জীবনের গল্প-৬

নিতাই বাবু ২২ জুলাই ২০২০, বুধবার, ০৮:৩৩:৩৩অপরাহ্ন স্মৃতিকথা ২২ মন্তব্য

জীবনের গল্প-৫ এখানে

জীবনের গল্প-৫-এর শেষাংশ: মেজো দিদি মারা যাবার চার-পাঁচ মাস পর জামাইবাবু আরেক বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করে। দিদির রেখে যাওয়া এক বছরের মেয়েটি শেষতক আমাদেরই লালন-পালন করতে হয়। মেজো দিদির মৃত্যুর পর বাবার অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে।

মেজো দিদি মারা যাওয়ার পর বাবার অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, তখন আর বাবাকে নিয়ে চিত্তরঞ্জন কটন মিলে গিয়ে ঔষধ খরচের টাকাও আনা সম্ভব হচ্ছিল না। চিত্তরঞ্জন মিল কর্তৃপক্ষও বাবার অনুপস্থিতে স্বাক্ষর বিহীন টাকা আমাদের কারোর কাছে দিতো না। মাস শেষে বাবার বেতনের টাকা তোলার জন্যও বাবাকে আদর্শ কটন মিল থেকে রিজার্ভ নৌকা করে চিত্তরঞ্জন কটন মিলের নদী ঘাটে নৌকা বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। তারপরও মাসের বেতন হাতে পেতে মাস শেষে বাবাকে নিয়ে দুই-তিন চিত্তরঞ্জন কটন মিলে যেতে হতো। এভাবে চলতে চলতে আমাদের সংসারের অবস্থাও দিন-দিন খারাপ হতে থাকে। সেইসাথে আমার লেখাপড়াও মাটির সাথে মিশে যেতে থাকে। মোটকথা তখন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে সপ্তাহের প্রত্যেকদিন ১০ টাকা মজুরিতে নিয়মিত কাজ করতে লাগলাম।

একসময় বাবাকে আর কোনও অবস্থাতেই নৌকায় করেও চিত্তরঞ্জন কটন মিলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তখন উপায়ন্তর না দেখে বাবা চিত্তরঞ্জন কটন মিলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার জন্য অবসরপত্র জমা দেয়। সেই অবসরপত্র মিল কর্তৃপক্ষের কাছে গৃহীত হয় একমাস পর। তারও দুইমাস পর বাবার চাকরির সার্ভিসের বিভিন্ন ভাতা-সহ টোটাল হিসাব হাতে পেয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে আমাদের ৮ সদস্যের সংসার যে কীভাবে চলেছিল, তা আর আমার এই লেখায় তুলে ধরতে পারলাম না, শর্টকাট করে বলে ফেলি।

বাবা চাকরি ছাড়ার দরখাস্ত দেওয়ার পর সংসারের করুণ অবস্থা দেখে আমি আদর্শ কটন মিলের ডেইলি কাজও ছেড়ে দিয়েছিলাম। কারণ প্রতিদিন কাজ থাকতো না! দুইদিন কাজ হতো, তো দুইদিন থাকতো না। এভাবে তো সে-অবস্থায় অন্তত আমার হচ্ছে না। কারণ হলো, অভাবগ্রস্থ সংসার তো ছিলোই, তারপরও ছিল আমার বাড়তি পকেট খরচ। যেমন– কাজের খাতিরে সহ-লেবারদের সাথে থেকে চা-বিড়ি-পান-সহ আরও নানারকম খরচ আমার এমনিতেই বেড়ে গিয়েছিল। যা দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য ওই লেবারদের সাথে কাজ করতেই গিয়েই, স্কুলে থাকতেই বিড়ি টানার বদভ্যাসটা হয়েগিয়েছিল। কাজ না থাকলে স্কুলে যাবার সময় নারায়ণগঞ্জের কাইয়ুম দু’চারটা পকেটে করে সাথে নিয়ে যেতাম। সময় সুযোগ বুঝে স্কুলের বাইরে গিয়ে ফুছুর-ফাছুর টনে আবার ক্লাসে আসতাম। যখন স্কুলে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিয়ে ওঁদের সাথে নিয়মিত কাজ করতে লাগলাম, পান-বিড়ি-সিগারেটও নিয়মিত টানতে লাগলাম। তখন চা-বিড়ি ছাড়া আমার মোটেও চলচ্ছিল না। তাই একদিন কাজ করে দুইদিন বসে থাকাটাও আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। বাধ্যতামূলক আদর্শ কটন মিলের ডেইলি কাজ ছড়ে দিয়ে নতুন করে এক মসজিদ নির্মাণের কাজে লাগে গেলাম।  মসজিদ তৈরি হচ্ছিল আদর্শ কটন মিলের ভেতরেই।

