ভাবী বা মা আমাদের জন্য কেনো অপেক্ষা করতো ভাতের প্লেট নিয়ে। কর্পোরেট দুনিয়ায় আন্তরিকতা হচ্ছে টাইমবারড। দুজনের দুই পার্টি। নাইট ক্লাব। ফিরি রাত ১/২ টায়। যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে যাই। সকালে সেই কুক,  দারোয়ান, ড্রাইভার। আমি নিঃশেষ।

“ভাইয়া বলছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি হবে। ঈষাণ কোণে মেঘ জমেছে। তোর গায়ের সব কলুষতা পঙ্কিলতা ধুয়ে মুছে যাবে। নতুন ঘ্রাণ পাবি। ”

আমিও চাই বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে আমি কাঁদতে পারবো। কান্না লুকাতে পারবো।

আজ রুবার জন্মদিন। পি এ কে দিয়ে উপহার কিনে আনলাম। রাতে জমজমাট পার্টি থাকছে। বাড়ি ফিরে বললাম,  আমি নিজে পছন্দ করে কিনেছি। ইন্টারকমে  ফোন। “স্যার আপনার বাবা, ভাই, ভাবি এসেছেন। ফোনটা দাও। ওহহো!  কতোদিন বলেছি, ফোন করে তারপর আসবে!  ভাবি বললো, আমাদের মনে ছিলো না। তোর বাসায় অনুষ্ঠান না?  আমরা আর একদিন আসবো! ”

নেশায় বুঁদ আমরা। আত্মার টান এখানে কাজ করে না। নির্দয় কলুপ আটা, বন্দি খাঁচার পাখি আমরা।

বৃষ্টিটা এসে শান্তির প্রলেপ দিয়ে গেলো। বুঝলাম, কী ভুল করেছি। কতো কষ্ট দিয়েছি তাদের!  অথচ কঠিন মুহূর্তে ওরাই পাশে।

ভাইয়া……

বল।

আমি বড় অন্যায় করেছি।

তুই যে নিজেই বুঝতে পারছিস এটাই বড়। মানুষের একান্ত অনেক বিষয় থাকে। বিবেকের সামনে দাঁড়াতে যেনো পারি : এটা খেয়াল রাখতে হয়। বিবেকের কাছে ছোট হতে নেই।

৪৯২জন ৩৫জন
0 Shares

২৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য