মসজিদের নির্মাণ কাজে সপ্তাহের প্রতিদিনই কাজ চলবে। সপ্তাহে শুধু একদিন সপ্তাহিক ছুটি থাকবে। আমার সাথে মিলের ভেতরে থাকা সমবয়সী আরও দুইজন লেবার ছিল। আমরা তিনজনে দৈনিক ১০ টাকা মজুরিতে নিয়মিত মসজিদ নির্মাণের কাজ করতে থাকি। সেই মসজিদ নির্মাণের কন্ট্রাক্টর ছিলেন চট্টগ্রামের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আমাদের কাজ দেখে সেই কন্ট্রাক্টরের পছন্দ হয়ে যায় এবং তিনি আমাদের চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে ইচ্ছাপোষণ করে। তখন আদর্শ কটন মিলের মসজিদ নির্মাণের কাজের সাথে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় উনার আরও কাজ চলছিল।

আমি ছিলাম ঢালাই মাল বানোর মধ্য সেরা একজন। কন্ট্রাক্টর সাহেব বিশেষ করে আমার কাজ দেখেই পছন্দ করেছিল। তিনি প্রতিদিনই বিকালবেলা কাজ শেষে তাঁর সাথে চট্রগ্রাম যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতো। চট্টগ্রাম গেলে আমরা আরও ২টাকা রোজ বেশি পাবো বলেও কন্ট্রাক্টর সাহেব বলতো। এই ২ টাকার লোভে আমার সাথের দুইজন রাজি হয়ে গেল। কিন্তু আমি রাজি হচ্ছিলাম না, মা যদি যেতে না দেয়, তাই। তাছাড়া বাসায় অসুস্থ বাবা শয্যাশায়ী। সংসারের ভার বড়দাদা একা কোনমতেই সইতে পারবে না, সেই চিন্তাও আমার মাথায় ছিল। কিন্তু প্রতিদিন সাথের দুই জনের খোঁচানিতে আর ঠিক থাকতে পারলাম না, ওঁদের সাথে যাবো বলে কথা দিলাম। কিন্তু আমি আমার মা’কে না জানিয়ে কোনও অবস্থাতেই চট্টগ্রাম যাবো না, তাও বলেছিলাম।

ওঁদের সাথে কথা দিয়ে একদিন মাকে জানালাম চট্রগ্রাম যাবার কথা। মা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। বাবা বড়দাদা তো না-না-না-এর  মধ্যেই থেকে গেল। কিন্তু কন্ট্রাক্টর সাহেব, আর সাথের দুইজনের তাগাদায় একসময় আমিও তাঁদের কথা দিলাম, মা রাজি থাকুক আর না থাকুক; চট্রগ্রাম যাবোই। তবে চট্টগ্রাম যাওয়ার আগে কন্ট্রাক্টর সাহেবকে জনপ্রতি ১০০ টাকা করে অগ্রীম দিতে হবে এবং যাওয়ার ভাড়া ও কাজে যোগদান করার আগ পর্যন্ত আমাদের খাওয়া খরচও দিতে হবে। কন্ট্রাক্টর সাহেব তা রাজি হয়ে গেলো। আমরাও খুশিতে হলাম আটখানা। মনে মনে ১২ টাকা খরচের হিসাব কষতে লাগলাম। ১২ টাকা থেকে প্রতিদিন ৫ টাকা খরচ করে বাকি ৭ টাকা বাসায় পাঠাতে পারলেই, মা-ও হবে খুশিতে আটখানা। 

মনে মনে এই হিসাব মাথায় রেখে বাসায় আসলাম। মাকে অনেক লোভ দেখালাম, যাবার আগে ১০০ টাকা দিয়ে যাবো বলে কথা দিলাম। আর প্রতিমাসে মানি অর্ডার করে টাকা পাঠাবো, সেটাও বললাম। আমার কথায় মা-ও লোভে পড়ে রাজি হয়ে গেল। আসার একদিন আগে অগ্রীম বাবদ পাওয়া ১০০ টাকা মায়ের হাতে দিলাম। ১০০ টাকা হাতে পেয়ে মা অনেক খুশি হলেন। মা বাবা ও বড় দাদাকে না জানিয়ে তা মনেই রেখে দিলেন। আসার সময় মা আমাকে ২০ টাকা খরচ করার জন্য সাথে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় দিলেন। আমরা তিনজন আদর্শ কটন মিল থেকে কন্ট্রাক্টরের সাথে চট্রগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওঁরা সাথে করে ওঁদের বেডিংপত্র নিয়ে নিলো। আমিও দুটো কাঁথা, একটা বালিশ, দুটো লুঙ্গি-সহ আমার পড়ার বইগুলো গাট্টির ভেতরে ঢুকিয়ে বেঁধে নিলাম। উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম গিয়ে কাজের অবসরে নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার। আমার সাথে যে দুইজন লেবার চট্টগ্রাম যাচ্ছে, তাঁদের একজনের নাম ইসরাফিল, অন্যজনের নাম মোহাম্মদ লোকমান হোসেন। আদর্শ কটন মিলের আসার পর থেকে এই দুইজনই আমার খোঁজখবর বেশি রাখাতো। সবসময় কাজও করতাম ওঁদের সাথে। চট্রগ্রামও যাওয়া হচ্ছে ওঁদের ইচ্ছার কারণেই।

একসময় যাঁর যাঁর মা-বাবার কাছে বলেকয়ে কন্ট্রাক্টর সাহেব-সহ আমারা চট্রগ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম। তখন ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে চট্রগ্রামের ভাড়া ছিল জনপ্রতি ২০ টাকা। একসময় ঢাকা থেকে রাতের ট্রেনে কন্ট্রাক্টর-সহ আমরা তিনজন চট্রগ্রাম পৌছলাম। সকালে ট্রেন থেকে নামার পর কন্ট্রাক্টর সাহেব প্রথমে আমাদের তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনজনকে নাস্তা খাওয়ালেন। একটু বিশ্রাম করতে দোতালা বাসার বারান্দায় শুতে দিলেন। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকালবেলা কন্ট্রাক্টর সাহেব আমাদের সাথে করে আজডিপুর নামক স্থানে এক টিলার উপরে নিয়ে গেলেন।

সেই টিলার উপরে এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর বাসভবন নির্মাণের কাজ চলছিল, নির্মাণ কাজের কন্ট্রাক্ট ছিল এই কন্ট্রাক্টর সাহেবেরই। সেখা গিয়ে কাজের দেখবাল করার দায়িত্বে থাকা কন্ট্রাক্টরের ম্যানেজারকে আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে কন্ট্রাক্টর সাহেব তাঁর বাসায় ফিরে গেলেন। সেদিন সেই টিলার উপরই আরও লেবারদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করে নির্মাণাধীন ভবনে সবার সাথে আমারাও ঘুমিয়ে পড়ি। রাত শেষে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে লেবারদের রান্না করা ডাল-ভাত খেয়ে আমাদের কী কাজ করতে হবে তা জানতে গেলাম, ম্যানেজারের কাছে। ম্যানেজার সাহেব আরও চার-পাঁচজন লেবারদের সাথে টিলার নিচ থেকে উপরে বালু ওঠানোর কথা বললেন।

টিলাটা ছিল পাহাড়ের মতো উঁচু। অনেক উঁচু টিলা হলেও সেখানকার পার্মানেন্ট লেবারদের কাছে যেন কোনও ব্যাপারই মনে হচ্ছিল না। তাঁরা দস্তুরমত বালুর টুকরি মাথায় নিয়ে দৌড়ে টিলার উপরে ওঠানামা করতে লাগলো। কিন্তু সেই কাজ আমাদের তিনজনের পক্ষে তা দুই ঘণ্টাও করা সম্ভব হচ্ছিল না। একসময় আমারা অস্থির হয়ে টিলার নিচেই চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়লাম। আমাদের এ অবস্থা দেখে সেখানকার স্থায়ী লেবাররা কেউ হাসাহাসি করতে লাগলো।কেউ দৌড়ে গিয়ে ম্যানেজার সাহেবকে খবর দিলো। ম্যানেজার দৌড়ে টিলার নিচে আসলো। ম্যানেজার সাহেব  টিলার নিচে নিচে আসলো। বালুর স্তুপের সামনে এসে ম্যানেজার সাহেব দেখে আমরা তিনজন পাহাড়ের লালমাটির উপর চিৎপটাং হয়ে মরার মতো পড়ে আছি। ম্যানেজার সাহেব আমাদের টেনে ওঠালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই কাজ আমরা পারবো কি-না?’ আমরা হাতজোড় করে মাথা নেড়ে না-ই করলাম। আমাদের হাতজোড়ে ম্যানেজার সাহেবের দয়া হলো।

ম্যানেজার সাহেবে আমাদের সাথে করে নিকটস্থ রাস্তার পাশে এক দোকানে নিয়ে গেলো। যাঁর যাঁরমতো চা-বিস্কুট খেতে বললো। আমরা ক্লান্ত শরীরে বেশ কয়েকটা পাউরুটি-সহ পান-বিড়ি হজম করলাম। আমাদের সাথে ম্যানেজার সাহেবও চা পান করলেন। এরপর টিলার উপরে নিয়ে হালকা-পাতলা অন্য কাজ আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। আমরা তিনজন বুঝিয়ে দেওয়া সেই কাজ মনোযোগ সহকারে করতে লাগলাম। এক সপ্তাহ পর কন্ট্রাক্টর সাহেব কাজের সাইটে আসলেন। সবার কাজের মজুরি বুঝিয়ে দিলেন। আমাদেরও সেই কথামতো দৈনিক ১২ টাকা হারে বুঝিয়ে দিলেন। তা নিয়ে সেখানকার স্থায়ী লেবারদের সাথে কন্ট্রাক্টর সাহেবের একটু মন কষাকষিও হয়েছিল।

সেখানকার লেবারদের কথা হলো, ‘ওঁরা কোনও কাজই পারে না, অথচ ওঁদের মজুরি ১২ টাকা। আর আমাদের মজুরি ১০ টকা হবে কেন?’ ওখানকার লেবারদের কথা শেষে কন্ট্রাক্টর আমাদের কাজের বর্ণনা বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওঁরা যা পারে, তা তোমরা আরও দুইবছরেও শিখতে পারবে না। আর আমি ওঁদের ঢাকা থেকে এখানকার কাজের জন্য আনিনি। ওঁদের এনেছি মহেশখালীতে রাস্তা নির্মাণ কাজের জন্য। ওঁরা শুধু আজ রাত পর্যন্তই এখানে থাকবে। গতকাল সকালেই আমি ওঁদের সাথে করে মহেশখালীর উদ্দেশে রওনা দিবো। সেখানেই ওঁরা কাজ করবে।’ এই বলেই কন্ট্রাক্টর সাহেব আমাদের এই নির্মাণাধীন ভবনে রেখে উনার বাসায় চলে যায়। আমারা রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে যাঁর যাঁরমতো ঘুমিয়ে পড়ি। রাত পোহালেই যেতে হবে মহেশখালী।

চলবে…

জীবনের গল্প-৭

জীবনের গল্প-১ এখানে

৩৪৪জন ১৯০জন
0 Shares

২২টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

ফেইসবুকে সোনেলা ব্লগ

লেখকের সর্বশেষ মন্তব্য